কৈশোরের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পথের যাত্রী নজরুল

অ+ অ-

 

বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৮৯৯ সালের ২৪ মে মঙ্গলবার বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া থানার অন্তর্গত চুরুলিয়া গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্ব-পুরুষ হযরত কাজী গোলাম নকশবন্দী (র.) মোগল সম্রাট শাহ আলমের (শাসনকাল ১৭৫৯/১৭৬০ সাল থেকে ১৮০৬ সাল পর্যন্ত) সময় পাটনার হাজীপুর থেকে বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া থানার অন্তর্গত চুরুলিয়ায় এসে বসতি স্থাপন করেন। পিতামহ কাজী আমিন উল্লাহর পুত্র কাজী ফকির আহমদের দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান তিনি। হযরত কাজী গোলাম নকশবন্দীর (র.) কাজী নজরুল ইসলামের পূর্বপুরুষ (সপ্তম পুরুষ) হিসেবেও পরিচিত। চুরুলিয়া অতীতে ছিল রাজা নরোত্তম দাসের (সিংহের) রাজধানী, বাংলার অস্ত্রাদি নির্মাণের প্রধান কেন্দ্র। অস্ত্র নির্মাণের স্থানগুলি আজও ‘চুরুলিয়া গড়’ নামে খ্যাত এবং সরকার কর্তৃক সংরক্ষিত। গড়ের ভগ্নস্তূপ নিয়ে নজরুল শিয়ারসোল স্কুলের ছাত্রাবস্থায় একটি কবিতাও লিখেছিলেন যার আরম্ভ ছিল এরকম—

(ঐ) গাঁয়ের দক্ষিণে দাঁড়ায়ে কে তুমি যুগ যুগ ধরি একা গো?
তোমার বুকে ও কিসের মলিন রেখা গো?
এ কোন দেশের ভগ্নাবশেষ?
কোন্ দিদিমার কাহিনীর দেশ?
যার অতীতেরি আবছায়াটুকু পাষাণেরি গায় দেখা গো—
তোমারি ঔরসে কোন চিতোরের চিতারি ভস্ম রেখা গো? ইত্যাদি

মোগল আমলে এখানে একটি প্রাচীন বিচারালয় ছিল, তার প্রমাণস্বরূপ প্রাচীন কাজী বংশ আজও এখানে বর্তমান। এই কাজী বংশ মোগল আমল থেকে আয়মা সম্পত্তি (আয়মা সম্পত্তি হলো মুসলিম শাসনামলে ধর্মপ্রচার, শিক্ষকতা, দাতব্য কাজ বা পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি হিসেবে মৌলভী বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের দেওয়া এক ধরনের নিষ্কর (খাজনা মওকুফকৃত) বা নামমাত্র করযুক্ত ভূসম্পত্তি) ভোগ করে আসছেন। কাজী নজরুল ইসলাম এই বংশেরই সন্তান।

কাজী ফকির আহমদের সংসারে জন্ম নিয়েছিল সাত পুত্র ও দুই কন্যা। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে জ্যেষ্ঠ পুত্র কাজী সাহেবজানের পর আরও চার পুত্র অকালেই মৃত্যুবরণ করেন। একের পর এক সন্তানের শোকাহত সেই পরিবারে পরবর্তীকালে নজরুলের জন্ম হলে তাঁর ডাকনাম রাখা হয় ‘দুখু মিয়া’। পরিবার-পরিজন, প্রতিবেশী ও স্বজনদের কাছে তিনি দীর্ঘদিন এই নামেই পরিচিত ছিলেন। শৈশব থেকেই দুঃখ, অভাব ও প্রতিকূলতার সঙ্গে তাঁর নিবিড় পরিচয় ঘটে। জীবনের প্রথম প্রহর থেকে যে বেদনাময় বাস্তবতা তাঁকে ঘিরে ছিল, তার ছায়া যেন কখনোই সম্পূর্ণভাবে সরে যায়নি। এমনকি জীবনের অন্তিম পর্বেও তাঁকে নানা দুঃখ-কষ্ট ও নির্মম নিয়তির পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাই ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়-জন্মের পর স্নেহভরে রাখা ‘দুখু মিয়া’ নামটি যেন এক গভীর ভবিষ্যদ্বাণীর মতোই তাঁর সমগ্র জীবনকে অর্থবহ করে তুলেছিল।

নজরুল তাঁর পিতা কাজী ফকির আহমদের মতোই যৌবনে ছিলেন বলিষ্ঠ, সুঠামদেহী ও সুদর্শন ব্যক্তিত্বের অধিকারী। উত্তরাধিকারসূত্রে কাজী ফকির আহমদেরও কিছু আয়মা সম্পত্তি ছিল। তবে তাঁর পিতা অল্প বয়সেই পিতৃহীন হওয়ায় আত্মীয়-স্বজনদের একাংশ পারিবারিক সম্পত্তির কিছু অংশ আত্মসাৎ করেছিল। অন্যদিকে, আত্মভোলা স্বভাবের কারণে অবশিষ্ট সম্পত্তিও হাতছাড়া হয়ে যায়। তবু বংশানুক্রমে প্রাপ্ত ‘কাজী’ উপাধিটি তাঁদের পরিবারের ঐতিহ্য হিসেবে অক্ষুণ্ণ ছিল। তাঁদের বাড়ির পূর্বদিকে রাজা নরোত্তমের গড় এবং দক্ষিণপার্শ্বে ‘পীর পুকুর’ নামে একটি পুষ্করিণী—শোনা যায় হাজী পাহলোয়ান নামে এক সাধক ঐ পুকুর খনন করিয়েছিলেন, তাই তার নাম ‘পীর পুকুর’। ঐ পুকুরের পূর্বপাড়ে পীর সাহেবের সমাধিক্ষেত্র আর পশ্চিমপাড়ে একটি ছোট্ট মসজিদ। পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে কাজী ফকির আহমদ আজীবন এই মাজার শরীফের খাদেমগিরি এবং মসজিদের সেবাযত্ন ও ইমামতির দায়িত্ব পালন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সাধকসুলভ মনোভাব ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রতিদিন সন্ধ্যায় মাজারে প্রদীপ প্রজ্বলন এবং মসজিদে বসে এশার নামাজ পর্যন্ত তসবিহ ও কোরআন তেলাওয়াতে নিমগ্ন থাকা ছিল তাঁর নিত্য অভ্যাস। সুন্দর হস্তাক্ষরের জন্য দলিল-দস্তাবেজ নকল করেও তিনি কিছু উপার্জন করতেন। ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও উদার মানসিকতার কারণে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ তাঁর কাছে আসত এবং তাঁর সান্নিধ্যে আন্তরিকতা অনুভব করত। দারিদ্র্য তাঁর জীবনের সঙ্গী হলেও তিনি কখনো নীচতা বা অসততার আশ্রয় নেননি। সততা, আত্মমর্যাদাবোধ ও মানবপ্রেমে উজ্জ্বল এই মানুষটি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। পিতার চরিত্রের মানবিকতা, উদারতা ও সর্বধর্মসমন্বয়ের চেতনা কাজী নজরুল ইসলামের রক্তধারায় উত্তরাধিকারসূত্রে প্রবাহিত হয়েছিল এবং পরবর্তী জীবনে তাঁর চিন্তা, কর্ম ও সাহিত্য এর দীপ্ত প্রতিফলন ঘটেছিল।

শৈশবে জ্ঞান হওয়ার পরই তার জীবনে নিয়তির নিষ্ঠুর লীলা শুরু হয়। মাত্র ৮ বছর বয়সে ১৩১৪ সালের ৭ চৈত্র (১৯০৮ সালের ২১ মার্চ) তার পিতার মৃত্যু হয়। পিতা ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। মৃত্যুকালে পরিবারের জন্য কোনো সঞ্চয় রেখে রেখে না যাওয়ায় তাঁর মৃত্যুতে দরিদ্রের সংসারে চরম আর্থিক বিপর্যয় দেখা দেয়। নজরুলের বিধবা মা ছেলেদের নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েন। বাচ্চাদের মুখে দু’মুঠো ভাত তুলে দেওয়া তার জন্য দুষ্কর হয়ে যায় বিধায় নজরুলের লেখাপড়া শেখার কোনো ভালো ব্যবস্থা হয়নি। তাঁর গোটা শৈশব হয়ে যায় বাধনহারা, লাগাম ছাড়া পল্লী বালকের মতো।

শৈশব থেকেই নজরুল ছিলেন প্রাণোচ্ছল ও রসিক। তাঁর সহজাত রঙ্গপ্রিয়তা, নির্মল হাস্যরস এবং তীক্ষ্ণ উপস্থিত বুদ্ধি, অসাধারণ ধী-শক্তি অতি সহজেই মানুষের মনে রেখাপাত করত। ফলে গ্রামের মক্তবের শিক্ষক মৌলভী ফজলে আহমদের বিশেষ স্নেহভাজন হয়ে ওঠেন। আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় সুপণ্ডিত মৌলভী সাহেবের সান্নিধ্যেই নজরুলের আরবি-ফারসি শিক্ষার প্রাথমিক ভিত্তি নির্মিত হয়। জনশ্রুতি আছে, সেই সময়ে কয়েকজন পশ্চিমাঞ্চলীয় আলেম ও মৌলভী সেই মক্তব পরিদর্শনে এলে তাঁরা কিশোর নজরুলের মুখে কুরআন শরিফের শুদ্ধ, সাবলীল ও সুললিত তেলাওয়াত শুনে বিস্মিত হন। এত অল্প বয়সে একজন বাঙালি বালকের এমন নির্ভুল উচ্চারণ ও স্বচ্ছন্দ পাঠ তাঁদের মুগ্ধ করেছিল।

পিতার কাছেই তিনি বাংলা ভাষার প্রাথমিক অক্ষরজ্ঞান লাভ করেছিলেন। পিতাই তাঁকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন হস্তাক্ষরের শিক্ষা দিয়েছিলেন। বর্ণপরিচয়ের প্রাথমিক ধাপ শেষ হওয়ার পর তাঁকে গ্রামের মক্তবে ভর্তি করা হয়। অধ্যবসায় ও মেধার পরিচয় দিয়ে তিনি মাত্র দশ বছর বয়সে, ১৩১৬ বঙ্গাব্দে (১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দ), নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এ সময়ে তিনি মক্তব, মাজার ও মসজিদের সংসর্গে বালক বয়সেই ধর্মীয় রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান ও মুসলমান সমাজ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পিতার মৃত্যুর পর বড়ভাই কাজী সাহেবজানের কাঁধে সংসারের দায়িত্ব পড়ে। জীবিকার তাগিদে তিনি আসানসোলের কয়লাখনিতে শ্রমিকের কাজ গ্রহণ করেন। ফলে পিতৃহীন কিশোর নজরুলের জীবনে এক কঠিন অধ্যায়ের সূচনা হয়, যা তাঁকে অকালেই জীবনের বাস্তব সংগ্রামের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বড়ভাইয়ে রোজগারে প্রেরিত অর্থে যখন সংসার চলছিল না তখন তিনি ওই মক্তবেই এক বছর শিক্ষকতা করেন। আশেপাশের পল্লীতে মোল্লাগিরি করে কিছু রোজগারের চেষ্টা করেন। মাঝে মাঝে হাজী সাহেবের মাজারের খাদেমগিরি ও মসজিদের ইমামতি করে কিছু আয়ের চেষ্টা করেন।

কৈশোর থেকেই নজরুলের মধ্যে গভীর আধ্যাত্মিক অনুরাগ লক্ষ করা যায়। জনশ্রুতি আছে কঠোর উপবাস, নামাজের মাধ্যমে তিনি আত্মিক সত্যের সন্ধান অর্থাৎ ঈশ্বর প্রাপ্তির চেষ্টা করতেন। পীরের খাদেম হয়েও তিনি রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ ও ভাগবত গভীর আগ্রহে অধ্যয়ন করেন। মাঝে মাঝে তিনি উধাও হয়ে যেতেন, আশপাশের সাধু-সন্ত, সুফি-দরবেশ ও আউল-বাউলদের সান্নিধ্যে গিয়ে তাঁদের জীবনাচার পর্যবেক্ষণ করতেন এবং তা নিজের জীবনেও অনুসরণ করার চেষ্টা করতেন। চাল চলনে উদাসীনতা ও ভাবুক স্বভাবের কারণে প্রতিবেশীরা তাঁকে কখনো ‘তারা ক্ষ্যাপা’, কখনো ‘নজর আলি’ নামে ডাকত। পরবর্তীকালে তাঁর ভক্তিমূলক আধ্যাত্মিক সঙ্গীত রচনা ও আধ্যাত্মিক সাহিত্য সাধনার বীজ নিহিত ছিল এই অভিজ্ঞতাগুলোর মধ্যেই।

অল্প বয়সেই নজরুলের কবিত্ব শক্তির পরিচয় মেলে। নজরুলের দূর সম্পর্কের চাচা (ফকির আহমদের চাচাত ভাই) কাজী বজলে করীমের ফারসি ভাষায় বিশেষ দক্ষতা ছিল এবং তিনি কবিতা চর্চা করতেন। কাজী বজলে করীমের কাছে তাঁর ফারসি ভাষায় দক্ষতা এবং উর্দু-আরবি-ফারসি মিশ্রিত ‘মুসলমানী বাংলায়’ কবিতা লেখার হাতে খড়ি হয় নজরুলের। অভাবের সংসারে লেখাপড়ায় বেশি মনোযোগী হতে না পারলেও দারিদ্রদোষ তার সহজাত কবিত্ব শক্তিকে নষ্ট করতে পারে নি।

তাঁর সময়ে চুরুলিয়ায় অনেক পল্লীকবি ছিলেন, তাঁদের সাহচর্যে তাঁর কবি-প্রতিভা বিকশিত হতে থাকে। পল্লীকবিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় কবিকে ‘গোদা কবি’ বলা হতো। সে সময়ের প্রধান পল্লীকবি বা ‘গোদা কবি’ ছিলেন কবিয়াল শেখ চকোর। তিনি নজরুলের অসাধারণ প্রতিভা অল্প বয়সেই চিনতে পেরেছিলেন। তিনি স্নেহভরে নজরুলকে ‘ব্যাঙাচি’ বলে ডাকতেন এবং লোকজনকে বলতেন, ‘এই ব্যাঙাচিই বড় হয়ে একদিন সাপ হবে’ পরবর্তীকালে নজরুলের খ্যাতি তাঁর সেই ভবিষ্যদ্বাণীকেই সত্য প্রমাণ করেছিল। দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্তিলাভের আশায় মাত্র ১১-১২ বছর বয়সেই নজরুল ‘লেটো’ দলে যোগ দেন। লেটো ছিল গান, নাটক ও অভিনয় নির্ভর এক ধরনের লোকনাট্য, যেখানে দুই দল পালাক্রমে গান ও অভিনয়ের মাধ্যমে প্রশ্নোত্তর করত। অল্প বয়সেই নজরুল এ ধরনের গান, নাটক ও প্রহসন রচনা করে আশপাশের গ্রামাঞ্চলে পরিচিতি ও সুনাম অর্জন করেন। চুরুলিয়া, রাখাপুড়িয়া, নিমশাহ গ্রামের লোকেরা তাঁকে ‘কবি’ বলে স্বীকার করে নেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজ গ্রামের লেটো দলের ওস্তাদের পদ প্রাপ্ত হন। লেটো-দলের ওস্তাদের দায়িত্ব কেবল গান, কবিতা বা নাটক রচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত না। তাঁকে গানের সুরারোপ, নাটক পরিচালনা এবং প্রয়োজন হলে শিল্পীদের অনুপস্থিতিতে নিজেই অভিনয় করতে হতো। আসরকে প্রাণবন্ত রাখতে অবসর সময়ে স্বরচিত গান কিংবা উর্দু গজল পরিবেশনও ছিল ওস্তাদের দায়িত্বের অংশ। পরবর্তী জীবনে নজরুল যে ফরমায়েশি রচনা ও তাৎক্ষণিক সৃষ্টিশীলতায় অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তার ভিত্তি রচিত হয়েছিল মূলত এই লেটো-পর্বে। মাত্র ১৩-১৪ বছর বয়সে এত বহুমুখী ও দায়িত্বপূর্ণ যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে তিনি সবার প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।

এই লেটো দলে যোগদান নজরুলের ভবিষ্যৎ কবি-জীবনকে নানাদিক দিয়ে প্রভাবিত করেছিল। লেটো গানের কথকরা শ্রোতার সামনে পৌরাণিক উপমা, প্রবাদ বাক্য, প্রচলিত গল্প-কিস্‌সা দিয়ে বিষয়কে উপস্থিত করেন, এ কারণেই নজরুলের লেখাতেও এই পৌরাণিক প্রতীক প্রচুর পরিমাণে এসেছে বলে অনুমান করা যায়। গ্রামাঞ্চলে যেখানে কথকতা, কীর্তন, যাত্রাগান, পালাগান কিংবা মিলাদ শরীফের আসর বসত, সেখানেই তিনি আগ্রহভরে উপস্থিত হতেন। বিভিন্ন ধারার ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও লোকজ পরিবেশনার সঙ্গে নিবিড় পরিচয় তাঁর জ্ঞান, রুচি ও সৃজনশীলতাকে সমৃদ্ধ করেছিল। নজরুল ১১/১২ বৎসর বয়সেই ‘লেটো’ দলের জন্য ‘চাষার সং’, ‘রাজপুত্র’, ‘শকুনিবধ’, ‘মেঘনাদবধ’, ‘দাতাকর্ণ’, ‘কবি কালিদাস’, ‘আকবর বাদশা’ নামক বেশ কয়েকটি পালাগান রচনা করেন। এছাড়া বহু মারফতী, পাঁচালী ও কবিগান রচনা করে ‘ছোট উস্তাদজী’ খ্যাতি অর্জন করেন। নজরুলের কবি-প্রতিভা জীবন-প্রভাতেই এমনভাবে ফুটে উঠেছিল যে, পার্শ্ববর্তী কয়েকটি পল্লীর লেটো দল তার কাছে পালা লেখাতে আসতো। এতে তাঁর রোজগারও হতো। সে সময়ের রচনায় উর্দু-ফারসি মিশেল ঘরোয়া বাংলা জবানের প্রাচুর্য দেখে মনে হয় যে, তিনি মুসলমানি পুঁথি ও মারফতি গানের সংস্পর্শ পেয়েছিলেন। রাঢ়-বঙ্গের পাঁচালীকার, কবিয়াল ও যাত্রাওয়ালাদের ঢঙে তিনি অনেক হাসির গানে প্রচুর ইংরেজী পদপ্রয়োগ করেন। কিন্তু সেই বাল্য রাচনায়ও ছিল স্বকীয়তার ছাপ। তাঁর ‘চাষার গীতে’ আছে:

চাষ কর দেহ জমিতে
হবে নানা ফসল এতে।
নামাজে জমি ‘উগালে’
রোজাতে জমি ‘সামালে’,
কলেমায় জমিতে মই দিলে
চিন্তা কি হে এই ভবেতে।।
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাতে
বীজ ফেল্ তুই বিধি-মতে,
পাবি ‘ঈমান’ ফসল তাতে —
আর রইবি সুখেতে।।
নয়টা নালা আছে তাহার
ওজুর পানি সিয়াত যাহার,
ফল পাবি নানা প্রকার—
ফসল জন্মিবে তাহাতে।।
যদি ভালো হয় সে-জমি
হজ্ জাকাত লাগাও তুমি,
আরো সুখে থাকবে তুমি—
কয় নজরুল এসলামেতে।।

এ গান বুঝি রাম রামপ্রসাদ সেনের সমস্বর—

মন রে, কৃষি কাজ জান না
এমন মানবজমি রইল পতিত আবাদ করলে ফলত সোনা।
কালী নামে দাও রে বেড়া, ফসলে তছরুপ হবে না
সে যে মুক্তকেশীর শক্ত বেড়া, তার কাছেতে যম ঘেঁষে না।
গুরুদত্ত বীজ রোপণ করে ভক্তিবারি তায় সেঁচ না।
ওরে একা যদি না পারিস মন, রামপ্রসাদকে সঙ্গে নে না॥

রামপ্রসাদ সেনের ‘ও মন তুমি কৃষি-কাজ জান না’ গানটিতে আছে কালী-মহাত্মের প্রচারণা, পক্ষান্তরে নজরুল তাঁর ‘চাষার সং’ রূপক নাট্যে মুসলমানি ঈমান ও আহকামের ফজিলৎ বর্ণনা করেছেন। বাল্য-রচনায় সকল বৈচিত্র্য ছাপিয়ে উঠেছিল তাঁর এই বিশেষত্ব।

নজরুলের জীবনে সুনাম ও দুর্নাম-উভয়ই যেন ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অলঙ্কার। সারাজীবন তিনি এই দুই বিপরীত অভিজ্ঞতাকে সমান স্বাভাবিকতায় বহন করেছেন। পরবর্তী জীবনে যখন তিনি জাতীয় খ্যাতিসম্পন্ন কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন, তখনও একশ্রেণির মানুষের সমালোচনা ও বিরূপ মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। শৈশব-কৈশোরেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। লেটো দলে পালা-রচয়িতা হিসেবে তাঁর যথেষ্ট খ্যাতি ছিল; পাশাপাশি মেধাবী ছাত্র হিসেবেও তিনি সুনাম অর্জন করেছিলেন। কিন্তু সেই সঙ্গে তাঁর দুরন্ত স্বভাবেরও বিস্তর কাহিনি ছিল। লেটো দলে যুক্ত থাকলেও দুষ্টুমি ও দুরন্তপনায় তিনি ছিলেন সবার চেয়ে এগিয়ে। কারও বাগানের ফল তাঁর নজরে পড়লে তা বেশিক্ষণ গাছে টিকত না; পুকুরের মাছ কিংবা ক্ষেতের ফসলও তাঁর দস্যিপনার হাত থেকে রেহাই পেত না। তাঁর এই অদম্য চপলতায় অতিষ্ঠ হয়ে পাড়াপড়শিরা শেষ পর্যন্ত তাঁর লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেন রানীগঞ্জের শিয়ারসোল রাজ স্কুলে। সেখানে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে নজরুল মনোযোগের সঙ্গে অধ্যয়ন শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁর মেধার স্বাক্ষর রাখেন এবং বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে পঞ্চম শ্রেণিতে উন্নীত হন।

এখানেও নজরুলের জীবনে স্থিতিশীলতা জুটল না। বোর্ডিং এর সুপারিনেটেন্ডেটের সাথে ছাত্রদের খাবারের মান নিয়ে ঝামেলা সৃষ্টি হয়। বোর্ডিং-এর সুপারিনেটেন্ডেট ছাত্রদের খাবারের ব্যাপারে কৃপণতা করতেন, ফলে কথাকাটি হয়। সুপারিনেটেন্ডেট প্রধান শিক্ষককে নজরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতেন কিন্তু প্রধান শিক্ষক নজরুলের কথায় কান দিতেন না। ফলাফল আবার ভবঘুরে জীবন! শিয়ারসোল স্কুল ছেড়ে দিয়ে পুনরায় লেটো দলে ভিড়ে গান লেখা শুরু হল, রাখাল ছেলেদের সঙ্গে মিশে সারা দুপুর টো টো করে ঘোরা শুরু হয়ে গেল। এই জীবনও তাঁর সব সময় ভাল লাগত না। আবার লেখাপড়ার দিকে মনটা ঝুঁকলো। অবশেষে ১৯১১ সালের দিকে বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট থানার অজয়নদীর তীরে মাথরুন গ্রামে কাশিমবাজারের মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী (১৮৬০-১৯৩০) স্থাপিত নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউটে ভর্তি হলেন। কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক (১৮৮২-১৯৭০) ছিলেন সে স্কুলের প্রধান শিক্ষক। নজরুলের সহজাত বিনয়ী স্বভাব ও শ্রদ্ধাশীল আচরণ সহজেই কুমুদরঞ্জনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

বাঁধাধরা শিক্ষাব্যবস্থা ও নিয়মমাফিক পাঠক্রমের প্রতি নজরুলের অনুরাগ ছিল অল্পই। তাঁর জ্ঞান পিপাসা ছিল প্রবল, কিন্তু বিদ্যালয়ের একঘেয়ে ও নীরস শিক্ষাপদ্ধতি তাঁর স্বাধীন মননের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। তবে পছন্দের কোনো বই হাতে পেলে তিনি গভীর আগ্রহে তা পড়তেন এবং শেষ না করে ক্ষান্ত হতেন না। ১৯১১ থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত মাথরুন বিদ্যালয়ে দুবছর একটানা অধ্যয়ন ও অর্থের চিন্তায় তিনি ক্রমে ক্লান্ত ও অস্থির হয়ে ওঠেন। বিস্তৃত পৃথিবী যেন তাঁকে আহ্বান জানাচ্ছিল নতুন সম্ভাবনা ও অজানার পথে। মুক্ত জীবনের আহ্বান তাঁকে আবার টানতে শুরু করে। অজানার পথে চলার দুর্নিবার আকর্ষণ, চিরচঞ্চল মনের অভিযাত্রার তাগিদ এবং স্বাধীনতার মোহ তাঁকে পথের মানুষ করে তোলে। তিনি পুনরায় লেটো-দলের সঙ্গে যুক্ত হন। যাযাবর শিল্পী জীবনের উন্মুক্ত স্বাদ তাঁকে সাময়িক তৃপ্তি দিলেও জীবনের সংগ্রাম থেকে মুক্তি পাওয়া এত সহজ ছিল না।

চুরুলিয়া অঞ্চলে প্রতি বছর সমভাবে ফসল ফলতো না; প্রায়ই দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি দেখা দিত। কৃষকের হাতে অর্থের অভাব থাকলে পালাগানের আয়োজনও কমে যেত। অন্যদিকে নজরুলের পরিবারে দারিদ্র্যের অবস্থাও তখন তীব্রতর হচ্ছিল। সেই সময়ে তিনি বাসুদেবের লেটো দলে গান রচনা করতেন, আবার ঢোল বাজিয়ে ও নৃত্যে অংশ নিয়েও দলের কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। পাড়াগাঁয় ডাক না পড়লে লেটো দল রোজগারের উদ্দেশ্যে শহরে যেত।

শহরে একটি আসরে নজরুলের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে অণ্ডাল ব্রাঞ্চের রেলওয়ের একজন খ্রিষ্টান গার্ড তাঁকে নিজের গৃহকর্মী ও বাবুর্চি হিসেবে নিয়োগ দেন।। তাঁর কাজ ছিল গার্ড সাহেবের বাড়ি প্রসাদপুর থেকে টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার এনে রেলস্টেশনে পৌঁছে দেওয়া আর কাজের শেষে মাতাল গার্ড সাহেবকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া। কখনো কখনো শহর থেকে বিদেশি মদ সংগ্রহ করে আনা। মদ্যপানে আসক্ত ওই গার্ড অধিকাংশ সময়ই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকতেন। গার্ড সাহেবের ঘনিষ্ঠতা ছিল এক স্বামী পরিত্যক্তা নারীর সঙ্গে, যিনি এক প্রতিবন্ধী কন্যা সন্তানকে নিয়ে দ্বিতীয়বার সংসার করেছিলেন। প্রতিবন্ধী মেয়েটির জন্মদাতা পিতা কাছেই থাকতেন এবং অর্থের বিনিময়ে মেয়েকে অন্যত্র বিয়ের ব্যবস্থা করতে চাপ সৃষ্টি করছিলেন। এই জটিল পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের উদ্দেশ্যে গার্ড সাহেব কৌশলে মেয়েটিকে নজরুলের সঙ্গে প্রসাদপুরে পাঠিয়ে দেন এবং তার পিতাকে জানান যে, মেয়েটি তাঁর মুসলমান বাবুর্চির সঙ্গে পালিয়ে গেছে। প্রসাদপুরে গিয়ে যাতে কোনো ঝামেলা না করতে পারে সেজন্য নজরুলকে দুই মাসের মাইনের টাকা দিয়ে বিদায় করে দিলেন। নজরুল আর কোনো দিন প্রসাদপুরের বাংলোয় ফিরে যাননি।

১৯১৩ সালের দিকে নজরুল প্রসাদপুর থেকে আসানসোল এলেন। পিছনে ফেলে এলেন শৈশব-কৈশোরের চেনা মাঠ-ঘাট, বন-বাদাড়, প্রিয় লেটো-দলের সান্নিধ্য, ব্যাকুল মায়ের স্নেহ এবং আত্মীয়-স্বজনের মায়াবন্ধন। কোনো আকর্ষণই তাঁকে আর ধরে রাখতে পারল না। এভাবেই দিশাহারা অথচ স্বপ্নমুখর এক তরুণ এসে পৌঁছাল মহকুমা শহর আসানসোলে।

অপরিচিত জায়গা, গ্রামের ছেলে, চারদিকে অচেনা মানুষ কি আর করা—স্টেশনের কাছেই হুগলী নিবাসী মহম্মদ বখশের রুটি দোকানে খোরাকীসহ মাসিক এক টাকা বেতনে কাজ নেন। তাঁর কাজ ছিল ভোরবেলায় রুটির জন্য ময়দা মাখানো আর দোকানে বসে দিনের বেলা রুটি তৈরি ও বিক্রি করা। দোকান মালিক খাওয়ার ব্যবস্থা করলেও থাকার ব্যবস্থা না করায় তিনি দোকান সংলগ্ন একটি তিনতলা বাড়ির সিঁড়ির নিচে রাতে ঘুমাতেন। অবসর সময় গান-কবিতা লিখতেন, বেচাকেনার ফাঁকে ফাঁকে হারমোনিয়াম সহযোগে গান গাইতেন, বাঁশি বাজিয়ে খদ্দেরদের আকৃষ্ট করতেন। নজরুল যে বাড়ির সিঁড়ির নিচে রাতে ঘুমাতেন সেই বাড়িতে থাকতেন পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর কাজী রফিজউল্লাহ ও তাঁর পত্নী শামসুন নেসা। একদিন সিঁড়ির নীচে নজরুলকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে কৌতূহলী হয়ে নজরুলের জীবন কাহিনী জানতে পারেন। তিনি নজরুলের পরিচয় নিয়ে তাঁকে নিজের বাড়িতে মাসিক ৫ টাকা বেতনে গৃহভৃত্যের কাজ দেন। কাজী দম্পতির তখন কোন সন্তানাদি ছিল না—নজরুলের মিষ্টি চেহারা ভদ্র ব্যবহার ও কবিত্বশক্তি দেখে ও গান শুনে গুণগ্রাহী রফিজউল্লাহ বুঝতে পারলেন এই বালকের মধ্যে প্রতিভার বীজ সুপ্ত আছে। উপযুক্ত শিক্ষা লাভের সুযোগ পেলে একজন উঁচুদরের কবি হয়ে উঠতে পারে। কাজী দম্পতির স্নেহ ও আদর পেয়ে নজরুল তাঁদের কাছে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে দেবার জন্য অনুরোধ করেন। কাজী সাহেব তাঁর লেখাপড়ার ব্যবস্থা করার জন্য ময়মনসিংহের কাজীর সিমলা গ্রামের বাড়িতে বড় ভাই সাখাওয়াতউল্লাহর কাছে পাঠিয়ে দিলেন এবং তাঁকে অনুরোধ করলেন তিনি যেন নজরুলকে স্কুলে ভর্তি করে দেন। আসানসোলে রুটির দোকানে ও কাজী রফিজউল্লাহর বাসায় নজরুল মাত্র তিনমাস ছিলেন।

কাজীর সিমলা গ্রামে তখন কোন স্কুল ছিল না। দরিরামপুর হাই স্কুলেই আশেপাশের গ্রামের ছেলেরা লেখাপড়া করত। সাখাওয়াত সাহেব নজরুলকে ১৯১৪ সালের জানুয়ারি মাসে ময়মনসিংহের ত্রিশাল বাজারের সন্নিকটবর্তী দরিরামপুর হাই স্কুলের সপ্তম শ্রেণীতে বিনাবেতনের ছাত্ররূপে ভর্তি করে দিলেন এবং তাঁকে নিজের বাড়িতে রাখলেন। গ্রাম থেকে স্কুলের দূরত্ব বেশি থাকায় দরিরামপুর স্কুলের কাছাকাছি নজরুলের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাও তিনি করে দিয়েছিলেন। দু’এক জায়গায় জায়গীররূপে তিনি থেকেছেন। কিন্তু স্কুলের বন্ধ আবেষ্টনী সেবারও নজরুলকে বেঁধে রাখতে পারল না। প্রতিদিন স্কুলে যেতেন না, স্কুলের কাছে ঠুনিভাঙ্গা ঝিলের তীরে বসে বাঁশী বাজাতেন, স্কুলে গেলেও অন্যমনস্ক থাকতেন। কেমন যেন উদাস উদাস ভাব তাঁকে পেয়ে বসেছিল। বার্ষিক পরীক্ষায় অষ্টম শ্রেণীতে উর্ত্তীর্ণ হন। ১৯১৪ সালের ডিসেম্বরর মাসে কাউকে কিছু না বলে ময়মনসিংহ ত্যাগ করে নিজ গ্রামে ফিরে আবার লেটো দলে যোগ দেন। তিনি মাত্র ১ বছর দরিরামপুর হাই স্কুলে পড়ে ছিলেন। কাজীর সিমলা কিংবা দরিরামপুরে আর কখনো ফিরে যাননি।

কিছুদিন ঘোরাঘুরির পর লেখাপড়ায় আবার মন ফিরল। এ সময় দুষ্টুমি ও চাঞ্চল্য অনেকটা কমে গেল। ১৯১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আবার রানীগঞ্জের শিয়ারসোল স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন। তবে এবার তাঁর স্কুলে  ভর্তি হতে বেগ পেতে হয়েছিল স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাঁকে প্রথমে ভর্তি করেননি। মনের দুঃখে তিনি এক বন্ধুকে তাঁর মনোবেদনা জানিয়ে কবিতাকারে পত্র লিখেন। ওই কবিতা পত্রের ভাব ও ভাষা দেখে প্রধান শিক্ষক মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিনাবেতনে স্কুলে ভর্তি করে নেন এবং মুসলমানদের হোস্টেলে বিনা খরচে আহার ও থাকার ব্যবস্থা করে দেন। হাত খরচ বাবদ সাত টাকা রাজবাড়ি থেকে দেবার ব্যবস্থাও করে দেন। (দ্র.—শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়-কেউ ভোলে না কেউ ভোলে, ১৩৬৭)। ১৯১৫ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত তিনি ওই স্কুলে অধ্যয়ন করেন। প্রতি বছর পরীক্ষায় প্রথম হয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও রচনা প্রতিযোগিতায় পুরস্কার লাভ করেন। রচনা প্রতিযোগিতায় একবার নগদ চার টাকা পুরস্কারও পেয়েছিলেন। শিক্ষকদের বিদায় উপলক্ষে অভিনন্দনপত্র রচনার দায়িত্বও প্রায়ই তাঁর ওপর পড়ত। এসব রচনায় নিজের নাম গোপনে এমনভাবে যুক্ত করতেন, যা সাধারণের চোখ এড়িয়ে গেলেও সচেতন পাঠকের নজর এড়াত না। এরকম একটি অভিনন্দন পত্রের কথা খান মহম্মদ মঈনুদ্দীন (১৯০১-১৯৮১) উল্লেখ করেছেন তাঁর ‘যুগস্রষ্টা নজরুল’ (১৯৫৭) গ্রন্থে। প্রতিটি স্তবকে ছটি পংক্তি নিয়ে মোট আটটি স্তবকে বিদায় অভিনন্দন পত্রটি রচিত। প্রতিটি স্তবকের প্রথম পংক্তি তাঁর নামের আদ্যক্ষর নিয়ে শুরু। এখানে তাঁর নামের অক্ষরগুলি নিয়ে কিভাবে প্রতিটি স্তবকের প্রথম পংক্তি রচনা করেছিলেন তা উদ্ধৃতি করা হলো—

নয়ন গলিয়া রয় তপ্ত অশ্রুনীড়
জলধি শুকায়ে যাও অনিল বয়ো না
রুদ্ধ বেদনা গো ছুটিছে মথিয়া হিয়া
ললাটে লিখন বিধি এত কি কঠোর
এতই উদার তুমি তরুণ বয়সে
সকলি ভুলিব কালে, রহিবে কীরতি
লাবণ্য শুকাল আজ সকলি ফুরাল
মধুর স্বপন ভাঙ্গি স্তব্ধ নিশীথে

শিয়ারসোল স্কুল নজরুলের জীবন ও মানস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও যুগান্তর দলের বিপ্লবী কর্মী নিবারণচন্দ্র ঘটক (১৮৯১-১৯৬০) তাঁর মনে দেশপ্রেম, সাম্যবাদ ও বিপ্লবী চেতনার বীজ বপন করেন। অন্যদিকে, সঙ্গীতপ্রেমী নজরুলের প্রতিভা লক্ষ্য করে শিক্ষক সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল তাঁকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম দেন। আরবি-ফারসি ভাষার প্রতি নজরুলের আগ্রহের ভিত্তি গড়ে ওঠে পারিবারিক পরিবেশে চাচা কাজী বজলে করীমের কাছে। শিয়ারসোল স্কুলে মৌলভী হাফিজ নুরুন্নবীর কাছে তিনি নিয়মিত ফারসি শিক্ষা লাভ করেন। নুরুন্নবীর উৎসাহেই তিনি সংস্কৃতের পরিবর্তে ফারসিকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেন। এই সুদৃঢ় ফারসি জ্ঞানের কারণেই পরবর্তীকালে করাচি সেনানিবাসে হাফেজের রুবাইয়াত অধ্যয়ন তাঁর জন্য সহজ হয়ে ওঠে। শিয়ারসোল স্কুলে অধ্যয়নকালে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১৯০১-১৯৭৬)। তাঁদের বন্ধুত্ব পরবর্তী জীবনেও অটুট ছিল।

১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হলে একদিকে জার্মানি ও তুরস্ক এবং অন্যদিকে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইতালির নেতৃত্বাধীন মিত্রশক্তি পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। ক্রমে এই যুদ্ধ ইউরোপের সীমানা অতিক্রম করে এশিয়া, আফ্রিকা ও অটোমান সাম্রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন রণক্ষেত্রে মিত্রবাহিনীর সহায়তার জন্য ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীকেও যুদ্ধে অংশ নিতে পাঠানো হয়। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর দীর্ঘদিন ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কোনো বাঙালি রেজিমেন্ট ছিল না। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রয়োজন মেটাতে ব্রিটিশ সরকার পুনরায় বাঙালিদের নিয়ে সেনাদল গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এরই ফলস্বরূপ ১৯১৬ সালে ‘বেঙ্গলি ডবল কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে ১৯১৭ সালের ২৬ জুন ‘বেঙ্গলি ডবল কোম্পানি’ সম্প্রসারিত হয়ে ‘৪৯ বেঙ্গলি রেজিমেন্ট’-এ রূপান্তরিত হয় এবং এর কেন্দ্র স্থাপিত হয় করাচি ক্যান্টনমেন্টে।

১৯১৭ সালে নজরুল দশম শ্রেণীর ছাত্র, ‘প্রি-টেস্ট’ পরীক্ষা চলছে। তখন তার বয়স আঠারো। সবেমাত্র কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পদার্পন করেছে। এদিকে শহরে, গাঁয়ে সৈন্য সংগ্রহের তোড়জোড় চলছে। একদিকে সংসারের অভাব অনটন তাঁকে ব্যাকুল করে তুলছে অপর দিকে দেশের নেতৃবৃন্দ বাঙালী যুবকদের যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হওয়ার জন্য যুদ্ধে যোগদানের জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। অগত্যা নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম ১৯১৭ সালের জুলাই মাসের পর কোনো এক সময়ে এই ৪৯ বেঙ্গলি রেজিমেন্টে যোগদান করে করাচিতে যান। সেখানে তিনি ১৯২০ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত সামরিক জীবনে কর্মরত ছিলেন।

কাজী নজরুল ইসলামের কৈশোর ছিল সংগ্রাম, দারিদ্র্য, অস্থিরতা ও আত্মগঠনের এক অনন্য অধ্যায়। পিতৃহীন অবস্থায় সংসারের দায়ভার কাঁধে নিয়েও তিনি জীবনের প্রতিকূলতার কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। মক্তবের শিক্ষকতা, মসজিদের ইমামতি, মাজারের খাদেমগিরি, লেটো দলে অংশগ্রহণ, বাবুর্চির কাজ কিংবা রুটির দোকানের কর্মচারী-প্রতিটি অভিজ্ঞতাই তাঁর জীবনবোধকে সমৃদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও লোকজ ঐতিহ্যের বহুমাত্রিক সংস্পর্শ তাঁর মননকে করেছে উদার ও অসাম্প্রদায়িক। শৈশবেই প্রকাশিত কবিত্বশক্তি, সঙ্গীত প্রতিভা ও জ্ঞান পিপাসা তাঁকে সমসাময়িকদের থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদা এনে দেয়। বিদ্যালয়ের গণ্ডি তাঁকে দীর্ঘদিন আবদ্ধ রাখতে না পারলেও জ্ঞানার্জনের আকাঙ্ক্ষা কখনো ম্লান হয়নি। সংগ্রামমুখর এই কৈশোরেই গড়ে ওঠে তাঁর বিদ্রোহী চেতনা, মানবপ্রেম এবং শিল্পীসত্তার দৃঢ় ভিত্তি। পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্য, সঙ্গীত ও সমাজচিন্তায় যে অসাধারণ নজরুলের আবির্ভাব ঘটে, তার বীজ নিহিত ছিল এই ঘটনাবহুল কৈশোরপর্বে। তাই নজরুলের কৈশোর কেবল একজন কবির বেড়ে ওঠার ইতিহাস নয়, বরং প্রতিকূলতাকে জয় করে আত্মপ্রতিষ্ঠার এক অনুপ্রেরণাদায়ী মহাকাব্য।

পুনশ্চ, নজরুলের বংশ তালিকা—হযরত গোলাম নকশাবন্দ—কাজী কেফায়েতুল্লাহ—কাজী খেবায়েতুল্লাহ—কাজী গোলাম হোসেন—কাজী আমিনুল্লাহ—কাজী ফকির আহমদ—কাজী নজরুল ইসলাম। (সূত্র: বাংলা সাহিত্যে নজরুল-আজহারউদ্দিন খান)