রিফাত চৌধুরীর কবিতা, অভিনয় এবং একা থাকার শিল্প
|| যে জীবন থেকে শিল্পীর জন্ম ||
১৯৬০ সাল। কিশোরগঞ্জ শহরে জন্ম কবি রিফাত চৌধুরীর। বাবা শামসুজ্জামান চৌধুরী, মা রাবেয়া খাতুন। শৈশব কেটেছে পুরান ঢাকার চকবাজারে, কৈশোর কিশোরগঞ্জের কলোনিবাড়িতে। একদিকে ঘিঞ্জি গলি, হকারের হাঁক, ভিড়ের গায়ে ভিড়। অন্যদিকে মাঠ, পুকুর আর পিচঢালা রাস্তার ধারে জমে থাকা বৃষ্টির জল। পরে যা লিখবেন তার অর্ধেক উঠে আসবে গলির ভিড় থেকে, অর্ধেক কলোনির নির্জন বারান্দা থেকে।
কলোনিবাড়ির স্মৃতি থেকে লেখা দুটি কবিতায় দুটি একা মুখ। এক বালিকা বারান্দায় হাত জড়ো করে দাঁড়িয়ে ভাবনায় ডুবে আছে। সামনের গাছগুলো আবেগ নিয়ে তার দিকে চেয়ে থাকে। এখানে দৃষ্টির দিক উল্টে গেছে। মানুষ গাছ দেখছে না, গাছ দেখছে মানুষকে। মফস্বলের সাদামাটা বিকেল হয়ে ওঠে এক কিশোরীর নীরবতার মঞ্চ। প্রকৃতি বসে থাকে দর্শকের সারিতে।
অন্য কবিতায় এক ছেলে হাঁটে মাঠের ধার ধরে। তার দামাল চলায় বাতাস ছেঁড়ে। রাস্তার পাশের স্থির জলে তার ছায়া ভাসে। শেষে সে পৃথিবী দেখে প্রিজমের ভেতর দিয়ে। প্রিজম আলো ভেঙে রং বের করে আনে। কৈশোরের চোখও তাই করে। সময় একদিন এই প্রিজম ভেঙে দেবে। সে কথা পরে।
আশির দশকে ঢাকা। ছোটকাগজের দিন। ১৯৮৪ সালে কাজল শাহনেওয়াজের সঙ্গে যৌথভাবে বের হলো ‘ছাঁট কাগজের মলাট’। একই নামে কাগজও সম্পাদনা করেছেন। ‘জলপ্রপাত’ আর ‘ফৃ’ ঘিরে তখন রিফাত, কাজল, আহমেদ মুজিব আর খায়রুল হাবিবদের একটা বৃত্ত। আশির শেষে আর নব্বইয়ের গোড়ায় কবি সরকার মাসুদের সঙ্গে তিনি ঢাকা চষে বেড়াতেন। আড্ডার জন্য দুজনে বাবুপুরা বস্তিতে একটা বেড়ার ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন।
বস্তির বেড়ার ঘরে যে কবিতার জন্ম, তার গায়ে কাদা লেগে থাকে। প্রথমপর্বের রিফাত চৌধুরী তাই মহানগরের পেছনের দিকের কবি। কম আয়ের মানুষের কবুতরের খোপের মতো ঘর, কাঁচাবাজারের প্যাচপেচে মেঝে, ফুটপাতের ঠাসা ভিড়। পরে এই চালচিত্র থেকে তিনি সরে যাবেন প্রতীকের দিকে। কিন্তু পায়ের নিচের মাটি ছাড়বেন না।
বইয়ের তালিকা লম্বা। ‘মেঘের প্রতিভা’, ‘উঠন্ত বৃক্ষের পত্র’, ‘বধির ব-দ্বীপ’, ‘সমুদ্রে নুনের পুতুল’, ‘অন্য মন অন্য জীবন অন্য স্বপ্নের কথা’, ‘আগে পড়নি’, ‘আমি একজন ভৌগোলিক’। অথচ বই কয়টা আর প্রথম বই কোনটা, তা নিয়ে সূত্রগুলো একমত নয়। কোথাও সতেরো, কোথাও উনত্রিশ। কোথাও প্রথম বই ‘ছাঁট কাগজের মলাট’, কোথাও ‘আলিঙ্গনের নাম’। একজন জীবিত কবির বইয়ের হিসাব যে দেশে এলোমেলো, সেখানে তাঁর চিকিৎসার ফাইল দেরিতে তৈরি হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকে না।
কবিতা তাঁকে ঘর দিয়েছে। ভাত দেয়নি। সেই অভাব একদিন তাঁকে ঠেলে দেবে ক্যামেরার সামনে।

১৯৮৩ সালে রিফাত চৌধুরী
|| সরলতার দাম ||
রিফাত চৌধুরী কথাটা ঘুরিয়ে বলেননি। লেখালেখি তাঁর প্রধান টান। অভিনয়ে গেছেন টাকার জন্য। ‘কে কাকে বাঁচায়? বাঁচতে তো হবে।’ এই স্বীকারোক্তি মাথায় রেখে তাঁর অভিনয়জীবন পড়তে হয়। এ গল্প যতটা শিল্পীর আত্মপ্রকাশের, তার চেয়ে বেশি একজন দিনমজুরের মজুরির।
শুরু একটা বেঁচে যাওয়া ফিল্মের ক্যান থেকে। নূরুল আলম আতিক ও তাঁর বন্ধুরা বিনয় মজুমদারকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র বানাচ্ছিলেন। কাজ শেষে কিছু ফিল্ম রয়ে যায়। সেই উদ্বৃত্তে দুদিনের শুটিংয়ে তৈরি হলো ‘বিজন মানুষ’। এক কবির সারাদিন। রিফাত চৌধুরী পরে বলেছেন, একজন বড় কবির ছবির বাড়তি ফিল্মে তাঁর মতো অখ্যাত কবির ছবি হলো, ভাবলে ভালো লাগে। প্রথম ভূমিকাতেই তিনি ছিলেন উদ্বৃত্তের মানুষ। সারা জীবন জায়গাটা তাঁকে ছাড়েনি।
তারপর আকরাম খানের ‘ছিপ’। ফরিদপুরে শুটিং, টিকিট কেটে জায়গায় জায়গায় প্রদর্শনী। নূরুল আলম আতিকের ‘সাইকেলের ডানা’, কুষ্টিয়ায়। এলিফ্যান্ট রোডে ‘ছবিয়াল’ দলের আড্ডা, যেখানে নূরুল আলম আতিক, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, আকরাম খান আর গিয়াস উদ্দিন সেলিম। দলটা ইরানি ছবির ভক্ত ছিল। ইরানি সিনেমা পেশাদার অভিনেতার চেয়ে রাস্তার মানুষের সহজ উপস্থিতিকে বেশি বিশ্বাস করেছে। রিফাতের অভিনয়ের চাবি এখানেই পড়ে আছে।
২০০৪ সাল। দেশি ধারাবাহিক তখন ভারতীয় সিরিয়ালের চাপে কোণঠাসা। আনিসুল হক আর মোস্তফা সরয়ার ফারুকী মিলে আনলেন একশো পর্বের ‘সিক্সটি নাইন’। ধানমন্ডির একটা বাড়ি, চার বোন, বিপত্নীক বাবা, নিচতলার ভাড়াটে। জয়া আহসান, তিশা, হাসান মাসুদ, আহমেদ রুবেল, শহীদুজ্জামান সেলিম, ফজলুর রহমান বাবু। এর আগে ‘একান্নবর্তী’ দিয়ে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ঢাকার মুখের ভাষাকে টেলিভিশনের বসার ঘরে তুলে এনেছিলেন। ‘সিক্সটি নাইন’ সেই ভাষাকে দিল উপস্থিত বুদ্ধির সচিত্র অভিনয়।
সেই সচিত্র ভঙ্গির সবচেয়ে খাঁটি নমুনা রিফাত চৌধুরী। এত তারকার ভিড়ে তিনি অভিনয় করলেন নিজের নামে। চরিত্রের আলাদা নাম নেই, আলাদা ইতিহাস নেই। দর্শক ডাকল ‘রিফাত কাকা’। কেউ বলল ‘জাতীয় কাকা’। বাকিরা হেঁটে গেছেন চরিত্রের দিকে। রিফাত চরিত্রকে টেনে এনেছেন নিজের উঠানে। পর্দা আর জীবনের মাঝের দেয়াল এত পাতলা করে দেওয়া সহজ কাজ ছিল না।
নাটকের পর সিনেমা। ‘ব্যাচেলর’ (২০০৪)। ফারুকীর ‘কানামাছি’র জন্য সুন্দরবন যাত্রা। রুবাইয়াত হোসেনের ‘মেহেরজান’ (২০১১), যেখানে পাশে জয়া বচ্চন, ভিক্টর ব্যানার্জি আর হুমায়ুন ফরীদি। শাহনেওয়াজ কাকলীর ‘নদীজন’ (২০১৫), পদ্মা আর গড়াইয়ের মাঝিদের জীবন। শেষ বড় কাজ ফারুকীর ‘সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’, ২০২৩ সালের ৩০ নভেম্বর চরকিতে মুক্তি। প্রায় মেকআপহীন ছবি। কেন্দ্রে এক দম্পতির সন্তানের অপেক্ষা আর শহরের শব্দদূষণ। রিফাত চৌধুরী সেখানে কেয়ারটেকার মিলন। অন্যের বাড়ি পাহারা দেন। অন্যের সংসারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন।
করোনার সময় কাজ ছেড়ে ফিরেছিলেন কটিয়াদির গ্রামের বাড়িতে। ২০২৪ সালে রেজা ঘটকের ‘ডোডোর গল্প’ দিয়ে ফেরার চেষ্টা করেছিলেন। একবার বিদেশে শুটিংয়ের ডাক এসেছিল। যাননি। পাসপোর্ট নেই। কেন নেই, সে কথা পরে।
এবার হিসাবের খাতা খোলা যাক। পাঁচশোর বেশি নাটক। বেশির ভাগ পার্শ্বচরিত্র, তাই পারিশ্রমিক কম। কেউ কেউ সেই কমটুকুও ঠিকমতো হাতে দেয়নি। রিফাত চৌধুরীর অভিযোগ, প্রযোজক আর পরিচালকেরা তাঁর সরলতা আর নীরবতাকে পুঁজি বানিয়ে পাওনা মেরে দিয়েছেন।এখানে একটা নির্মম অঙ্ক মেলে। যে সরলতা পর্দায় তাঁকে খাঁটি করেছে, বাজারে সেই সরলতাই তাঁকে ঠকিয়েছে। ক্যামেরার সামনে তিনি ভান জানতেন না। টাকার টেবিলেও জানতেন না। ফলে শিল্প যে গুণ চায়, বাজার সেই গুণ হারিয়ে যায়।
|| গ্রামীণ জনপদ ও প্রান্তিক মানুষের ভূগোল ||
রিফাত চৌধুরী বন্ধুদের খোঁচা দিতেন গাছ, সাঁকো, পাখি আর ঋতু নিয়ে লেখার জন্য। এগুলো তাঁর কাছে বাঁধা রাস্তা, চেনা ‘কাব্যিক বিষয়’। তবু গ্রাম তাঁর কবিতায় আছে। ২০২১ সালে এক আলাপে তিনি বলেছিলেন, গ্রাম থেকে উঠে আসা কলমই এ দেশের সাহিত্য আর সংস্কৃতিকে ভরিয়েছে। তাঁর গ্রাম অবশ্য পোস্টকার্ডের ছবি নয়। তাঁর গ্রাম খরচের খাতা।
‘প্রকৃতি’ কবিতা শুরু হয় রঙে। নীল আকাশে হলুদ মেঘ, জলাঘাস, উড়ে যাওয়া বক। তারপর মানুষ ঢোকে। নদীর পাড়ে গাছের ছায়ায় জিরিয়ে নিচ্ছেন কয়েকজন মেয়েমানুষ। পাশে দুটো অলস ছাগল। দূরে হালকা নীল জলে নৌকা। শেষ স্তবকে জল শুকিয়ে আসে।
‘...নদী ক্ষীণ শরীর নিয়ে তিরতির করে বয়ে চলেছে।
চারিদিকে বালিয়াড়ি।
মহিলারা কলসী কাঁখে করে দূর দূরান্ত থেকে জল নিয়ে বাড়ি যায়।’
শুরুতে জলে ভেজা জমিন। শেষে জলের জন্য দীর্ঘ হাঁটা। নদী যা হারিয়েছে তার দাম মেটাচ্ছে মেয়েদের কোমর আর পা। কলসির ভার কাঁখে চেপে বসে। বালিয়াড়িতে পা ডেবে যায়। কবিতার নাম ‘প্রকৃতি’। ভেতরে প্রকৃতির ক্ষয়ের হিসাব, আর সেই হিসাব লেখা হচ্ছে গ্রামের মেয়েদের শরীরে। মাটি আছে, জল আছে, তবু ঘাম না ঝরালে কিছুই মেলে না।
‘পুকুর’ আরও অদ্ভুত। ভরদুপুর। একটা পুকুর, একটা ডাবগাছ, মাথার ওপর সূর্য। রোদ নামে সদ্য ছাঁচে ঢালা ইস্পাতের সুঁচের মতো সোজা হয়ে। পুকুরটাকে কবির মনে হয় সূর্যের মুখোমুখি রাখা বিরাট এক আয়না। সেই আয়নায় তিনি দেখেন, পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন লোক। হাতে কাটা ডাব। মাথা নেই। বন্ধনীর ভেতরে কবি নিজেকেই প্রশ্ন করেন, মস্তিষ্কহীন? লোকটার মাথা ঝুলছে ওপরে, ডাবগাছে।
ফল নেমে এসেছে হাতে, মাথা উঠে গেছে গাছে। যে মানুষ খাটে, তার শরীর পড়ে থাকে মাঠে। তার ভাবনাটুকু কেউ তুলে রেখেছে নাগালের বাইরে। আর কবি দৃশ্যটা দেখছেন আয়নায়, সরাসরি নয়। উল্টো ছবিতেই সোজা সত্য বেরিয়ে আসে।
চার দশক পর, ২০২৫ সালে, রিফাত চৌধুরী আবার গ্রামে ফেরেন। এবার ট্রেনের জানালা দিয়ে। ধানখেতের মাঝ দিয়ে রেললাইন। রোদে লাইনগুলো ঝিকমিক করে প্রাগৈতিহাসিক সরীসৃপের পিঠের আঁশের মতো। শুনশান রাস্তায় গরু চরে। কাঁচা রাস্তায় একজন সাইকেলে চলে যায়। দৃশ্য সরে যায় ফাস্ট ফরোয়ার্ড করা ছবির মতো। পুকুরকে মনে হয় শিল্পীর আঁকা ক্যানভাস, হাঁসে ভরা জলাভূমিকে কার্ডবোর্ডের খেলাঘর। মাঠে কৃষক ধানের আঁটি কেটে রেখেছেন।
ফাস্ট ফরোয়ার্ডের উপমা একজন অভিনেতার, যিনি জীবনভর দৃশ্যকে ফ্রেমে দেখেছেন। তবে ধার আছে শেষ লাইনে। পাঠ্যবইয়ের চেনা ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ধরে তিনি বলেন, সেই নীড়ও এখন চালাকচতুর হয়ে উঠেছে। পুরো কবিতা যে সুন্দরের দিকে টানছিল, শেষ লাইন তাকে এক ধাক্কায় উল্টে দেয়। ‘প্রকৃতি’র শেষ স্তবকও ঠিক তাই করেছিল। চল্লিশ বছরের ব্যবধানে একই কৌশল। আগে সৌন্দর্য দেখাও, শেষে তার দাম।

ছাঁট কাগজের মলাট: প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ
|| সমাজ, রাষ্ট্র ও ক্ষমতার সম্পর্ক ||
নব্বইয়ের দশকের কবিতা ‘আশা’। নির্জন এক জায়গায় পরপর দাঁড় করানো কয়েকটা রিকশা। একটার পেছনে এক নেত্রীর মুখ আঁকা। স্প্রিং বেরোনো ফাটা সিটে চালক অলস বসে আছেন, কারণ যাত্রী নেই।
‘রংচটা ধূলোমাখা তোবড়ানো পুরোনো
…রিকশার চাকা দুটো টাল খাওয়ানো।’
প্রথম লাইনে চারটা বিশেষণ, চারটাই ক্ষয়ের। রংচটা, ধুলোমাখা, তোবড়ানো, পুরোনো। শেষ লাইনে চাকা টাল খাওয়া। টাল খাওয়া চাকা সোজা পথে চলে না। শ্রমজীবী মানুষের রুটির যন্ত্রে রাজনীতির বিজ্ঞাপন, আর সেই যন্ত্র ভেঙে পড়ছে। কবিতার নাম ‘আশা’। কবি একটা মতও দেননি। শব্দের ক্যামেরায় শুধু একটা ছবি তুলে রেখেছেন। নব্বইয়ের দলীয় রাজনীতির এত ঠান্ডা সমালোচনা খুব কমই লেখা হয়েছে।
রাষ্ট্র এখানে আসে দেয়ালের পোস্টার হয়ে, পাশে দাঁড়ানো হাত হয়ে নয়। তিন দশক পর কবিতাটা রিফাত চৌধুরীর নিজের জীবনে আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ফিরেছে। তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। পাসপোর্ট নেই। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। এসব তিনি জেনেবুঝে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
যুক্তিটা তাঁর নিজের। নাগরিক হলে রাষ্ট্র তাঁকে একটা হোল্ডিং নম্বর দিত। দেয়নি। সুতরাং তিনি এ দেশের নাগরিক নন। একটা কার্ড আর একটা নম্বরকে পরিচয় বলা তাঁর কাছে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা।
হোল্ডিং নম্বর মানে মাটির ওপর একটা ঘর, একটা ঠিকানা। রাষ্ট্র তাঁকে মাটি দেয়নি, দিতে চেয়েছে প্লাস্টিকের কার্ড। রিফাত চৌধুরী বলছেন, আগে ঘর, তারপর নম্বর। যে কবি জীবন শুরু করেছিলেন কবুতরের খোপে থাকা মানুষদের নিয়ে লিখে, তাঁর মুখে এই যুক্তি বেমানান লাগে না।
একই জায়গা থেকে তিনি সরকারি সাহায্যও ফিরিয়ে দিচ্ছেন। সরকার চলে জনগণের টাকায়, সে তাঁকে কী দেবে? তবে মানুষ ভালোবেসে কিছু দিলে নেবেন। রাষ্ট্র আর মানুষকে তিনি দুই খাতায় রাখেন। রাষ্ট্রের দান তিনি নেন না। মানুষের ভালোবাসা নেন।
এই অবস্থান নিয়ে তর্ক চলতে পারে, চলা উচিতও। যে বুড়ো কৃষকের বয়স্ক ভাতা আটকে আছে পরিচয়পত্রের একটা ভুল অক্ষরে, তার কাছে কার্ড বাঁচার দরজা। কিন্তু রিফাত চৌধুরীর প্রত্যাখ্যান আর ঢাকা মেডিকেলের ফাইল পাশাপাশি রাখলে ছবিটা ঝকঝকে হয়ে ওঠে। যে মানুষ নম্বর হতে চাননি, তিনি আটকে আছেন এমন এক ব্যবস্থায়, যা মানুষকে চেনে কেবল ফাইলে। সাংবাদিক তাঁকে বলেছেন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তিনি নিজে বলেন, তিনি নাগরিকই নন। এই দুই কথার মাঝখানে বিছানো আছে হাসপাতালের মেঝে।
|| কবিতায় মানুষের অন্তর্জগতের ভাষা ||
রিফাত চৌধুরীর কবিতা সরল। সেই সরলতা একটা ফাঁদও। অমনোযোগী পাঠক ছবিটুকু দেখে পাতা উল্টে যান। ছবির নিচে যে একজন একা মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে, তাঁকে দেখেন না।
‘ওভারব্রিজের মতো’ কবিতায় একই দৃশ্য তিনবার। একজন মানুষ ওভারব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে বাড়ির দিকে চেয়ে আছে।
‘একটি মানুষ দাঁড়িয়ে আছে ওভারব্রীজের ওপর
একাই বাড়ির দিকে চেয়ে
এক্কেবারে একা।…’
প্রতিবার শব্দের ক্রম একটু সরে। ‘একা’ থেকে ‘একাই’। শেষে ‘এক্কেবারে একা’। পুনরাবৃত্তি এখানে সাজ নয়, সময়ের মাপ। প্রতিবার পড়তে পড়তে মানুষটা আরও খানিক দাঁড়িয়ে থাকে। আর শিরোনামে ওভারব্রিজের ওপর নয়, ওভারব্রিজের মতো। মানুষটা নিজেই সেতু হয়ে গেছে। দুই পাড়ের মাঝে ঝুলে থাকা লোহার কাঠামো। বাড়ি দেখা যায়। পৌঁছানো যায় না।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে কবিতাটা পড়লে গলা শুকিয়ে আসে। হাসপাতালে পরিবারের কেউ নেই। কিন্তু রিফাত চৌধুরী একে দুঃখ বলেন না। বলেন অর্জন। একা থাকা সবাই পারে না, তিনি পেরেছেন। একা থাকা নিরাপদ। বারো বছর বয়স থেকে তিনি নিঃসঙ্গ। মানুষ দল বেঁধে জন্মায় না, দল বেঁধে বিদায়ও নেয় না। আকাশে একটা তারার পাশে আরেকটা তারা নেই, আছে আলোকবর্ষ দূরে। কোটি বছর তারা একা জ্বলছে। গ্রহ-নক্ষত্র যদি এভাবে থাকতে পারে, তাঁর একাকীত্ব তো তুচ্ছ।
এটা দর্শন, না বর্ম? সম্ভবত দুটোই। যে মানুষ বারো বছর বয়স থেকে একা, সে একাকীত্বের ব্যাখ্যা না খুঁজে বাঁচতে পারে না। রিফাত চৌধুরী সেই ব্যাখ্যা খুঁজেছেন নক্ষত্রে।
তরুণ বয়সে তাঁর আশ্রয় ছিল ছোট। ‘অ্যাকোয়ারিয়াম’ কবিতায় মন খারাপ হলে তিনি ঘরের আলো নিভিয়ে জ্বালেন অ্যাকোয়ারিয়ামের সবুজ আলো। ঘোর সবুজ জলে লাল মাছ ঘোরে। কোণে একটা ঘড়ির মতো কিছু। তারপর প্রশ্ন, গভীর জলের তলায় কি সময় বয়? কাচের জগৎ শান্ত, রঙিন, তবু সেখানেও ঘড়ি। আশ্রয় সুন্দর, আবার খাঁচাও। মাছের মতো কবিও কাচের ভেতর। বুড়ো কবির অ্যাকোয়ারিয়াম আরও বড়। গোটা আকাশ।
|| একটাই দেখার ধরন ||
রিফাত চৌধুরী ক্যামেরার ভাষায় লেখেন। ‘মরা খোলার সাধুরা’ শুরু হয় তাঁবুর খানিকটা অংশ দিয়ে। মানে কবিতা শুরু হয় ফ্রেম কোথায় কাটা পড়েছে তার বর্ণনায়।
শাড়ির দোকানের কবিতায় দুই রকম চোখ একসঙ্গে কাজ করে। এক চোখে কাপড়। চাঁদের আলোয় বোনা, আশ্বিনের হাওয়ায় গড়া আঁচল। এটা কবির চোখ। অন্য চোখে মাপজোখ। বাঁ পাশের নারী কিনার ঘেঁষে বসে, ডান পাশের জন একটু সরে, আরেকজন মাঝখানে কিন্তু পেছনে। এটা পরিচালকের চোখ। মঞ্চের ভাষায় একে বলে ব্লকিং। সাধারণ একটা কেনাকাটাকে তিনি সাজিয়েছেন সিনেমার দৃশ্যের মতো।
আরেক কবিতায় এক নারী মুভি ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়ে ‘কাট’ বলেন। তাঁর বর্ণনা পরস্পরবিরোধী ছবির মালা। টিয়ার মতো লাল ঠোঁট, সদ্য ভাঙা নারকেলের মতো ছলছলে চোখ, বস্তির মেয়ের উল্লসিত হাসি। হাতে ইস্পাতের দস্তানা। নিজের কাটা ক্ষতে নিজেই ওষুধ ঢালছেন। শেষে কবি বলেন, এই ইস্পাতহৃদয়া জন্ম দেবে মরচে রঙের শিশু। ইস্পাতে একদিন মরচে ধরে। যে কাঠিন্য দিয়ে তিনি নিজের ক্ষত সামলান, তার দাম গুনবে পরের প্রজন্ম।
‘গ্রুপ ছবি’তে সাত-আটটা কাক কালো পোশাকে ছবি তোলার জন্য দাঁড়িয়ে। তিন লাইনে দুনিয়ার সব আনুষ্ঠানিক জমায়েতের ব্যঙ্গ। এসব কবিতা বলে দেয়, সিনেমার জগৎ তিনি ভেতর থেকে চেনেন।
উল্টো দিকেও তাই। ‘সিক্সটি নাইন’ যে কাঁচা, উপস্থিত ভঙ্গি দাবি করত, সেটা আসলে তাঁর কবিতার ভঙ্গি। কবিতায় তিনি অলংকার ছাঁটেন। অভিনয়ে ছাঁটেন অভিব্যক্তির বাড়াবাড়ি। কবিতায় ক্যামেরা, ক্যামেরায় কবিতা।
তবু দুই পেশার মধ্যে একটা নিষ্ঠুর তফাত আছে। কবিতায় সরলতা তাঁর শক্তি। কবির কোনো দর-কষাকষি নেই, আছে শুধু পাঠক। মিডিয়ায় একই সরলতা তাঁর দুর্বলতা, কারণ সেখানে প্রযোজক আছে, চুক্তি আছে, বকেয়া আছে। একই মানুষ, একই চোখ। দুই হাটে দুই দাম।
|| শরীর, নীরবতা ও শব্দের নিজস্ব ভাষা ||
রিফাত চৌধুরীর কবিতায় শরীর আসে কাটা আর ভাঙা অবস্থায়। একটা মেয়ে তরমুজ কাটছে। প্রথম দুই লাইন নিছক ঘরোয়া। তারপর ক্যামেরা কাছে আসে। ছুরির ঠান্ডা ইস্পাতের ফলা পাকা তরমুজের লাল ‘বুক’ চিরে যায়। ‘বুক’ শব্দটা আসতেই ফল আর ফল থাকে না। রস গড়ানোর কথা আসে দুবার, টপটপ শব্দসহ। শেষে রসটা একটু বেশি লাল। যেন রক্ত। কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবু পাঠকের শিরদাঁড়া ঠান্ডা হয়ে আসে। প্রতিদিনের রান্নাঘরে হিংসা কত কাছে ঘুমিয়ে থাকে, ছুরি আর রক্তের মাঝখানে দূরত্ব কত কম, কবি শুধু সেটুকু দেখিয়ে সরে যান।
‘মাথা এবং গর্ত’ আরও সরাসরি। পড়ে থাকা তিনটা আঙুল। মাটির হাঁড়ির মতো ভাঙা খুলি। রাস্তার গর্তে একটা মাথা। দুর্ঘটনা না হত্যা, কবি বলেন না। মানুষের মাথা এখানে গৃহস্থালির ভঙ্গুর বাসন। শহরের রাস্তায় শরীর কত সস্তা, সেটুকু রেখে যান। ২০১৮ সালে সেই রাস্তাতেই তাঁর নিজের শরীর ভেঙেছিল।
কণ্ঠের কবিতা ‘দাঁত’। শুরুতে কবির গলা নেই। আছে ফুটপাতের মাজনওয়ালার গলা। এই মাজন লাগালে দাঁত চকচক করবে রুপার মতো, তামার মতো, টিনের মতো, দস্তার মতো, পারদের মতো। তালিকা দামি ধাতু থেকে নামতে নামতে গিয়ে ঠেকে বিষে। প্রতিশ্রুতি নিজেই নিজের গলা টিপে ধরে। তারপর ক্যামেরা ঘোরে। লোকটা সিটি করপোরেশনের সুইচবক্স ঘেঁষে বসে মাইক লাগিয়ে চেঁচাচ্ছে। শেষে মুক্তাহাসির দাঁত হয়ে যায় হিংস্র জন্তুর দাঁত।
মাইকটা মনে রাখার মতো। কয়েক দশক পর রিফাত চৌধুরী যে ছবিতে কেয়ারটেকার, তার একটা বড় বিষয় শব্দদূষণ। শহরের চিৎকার শুধু বিরক্তিকর নয়, হিংস্র। কথাটা তিনি কবিতায় বলে রেখেছিলেন অনেক আগে।
আর নীরবতা। এক লাইনের কবিতা ‘মেয়েমানুষ’। সবুজ শাড়ি পরা এক মহিলা তারে আরেকটা সবুজ শাড়ি মেলে দিচ্ছেন। এক বাক্যে দুবার সবুজ। নারী আর শাড়ি মিশে যায় একে অন্যের ভেতর, যেন একজন আরেকজনকে রোদে দিচ্ছে। শিরোনামের শব্দটা সমাজ ব্যবহার করে নারীকে জিনিসের কাতারে নামাতে। কবিতার অর্থ লেখা আছে ওই এক লাইনের পরের শূন্যতায়।
এই শূন্যতার চূড়ান্ত রূপ ‘ব্রাইট ফর্ম’। কবি ঘোষণা দেন, এমন কবিতা লিখবেন যাতে ভাব থাকবে না, ভাষা থাকবে না, ছন্দ বা অর্থ থাকবে না। থাকবে শুধু শাদা পাতা। সুরটা ঠাট্টার। কথাটা সত্যি।
কবিতায় নীরবতা রিফাত চৌধুরীর সবচেয়ে বড় অস্ত্র। যত কম বলেন, তত বেশি শোনা যায়। অথচ সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, প্রযোজকেরা তাঁর নীরবতাকেই পুঁজি করে তাঁকে ঠকিয়েছেন। যে নীরবতা পাতায় অর্থ বোনে, সেটাই হাটে গিয়ে পাওনা হারায়। শিল্পে নীরবতা ক্ষমতা। জীবনে নীরবতা লোকসান। তাঁর গোটা জীবন এই দুইয়ের টানাটানিতে ছেঁড়া।

২০১৯ সালে কিশোরগঞ্জে রিফাত চৌধুরী ও কাজল শাহনেওয়াজ
|| সৃষ্টিতে সে সময়ের বাংলাদেশ ||
আশির দশক সামরিক শাসনের দশক। সুমন রহমান সেই সময়ের কবিতা নিয়ে লিখতে গিয়ে একটা জরুরি কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। তখন স্বৈরাচারকে দুটো গাল দিলেই ‘বিপ্লবী’ কবির সনদ মিলত, আর আবৃত্তির মঞ্চ ছিল সেই কবিতার বাজার। আশির নতুন কবিরা সেই স্লোগান লিখতে রাজি হননি।
রিফাত চৌধুরী এই অস্বীকারের বড় নজির। তিনি রাজনীতি এড়াননি। এড়িয়েছেন রাজনীতির মুখস্থ বুলি। তাঁর রাজনীতি ঢোকে জিনিসের ভেতর দিয়ে। টাল খাওয়া চাকা, মাজনওয়ালার মাইক, শুকিয়ে আসা নদী। মিছিলের গলা তিনি ধার করেননি। ধার করেছেন ফুটপাতের গলা।
নব্বইয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র আর দুই নেত্রীর যুগ। দেয়ালে দেয়ালে নেতার মুখ, রিকশার পিঠেও। ২০০৪ সালে ‘সিক্সটি নাইন’ দেশি ধারাবাহিককে নতুন শ্বাস দিল। ঢাকার কথ্য বাংলা মূলধারায় জায়গা পেল, আর তিনি হয়ে উঠলেন সেই ভাষার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য মুখ।
২০১১ সালে ‘মেহেরজান’ নিয়ে তুমুল বিতর্ক। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে ভিন্ন সুরে কথা বলা যে কত কঠিন, ছবিটা প্রেক্ষাগৃহ থেকে সরে গিয়ে তা দেখিয়ে দিল। ২০১৫ সালে ‘নদীজন’ আটকাল সেন্সরে, হিল্লা বিয়ের দৃশ্যের জন্য। গ্রামের কঠিন সত্য পর্দায় আনতে গিয়েও বাধা। একই বছর বইমেলায় বের হলো ‘আমি একজন ভৌগোলিক’। কবি যেসব কাজে যুক্ত থেকেছেন, তার কয়েকটি এভাবে ক্ষমতার দেয়ালে ধাক্কা খেয়েছে। কাকতাল মনে হয় না। এমন কাজের দিকেই তাঁর টান।
তারপর করোনা। কাজ বন্ধ। কটিয়াদি। ২০২৪ সালে ফেরার চেষ্টা। ২০২৫ সালে নতুন কবিতা, যেখানে গ্রামও চালাকচতুর। ২০২৬ সালে হাসপাতালের মেঝে। তিনি সময় মাপেন জায়গা দিয়ে। রিকশার স্ট্যান্ড, কলোনির বারান্দা, সুইচবক্সের পাশের ফুটপাত, ট্রেনের জানালা, হাসপাতালের করিডোর। নিজেকে বলেন ভৌগোলিক। অথচ এই ভৌগোলিকের নিজের কোনো হোল্ডিং নম্বর নেই।
|| শিল্পীর দায়: বিনোদন নাকি প্রশ্ন ||
টেলিভিশনের দর্শক রিফাত চৌধুরীকে চেনেন হাসির মানুষ হিসেবে। কবিতার পাঠক চেনেন কঠিন প্রশ্নের কবি হিসেবে। দুই পরিচয় কি পরস্পরের শত্রু?
২০১৮ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, সত্যিকারের শিল্পী হতে হলে প্রচণ্ড সৎ থাকতে হয়, মানবিক থাকতে হয়। শিল্পকলা একাডেমিকে তুলনা করেছিলেন পাটের আড়তের সঙ্গে, তেজগাঁও শিল্প এলাকার সঙ্গে। সবাই একমত হবেন না। এটা স্পষ্টতই এক ক্ষুব্ধ শিল্পীর মত। কিন্তু সেই আলাপেই একটা বাক্য তাঁর গোটা শিল্পের চাবি হয়ে আছে। ‘রাষ্ট্র যতো ফ্যাসিস্ট হবে সেই দেশের শিল্প ততো বিমূর্ত হবে।’
ভয়ের দিনে শিল্পী লুকায় প্রতীকের আড়ালে, দুর্বোধ্যতার অন্ধকারে। তিনি হেঁটেছেন উল্টো পথে। তাঁর কবিতা যত সরল, তত সরাসরি। সরলতাই তাঁর অবস্থান। হাসির চরিত্রেও তিনি প্রশ্ন ছাড়েননি। তবে একটা সত্য লুকাননি। অভিনয় ছিল বাঁচার উপায়, আর দুটো একসঙ্গে টানতে গিয়ে অনেক বছর লেখা থেকে দূরে থেকেছেন।
হাসপাতালের বিছানা থেকে এই প্রশ্নে তিনি আরেকটা স্তর জুড়ে দিলেন। লেখা তাঁর রক্তে মিশে গেছে। তিনবেলা ভাতের মতো একবেলা কবিতাও তাঁকে খেতে হয়। আর সবচেয়ে চমকে দেওয়া কথাটা। কবিতা তাঁকে ছেড়ে যাবে না, কারণ ‘কবিতার একমাত্র নির্ভরযোগ্য আশ্রয় হলাম আমি।’
আমরা চিরকাল বলে এসেছি, কবিতা কবির আশ্রয়। তিনি কথাটা উল্টে দিলেন। তিনিই কবিতার আশ্রয়। যে মানুষের নিজের ঘর নেই, নম্বর নেই, বিছানার পাশে পরিবার নেই, তিনি কবিতাকে ঘর দিচ্ছেন। একে অহংকার ভাবলে ভুল হবে। এ এক ধরনের দায়। এই দেশে কবিতা অনাথ। কাউকে না কাউকে তাকে কোলে তুলে নিতে হয়।
তাহলে শিল্পীর দায়ের প্রশ্ন আসলে সমাজের দায়ের প্রশ্ন। যে সমাজ কবিকে পেট চালাতে অন্য পেশায় পাঠায়, সেই পেশায় তাঁর পাওনা মেরে দেয়, আর অসুখের দিনে একটা বেড দিতে দুই রাত লাগায়, কবির কাছে সে কোন মুখে দাবি তোলে?
|| সমকালীন কবিতার সহযাত্রী ||
রিফাত চৌধুরীকে চিনতে হলে তাঁর সময়ের কবিদের পাশে দাঁড় করাতে হয়। কাজল শাহনেওয়াজ তাঁর সবচেয়ে কাছের সহযাত্রী, প্রথম বইয়ের যৌথ লেখক। কাজলের কবিতায় মাঠকর্মীর জরিপের ঝোঁক, খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রতি টান, বিজ্ঞানের নিরাসক্ত চোখ। দুজনেই সহজ অথচ গভীর কবিতার পক্ষে। দুজনেই ‘কাব্যিক বিষয়’ এড়ান। তফাতটা হলো, কাজল জরিপ করেন, রিফাত একটা শট নেন। কাজল বিস্তারে যান, রিফাত থেমে থাকেন সংক্ষেপে। শেষ দিকে অবশ্য রিফাত চৌধুরীও গদ্যের দিকে ঝুঁকেছেন।
বাবুপুরা বস্তির সেই সঙ্গী অমিতাভ পাল আরেক দিকের মানুষ। তিনিও গত হয়েছেন কয়েক বছর আগে। মাঝে মাঝে সঙ্গী হতেন সরকার মাসুদ। তাঁর কবিতায় নিসর্গ অনেকটা জায়গাজুড়ে থাকে। তাঁর সাঁকো মিলনের নয়, বিচ্ছেদের। প্রায়ই ভাঙা, নড়বড়ে। রিফাত চৌধুরী এই নিসর্গপ্রীতি নিয়ে তাঁকে খোঁচা দিতেন। অথচ রিফাতের ওভারব্রিজও বিচ্ছেদের সেতু। দুই বন্ধু একই প্রতীকে পৌঁছেছেন দুই রাস্তা ধরে। একজন গ্রামের বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে, আরেকজন শহরের লোহার ওভারব্রিজে চড়ে।
সরকার মাসুদের একটা কথা এখানে পুরো মানে পায়। বাংলাদেশের কবিতায় রিফাত যেন কাছের একটা দ্বীপ, যেখানে এখনো সহজে নৌকা ভেড়েনি। ভাষা সহজ, তবু বেশির ভাগ পাঠক তাঁর শিল্পমেজাজ ধরতে পারেন না। রিফাত এর কারণ বলতেন ‘সঠিক পাঠক’-এর অভাব।
সঙ্গে একটা অদ্ভুত বৈপরীত্য। টেলিভিশনের কোটি দর্শক তাঁকে চেনেন, কবি হিসেবে চেনেন না। কবিতার পাঠক তাঁকে শ্রদ্ধা করেন, কিন্তু সংখ্যায় হাতে গোনা। এক মানুষ, দুই শ্রোতা, মাঝখানে প্রায় কোনো সেতু নেই। তিনি নিজেই যেন সেই ওভারব্রিজ।

২০১৮ সালে হাত ভেঙে রিফাত চৌধুরী ভর্তি হন ঢামেক হাসপাতালে, সঙ্গে কাজল শাহনেওয়াজ
|| শিল্পভাবনার কয়েকটি সূত্র ||
তাঁর শিল্পভাবনা কয়েকটা সূত্রে বাঁধা যায়। কবিতা আগে আসে ছবি হয়ে, তারপর ছেঁকে পৌঁছায় হৃৎপিণ্ডে। কবিতা হবে ছোট। চেনা ‘কাব্যিক’ বিষয় এড়াতে হবে। শিল্পী থাকবেন সৎ। আর হাসপাতাল থেকে পাওয়া নতুন সূত্র, ঘোলা জলের নয়, স্বচ্ছ জলের মাছ ধরা ভালো। নৈতিকতা আর নন্দনতত্ত্ব তাঁর কাছে একই পুকুর।
তবে সবচেয়ে গভীর সূত্রটা প্রতিভার গণতন্ত্র। ‘মেঘের প্রতিভা’য়:
‘ছেঁড়া জামা পরা এক কিশোর,
ছেঁড়া জামা তার প্রতিভা
আলো-ছায়াঘেরা আকাশের নিচে
বোরখা পরা প্রার্থনারত মহিলা,
বোরখা তার প্রতিভা
আয়না হাতে একটা বেশ্যা
আয়না তার প্রতিভা।’
প্রতিভা শব্দটা আমরা তুলে রাখি বিশেষ মানুষের জন্য। রিফাত চৌধুরী শব্দটা সবার হাতে বিলিয়ে দিলেন। ছেঁড়া জামা পরা কিশোরের প্রতিভা তার ছেঁড়া জামা। প্রার্থনারত বোরখা পরা নারীর প্রতিভা তাঁর বোরখা। আয়না হাতে যৌনকর্মীর প্রতিভা তাঁর আয়না। তিনটি ছবির গড়ন এক। একজন মানুষ, তার গায়ের বা হাতের একটা জিনিস, আর সেই জিনিসই তার প্রতিভা।
এখানে করুণা নেই। নৈতিক বিচারও নেই। প্রার্থনারত নারী আর যৌনকর্মী দাঁড়িয়ে আছেন একই কবিতায়, একই মর্যাদায়। জীবন যাকে যা পরিয়েছে, সেটাই তার বাঁচার কৌশল। মেঘের প্রতিভা আকার বদলানোয়, ভেসে যাওয়ায়, বৃষ্টি হয়ে মাটিতে নামায়। মানুষের প্রতিভাও পরিস্থিতির ছাঁচে আকার নেয়।
কবিতাটার পাশে রিফাত চৌধুরীর নিজের জীবন রাখা যায়। পার্শ্বচরিত্রের অভিনেতা, নম্বরহীন নাগরিক, পরিবারহীন রোগী। তাঁর প্রতিভা কী? সম্ভবত তাঁর একাকীত্ব। অন্যের চোখে যা দুর্ভাগ্য, তিনি তাকে বলছেন অর্জন। ছেঁড়া জামাকে প্রতিভা বলার সাহস যাঁর আছে, তিনি নিজের নিঃসঙ্গতাকেও ওই নামে ডাকতে পারেন।
|| আত্মঅভিজ্ঞতার রূপান্তর ||
রিফাত চৌধুরীর কবিতায় ‘আমি’ কম আসে। এলেও দ্রুত মিশে যায় অন্যদের ভিড়ে। সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হাসপাতালেরই একটা পুরোনো কবিতা। ‘প্রসূতিঘরের কবিতা’ শুরু হয় দূর থেকে। ‘একজন ব্যক্তি’ তিনি বাড়িতে একা দিন কাটাচ্ছেন। স্ত্রী নাকি সন্তানসম্ভবা, তাঁকে আলাদা রাখা হয়েছে। ‘নাকি’ শব্দটায় থামতে হয়। নিজের জীবনের খবরও যেন অন্যের মুখে শোনা। তারপর সেই মানুষ প্রসূতিঘরের সামনে, করিডোরে একা। বন্ধ দরজার ওপাশে স্ত্রী। তিনি শোনেন পাখির ডাক আর পাতার শব্দ।
দরজার ওপাশে জন্মের যন্ত্রণা। এপাশে অপেক্ষা। বাইরে প্রকৃতির নির্বিকার শব্দ। মানুষটি সৃষ্টির সবচেয়ে বড় মুহূর্তের একেবারে কাছে, অথচ অংশীদার নন। শিল্পীর বেলাতেও কথাটা খাটে। সৃষ্টি মানে যন্ত্রণা পেরোনো, আর সেটা প্রায়ই একা।
কয়েক দশক পর ‘সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’তে তিনি কেয়ারটেকার। এক দম্পতির সন্তানের অপেক্ষার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। সৃষ্টির কাছে, কেন্দ্রে নয়। কবিতায় যে জায়গাটা লিখেছিলেন, পর্দায় গিয়ে ঠিক সেখানেই দাঁড়ালেন।
আর এখন তিনি নিজেই হাসপাতালের করিডোরে। এবার রোগী হয়ে। তবু এখানেও ‘আমি’ দ্রুত সবার হয়ে যায়। একাকীত্বের কথা বলতে বলতে তিনি সাংবাদিককেই মনে করিয়ে দেন, আজ তাঁর পাশে সহকর্মীরা আছেন, একদিন দেখবেন সবাই যার যার জায়গায় চলে গেছে। একা পথিক একাই ঘরে ফিরবে। ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা এক বাক্যে হয়ে ওঠে সবার ভবিষ্যৎ। এটাই রিফাত চৌধুরীর পুরোনো কৌশল। নিজের ক্ষতটা দেখান না। দেখান ক্ষতটা কতখানি সবার।
|| একজন শিল্পীর সময় পাঠ ||
প্রথম দিকের রিফাত চৌধুরী সময় পড়তেন জিনিসের ক্ষয় দেখে। রংচটা রিকশায়, মরচে ধরা ইস্পাতে। শেষ দিকের তিনি সময় পড়েন নিজের শরীর দিয়ে। কবি বলেন, তিনি একটু দেরিতে চলেন। পেছনের দিকে হাঁটেন। নিজেকে বলেন পুরোনো প্রস্তর যুগের মানুষ। নিজের সময়ে ফিরতে চান, আর পায়ে বাঁধা থাকে ঘড়ি। তিনি মিনিট জমান, ঘণ্টা ওড়ান।
ঘড়ি থাকে হাতে, সময় দেখার জন্য। পায়ে বাঁধা ঘড়ি শিকল। সময় সেখানে দেখার জিনিস নয়, টেনে নিয়ে চলার ভার। তরুণ কবি অ্যাকোয়ারিয়ামের তলায় ঘড়ি দেখে জানতে চেয়েছিলেন, জলের নিচে সময় বয় কিনা। বুড়ো কবি উত্তর জানেন। সময় বয়, আর সেটা পায়ে বাঁধা। যাঁকে একশ গজ হেঁটে বসে পড়তে হয়, তাঁর কাছে ছবিটা আর রূপক থাকে না।
‘আইসক্রিম’ কবিতাটি তিনি উৎসর্গ করেছেন শাহজাহান সাজুকে। এখানে কবি নিজেকে ভাবেন ফুটপাতের কিনারায় ফেলে দেওয়া আইসক্রিমের কাপ। তলায় একটু মিষ্টি লেগে আছে। কোনো ভিখারি হয়তো আঙুলে তুলে চেটে নেবে। ‘মানুষের ভালোবাসায় চিকিৎসা চলছে’ কথাটা শুনলে এই কবিতা মনে পড়ে। ফেলে দেওয়া কাপের শেষ মিষ্টিটুকু যে তুলে নেয়, তিনি তার কাছে কৃতজ্ঞ। রাষ্ট্রের কাছে নন।
সংসারের সময় ধরা আছে চালকুমড়ার কবিতায়। বাজারে যাওয়ার পথে বউ বলেন, চোখে চালকুমড়া পড়ে না? কবির আক্ষেপ, একসময় বউ চাইতেন চুমু, এখন চান চালকুমড়া। এই সংসার নন্দনকানন হয়ে উঠতে পারল না। হাসির কবিতা। হাসির তলায় একটা গোটা জীবন। চুমু থেকে চালকুমড়া, প্রেম থেকে বাজারের ফর্দ। কবি কাউকে দোষ দেন না, বউকেও না। চালকুমড়া চাওয়ার ভেতরে একটা সংসার টিকিয়ে রাখার ঘাম আছে। আজ যখন জানা যায় তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, কবিতার হাসিটা আরও ভারী হয়ে ওঠে।
প্রিজমের ভেতর দিয়ে রঙিন রাস্তা দেখা কিশোর থেকে পায়ে ঘড়ি বাঁধা বুড়ো মানুষ। রংচটা রিকশা দেখা কবি থেকে নিজেকে ফেলে দেওয়া কাপ ভাবা কবি। চোখ বদলায়নি। সহজ, সরাসরি, দৃশ্যে ভর দেওয়া। বদলেছে দেখার জিনিস। আগে বাইরের ক্ষয়, এখন নিজের। আর দুই পর্বেই ক্ষয়ের পাশে বসে থাকে একটু কৌতুক, একটু মমতা।
|| আয়না ও দায় ||
‘মেঘের প্রতিভা’য় যৌনকর্মীর প্রতিভা তাঁর হাতের আয়না। ‘পুকুর’-এ পুকুর সূর্যের সামনে রাখা আয়না। রিফাত চৌধুরীর প্রতিভাও একটা আয়না। সেখানে আমরা দেখেছি টাল খাওয়া চাকার রিকশা, মাজনওয়ালার হিংস্র দাঁত, শুকনো নদী থেকে জল টানা মেয়েদের বাঁকা কোমর, ডাবগাছে ঝুলে থাকা মজুরের মাথা, ওভারব্রিজে একা দাঁড়ানো মানুষ। পর্দায় দেখেছি এক কাকাকে, এক কেয়ারটেকারকে, যাঁদের মুখ আমাদের চেনা কারও মুখের মতো।
আয়না চিকিৎসা করে না। শুধু দেখিয়ে দেয় ক্ষত কোথায়। রিফাত চৌধুরী সারাজীবন দেখিয়েছেন সমাজের অসুখ কোথায় বাসা বেঁধেছে। আজ সেই অসুখ তাঁর নিজের শরীরে। আর দুবারই, ২০১৮ আর ২০২৬ সালে, ওষুধ এসেছে ব্যক্তির দয়া থেকে। ব্যবস্থা থেকে আসেনি।
তিনি আর ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে চান না। কবিতা ছাড়বেন না, কবিতাও তাঁকে ছাড়বে না। হাসপাতালের বিছানায় বসে তিনি কবিতা পড়ছেন। পায়ে ঘড়ি বাঁধা মানুষটা এখনো হাঁটছেন। একশ গজ করে। থেমে, জিরিয়ে, আবার। রংচটা রিকশার কবিতাটার নামও তো ছিল ‘আশা’।
প্রশ্নটা তাঁর। উত্তরের দায় আমাদের। কবি তো ব্যধির সঙ্গে লড়াই করছেন। চেনা শহরের অচেনা স্মারকে। যে ব্যবস্থা ফাইল ছাড়া রোগী চেনে না, নম্বর ছাড়া নাগরিক চেনে না, আর পাঁচশো নাটকের অভিনেতাকে চেনে না তাঁর পাওনা মেটানোর দিনে, সেই ব্যবস্থার চিকিৎসা না হলে কার চিকিৎসা হবে?
নোট: প্রতিধ্বনির জন্য ছবিগুলো সরবরাহ করেছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক কাজল শাহনেওয়াজ।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন