‘বিদ্রোহী’কে ঘিরে বিতর্ক, বিরোধিতা ও ব্যঙ্গের ঝড়
সময়টি ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ—বাংলা ১৩২৮ সালের পৌষ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ফেরৎ ২২ বছর বয়সী কাজী নজরুল ইসলাম মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে কলকাতার ৩/৪-সি তালতলা লেনের এক ভাড়া বাসায় থাকতেন। মুজফ্ফর আহমদের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, একদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে তিনি যখন হাত-মুখ ধুয়ে বসেছেন, তখন নজরুল তাঁকে নিজের লেখা ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি শোনান। সাধারণত নজরুল এত সকালে ঘুম থেকে উঠতেন না। তাই অনুমান করা যায়, সেদিন তিনি শেষ রাতে জেগে কবিতাটি রচনা করেছিলেন। সেই সময় ফাউন্টেন পেনের প্রচলন ছিল না; দোয়াতে বারবার কলম ডুবিয়ে লিখতে হতো। এতে ভাবনার গতির সঙ্গে লেখার গতি মিলিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ত। সম্ভবত এ কারণেই তিনি কবিতাটি পেন্সিলে লিখেছিলেন, যাতে চিন্তার স্রোত বাধাগ্রস্ত না হয় এবং তাঁর সৃষ্টির উচ্ছ্বাস অক্ষুণ্ণ থাকে।
সামান্য বেলা গড়াতেই ‘মোসলেম ভারত’-এর সম্পাদক আফজালুল হক কলকাতার ৩/৪-সি তালতলা লেনের সেই ভাড়া বাড়িতে উপস্থিত হন। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁকেও তাঁর সদ্য রচিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি শোনান। কবিতা শুনে আফজালুল হক যেন উত্তেজনায় উদ্বেল হয়ে ওঠেন। তিনি আর দেরি না করে বলেই বসেন, ‘এখনই কবিতাটির একটি কপি করে দিন, আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাব।’ নজরুল শান্ত ও ধীরভাবে কবিতাটি নকল করে তাঁর হাতে তুলে দেন। এভাবেই ‘মোসলেম ভারত’-এ প্রকাশের জন্য কবিতাটির প্রথম কপি নিয়ে তিনি বিদায় নেন। কিছুক্ষণ পরই সেখানে আসেন ‘বিজলী’ পত্রিকার ম্যানেজার অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য (১৮৮২-১৯৬২)। তিনিও কবিতাটি শুনে মুগ্ধ হন এবং ‘বিজলী’-তে প্রকাশের উদ্দেশ্যে নজরুলের হাতে লেখা আরেকটি কপি সংগ্রহ করে নিয়ে যান।
কবিতাটির প্রতি অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্যের আকর্ষণ এতই প্রবল ছিল যে অপেক্ষা করার ধৈর্য তাঁর ছিল না। ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকার প্রকাশনা ছিল অনিয়মিত; কবে তা বেরোবে, তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। অথচ এমন এক অগ্নিময় কবিতাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখা যায় না-এর প্রতিটি পঙ্ক্তিতে যেন জাগ্রত বিদ্রোহ, যা পাঠকের রক্তে উত্তাপ ছড়িয়ে দেয় এবং বাংলা কবিতায় এক নতুন, প্রতিবাদমুখর কণ্ঠস্বরের পরিচয় বহন করে। এই কারণেই অবশেষে কিছুটা কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হলো। তিনি এমনভাবে বিজলীতে ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশ করেন, যেন তিনি উহা ‘মোসলেম-ভারত’ থেকেই উদ্ধৃত করছেন। ওই সংখ্যা ‘বিজলী’তে ‘মোসলেম-ভারত’ কার্তিক সংখ্যার একটি ছোট সমালোচনা তিনি প্রকাশ করেন। এই সমালোচনার শেষে তিনি লিখেছিলেন—“এই সংখ্যায় ‘মোসলেম-ভারত’ থেকে কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি এত সুন্দর হয়েছে যে, আমাদের স্থানাভাব হলেও তা ‘বিজলী’র পাঠক-পাঠিকাদের উপহার দেবার লোভ আমরা সম্বরণ করতে পারলাম না। এই মন্তব্যের সূত্র ধরেই ‘বিজলী’ পত্রিকায় কবিতাটি প্রকাশিত হয়। আর এভাবেই ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি, বঙ্গাব্দ ১৩২৮-র ২২ পৌষ, শুক্রবার—‘বিদ্রোহী’ প্রথমবারের মতো ‘বিজলী’র পাতায় মুদ্রিত হয়ে বাংলা সাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা করে। সাহিত্যের ইতিহাসে এটা বেশ চমৎকার মজার ব্যাপার যে প্রেসের কবলমুক্ত হবার আগেই তার সমালোচনা আর কবিতার উদ্ধৃতি বেরিয়ে গিয়েছিল বিজলীতে। শোনা যায় বৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও ‘বিজলী’র চাহিদা এত বেশি ছিল যে সে সপ্তাহে কাগজ দুইবার বের হয়েছিল। সেই সপ্তাহে ‘বিজলি’ দু’বারে ঊনত্রিশ হাজার কপি ছাপা হয়েছিল এবং প্রায় দেড় দু’লক্ষ পাঠক কবিতাটি পড়েছিল। পরবর্তীতে কবিতাটি ‘প্রবাসী’, ‘সাধনা’, 'দৈনিক বসুমতি'সহ বহু দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
১৪৮ পঙক্তির বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম দীর্ঘ এই কবিতা প্রকাশের পর চারদিকে ধন্য ধন্য রব ওঠে। এই ‘বিদ্রোহী’র মাধ্যমে একরাত্রেই নজরুল মধ্যগগনে অধিষ্ঠিত হলেন। হাবিলদার নজরুল ইসলাম থেকে হয়ে গেলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সমকালে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা কী আলোড়ন তুলেছিল, তার কয়েকটি মন্তব্যের উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে—
১. ‘আবেগের আগুনে ভরা কবিতা।’—সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
২. “‘বিদ্রোহী’ পড়লুম ছাপার অক্ষরে মাসিকপত্রে, মনে হলো, এমন কখনো পড়িনি।’—বুদ্ধদেব বসু।।
৩. ‘গাইবার গান নয়, চিৎকার করে পড়বার এমন কবিতা এদেশের তরুণেরা যেন এই প্রথম হাতে পেয়েছিল। তাদের উদ্দাম, হৃদয়ের অস্থিরতাই এ যেন আশ্চর্য প্রতিধ্বনি।’—প্রেমেন্দ্র মিত্র।
৪. ‘তরুণ সমাজ তো বিদ্রোহীর ভাষায় বাক্যলাপ শুরু করে দিল।’—পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়।
৫. ‘এর মর্ম কথা হচ্ছে এ এক অপূর্ব উন্মাদনা—এক অভূতপূর্ব আত্মবোধ—সেই আত্মবোধের প্রচণ্ডতায় কবি উচ্চকিত—প্রায় দিশেহারা।’—কাজী আবদুল ওদুদ।
এছাড়াও বিদ্রোহী কবিতা পড়ে নজরুলকে নিয়ে জনৈক শৈলেন্দ্র কুমার মল্লিক ‘বিদ্রোহী বীর’ নামে কবিতা লিখলেন যা মোসলেম ভারতের ১৩২৮ অগ্রহায়ণ সংখ্যায় ছাপা হয়। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়ে ‘যৌবন’ নামে কবিতা লিখেছিলেন—
আমি আলেয়ার আলো, আপন খেয়ালে চলি,
ঝঞ্ঝা মানি না, মানি না বাত্যা ভয়।
আমি উল্কার মতো আপন বেগেতে জ্বলি পথহারা,
নাহি কারো সাথে পরিচয়
আমি পর্বত হতে দুর্জয় বেগে নামি
বাধা বন্ধন দু'ধারে ঠেলিয়া যাই; ইত্যাদি।
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (১৯০৩-১৯৭৬) এই কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন—
‘কে এ নতুন কবি? নির্জীব দেশে এ কার বীর্যবাণী? শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, সমগ্র দেশ প্রবল নাড়া খেয়ে জেগে উঠল। এমনটি কোনদিন শুনিনি, ভাবতেও পারিনি। যেন সমস্ত অনুপাতের বাইরে, যেন সমস্ত অঙ্কপাতেরও অতিরিক্ত।...’
‘গদগদ বিহ্বলের দেশে এ কে এল উচ্চণ্ড বজ্রনাদ হয়ে। আলস্যে আচ্ছন্ন দেশ আরামের বিছানা ছেড়ে হঠাৎ উদ্দণ্ড মেরুদণ্ডে উঠে দাঁড়াল, চোখ কচলে তাকালো সকলে।...’
‘একেবারে বিদ্যুৎগতিতে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। শুধু ছড়িয়ে পড়ল না, জীবনদায়িনী চেতনায় সকলকে বিদ্যুদ্দাম করে তুলল।...’ সবাই জেগে উঠল, উঠে বসল, দাঁড়িয়ে পড়ল, ছুটে এল বাইরে। অকপটে এ আমাদের কবি, আমাদেরই প্রাণের অব্যক্ত ভাষাকে এ ছন্দে স্পন্দে নির্গল করেছে।
এই কবিতা লিখেই নজরুল জনমানসের নির্মল অন্তরঙ্গতায় উপনীত হল। (জ্যৈষ্ঠের ঝড়)
‘বিদ্রোহী’র আবির্ভাবের পর কাজী নজরুল ইসলামের নাম মুহূর্তেই সমগ্র বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। বিস্মিত জনসাধারণের মুখে মুখে উচ্চারিত হতে থাকে তাঁর নাম; সভা-সমিতি, মিটিং-বৈঠক—সবখানেই তাঁকে আহ্বান জানানো শুরু হয়। যেন এক নবজাগ্রত কণ্ঠস্বর হঠাৎ করেই জনমানসে আলোড়ন তুলেছে। এই উত্থান অগ্রাহ্য থাকেনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছেও। তিনিও স্বীকার করেছিলেন নজরুলের তপ্ত প্রাণের সেই নবীন সজীবতা, তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত ও স্বতন্ত্র সৃষ্টিশীলতার দীপ্তিকে।
১৯২২ সালে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মৃত্যুতে কলকাতায় আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সভার দর্শকসারির প্রথম দিকে নীরবে বসেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। হঠাৎ রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি গিয়ে পড়ে তাঁর উপর। তিনি নজরুলকে উদ্দেশ্য করে বলেন—‘নজরুল, তুমি সেখানে কেন? এসো, এখানে এসে আমার পাশে বসো।’
রবীন্দ্র প্রভাবিত সাহিত্যযুগে ২৩ বছর বয়সী নজরুলকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাঁর পাশে ডেকে বসায়, জানা যায় এই দৃশ্য সভায় উপস্থিত কয়েকজন সাহিত্যিকের মনে ঈর্ষার সঞ্চার করেছিল। সেই শোকসভাতেই নজরুল কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতির উদ্দেশে রচিত 'কবি সত্যেন্দ্র' নামে আবেগমথিত কবিতা আবৃত্তি করেন যার প্রথম লাইন ছিল ‘অসত্য যত রহিল পড়িয়া সত্য সে গেল চলে’।
কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’-র ভাগ্যে কেবল অজস্র প্রশংসাই জোটেনি; তাকে ঘিরে নিন্দা, বিরূপ সমালোচনা ও তীব্র ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের ঝড়ও কম ওঠেনি। এর দুর্বার উচ্চারণ যেমন একদল পাঠককে মুগ্ধ করেছিল, তেমনি আরেকদলকে করেছিল বিচলিত ও বিরূপ। কবিতাটি প্রকাশের পর বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে যেমন অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, তেমনি এর বিরুদ্ধে একদল কবি-সাহিত্যিক ও রক্ষণশীল মহল তীব্র বিরূপ সমালোচনাও করেছিল। মুসলমান সমাজ তাঁকে ঈশ্বরদ্রোহী ভেবেছিলেন। হিন্দুরা কবিতায় এত আরবি-ফার্সির মিশ্রণ পছন্দ করেননি। তাঁদের অভিযোগ ছিল—কবিতাটি অত্যধিক উচ্চকণ্ঠ, আবেগমত্ত ও সংযমহীন; এতে বিদ্রোহের উন্মত্ততা শিল্পের ভারসাম্যকে ছাড়িয়ে গেছে। ‘আবেগের বেগে, তারল্যে ভরা’। ‘প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে যাত্রা অনেকক্ষেত্রে মনে হয় ধারাবাহিকতা রাখেনি’। ‘একই ভাবের, একই বিষয়ের পুনরুক্তিও যথেষ্ট’। অতিকথন ও আতিশয্য এর পদে পদে। সমকালীন রক্ষণশীল ধর্মীয় ও সাহিত্যিক মহলের কেউ কেউ কবিতাটিকে ‘উচ্ছৃঙ্খল’, ‘অহংকারপূর্ণ’ এবং ‘অতিরঞ্জিত’ বলেও আখ্যা দেন। বিশেষত ‘আমি চির-বিদ্রোহী বীর’—এই আত্মঘোষণামূলক উচ্চারণ তাঁদের কাছে প্রচলিত কাব্যরীতির বাইরে এক বিস্ফোরক ও অশান্ত উচ্চারণ বলে মনে হয়েছিল। তৎকালীন কিছু পত্র-পত্রিকায় কবিতাটিকে ‘শব্দের ঝড়’, ‘বিক্ষুব্ধ উন্মাদনা’ কিংবা ‘অসংযত আবেগের বহিঃপ্রকাশ’ বলেও সমালোচনা করা হয়।
সবচেয়ে আলোচিত সমালোচকদের অন্যতম ছিলেন মোহিতলাল মজুমদার। তিনি দাবি করেছিলেন, ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ভাব, ভাষা ও ভঙ্গিতে তাঁর গদ্যরচনা ‘আমি’-এর সুস্পষ্ট প্রভাব বিদ্যমান; এমনকি নজরুল তাঁর চিন্তারই অনুকরণ করেছেন বলেও তিনি অভিযোগ তোলেন। এ দাবিকে ঘিরে তৎকালীন সাহিত্যসমাজে তুমুল বিতর্কের সূচনা হয়। ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশের অব্যবহিত পর থেকেই মোহিতলাল প্রচার করতে থাকেন যে, ১৩২১ বঙ্গাব্দের পৌষ সংখ্যার ‘মানসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর ‘আমি’ প্রবন্ধের ভাবসম্পদ থেকেই ‘বিদ্রোহী’র উৎসার ঘটেছে। তাঁর অভিযোগ ছিল, নজরুল সেই প্রভাব স্বীকার তো করেনইনি, বরং কোনো কৃতজ্ঞতার উল্লেখও করেননি। সুকুমার সেনের মতে, মোহিতলালের ‘আমি’ প্রবন্ধের ভাবসম্পদ ক্ষেত্রমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অভয়ের কথা’ থেকে গৃহীত। মোহিতলাল ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশের পূর্বেই নজরুলের উপরে বিরূপ হয়েছিলেন; কারণ নজরুল তাঁর অভিভাবকত্ব মেনে চলছিলেন না। ফলে তিনি নজরুলের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে পড়েছিলেন আর ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশের পরে তিনি নজরুলের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠেন।
সজনীকান্ত দাস (১৯০০-১৯৬২) সাপ্তাহিক ‘শনিবারের চিঠি’তে (১৯২৪, ৪ঠা অক্টোবর ১৩৩১, ১৮ আশ্বিন) ভবকুমার প্রধান বেনামে কামস্কাটিয়া ছন্দে ‘ব্যাঙ’ কবিতা লেখেন—
আমি ব্যাঙ
লম্বা আমার ঠ্যাং
ভৈরব রভসে বরষা আসিলে
ডাকি যে গ্যাঙোর গ্যাঙ
আমি ব্যাঙ—
আমি নাগশিশু, আমি ফণিমনসার জঙ্গলে বাসা বাঁধি
আমি ‘বে সব বিস্কে’ ‘সাইক্লোন’ আমি মরুসাগরের আধি।
শনিবারের চিঠি’র লেখক, সম্পাদক, যোগানন্দ দাস, অশোক চট্টোপাধ্যায় এবং সজনীকান্ত দাস এই তিনজনের যৌথ রচনা শ্রী অবলানলিনী কান্ত হ্যাঁ, এম-এ এ জেড ছদ্মনামে ‘আমি বীর’ শিরোনামে ‘বিদ্রোহী’র প্যারোডি, ১৮ আশ্বিন, ১৩৩১, ৪ঠা অক্টোবর ১৯২৪ সংখ্যায় প্রকাশ করেন—
আমি বীর!
আমি দুর্জয় দুর্ধর্ষ রুদ্র দীপ্ত উচ্চ শির
আমি বীর!
দু’চোখে আমার দাবানল জ্বলে জ্বল জ্বল জ্বল্
স্তব্ধ বিশ্ব ইঙ্গিতে ভ্রূকুটির
আমি বীর! আমি বীর!...
শ্রী মধুকর কুমার কাঞ্জিলাল ছদ্মনামে বিদ্রোহী কবিকে উদ্দেশ্য করে ‘তোমাদের প্রতি’ শিরোনামে জনৈক রচয়িতা লিখেন,
ওগো বীর,
ফেলে দিয়ে কাঁথা আর খাটিয়া তাকিয়া
ওঠো, জাগ, গা ঝাড়িয়া, চক্ষু রগড়িয়া।
তব উচ্চ শির
গর্বমত্ত বিন্ধ্যাচল সম আগুলাক পথ থেমে
যাক থমকিয়া অরুণের রব
অকস্মাৎ হেরি তব চিরুণী-চর্চিত দিব্য কেশ—
… … … …
হে কবি-হাকিম
বেদুঈন ভারত-বিজয়ী গাজি পিতৃকুল এ দীন বাংলার
কোন গাঁয়েতে সাকিম।
… … …
তোমার কৃপাতে
বারাঙ্গনা সতী হয়, চোর হয় শিব
জন্ম পায় কল্পনা—ঔরসে তব শতকোটি বীর্যবান ক্লীব।
হে বীর, মেত না আর সাহিত্য ও সত্যের নিপাতে।
[শনিবারের চিঠি ভাদ্র ১৩৩৪ সংখ্যা]
মোহিতলাল মজুমদার শ্রী সত্যসুন্দর দাস ছদ্মনামে ‘চিঠি'তে বিদ্রোহী চেতনার সমালোচনা করে ‘সাহিত্যের আদর্শ’ শিরোনামে বিদ্রোহীর স্বরূপ আবিষ্কার করেন—
আমাদের দেশে খুব বর্তমানকালে এমন একটি প্রবৃত্তি দেখা দিতেছে যাহাতে সাহিত্যের এই নীতি বা আদর্শ একেবারে উড়িয়া যাইতেছে; অতিশয় অমেধ্য এবং মানবাত্মার পথে গ্লানিকর একশ্রেণীর ভাব ও ভাবুকতা বিদ্রোহের ‘রক্ত নিশান’ উড়াইয়া ভয়ানক আস্ফালন করিতেছেন, এ বিদ্রোহের মধ্যে প্রাণশক্তির প্রাবল্য নাই, মনুষ্যত্বের অভ্রভেদী অভ্যুত্থান কামনা নাই—মানবাত্মার জয়-ঘোষণা ইহাতে নাই। কারণ, মানুষের মধ্যে যে পশু আছে, সেই পশুর ক্ষুধা, রিপুর তাড়না, বিচার ও বিবেক ধর্মহীন কুৎসিৎ দেহসর্বস্বতাই এই বিদ্রোহের মূল প্রবৃত্তি-এক কথায়, ইহা মনুষ্যত্বের বিরুদ্ধে মনুষ্যত্বের আক্রোশ।…
[শনিবারের চিঠি আশ্বিন, ১৩৩৪ সংখ্যা]
আজীবন নজরুল বিদ্বেষী নীরদচন্দ্র চৌধুরী ‘শ্রী বলাহক নন্দী’ ছদ্মনামে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’র বালখিল্য আলোচনা করেছেন ‘প্রসঙ্গ কথা’ শিরোনামে, তিনি লিখেছেন—
বাংলাদেশের বালক-বালিকারা যাঁহাকে ‘ঝঞ্ঝার জিঞ্জীর’ ‘ঝড়-কপোতী’ অথবা একরকমই একটা দুর্বোধ্য নামে বিদ্রোহের অবতার বলিয়া জ্ঞান করে, তাঁহাকে এবং তাঁহার যে কবিতাটিকে বিদ্রোহ-বাণীর পাঞ্চজন্য শঙ্খ বলিয়া ধরিয়া লয় তাহাকেই দৃষ্টান্তস্বরূপ ধরি না কেন?...’ আমি এটা, আমি সেটা, আমি জীবনের যত জীর্ণ, পরিত্যক্ত, জোড়াতালি দেওয়া জিনিষ তাহারই ভগ্নাবশেষ। আমি ফাটা টর্পেডোর টুকরা, আমি সাইক্লোন, আমি কৃষ্ণের বাঁশি, আমি অর্ফিয়ুসের বীণা, আমি চেঙ্গিজ, আমি ভীম ভাসমান মাইন, আমি বিধবার দীর্ঘশ্বাস, আমি বন্ধনহারা কুমারীর বেণী—ভগবান, বিদ্রোহীর মন কেমন জানি না, কিন্তু এমন স্বেচ্ছাচারী বাদশাহ, এমন ভীরু পদানত কেরাণীই বা কে আছে যে ষোড়শী তরুণীর গালের গুলবাগে শুভ্র গ্রীবার উপর, সুকোমল বক্ষঃস্থলে দিন রাত লুটোপুটি খাইবার প্রলোভন সম্বরণ করিতে পারে? এ তো বিদ্রোহ নয়, এ যে আত্মসমর্পণ।
[শনিবারের চিঠি কার্তিক, ১৩৩৪]
চাঁরুচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘কবিদ্রোহী’ শিরোনামের প্যারডি হাস্যরসের নামে নিম্নমানের রুচির পরিচয় দিয়েছে। ভুমিকাসহ এটির দুইটি স্তবক তুলে ধরা হলো—
“কাজী নজরুল ইসলাম সাহেবের ‘বিদ্রোহী' পড়িয়া রোমক সম্রাট Caligula সাহেব পাগল হইয়া যান; তখন তিনি যে কয়টি ব্যক্তিকে দংশন করেন, তাঁহাদের মধ্যে স্বরস্বতী, প্রজা-পারমিতা, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য। ইঁহাদের আর সকলেই দশদিনের মধ্যে প্রাণত্যাগ করেন, কেবল রবীন্দ্রনাথ দৈবযোগে বাঁচিয়া যান। রোমের এই দারুণ সংকটকালে আমার সোদর প্রতিম বন্ধু চাঁরুচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নিম্নলিখিত কবিতাটি রচনা করিয়া বর্মাকৃত দেহে Appian way-তে দাঁড়াইয়া গোধূলি লগ্নে ইহা সম্রাটকে শোনান। কবিতার সংগ্রাহক ‘জীমূত বাহন’।
আমি ভৈরব হাতে বিষাণ,
আমি বিষ্ণুর হাতে চক্র
আমি মহাসিন্ধুর নক্র,
আমি দুষ্টের মুণ্ডিত শিরে
ষষ্ঠী ঘোষের তক্র।
… … … … … …
আমি খোরাসানী ঘোড়া ছুটে যাই টগবগ বগ
পচা ঘায়ে নালী, জ্বলি আমি চির দগদগ,
আমি ফিরিঙ্গী, আমি মগ
আমি ‘চায়না সাগরে’ ‘টাইফুন’
আমি ‘জার্মান ওশানে' মহা ‘ফগ।’
[শনিবারের চিঠি কার্তিক, ১৩৪১]
শনিবারের চিঠি আধুনিক সাহিত্যের রুচিহীনতা ঠেকাবার জন্য একটা বলিষ্ঠ প্রাণপূর্ণ প্রতিবাদ করার মূল উদ্দেশ্য বলে সজনীকান্ত দাস তাঁর ‘আত্মস্মৃতি’-তে জানালেও উল্লেখিত প্যারোডিতে তাঁরা নিজেরাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে রুচিহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। যে অভিযোগ সজনীকান্ত, মোহিতলাল, নীরদচন্দ্র চৌধুরীরা নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ও চেতনার বিরুদ্ধে এনেছেন সেই অভিযোগে তাঁরাই অভিযুক্ত হয়ে যান।
‘ইসলাম দর্শন’ কার্তিক ১৩২৯ সংখ্যায় স্বয়ং পত্রিকা সম্পাদক আবদুল হাকিম ‘বিদ্রোহী’র প্যারোডি ‘বিদ্রোহ দমন’ নামে রচনা করে—
ওগো বীর
অসংযত বিদ্রোহী অধীর।
সংযত হয়ে নমিত কর তব গর্বিত উন্নত শির।
শির ‘উচু নেহারি' তোমারি লাজনত শিষ্টতা ধরণীর।
তুমি বেল্লিক বেঈমান
তুমি নমরুদ, তুমি ফেরাউন, তুমি খোদাদ্রোহী শয়তান।
তুমি স্বজনের অরি ফুলের কন্টক-ভ্রাতৃদ্রোহী বিভীষণ,
তুমি কুলবধূর বস্তাপহারী-দুর্মতি দুঃশাসন।
তুমি দেশের লাঞ্ছনা জাতির গঞ্জনা সমাজের প্লেমান,
ওরে বিদ্রোহী বেঈমান। প্রভৃতি
আরও একটি প্যারোডি ওই পত্রিকায় মোঃ গোলাম হোসেনের ‘প্রলয়ের ভেরী’ অগ্রহায়ণ ১৩২৯ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়—
তুমি অহঙ্কার মত্ত ইবলিস।
তুমি রুদ্র পিশাচ শয়তান খাবিস!
তাই, আপনারে ছাড়া কাহারে তুমি কর না কুর্নিশ।
তুমি শত্রুর সাথে গলাগলি করে মৃত্যুর সঙ্গে ধর পাঞ্জা।
বলি মাঝে মাঝে অভ্যাস আছে খাওয়া কি গাঞ্জা?
তাই নেশার জোরে, মহাঘোরে, হও ‘সাইক্লোন ঝঞ্জা।' ইত্যাদি
গোলাম মোস্তফা নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা ও ইসলামী-হিন্দু পৌরাণিক উপমার মিশ্র ব্যবহারের সমালোচনা করেছিলেন। পরে তিনি ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়াতে ‘বিদ্রোহী'কে লক্ষ্য করে ১৯২৩ সালে লিখলেন—
ওগো ‘বীর’
সংযত কর, সংহত কর ‘উন্নত' তব শির।
‘বিদ্রোহী'? শুনে হাসি পায়।
বাঁধন-কারার কাঁদন কাঁদিয়া বিদ্রোহী হ’তে সাধ যায়?
সে কি সাজেরে পাগল সাজে তোর?
আপনার পায়ে দাঁড়াবার মত কতটুকু তোর আছে জোর?
(নিয়ন্ত্রিত: রক্তরাগ)
গোলাম মোস্তফা নজরুল বিরোধিতা সারাজীবন করেছেন। নজরুল যখন সম্বিতহারা তখনও তাঁর বিরোধিতা কমেনি। এ প্রসঙ্গে অন্য কোনো প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করার ইচ্ছা আছে।
মাসিক সঞ্চয়, পৌষ, ১৩৩৬, আটের আঁটুনি নজরুল ইসলাম কি অতি-আধুনিক? শিরেনামে লেখা হয়—বিদ্রোহীর বদ্-নসীব। ‘বিদ্রোহী’ লইয়া বাংলাদেশে কী রকম হৈ চৈ হইয়াছিল তাহা ভুলিবার নয়। ‘প্রবাসী’ প্রমুখ অনেক পত্রিকায় তাহা সঙ্কলিত হইয়াছিল। ‘উদ্বোধনে’র এক লেখক ‘বিদ্রোহী’কে গীতার ছোট সংস্করণ পর্যন্ত বলিয়াছিলেন। কিন্তু কালের কুটিল প্রবাহে এই প্রশংসার বেগ ক্রমশঃ কমিয়া আসে। কমিতে কমিতে ‘বিদ্রোহী এখন ‘মেকী আস্ফালন’ আখ্যায় আখ্যাত হওয়ার অবস্থা পর্যন্ত পঁহুছিয়াছে। ভবিষ্যতের কাব্য-রসিকের বিচারে আরো কী শুনিব, কে জানে?
বাহার ‘নজরুলিস্তানে’ উক্ত ‘সাপ্তাহিক সওগাতে’ বাগবান appreciation-গুলি জড় করিতেছিলেন। আমরা এখানে পরের কয়েকটি depreciaton উদ্ধৃত করিতেছি—
(১) ‘নবীন-কবি নজরুল ইসলামের সুবিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’র আবেগ—সত্যদৃষ্টি গুপ্তার হাতে নিয়ন্ত্রিত নয়। তাই তার অনেক খানি কাব্য হিসাবে অকিঞ্চিৎকর।' —কাজী আবদুল ওদুদ, ১৩৩২।
(২) ‘আমি বন্ধন হারা কুমারীর বেণী’ ইত্যাদিতে বিদ্রোহীর স্বভাবসিদ্ধ রুদ্র নর্তনের ব্যাঘাত ঘটিয়াছে। ‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত, আমি সেইদিন হবো শান্ত’—এই রূপ অস্বাভাবিকভাবে দমিয়ে যাওয়ায় কবিতার রসভঙ্গ হইয়াছে।’—আবদুল কাদের, ১৩৩২।
(৩) “নজরুল ইসলামের প্রথম দিককার কবিতা ‘বিদ্রোহী’ উঁচু দরের কবিতা নয়। নজরুল ইসলাম খুব কিছুদিন জোর গলায় জয়ধ্বনি করলেন, তার অধিকাংশ ফাঁকা আওয়াজ।’—প্রগতি, শ্রাবণ, ১৩৩৬।
(৪) “আমাদের তথাকথিত কোনোও ‘বিদ্রোহী’ কবি বড় আশায় তাল ঠুকিয়া নকল পৌরুষের অভিনয় করিতে দাঁড়াইয়াছিলেন। কিন্তু হায়। ‘বুলবুলে’র গান তাঁহাকে লজ্জাবতী লতার পাশে আনিয়া ফেলিয়াছে।’—নির্মল কুমার ঘোষ দস্তিদার, উপাসনা, আশ্বিন, ১৩৩৬।
মোহাম্মদী, পৌষ, ১৩৩৬, বাঙ্গালী মুসলমানের সাহিত্য সাধনার পথঃ এস, ওয়াজেদ আলী বি, এ (ক্যান্টাব), বার-এট-ল লিখছিলেন—
“...আমাদের ‘প্রতিভাশালী' কবি কাজী নজরুল ইসলামই হিন্দু মুসলেম কালচার সমন্বয়ের অপূর্ব স্বপ্নটি দেখেছেন।... হিন্দু পৌত্তলিক-তার সঙ্গে ইসলামের তৌহিদকে মিলিয়ে তিনি নূতন একটা কিছু সৃষ্টি করতে চান।... কবি নজরুল ইসলামের চিন্তার এবং সাধনার ধারা দেখলে কিন্তু মনে হয়, হিন্দুর পুরাণই হবে তাঁর প্রস্তাবিত কালচার খিচুড়ীর প্রধান উপকরণ, আর তাকে মুখরোচক করবার জন্য ইসলামিক একটা ফোড়ন দেওয়ার ব্যবস্থা হবে মাত্র।”
সমকালীন মুসলমান নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা ‘মোসলেম ভারত' ব্যতিত অন্যান্য পত্রিকার মধ্যে ‘ইসলাম-দশর্ন’, ‘মোসলেম দর্পন’, ‘মাসিক মোহাম্মদী’ প্রভৃতি পত্রিকা ‘বিদ্রোহী’ নিয়ে আলাদাভাবে সমালোচনা না করলেও নজরুলের সমগ্র সাহিত্য নিয়ে চরম নেতিবাচক রচনা ও সমালোচনা প্রকাশ করেছে।
১৩২৯ বঙ্গাব্দের কার্তিক সংখ্যায় প্রকাশিত ‘ইসলাম-দর্শন’ পত্রিকায় মুন্সী মোহাম্মদ রেয়াজউদ্দিন আহমদ ক্ষুব্ধ ভাষায় নজরুল সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন—‘লোকটা মুসলমান না শয়তান’। পরবর্তীকালে ১৩৩২ সালের ভাদ্র সংখ্যায় ‘মোসলেম দর্পণ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘ইসলাম-বৈরী মুসলমান কবি’ শীর্ষক নিবন্ধকে কেন্দ্র করে নজরুল-সমালোচনার বিতর্ক আরও তীব্র আকার ধারণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৩৩৪ সালের মাঘ সংখ্যায় ‘ইসলাম-দর্শন’-এ শেখ হবিবর রহমান ‘কাজীর কেরদানী’ শীর্ষক প্রবন্ধে কাজী কাজী নজরুল ইসলাম-কে কঠোরভাবে আক্রমণ করেন। ১৩৩৫ সালে মাসিক ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকাও নজরুল-বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে। পত্রিকাটির কার্তিক সংখ্যায় নজির আহমদ চৌধুরী রচিত ‘এছলাম ও নজরুল ইসলাম’ শীর্ষক প্রবন্ধে নজরুল-বিরোধিতার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তাঁকে ইসলামের শত্রু হিসেবে অভিহিত করা হয়। সেখানে লেখা হয়েছিল—
‘...যে অসংযত বাক লেখক নিজেকে জগদীশ্বর বা রব্বুল আলামীন আল্লাহর ঈশ্বর বলিয়া প্রকাশ করিতে একটুও দ্বিধা না করেন, যিনি আল্লাহকে “খেয়ালী বিধি” বলিয়া তাঁহার বুকে পদাঘাত করার এমন অনুপম ধৃষ্টতা করিতে আনন্দে ও গৌরব অনুভব করেন... এছলামের প্রতি এক রতি মাসা পরিমাণ শ্রদ্ধা ভক্তি বিদ্যমান থাকিতে কোন মুসলমানই তাঁহাকে আপন বলিয়া গ্রহণ করা তো দূরে থাকুক অন্তর হইতে ধিক্কার না দিয়া পারে না। এছলামের চোখে এ অপরাধ অমার্জনীয়। সুতরাং বর্তমান যুগে তিনি যে এছলামের প্রধান শত্রু, তাহাতে আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই।’
এইসব মন্তব্য ও প্রবন্ধ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, কাজী নজরুল ইসলাম-এর বিদ্রোহী চেতনা, ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহারের সাহসী ভঙ্গি এবং প্রচলিত রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে তাঁর উচ্চারণ তৎকালীন একাংশের ধর্মীয় ও সাহিত্যিক মহলে প্রবল প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছিল।
উপমহাদেশের চারটি প্রধান ধর্মের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের সম্মিলিত রূপায়ণে নির্মিত হয়েছে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। এর কাব্যভুবনে পুরাণ, মিথ ও নানা ধর্মীয় অনুষঙ্গ কেবল অলঙ্করণস্বরূপ উপস্থাপিত হয়নি; বরং কবিতার অঙ্গসৌষ্ঠব, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প ও ধ্বনিমাধুর্যের সঙ্গে একাত্ম হয়ে তা পেয়েছে গভীর তাৎপর্য। বিভিন্ন ঐতিহ্যের পৌরাণিক উপাদানকে নজরুল সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। একই সঙ্গে বঞ্চনা ও বৈষম্যহীন এক মানবিক সমাজব্যবস্থার স্বপ্নচিত্র অঙ্কনে কবির দৃঢ় প্রত্যয় প্রকাশিত হয়েছে।
এত বিরূপ সমালোচনা, তীব্র বিরোধিতা ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের ঝড় বয়ে যাওয়ার পরও বিগত একশ বছরে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রাসঙ্গিকতা ম্লান হয়নি; বরং সময়ের প্রবাহে তা আরও গভীর, ব্যাপক ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। যে কবিতাকে একসময় কেউ উচ্ছৃঙ্খলতার, কেউ অতিরঞ্জনের, আবার কেউ ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগে বিদ্ধ করতে চেয়েছিল, সেই কবিতাই আজ স্বাধীনচেতা মানবমনের এক অনিবার্য উচ্চারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়েছে, ‘বিদ্রোহী’ কেবল ক্ষণিক আবেগের বিস্ফোরণ নয়; এটি অন্যায়, শোষণ, সংকীর্ণতা ও মানববিরোধী সব শক্তির বিরুদ্ধে মানুষের চিরন্তন আত্মপ্রত্যয়ের কাব্য। তাই শতবর্ষ অতিক্রান্ত হওয়ার পরও কবিতাটির দীপ্তি নিভে যায়নি-বরং প্রতিটি নতুন সময়, নতুন সংকট ও নতুন সংগ্রামের ভেতর দিয়ে তার আবেদন আরও তীব্র ও তাৎপর্যময় হয়ে উঠেছে। কারণ, এটি কেবল একটি কবিতা নয়; বরং অন্যায়, শোষণ, সাম্প্রদায়িকতা ও মানবিক অবমাননার বিরুদ্ধে মানুষের চিরন্তন প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর। সময় বদলেছে, শাসনের ধরন বদলেছে, সমাজের সংকটের রূপও পরিবর্তিত হয়েছে; কিন্তু বৈষম্য, নিপীড়ন ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আজও মানবসমাজে বিদ্যমান। সেই কারণে ‘বিদ্রোহী’র উচ্চারণ এখনও সমানভাবে অনুরণিত হয়।
কবিতাটির আরেকটি বড় শক্তি হলো এর অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী মানবতাবোধ। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যের নানা প্রতীক ও পুরাণকে একসূত্রে গেঁথে কাজী নজরুল ইসলাম এমন এক মানবিক চেতনার পরিচয় দিয়েছেন, যা বিভক্ত পৃথিবীতেও সম্প্রীতির বার্তা বহন করে। বর্তমান বিশ্বে ধর্মীয় বিদ্বেষ, জাতিগত সংঘাত কিংবা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে এই দৃষ্টিভঙ্গি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সাহিত্যিক দিক থেকেও কবিতাটির গুরুত্ব কমেনি। এর দুর্বার ছন্দ, তীব্র আবেগ, অনন্য শব্দচয়ন, পৌরাণিক অনুষঙ্গ ও বিপুল কল্পলোক বাংলা কাব্যভাষাকে নতুন শক্তি ও ব্যাপ্তি দিয়েছে। আজও বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহ, দ্রোহচেতনা কিংবা আত্মমুক্তির কবিতা আলোচনা করতে গেলে ‘বিদ্রোহী’ অনিবার্যভাবে ফিরে আসে।
তবে এটিও সত্য, বর্তমান প্রজন্মের পাঠকের কাছে কবিতার কিছু পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক অনুষঙ্গ দুর্বোধ্য মনে হতে পারে। তাই এর প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন নতুন ব্যাখ্যা, প্রাসঙ্গিক পাঠ ও সমকালীন আলোচনার। কিন্তু মূল চেতনা-মানুষের মুক্তি, আত্মমর্যাদা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অদম্য প্রতিরোধ আজও সমান জীবন্ত।
তথ্যসূত্র
১। বাংলা সাহিত্যে নজরুল: আজহারউদ্দিন খান।
২। কবি কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সৃজন: রফিকুল ইসলাম।
৩। কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি কথা: মুজফ্ফর আহমদ
৪। যুগস্রষ্টা নজরুল: খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন।
৫। সমকালে নজরুল ইসলাম: মুস্তাফা নূরউল ইসলাম।
৬। নজরুল ও তার বৈরিপক্ষ: আনোয়ারুল হক।
৭। কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার শতবর্ষ স্মারক: কবি নজরুল ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রকাশিত।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন