পরম সুখপাঠ্য গল্পের ঝাঁপি

অ+ অ-

চিনুয়া আচেবে বলেছেন, মানুষ হতে হলে অবশ্যই তার গল্প থাকতে হবে। চারপাশের সবকিছুই গল্প, গল্পেই সবকিছু। মাহবুব মোর্শেদও একজন গল্পময় মানুষ। মানবসম্পর্ক, সম্পর্কের ভেতরের রঙ ও রেখার ছবি নিয়ে তার গল্প, যেখানে চুপচাপ রহস্য, ইশারা-আভাস। বাংলা গল্পে বুদ্ধির চেয়ে হৃদয়ের আবেদন বেশি। তার গল্পে এই ধারা বহমান, পরিচিত চৌহদ্দির মধ্যে ঘোরাঘুরি করে চরিত্র, কাহিনি যা সহজ সরল স্পষ্ট, নাটকীয় মুহূর্তে জমজমাট, তলদেশে লুকিয়ে থাকে নিগূঢ় চৌম্বকীয় টান।

মাহবুব মোর্শেদের বাসনাবিলাস বইয়ের প্রথম গল্প ‘ঘ্রাণ’র প্রাণ হলো প্রেম। তনিমার এই প্রেম অসহ্যের, কাউকে বলা যায় না। দীর্ঘদিন কথাবলা, একদিনই দেখা করা—তারপর সব শেষ। বিবাহিতা, দুই বাচ্চার মা তনিমা দাম্পত্য জীবনের পানশে, একঘেয়ে বৃত্তে আবদ্ধ থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে ওঠে। তখনই আলাউদ্দিন নামের গাছপ্রেমী পুরুষের আবির্ভাব। গাছপ্রেমী পুরুষ শরীরপ্রেমী হয়ে ওঠে কৌশলে, রমনার বটমূলে বৈশাখ উদযাপনের গরম সকালে, রিকশায়। এত বছর পরেও ওয়ারড্রব থেকে শাড়ি বের করতে গিয়ে সেইদিনের ঘামভেজানো প্রেমিক পুরুষের ঘ্রাণ ধাক্কা দেয় তনিমাকে। সে বুঝতে পারে না, ‘আবেশটা তাকে কেন কাঁপিয়ে দিচ্ছে...।’ গল্পটি পড়তে পড়তে পাঠক থেমে যাবেন, চোখ বুজবেন, হারানো মানুষকে মনে করবেন। গল্পের সিনেমাটিক দৃশ্যগুলো খুবই স্বচ্ছ, গাঢ়, মনোহর।

‘সোলমেট’ গল্পের প্রেক্ষাপট বেশ অভিনব। ভার্চুয়াল সেক্স এখনকার দিনে ডালভাত। কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্ক মানুষ সবাই কমবেশি এ বিষয়ে জানে, কিংবা অভিজ্ঞ। ভার্চুয়াল সেক্স করে গর্ভবতী, এমন ধরনের মিস্টিরিয়াস ঘটনা এ গল্পের বিষয়। প্রেম জিনিসটাই একটা ধাঁধা। তাই বিবাহিত, বাচ্চাদের বাবা, বিদেশে সেটেল্ড মনোয়ার বিবাহিতা তুষির প্রেমে পড়ে। দুজনে খুঁজে পায় তাদের সোলমেট। তুষি স্বামীর সঙ্গে থাকে, অথচ বাচ্চার বাবা হিসেবে দাবি করে মনোয়ারকে। কিন্তু এই কথা বিশ্বাস করবে কেউ? তুষির স্বামী নাইম, মনোয়ার...আচ্ছা আপনি কি করছেন? কিন্তু নাইম এখন বাবা হওয়ার গৌরব থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবে কেন? ‘কারণ এরই মধ্যে নাইম জেনে গেছে বাচ্চাটা তার। ঘুমের ঘোরে স্বপ্নের মধ্যে কোনো একটা ঘটনার ফলে তুষির পেটে নাইমের বাচ্চা এসেছে।’ সুমাইয়া, মনোয়ারের স্ত্রী, ব্যতিক্রমী এক নারী চরিত্র। গল্পটাতে স্বয়ং লেখক হাজির, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও এমন করে থাকতেন।

‘বদলি’ গল্পটি নাটকীয় ঘরানায় তীব্র। শেষ পর্যন্ত না পড়লে আপনি বুঝতেই পারবেন না কে কার সঙ্গে কতটুকু জড়িয়ে ছিল, জড়িয়ে যাবে। রুবার প্রেমিকাসুলভ মনোভাব, অথচ সে বিবাহিতা, ব্যাচেলর শাকিলের সঙ্গে তার দৈহিক সম্পর্ক চলমান। দৈহিক স্বাদ পেয়ে গেলে পুরুষ যা করে শাকিলও তাই করছে, অবশ্য মেয়েরাও এখন পিছিয়ে নেই। কিন্তু গল্পকথক, শাকিলের বন্ধু ও রুমমেট, তার করণীয় কী? রুবাকে সাহায্য করা? নাকি শাকিলের শূন্যস্থান পূরণ করা? ‘দুই হাত উঁচু করে খোঁপা থেকে সাবধানে বেলি ফুলের মালা খুলতে খুলতে রুবা বলে, যাবার সময় মনে করবা, ফুলগুলো খোঁপায় গুঁজে নিতে হবে।’ ধরতে পারছেন পাঠক?

‘রিপনের হাতঘড়ি’ বখাটে ছাত্ররাজনীতির নগ্নতা নিয়ে লেখা। ইডেন কলেজের নেত্রীর কথা মনে আছে যে মন্ত্রী-আমলাদের সুন্দরী মেয়ে সরবরাহ করত? কিংবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সেঞ্চুরি করা বড় ভাইয়ের কথা? এর মানে আর সব প্রতিষ্ঠানের নেতারা ভালো তেমনটা নয়। ‘এই চুৎমারানির খালি হাত মারার ধান্দা। আরে মাদারচোদ, ফিলিংস হইতেছে রাজা-বাদশার মতো। রাজা কোনোদিন হাত মারে? জীবনেও শুনছিস কোনো রাজার হাত মারার কথা? আমরা এইখানকার রাজা না?’ কিন্তু গল্পে যাদের কথা বলা হচ্ছে, তারা ততটা খারাপ নয়, যতটা খারাপ দেখতে পায়, শুনতে পায়। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, যৌনতা পেরিয়ে লেখক গল্পটা এমন জায়গায় টেনে নিয়েছেন যা অকল্পনীয়।

‘জাম্বুরা’র বিষয় খুব চেনা। ধনী বন্ধু, গরিব বন্ধু, টানাপোড়েন, ঈর্ষা, শেষমেশ পরিণতি। বন্ধুকে কব্জা করতে বউকে এগিয়ে দেওয়া, নাকি বউয়েরই এগিয়ে যাওয়া—মধ্যবিত্তের দাম্পত্য জীবনে এমনটা অনেকেরই কমবেশি হয়ে থাকে। ‘জাম্বুরা কিন্তু বেশ হইছে দোস্ত। সব কটা গাছ জাম্বুরায় হলফল করে উঠছে। পাতায় কী মিষ্টি গন্ধ রে!’ মঞ্জুরের এই আহ্বান মাকসুদ উপেক্ষা করে যায় নিজের ভয়ে, স্ত্রী নওরীনের ভয়ে। কারণ, মেয়েদের সিক্স সেন্স কাজ করে বেশি। কিন্তু শেষমেশ ভয়কে জয় করে এগিয়ে যায় মাকসুদ। রুমানা কি অপার হয়ে বসে আছে? অবশ্যই... তারপর? তারপর পাঠকের মুগ্ধ হওয়ার পালা...

কে কখন কোথায় যে আটকা পড়ে আগাম তা বলা যায় না। ‘বুশরা’ গল্পে যে টানাপোড়েন দেখানো হয়েছে তা দাম্পত্যের, তাই বলে এমনভাবে? বুশরার মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্বে শরৎচন্দ্রীয় আবেশ, আকবরের পাকাপোক্ত সন্দেহ, নাফিজের কূল হারানো, না বুশরা, না নুশরা; কিন্তু আকবর দিশাহীন, স্ট্রাগল করে দাঁড়ানো পুরুষ হতাশায় নিমজ্জিত। মানুষ মূলত কী চায়? টাকা? সময়? ভালোবাসা? এ সবই আকবরের আছে, তাহলে বুশরা, এক বাচ্চার মা, তমালের সঙ্গে চলে গেল কেন? এখানেই গল্পের আসল টুইস্ট।

লেখকরা আড্ডাপ্রিয় হয়। সম্ভোগ, পান, গান, নাচ মিলিয়ে জমজমাট হয়ে ওঠে এখনকার আড্ডাগুলো। ‘ইখতিয়ারের জন্মদিন’ গল্পে জন্মদিন পালনের জন্য ইখতিয়ার সবান্ধব বন্ধুর বাগানবাড়িতে উপস্থিত হয়। সেখানে মাতলামি, ইতরামি পেরিয়ে কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষ; ইখতিয়াররা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। গল্পে পুঁজিপতিদের প্রতি ঘৃণা, সৃজনশীল মানুষের নষ্টামি সাদামাটাভাবে উঠে এসেছে। ‘সে আমাকে রেখেছে দিনের পর দিন ভোগ করার জন্য। কিন্তু বিয়ের কথা বললে খেপে যায়।’

বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও শক্তিশালী গল্পটির নাম ‘স্যাপিওসেক্সুয়াল।’ উত্তম পুরুষে বলা গল্পটিতে ঋতুপর্ণ ঘোষ কিংবা তুরস্কের চলচ্চিত্রকার Nuri Bilge Ceylan-এর সিনেমাটোগ্রাফির নজির আছে। পড়তে পড়তে খেই হারিয়ে যায়, মুগ্ধতায় চমকে ও থমকে যেতে হয়। মানুষের বুকে থাকে নানা চিত্র, গল্প, ভালোবাসার স্তর। গল্পটি পড়তে পড়তে সৈয়দ হকের ‘ঈর্ষা’ নাটকের প্রৌঢ় শিল্পীর কথা মনে পড়ছিল যে তার ছাত্রীর প্রেমে পড়েছিলেন, ছাত্রীও নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিল প্রেমিকের তুলির আঁচড়ে। চিত্রশিল্পী আখতারুল ইসলামের ব্যক্তিজীবন, শিল্পীজীবনের সঙ্গে শিল্পসংগ্রাহক কায়সার ও লেখক মঈনের সান্নিধ্য, প্রিয়দর্শিনী গায়িকা সুহাসিনী ও মডেল তৃণার নগ্ন স্কেচ অঙ্কন, কায়সারের সঙ্গে সুহাসিনীর প্রেম—সবমিলিয়ে বৃহৎ ক্যানভাসের গল্পটি এ বইয়ের তো অবশ্যই, লেখকেরও অন্যতম সেরা গল্প। এমন করে শিল্পী ও শিল্প নিয়ে মানুষের অন্দরমহলে ঢুকে কাহিনি বিস্তার করা চাট্টিখানি কথা নয়। মেঘ ও বৃষ্টির সঙ্গে মানুষ ও যৌনতা এবং শিল্পী ও সৌন্দর্য মিলেমিশে একাকার। এমন নাটকীয় ভঙ্গি, আভাস ও ইঙ্গিত, রহস্য, প্রকাশের লুকোচুরি, স্ল্যাংয়ের টেকসই, নান্দনিক ব্যবহার শিল্পিত, পরিশীলিত মানদণ্ডে দারুণভাবে উত্তীর্ণ। শুধু এ গল্পটি পড়ার জন্যও বইটি সংগ্রহ করা যায়।

‘বাসনাবিলাস’ মাহবুব মোর্শেদের আটটি ভিন্ন স্বাদের গল্পের সমাহার যেখানে বিবাহিত নারী-পুরুষের আনাচ-কানাচ, প্রেম, রুচিবোধ সরল ও মাখোমাখো গদ্যে ঝলমলে। বর্ণনা বেশ বাহুল্যহীন, তবে খানিকটা ভাবালুতাময়, অতৃপ্তিবোধে উজ্জীবিত, কথক ও লেখকের মধ্যে ভারসাম্যহীনতাও লক্ষণীয়। শিল্পাভিমুখী যাত্রায় একনিষ্ঠ লেখক গল্পের শুরুটা গতানুগতিক করলেও অপ্রত্যাশিত সমাপ্তি টেনেছেন। মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজবাস্তবতায় বিয়ে নারীদের অন্তঃস্থ জীবনের সর্বনাশ করে—মাহবুব মোর্শেদের কোনো কোনো গল্পে নারী মোপাসাঁর গল্পের নারী চরিত্রের মতোই বস্তু এবং যৌন-অঙ্গও। নারী কতখানি সমাজের তৈরি, আর কতখানি শারীরবৃত্তীয় পরিচয়ে নারী, তা নির্ণয় করা এবং সমাজের তৈরি নারীদের ক্ষেত্রে সমাজের এই নারীকরণ প্রক্রিয়ায় ভাষার অবদান কতখানি, তা নির্ধারণের চেষ্টাও আছে। বইয়ের নামের সঙ্গে গল্পগুলোর খুবই মিল। প্রত্যেকটি গল্পের চরিত্র ও সংলাপ স্বচ্ছ, সাবলীল ও নান্দনিক, নাটকীয় টানে মুখর। শব্দের যথার্থ ও যৌক্তিক ব্যবহার, উপকাহিনীর অপূর্ব যোগসূত্র স্থাপন, মিষ্টি গদ্যের গল্পগুলো অত্যন্ত সুখপাঠ্য যা বার বার পড়ার জোরালো অনুভূতি তৈরি করে।