বিবিধ মুরাকামিতা কিংবা মার্জার সংক্রান্ত প্রতিবেদন

অ+ অ-

 

তোমরা মনুষ্য, আমরা বিড়াল, প্রভেদ কি?
—বিড়াল/বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

এলিজাবেথ যেদিন পিটার ক্যাট বারটা খুঁজে পেল হেমন্তের এক অদ্ভুত বিকেলে, জাফরান রঙের সূর্য তখন ঢাকা শহরের পুরনো দোতলা বাড়িগুলোর ছাদে এমনভাবে রোদ ছিটিয়ে দিচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল কেউ যেন নরম ক্ষীরের বিছানা পেতেছে। আমি তখন সবেমাত্র চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। কী করব জানি না, কোথায় যাব জানি না। শুধু জানি এলিজাবেথ তিন মাস আগে চলে গেছে। নোটিশটা রেখে গেছিল ফ্রিজের দরজায়, চুম্বক দিয়ে আটকানো। ‘আমি নিজেকে খুঁজতে যাচ্ছি,’ লিখেছিল সে। আর কিছু না।

সেদিন হাঁটছিলাম পুরান ঢাকার এক গলিতে, যেখানে আগে কখনো আসিনি। কীভাবে এ গলিতে পৌঁছলাম মনে নেই। পিটার ক্যাট লেখা সাইনবোর্ড পেরুতে গিয়ে মনে পড়লো এলিজাবেথ বোধহয় এই জ্যাজ বারটির কথা বলেছিল। ১৯৭৮ সাল থেকে খোলা। আমি থমকে দাঁড়ালাম। এলিজাবেথকে বিশ্বাস করিনি সেদিন। মুরাকামির আত্মজীবনী পড়েছিলাম সেই কবে। মনে পড়ে গেল, তিনিও তো একটা জ্যাজ বার চালাতেন এই নামে, টোকিওতে। তাঁর প্রিয় বিড়ালের নামে। এলিই বইটি দিয়েছিল। আর তারও অনেক পরে সেই স্বতন্ত্র গোধুলীর বর্ণনা করতে করতে দাবী করেছিল সে পিটার ক্যাট বারটি আবিষ্কার করেছে।

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। অন্ধকার, তবে আরামদায়ক আলোর মতো অনুভূতি। কোণায় একটা পুরনো রেকর্ড প্লেয়ারে ৯০ দশকের শিল্পী আদনান বাবুর গান বাজছে। ‘চেয়ে থাকো কী বা নাই থাকো তুমি আধো খোলা জানালায়…’। কিন্তু এই গান এই সময়ে কী করে এলো! ক্রমশ নস্টালজিয়া গ্রাস করল আমাকে। স্কুলে যাওয়া কিংবা ফেরার পথে জিপসি নামের এক ফিতা ক্যাসেটের দোকানে অনবরত বাজত গানটি।

এক পায়া স্টিলের চেয়ারগুলো ফাঁকা। সারি সারি দামি-কম দামি বোতল জেল্লা ছড়াচ্ছে শেলফে। অথচ কাউন্টারের পেছনে কেউ নেই। ভেতরের টেবিলগুলোও ফাঁকা। শুধু একটা বিড়াল, সাদা-বাদামি ডোরাকাটা, কাউন্টারের উপর বসে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

‘বসুন,’ বিড়ালটা বলল।

আমি চমকালাম না। হয়তো চমকানো উচিত ছিল, কিন্তু হলাম না। মুরাকামি অনেক পড়েছি, জীবনানন্দও। কথা বলা বিড়াল তাই খুব একটা অস্বাভাবিক মনে হলো না।

‘তুমি পিটার?’ জিজ্ঞেস করলাম।

‘না,’ বিড়ালটা বলল। ‘পিটার অনেক আগে মারা গেছে। আমি তার সপ্তম প্রজন্মের নাতনি। নাম নোবরু। তবে এখানে নাম খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ না। তুমি কী খাবে?’

আমি একটা চেয়ারে বসলাম। ‘হুইস্কি অন দ্য রকস।’

নোবরু কাউন্টারের পেছনে লাফ দিয়ে নামল। কীভাবে একটা বিড়াল হুইস্কি ঢালবে ভাবছিলাম, কিন্তু তার আগেই দেখলাম গ্লাসটা আমার সামনে এসে গেছে। পারফেক্ট। বরফের দুটো কিউব, হুইস্কি ঠিক পরিমাণমতো।

‘তুমি কী খুঁজছ?’ নোবরু জিজ্ঞেস করল, আবার কাউন্টারে লাফিয়ে উঠে।

‘কিছু না,’ বললাম। ‘হাঁটছিলাম।’

‘মিথ্যা কথা। সবাই কিছু না কিছু খুঁজছে। তুমিও খুঁজছ। কী খুঁজছ সেটা হয়তো তুমি জানো না, কিন্তু খুঁজছ।’

আমি হুইস্কিতে চুমুক দিলাম। ঠান্ডা, তিক্ত, তৃপ্তিদায়ক।

‘এলিজাবেথ চলে গেছে,’ শেষমেশ বললাম। ‘তিন মাস আগে।’

‘আর তুমি তাকে খুঁজছো?’

‘না। আমি জানি সে কোথায় আছে। অন্তত কোন শহরে আছে। কিন্তু যাচ্ছি না।’

‘তাহলে কী খুঁজছো?’

‘আমি নিজেকে খুঁজছি। নাকি তাকে? দুটোর কোনোটাই হয়তো না। হয়তো একটা বিড়াল খুঁজছি।’

নোবরু আমার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। ‘তুমি জীবনানন্দ পড়েছ?’

আমি অবাক হলাম। ‘হ্যাঁ।’

‘বিড়াল কবিতাটা?’

‘হ্যাঁ।’ গম্ভীর গলায় আবৃত্তির সুরে বললাম। ‘একবার তাকে দেখা যায়, একবার হারিয়ে যায় কোথায়।’

নোবরু একটু মৃদু ঘড়ঘড় করল, যেটা হয়তো সম্মতি, হয়তো আনন্দ, হয়তো দুঃখ। ‘ঠিক ধরেছ। আমরা বিড়ালেরা এভাবেই থাকি। একবার আছি, একবার নেই। কিন্তু মানুষেরা বোঝে না যে, তারাও একইভাবে থাকে। তারা ভাবে তারা সবসময় আছে, একটা নির্দিষ্ট জায়গায়, একটা নির্দিষ্ট জীবনে। কিন্তু সেটা মিথ্যা।’

‘শ্রোডিঙ্গারের বিড়ালের মতো?’ বললাম।

নোবরু হাসল। বিড়াল কীভাবে হাসে জানি না, কিন্তু নোবরু হাসল। ‘হ্যাঁ। তবে শ্রোডিঙ্গার ভুল করেছিল একটা জায়গায়। সে ভেবেছিল বাক্স খুললেই বিড়াল একটা অবস্থায় চলে যাবে—হয় জীবিত, না হয় মৃত। কিন্তু সত্যি কথা হলো, বাক্স খোলার পরেও বিড়াল দুই অবস্থাতেই থাকে। শুধু মানুষ একটা অবস্থা দেখতে পায়। কিন্তু বিড়াল জানে, সে এখনো দুই জায়গায় আছে।’

আমি আরেকটা চুমুক দিলাম। রেকর্ড প্লেয়ারে এখন মহিনের ঘোড়াগুলি বাজছে। ‘সংবিগ্ন পাখিকূল’। আমার প্রিয় ট্র্যাক। ‘রানওয়ে জুড়ে পড়ে আছে শুধু কেউ নেই শূন্যতা…’

‘তুমি কি জানো,’ নোবরু বলল, ‘এই মুহূর্তে তুমি তিনটা জায়গায় আছ? একটা জায়গায় তুমি এই বারে বসে আমার সঙ্গে কথা বলছ। আরেকটা জায়গায় তুমি তোমার ফ্ল্যাটে একা বসে আছ, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে। আর তৃতীয় জায়গায় তুমি ট্রেনে চড়ে এলিজাবেথের শহরে যাচ্ছ।’

‘তিনটাই কি সত্যি?’

‘তিনটাই সমান সত্যি। তুমি শুধু একটা দেখতে পাচ্ছ। কিন্তু তুমি তিনটাতেই আছো।’

আমি গ্লাস শেষ করলাম। নোবরু আবার ভরিয়ে দিল। এবার আমি লক্ষ করলাম, তার থাবা দেখা যাচ্ছে না। যেন সে বাতাসেই হুইস্কি ঢালছে।

‘মুরাকামি,’ আমি বললাম, ‘তিনি কি জীবনানন্দ পড়েছিলেন?’

‘হয়তো পড়েছিলেন, হয়তো পড়েননি। কিন্তু সেটা গুরুত্বপূর্ণ না। দুজনেই একই জিনিস দেখেছিলেন—আমাদের দেখেছিলেন। আমরা বিড়ালেরা সব জায়গায় আছি, সব সময়ে আছি। টোকিওতেও আছি, ঢাকাতেও আছি, বরিশালেও আছি। ১৯৫০ সালেও আছি, ১৯৭৮ সালেও আছি, ২০২৫ সালেও আছি। আমরা সীমানা মানি না। আমরা বাক্সের ভেতরে এবং বাইরে একসঙ্গে থাকি।’

‘তুমি কি পিটার ক্যাট?’ আবারও জিজ্ঞেস করলাম। ‘মুরাকামির পিটার ক্যাট?’

‘পিটার ক্যাট বলতে পারো, বলতে পারো নোবরু ওয়াতায়াও, যে হারিয়ে গিয়েছিল উইন্ড আপ বার্ড ক্রনিকলে। আমি সেই বিড়ালও যাকে জীবনানন্দ দেখেছিলেন হেমন্তের সন্ধ্যায়। আমি এলিজাবেথের পোষা বিড়ালও, যে মারা গিয়েছিল তোমাদের বিয়ের আগে।’

আমি চমকে উঠলাম। ‘তুমি সেটা কীভাবে জানো?’

‘আমি সব জানি। কারণ আমি সব জায়গায় আছি।’

রেকর্ড প্লেয়ার এখন ‘হারিয়ে গেছি…’ বাজাচ্ছে। আজম খান। বারের ভেতর হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে এল। নাকি এ আমার মনের ভ্রম?

‘আমি যদি বাক্স খুলি?’ বললাম। ‘আমার সিদ্ধান্ত যদি আমিই নিই যে কোন জীবনে থাকব, তাহলে?’

‘তুমি সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না,’ নোবরু বলল। ‘সিদ্ধান্ত নেয়া মানে একটা বাস্তবতা বেছে নেয়া। কিন্তু তুমি একবার বেছে নিলেই বাকি বাস্তবতাগুলো মিলিয়ে যায়। তুমি আর কখনো জানতে পারবে না অন্য জীবনগুলো কেমন ছিল।’

‘তাহলে আমি কী করব?’

‘কিছু করো না। শুধু থাকো। তিনটা জীবনেই থাকো। বাক্স খুলো না।’

আমি উঠে দাঁড়ালাম। মাথা ঘুরছিল একটু। ‘আমার যেতে হবে।’

‘কোথায়? কোন জীবনে?’

আমি জানতাম না কী বলব। দরজার দিকে হাঁটতে লাগলাম। পেছন থেকে নোবরুর গলা ভেসে এল।

‘মনে রেখো। তুমি একবার আছ, একবার নেই। আমরা সবাই তাই। আমরা সবাই শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল।’

দরজা খুলে বাইরে বেরোলাম। গলিটা আগের মতোই ছিল। তবে সূর্য এখন ডুবে গেছে। অন্ধকার নেমে এসেছে। আমি পেছন ফিরে তাকালাম—বারটা নেই। শুধু একটা পুরনো বন্ধ দরজা, যার উপর কোনো সাইনবোর্ড নেই।

আমি হাঁটতে শুরু করলাম। জানি না কোথায় যাচ্ছি। হয়তো ফ্ল্যাটে ফিরছি। হয়তো স্টেশনের দিকে যাচ্ছি। হয়তো আরেকটা বার খুঁজছি। তিনটাই হচ্ছে, একইসঙ্গে।

রাস্তার ধারে একটা বিড়াল দেখলাম। সাদা-বাদামি ডোরাকাটা। আমার দিকে তাকাল, তারপর অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। একবার দেখা গেল, পরক্ষণেই হারিয়ে গেল। এলিজাবেথ বিড়াল ভালবাসতো। ঘরভর্তি বিড়াল থাকার পরও সে সেই মৃত বিড়ালটির জন্যে কাঁদতো।

আমার হাসি পেল। তিন মাসে বোধহয় এবারই প্রথম হাসলাম।

পকেট থেকে ফোন বের করে এলিকে একটা মেসেজ পাঠালাম: ‘আমি তোমাকে খুঁজছি না। আমি নিজেকেও খুঁজছি না। আমি শুধু হাঁটছি। এবং এই হেঁটে চলার মধ্যে যে সৌন্দর্য (ও আনন্দ) অনুভূত হচ্ছে হয়তো তা-ই আমি খুঁজছি।’

মেসেজ পাঠানোর পর মনে হলো হয়তো পাঠাইনি। হয়তো শুধু ভেবেছি পাঠাব। হয়তো ফোনটা পকেট থেকে বেরই করিনি। হয়তো তিনটাই সত্যি।

হেমন্তের রাত কিছুটা ঠান্ডা। আকাশে তারা দেখা যাচ্ছে। আমি হাঁটছি। কোথাও হারমোনিয়াম বাজছে। কোথাও একটা বিড়াল সূর্যের নরম শরীরে থাবা বুলিয়ে খেলা করছে। কোথাও একটা বিড়াল অন্ধকারকে ছোট ছোট বলের মতো থাবা দিয়ে লুফে নিচ্ছে আর সমস্ত পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিচ্ছে।