নিত্য-অনিত্যের শব্দের জার্নাল
কিছু কিছু শব্দ আচমকা আমাকে শূন্যতার মুখোমুখি করে। বারবার উচ্চারণ করতে করতে প্রথমে তারা অচেনা হয়ে ওঠে, তারপর একসময় অর্থহীন। তখন তাদের কাছে আবার চুপচাপ ফিরে আসতে হয়। ফিরে দেখতে গিয়ে বিস্ময় জাগে অর্থের ছড়িয়ে পড়া দেখে, যেন আনাড়ি হাতে জলরঙ। নিজেকে প্রকাশ করতে করতে সেই অর্থ ভিন্ন শব্দের কাছে নিয়ে যায়।
অর্থের সীমানা পেরিয়ে আরও বহু মানুষের উপলব্ধির ভেতর দিয়ে যদি দেখতে চাই তাদের? কবি, লেখক, দার্শনিক কিংবা বহু আগে চলে যাওয়া কোনো মানুষের উপলব্ধির ভেতর হয়তো একই শব্দের অন্য কোনো অর্থ অপেক্ষা করে থাকে। অতঃপর মনে মনে সেইসব শব্দকে নতুন করে বুঝে ওঠার এই চেষ্টা।
|| নৈঃশব্দ্য ||
মাঝরাতের নৈঃশব্দ্য নিয়ে ওয়াল্ট হুইটম্যান লিখছেন:
হে আত্মা, এ শুধু তোমার সময়, নৈঃশব্দের মাঝে তোমার মুক্ত উড়ে যাওয়ার,
বই থেকে দূরে, শিল্প থেকে দূরে, দিন মুছে গেলে, যখন পাঠ
শেষ হয়ে যায়,
পুরোপুরি জেগে ওঠো, নিশ্চুপ, চেয়ে থাকো, ভাবনায়
তোমার প্রিয় সব বিষয়আশয়:
রাত্রি, নিদ্রা, মৃত্যু আর নক্ষত্ররাজি।
কোনান ডয়েল হোমসকে দিয়ে ওয়াটসনকে বলাচ্ছেন:
তোমার একটা বড় গুণ হল নীরবতা, বুঝলে হে ওয়াটসন। এটাই তোমাকে সঙ্গী হিসেবে অসাধারণ করে তুলেছে।
কবি ভিসওয়াবা শিমবোরস্কা তিনটা অদ্ভুত শব্দের কথা বলতে গিয়ে বলেন:
আমি যতক্ষণে ‘ভবিষ্যৎ’ শব্দটি উচ্চারণ করে শেষ করি,
প্রথম অক্ষরটি তারই মাঝে অতীত হয়ে ওঠে।
যখন ‘নীরবতা’ শব্দটি বলে উঠি,
ধ্বংস করে ফেলি সেই নীরবতা।
যখন উচ্চারণ করি ‘কিছুই না’,
এমন কিছু তৈরি করি অস্তিত্বহীনতা যাকে ধারণ করতে পারে না।
ভার্জিনিয়া উলফ সমুদ্রের ঢেউ দেখতে দেখতে ভাবছেন:
নৈঃশব্দ্য কী দারুণ; এই কফির কাপ, টেবিল। কতটা দারুণ এই একা বসে থাকা, যেন একাকী সমুদ্রের পাখি খুঁটির উপরে ডানা মেলে বসে আছি। আমাকে এখানে আজীবন বসে থাকতে দাও, এইসব মামুলি জিনিসের সাথে, এই কফির কাপ, এই ছুরি, এই কাঁটাচামচ, যারা নিজেদের মত থাকে, আর আমি আমার মত।
শোনা যায় রুমি বলেছিলেন—
নীরবতা খোদার ভাষা, আর বাদবাকি সব সে ভাষার বাজে অনুবাদ।
তাই আমি বলছি:
নীরবতার সাথে বেঈমানি কোরো না, প্লিজ।
|| মৃত্যু ||
মৃত্যু নিয়ে ভাবলে ইভান ইলিচের কথাই মনে পড়ে। জীবনের একমাত্র পরিণতি মৃত্যু। প্রতিদিন অসংখ্য মৃত্যুর সংবাদ দেখেও বিশ্বাস হয় না একদিন আমারও মৃত্যু হবে। চোখের সামনে সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের একে একে চলে যাওয়া দেখেও বিশ্বাস হয় না। অথচ জানি একদিন মুখোমুখি হ’তে হবে। সেই মুহূর্তে কি ভয় হবে? অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলার ভয়? ভুলভাবে জীবন কাটিয়ে আসার আফসোস? জীবনের অর্থ কি স্পষ্ট হবে সেই অন্তিম মুহূর্তে?
দস্তইয়েভস্কি’র প্রিন্স মিশকিন যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মানুষটার কথা বলেছিল আর কয়েক মিনিট বাঁচবে তার কথাও মনে আসে। তার কাছে জীবন আর সময়ের অর্থ কেমনভাবে ধরা দিয়েছিল? আকাশ আর তার পটভূমিতে গির্জার চূড়া হয়ে উঠেছিল শেষবারের মত দেখা পৃথিবী। প্রতিটা সেকেন্ড হয়ে উঠেছিল ভীষণভাবে বেঁচে থাকার মুহূর্ত।
আর কিরিলভ? হ্যাঁ, তার কথাও মনে আসে। কিরিলভ জীবনকে ভালোবাসত, অথচ মৃত্যুভয়কে জয় করার মধ্যেই খুঁজে ফিরেছিল মানুষের চূড়ান্ত স্বাধীনতা। মানুষের সবচেয়ে বড় দাসত্ব যদি হয় মৃত্যুর ভয়, তবে সেই ভয়কে অস্বীকার করেই সে নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন প্রমাণ করতে চাইত।
দার্শনিক এপিকিউরাস মৃত্যুভয়কে যুক্তি দিয়ে জয় করতে চেয়েছিলেন—আমরা যখন আছি, মৃত্যু তখন নেই। আর যখন মৃত্যু আসে, তখন আমরা নেই।
এপিকিউরাসের এই যুক্তির যেন প্রায় আড়াই হাজার বছর পরে জবাব দেন কবি ফিলিপ লারকিন—
ভয় সেই চিরকালের শূন্যতাকে নিয়ে,
যে নিশ্চিত বিলুপ্তির দিকে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি,
যার মাঝে একদিন চিরতরে হারিয়ে যাব, থাকব না এখানে,
থাকব না কোথাও।
দার্শনিকের যুক্তি ছিল: মানুষ এমন কিছুকে ভয় পেতে পারে না যার পরিণতি সে অনুভবই করবে না। আর কবি বললেন: ঠিক সেটাই তো ভয়। অনুভব না করার শূন্যতা। সহস্র বছরের ব্যবধানে তর্ক চলে দার্শনিক আর কবির।
এমিলি ডিকিনসন মৃত্যুকে দেখেছিলেন আরো শান্ত সমাহিত হয়ে—
মৃত্যুর জন্য থমকে যাওয়ার সময় আমার ছিল না
তাই সে নিজেই সদয় হয়ে থামল আমার জন্য
গাড়িটায় ছিলাম শুধু আমরা দুজন
আর অমরত্ব
এমিলি ডিকিনসন মৃত্যুকে কোন ভয়ংকর রূপে না দেখে দেখেছেন একজন ভদ্রলোক জুড়িগাড়ি নিয়ে এসেছে নিয়ে যেতে। গাড়ি তাঁকে নিয়ে চলেছে স্কুল, ভরে ওঠা শস্যের মাঠ, অস্তগামী সূর্য পেরিয়ে জীবনের স্মৃতির রূপক পথ ধরে।
আর জীবনানন্দ দাশ বলছেন—
মৃত্যু এলে মরে যেতে হবে
ভালোবাসা নদীর জলের মতো হয়ে রবে
জলের থেকে ছিঁড়ে গিয়েও জল
জোড়া লাগে আবার যেমন নিবিড় জলে এসে
জলের আরেক নাম তো জীবন। মানুষ চলে যায়, কিন্তু ভালোবাসা কি যায়? নাকি ছিঁড়ে যাওয়া জলও একদিন অন্য কোনো জলের সঙ্গে গিয়ে মেশে? অলৌকিক ডাব হাতে যেদিন কবি হেঁটে গেলেন ট্রাম লাইন পেরিয়ে সেদিন কি মনে ছিল এই কথা তাঁর?
মানুষ থাকে না, তবু ভালোবাসা থেকে যেতে পারে। আশা জাগে এ কথা পড়ে। সেই সাথে মনে হয় যে আমি থাকব না তার আর কিই বা যাবে আসবে তাতে।
|| দুঃখ ||
দুঃখের চেয়ে সার্বজনীন ও আপন মানুষের আর কী আছে?
মানুষের সমাজে নানা ধর্ম মানুষকে বিভিন্নরকম সৃষ্টিতত্ব দিয়েছে, জীবনযাপনের নানা প্রণালী বাতলে দিয়েছে, দিয়েছে বিবিধ শাস্তির ভয় ও পুরষ্কারের লোভ। কিন্তু দুঃখের বেলায় একই স্বরে আশা যুগিয়েছে। একই স্বরে তারা বলেছে দুঃখ কোন দুর্ভাগ্যের ফল নয়, বরং মানুষের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বলেছে দুঃখ এক পরীক্ষা কিংবা অনিত্যতার শিক্ষা।
মানুষকে দিয়ে যাওয়া বুদ্ধের শিক্ষার কেন্দ্রে রয়েছে দুঃখ। বলেছেন—জন্ম দুঃখ, বার্ধক্য দুঃখ, মৃত্যু দুঃখ; শোক, বিলাপ, যন্ত্রণা, বিষাদ ও হতাশা দুঃখ। প্রিয়জন থেকে বিচ্ছেদ দুঃখ; যা চাই তা না পাওয়াও দুঃখ। বুদ্ধ স্রেফ সান্ত্বনা না দিয়ে মানবজন্মের সবচেয়ে বড় সত্য দুঃখের স্বরূপ চেনাতে চেয়েছেন। দুঃখকে প্রথমে সত্য বলে জানতে হবে।
ভগবদ্গীতায় আছে, দুঃখ স্থায়ী কিছু নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুন যখন ভেঙে পড়েছেন কৃষ্ণ বলছেন—সুখ-দুঃখ আসে এবং চলে যায়; তারা স্থায়ী নয়। তাদের সহ্য করো।
গীতা বলছে, সুখের মতো দুঃখও আগন্তুক। চিরস্থায়ী কিছু নয়।
যিশু বলছেন—যারা শোকের মাঝে আছে তারাও আশীর্বাদপ্রাপ্ত, কারণ তারা সান্ত্বনা পাবে।
দুঃখকে অস্বীকার না করে বরং যিশু শোকের মধ্যেই সান্ত্বনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন।
কুরআনে বলা হয়েছে—নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি আছে।
এখানে বলা হচ্ছে কষ্টের সঙ্গে, কষ্টের পরে নয়। যেন সব সময় ভবিষ্যতের কোনো সময়ে নয়, বরং কখনও দুঃখের ভেতরেই থাকে স্বস্তির বীজ। এ যেন অন্ধকার আর আলোর মত। সব সময় একের পরে এক আসে এমন নয়, কখনও তারা পাশাপাশিই থাকে।
এই একই আশার প্রতিধ্বনি শুনি কবিদের উচ্চারণে। কাহলিল জিবরান তাঁর দ্য প্রফেট-এর ‘আনন্দ-বেদনা প্রসঙ্গে’ কবিতায় বলছেন—তোমার আনন্দ আসলে মুখোশখোলা দুঃখ। তারপরেই আবার বলছেন—দুঃখ তোমার অস্তিত্বের যত গভীর পর্যন্ত খুঁড়ে যায়, তত বেশি আনন্দ ধারনের জায়গা তুমি পাও।
কবি অসাধারণ উপমা দিয়ে আরো বলেন: যে পেয়ালায় মদ রাখা হয়, সেই পেয়ালাই তো কুমোরের আগুনে পুড়েছিল। যে বাদ্যযন্ত্র সান্ত্বনা দেয়, সেই কাঠকেই তো ধারালো ছুরি দিয়ে ফাঁপা করা হয়েছিল। আনন্দ আর দুঃখ তাঁর কাছে একই পাত্রের দুই অবস্থা, বিপরীত বা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।
একই বার্তা আমরা পাই নিৎশের চিন্তায়। ফ্রিডরিখ নিৎশে বলেন—যে মানুষ জীবনের গভীরতম আনন্দ পেতে চায়, তাকে গভীরতম দুঃখের সম্ভাবনাও মেনে নিতে হয়।
হয়তো মানুষকে মানুষ করে তোলে তার দুঃখ। মানুষের সৃষ্টিশীলতা আর মহত্তর জীবনবোধের উৎস বুঝি এই দুঃখ। তাই হয়ত কবি বিনয় মজুমদার বলেছিলেন— লিখতে লিখতে বুঝেছি কবিতা লিখলে দুঃখ ভোলা সম্ভব। কিন্তু দুঃখ ভুলে গেলে আর কবিতা লেখা যায় না।
দুঃখ ভুলে যেতে চাই আমরা সবাই। তবু কিছু দুঃখ ভুলে গেলে বোধহয় মানবজন্মের খানিকটা হারিয়ে যায়। কেননা দুঃখই তো মানুষকে অন্য মানুষের দুঃখ চিনতে শেখাতে পারে।
|| ভয় ||
ভয় নামের অনুভূতির ইতিহাস সম্ভবত মানুষের চেয়ে পুরনো। বিবর্তনের পথে মানুষ আজকের মানুষের মত হয়ে ওঠার আগে ভয় পেতে শিখেছিল টিকে থাকার প্রয়োজনে। বিপদ বুঝে ভয় পেয়ে থমকে দাঁড়ানো, পালিয়ে যাওয়া কিংবা লড়াই করার এই ইতিহাস তাই মানুষের প্রেমের মতই পাপের চেয়েও প্রাচীন। ভয় পেতে জানত বলে মানুষ প্রজন্মান্তরে লক্ষ বছর টিকে গেছে। এই হিসেবে ভয়কে দুর্বলতা ভাবার হয়ত উপায় নেই।
প্রাচীন মানুষের সামনে ভয় ছিল দৃশ্যমান। অন্ধকার, হিংস্র পশু, শত্রু কিংবা স্বয়ং প্রকৃতি। আধুনিক মানুষের কাছে এই ভয়ের চেহারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বদলে গেছে। দৃশ্যমান থেকে ক্রমশ অদৃশ্যের প্রতি ভয় বেড়েছে। ভয়, মৃত্যু, ক্রোধ, দুঃখে অস্থির এই দুনিয়ায় মানুষ কীভাবে মানসিক স্থিরতা ধরে রাখতে পারে তা নিয়ে অনেক ভেবেছিলেন রোমান স্টোয়িক দার্শনিক সেনেকা। প্রায় দুই হাজার বছর আগে সেনেকা বলেছেন, এমন অনেক বিষয়ে আমরা ভয় পাই যেগুলো এখনও ঘটেনি, হয়তো ঘটবেও না। তাঁর ভাষায়—
বাস্তবে যতটা কষ্ট আমরা পাই, তার চেয়ে বেশি কষ্ট পাই কল্পনায়।
সেনেকা দেখেছেন ভয়কে আশংকার রূপ নিতে। দার্শনিক ও চিন্তাবিদ সোরেন কিয়ের্কেগার্ড ভেবেছেন ভয়ের আরেক রূপান্তর উদ্বেগ নিয়ে। তিনি বলছেন—উদ্বেগ হলো স্বাধীনতার মুখোমুখি হয়ে অনুভব করা বিহ্বলতা।
ভয় সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো কিছু থেকে আসে। যেমন—বিপদ, সম্ভাব্য বিপদ, রোগ, যুদ্ধ, মৃত্যু। কিন্তু উদ্বেগ আসে এমন এক জায়গা থেকে, যেখানে আসলে রয়েছে বহু সম্ভাবনা আর অনিশ্চয়তা। আমি উঁচু দালান বা পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছি। এমন ভয় তো আছেই যে আমি পরে যেতে পাড়ি, আবার হঠাৎ এমনও তো মনে হয় আমি চাইলে লাফ দিতে পারি। সীমিত অর্থে এরকম কোন উদ্বগের দিকেই কি ইশারা করছেন কিয়ের্কেগার্ড?
কিয়ের্কেগার্ডের ভাবনার মানুষ ভয় পায় কারণ সে স্বাধীন। ওদিকে আবার ক্ষমতার মালিক যারা তারা যখন মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় তাদের চিনে নিতে হয় মানুষের ভয়ের মানচিত্র, উদ্বেগের নকশা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার জন্য সহিংস মৃত্যুর ভয় কতটা কার্যকর। তাদের অনেকের মতে রাষ্ট্রের প্রয়োজনই তৈরি হয় মানুষের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয় থেকে।
আধুনিক পৃথিবীতে রাষ্ট্র বা ক্ষমতা যে সবসময় কেবল প্রকাশ্যে ভয়ভীতি দেখায় তা নয়, নজরদারিত্ব, নিয়ম ও নানান প্রতিষ্ঠান দিয়েও নতুন নতুন ভীতির উৎস তৈরি করে। দার্শনিক মিশেল ফুকো দেখিয়েছেন নজরদারিত্বের মাঝে মানুষ কীভাবে ধীরে ধীরে ক্ষমতার চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম আত্মস্থ করে নেয়। বাইরে থেকে সবসময় ভয়ভীতি বা জোর প্রয়োগ না করলেও সে নিজেই নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। বলা যায়, ক্ষমতা তখনই সবচেয়ে সফল যখন আসলে মানুষ নিজেরাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, সেলফ-সেন্সর করে নিজেদের কণ্ঠ। এখানে ঠিক কী কাজ করে? ভয়, আশংকা নাকি উদ্বেগ? কখন একটি শব্দের অর্থের সীমানা শেষ হয় আরেকটি শব্দের দিকে?
জর্জ অরওয়েলের ‘১৯৮৪’ গ্রন্থে আমরা দেখি রাষ্ট্র কীভাবে মানুষের গভীরতম ভয় খুঁজে বের করে। সত্য তামাদি হয়ে যাওয়া এই সময়ে আমরা দেখি সামষ্টিক ভয়ের জ্বালানি দিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতায় টিকে থাকা, শত্রু আসছে কিংবা সংস্কৃতি লুট হয়ে যাচ্ছে অথবা বাইরের মানুষ চাকরির সুযোগ নিয়ে যাচ্ছে এইসব অনিশ্চয়তার ভয় কতটা কার্যকর। এই পর্যায়ে এসে মনে আরেকটি প্রশ্ন আসে। মানুষ কি সবচেয়ে ভয়ংকর বিপদকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পায়? কোন বিপদকে কতটা ভয় পাবে কীভাবে ঠিক করে মানুষের অবচেতন?
বহু দশক ধরে আমরা পরিবেশ আর জলবায়ু বিপর্যয়ের কথা জানি। বিজ্ঞানি ও চিন্তাবিদেরা অনেকেই বলছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অদূর ভবিষ্যতে মানুষকে দাঁড় করাবে অস্তিত্বের ঝুঁকির মুখে। নিয়ন্ত্রণবিহীন প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতি পরিবেশ বিপর্যয়কে করছে আরো ত্বরান্বিত। অথচ বিশাল এইসব বাস্তব ঝুঁকির চেয়ে মানুষ বরং বেশি ভয় পায় নরকের আগুনকে, যার অস্তিত্বের কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ কোথাও নেই। কেন?
তবে কি ভয় জন্মায় আমরা বিপদটাকে কতটা স্পষ্ট করে কল্পনা করতে পারি তার ওপর? নরকের আগুন প্রসঙ্গে শৈশবে যুক্তি বুঝে ওঠার আগেই আমরা শিখে ফেলি পাপ, বিচার ও শাস্তির একটি পরিপূর্ণ গল্প। পরিবেশ বিপর্যয় সম্পর্কে আছে পরিসংখ্যান, গ্রাফ আর তাপমাত্রার ভবিষ্যৎ মডেল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকির আছে সম্ভাবনা ও প্রত্যক্ষ ফলাফল। বয়ে আনছে সেইসাথে নিত্যনতুন লোভের হাতছানি আর পিছিয়ে পড়ার ভয়।
মানুষ কি তবে সত্যিকারের বিপদের চেয়ে একটি পরিপূর্ণ ভয়ের গল্পে বেশি প্রভাবিত হয়?
|| ক্ষমা ||
ক্ষমা কাউকে আমরা কেন করি? কাউকে তার অপরাধ থেকে মুক্তি দিতে? নাকি নিজেদেরকে ক্রোধের ভার থেকে রেহাই দিতে? যে মানুষ আঘাত পেয়েছে, অপমানিত হয়েছে, বিশ্বাসভঙ্গের শিকার হয়েছে তার কাছে অনেক সময় শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন হয়ে থাকে না। কাউকে ক্ষমা করা মানে কি তার অন্যায়কে ছোট করে দেখা? ভুলে যাওয়া? সম্পর্ক আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া? তা কি আদৌ সম্ভব হয়? হয়তো ক্ষমা স্রেফ একধরনের নিষ্পত্তি যাতে মানুষ সামনে এগিয়ে যেতে পারে।
বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষায় ঘৃণার উত্তরে ঘৃণাকে সমাধান বলা হয়নি। ক্ষমাকে দেখা হয়েছে প্রতিশোধের শৃঙ্খল ভাঙার উপায় হিসেবে। খ্রিস্টধর্মে যিশু বারবার ক্ষমার কথা বলেছেন। কুরআনেও ক্ষমাকে উচ্চতর গুণ হিসেবে দেখা হয়েছে। অবশ্য সকল ধর্মেই ক্ষমার পাশাপাশি ন্যায়বিচারের প্রয়োজনীয়তার কথা বারবার উচ্চারিত হয়েছে। অর্থাৎ ক্ষমা আর ন্যায়বিচারকে সবসময় একে অন্যের বিপরীতে দাঁড় করানো হয়নি। হয়তো এখানেই কোন একটা প্রয়োজনীয় ভারসাম্যের ইশারা রয়েছে।
ব্যক্তির পর্যায় পেরিয়ে আরো বড় পরিসরে ক্ষমা এক ভিন্ন তাৎপর্য ধারণ করে। ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক হানা আরেন্ট ক্ষমাকে দেখেছিলেন ভিন্নরূপে। তিনি দেখছেন ক্ষমা ছাড়া মানুষ অতীতের কাছে বন্দি রয়ে যায়। তাঁর যুক্তিতে মানুষের কর্মের ফল আমরা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। একটা কাজ থেকে যে ফল তা থেকে আসে নতুন আরেক ফল; এই চক্র চলতেই থাকে। তিনি লিখেছেন, ক্ষমা না থাকলে আমরা ফলাফলের চক্রে আটকে যেতাম। ক্ষমতা হারাতাম নতুন করে শুরু করার।
তারমানে কি ক্ষমা হলো অতীতকে ভবিষ্যতের একমাত্র মালিক হতে না দেওয়ার উপায়? দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবসানের পর যে প্রশ্নটির মুখোমুখি হয়েছিল দেশটি তা ছিল—এত অত্যাচারের পরে একটা সমাজ একসঙ্গে থাকবে কীভাবে? দক্ষিণ আফ্রিকার আর্চবিশপ ও বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ ডেসমন্ড টুটু বলেছিলেন—ক্ষমা ছাড়া ভবিষ্যৎ নেই। কিন্তু সেই ক্ষমার আগে সত্য বলা প্রয়োজন, প্রয়োজন দায় স্বীকার করা। কারণ সত্য না থাকলে ক্ষমা বিস্মৃতি এনে দেয়। আর বিস্মৃতি অন্যায়কে ফিরে আসার সুযোগ করে দেয়।
ফরাসি দার্শনিক জাক দেরিদা ক্ষমার প্রশ্নকে নিয়ে গেছেন আরো কঠিন জায়গায়। তাঁর মতে, ক্ষমার আসল পরীক্ষা হয় তখনি যখন অপরাধ হয়ে থাকে প্রায় ক্ষমার অযোগ্য। ছোট কোন ভুল বা অন্যায়, অনিচ্ছাকৃত আঘাত ক্ষমা করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু গণহত্যা, নির্যাতন, বিশ্বাসঘাতকতা এমন বিশাল সব অপরাধে ক্ষমা শব্দের অর্থ কী? ক্ষমা যদি হয় শর্তসাপেক্ষে? অনুতাপ, শাস্তি আর তারপর ক্ষমা; তাহলে তা কি আদৌ ক্ষমা? নাকি নৈতিক চুক্তি?
নিজেকে ক্ষমা করার প্রশ্নে যদি আসি আমরা দেখি তাও সহজ নয়। আমরা নিজেদের পুরোনো ভুলকে বর্তমানের জ্ঞান দিয়ে বিচার করি আর নিজদেরকেই ক্ষমা করতে পারি না। অনুতাপ প্রয়োজন, দায় স্বীকার করাও দরকার, কিন্তু মানুষ যদি সারাজীবন নিজের পুরোনো অবস্থানকে ঘৃণাই করেই যায়, তাহলে নতুন মানুষ হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয় না। তাই ক্ষমা হয়তো ভুলে যাওয়া নয়, ভুলকে অস্বীকার করাও নয়। হয়তো সবকিছু স্বীকার করেও নিজেকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আরেকটি সুযোগ দেওয়ার নামই ক্ষমা।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন