বেঁচে থাকার রসদ
আড্ডার ঠেক থেকে বাড়ি ফিরে দ্রুত খেয়েদেয়ে বিছানায় ঘুমোবার চেষ্টা করল বিমান। না, কিছুতেই ঘুম আসছে না। একটা কঠিন সিদ্ধান্তের জন্যে মন উচাটন। কী করবে সে! শেষ পর্যন্ত জীবিকার অন্বেষণে এমন এক কঠিন কাজের মধ্যে ঢুকতে হবে! কিন্তু না ঢুকেই উপায়ই বা কি! কিছু একটা না করে তো এইভাবেই সংসারের বোঝা হয়ে দিন কাটাতে হবে সারাজীবন। কিন্তু কিছু একটা করতে চাইলেই কি কাজ পাওয়া যায়! পড়াশুনোর পাট চুকিয়ে সেই কবে থেকে তো কাজের সন্ধান সে করেই চলেছে। কিন্তু কোথায় কাজ! মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দিলে হয়তো মিলতে পারে। কিন্তু সেখানেও নানা অনিশ্চয়তা। কত মানুষ কতভাবে প্রতারিত হচ্ছে! বিমানের বাবা সেই কবে অবসর নিয়েছেন। তার পেনশনের টাকাতেই সংসার চলে কোনওরকমে। মা অনেকদিন ধরেই অসুস্থ, শয্যাশায়ী। বিবাহযোগ্যা বোনের পাত্র খোঁজা চলছে। মোটা টাকা পণ না দিলে আজকাল ভালো পাত্র মেলে না। অবশ্য আজকাল কেন, কোনোদিনও কি মিলত!
গিরিশ ঘোষ তাঁর বলিদান নাটকটা সেই কত বছর আগে লিখেছিলেন। এই সেদিন সে দেখে এলো বর্ধ্মানে। পশ্চিমবঙ্গ নাট্য একাডেমি ওটা নতুন করে মঞ্চস্থ করেছে। সেদিনকার সেই সময়ের খুব একটা বদল ঘটেনি আজও। আমাদের বহিরঙ্গে নানারকম পরিবর্তন ঘটলেও ভিতরটা সেই প্রাচীনকালের মতোই যেন রয়ে গেছে! চুপচাপ বিছানায় শুয়ে এইসব এলোমেলো কথার ফাঁকে মনের মধ্যে মানবদার আজকের দেওয়া প্রস্তাবটা তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। কাজ একটা পেল বটে! কিন্তু এই কাজ করবে সে! শেষ পর্যন্ত শিশু ও নারী পাচারের কাজ! না, না এটা সে কী করে করবে! বেঁচে থাকার জন্যে এমন একটা অমানবিক কাজ করতে হবে অবশেষে! আর ভাবতে পারছে না বিমান। কিন্তু উপায় কি! কয়েক বছর ধরে তো কম চেষ্টা করা হল না। কিছুই তো জুটল না আজ পর্যন্ত! বেঁচে থাকার জন্যে স্বনির্ভর হয়ে কিছু তো রসদ সংগ্রহ করতেই হবে! না, এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। আজকের রাতটাই হাতে আছে। হ্যাঁ কিংবা না মানবদাকে আগামীকালই বলতে হবে। নইলে তিনি অন্য লোক খুঁজবেন বলেছেন। মানবদা অনেক ভেবেচিন্তে নাকি ওকে ঠিক করেছেন। নইলে এলাকায় বেকার ছেলের কি অভাব আছে! সেদিক থেকে বিমানের এটা সৌভাগ্যই বলতে হবে। এইসব এলোমেলো কথা ভাবতে ভাবতে বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে একসময় সে ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে কোনওরকমে তৈরি হয়ে বিমান পা বাড়াল মানিকদার চায়ের দোকানের দিকে। জোর পায়ে হাঁটছিল সে। দেরির জন্যে যদি কাজটা ফসকে যায়!
চায়ের দোকানে অনেক মানুষ, তারই মধ্যে মানবদাকে একা পেয়ে সে তাঁর সম্মতিটুকু জানাতেই মানবদা তার হাতে একতাড়া টাকা গুঁজে দিল। বললেন, আমি জানতাম তুই রাজি হবি। এটা তোর সেলামি। মন দিয়ে কাজ কর, আরও পাবি। কোনও কিছু না করেই এতগুলো টাকা পেয়ে বিমান কেমন হতবিহবল হয়ে গেল। মানবদা তাকে বলল, তৈরি থাকিস। খুব শিগগিরই একটা কাজ করে দিতে হবে। দু’একদিনের মধ্যে সব বুঝিয়ে দেব। তারপর দু’একদিন পেরিয়ে সাতদিন হয়ে গেল। বিমান মনে মনে কেমন সিঁটিয়ে আছে। কী যে করতে হবে কে জানে! কিন্তু এখন তো আর পিছিয়ে আসার উপায় নেই! এরমধ্যে মানবদা একটা দামি মোবাইল ফোন ওকে দিয়েছে। একদিন সেই মোবাইল ফোনেই এল বার্তা, আগামীকাল সকালে তৈরি থাকিস। ফোন করলেই একেবারে সোজা চলে আসিস কাজলডাঙ্গার মোড়ে। একটা কালো রঙের গাড়ি আসবে তোকে নিতে। ওর ভিতরে থাকবে তোর পরিচিত একজন। ওই তোকে কাজটা বুঝিয়ে দেবে। সবটা কেমন রহস্যময়। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই মানবদা দ্রুত বলে চললেন, খুব সাবধানে কাজটা করতে হবে কিন্তু। দিন দু’য়েক বাইরে থাকতে হবে! কাজটা হয়ে গেলেই মোটা অঙ্কের একটা টাকা পাবি। তুই ভাবতে পারবি না কত সামান্য কাজের বিনিময়ে কত বড় অঙ্কের টাকা তুই পাবি।
যথারীতি পরদিন সকালে মানবদার ফোন এলো এবং ঘর থেকে বেরিয়ে কাজলডাঙ্গার পথে পা বাড়াল বিমান। মোড়ে পৌঁছাতে না পৌঁছাতে একটা কালো রঙের গাড়ি এসে গেল। বিমান তাতে উঠেই দেখতে পেল ওর সহপাঠি সুহাসকে। সুহাস ক্লাসের ফার্স্ট বয়। ওর তো ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হবার কথা। সেও তাহলে এই কাজে নেমেছে! বিমান একটু বিস্মিতই হল। ততক্ষণে গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। গাড়ির মধ্যেই সুহাস ওকে কাজটা বুঝিয়ে দিল। ঘন্টা পাঁচেক পরে বিমানকে গাড়িটা পৌঁছে দেবে ঝাড়খণ্ডের এক মন্দির চত্বরে। তার বেশ কিছু আগে সুহাস এক জায়গায় নেমে যাবে। বিমানের কাজ হল, ওই মন্দির চত্বরে আসা ভিখিরি বাচ্চাদের কয়েকজনকে ভুলিয়ে ভালিয়ে গাড়িতে তুলে নিয়ে আসা। ওই মন্দিরে খুব বেশি লোকজন থাকে না। তাই কাজটা নাকি খুব সহজ। ওখানে ঢুকলেই পয়সার লোভে বাচ্চারা ছুটে আসে। ওদের দু’হাত ভরে পয়সা দিয়ে মন জয় করতে হবে। তারপর কয়েকজনকে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে আসতে হবে। আপাত অর্থে কাজটা খুব সহজ মনে হলেও বিমানের বুকটা কেমন দুরদুর করে উঠল। মনের সেই ভয় ভয় ভাবটা সঙ্গে নিয়েই সে চলল আপন গন্তব্যে।
যথাসময়ে সুহাস এক জায়গায় নেমে গেল। যাবার আগে বাচ্চাদের দেবার জন্যে খুচরো কিছু পয়সা ওকে দিয়ে গেল। এইবার বিমান একেবারেই একা। এবার সে গাড়ির চালক ওর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। চালক নাকি ওখানে কয়েকবার এসে সবকিছু দেখে গেছে। বাচ্চাদের লোভ দেখিয়ে গাড়িতে ওঠানো নাকি খুব একটা কঠিন কাজ নয়। বিমানের ভয় তবু যায় না। মনে মনে নানা আশা ও আশঙ্কার মেঘ সাঁতরাতে সাঁতরাতে সামনের দিকে এগিয়ে চলল ও।
মন্দির চত্বরে যখন গাড়িটা পৌঁছাল, তখন ঘড়িতে ঠিক বেলা বারোটা। বিমান গাড়ি থেকে নামতেই হৈ হৈ করে দশ বারোটা ছোট ছোট কয়েকটা বাচ্চা সত্যি সত্যি ওর কাছে এগিয়ে এল। বিমান তাদের প্রত্যেককে পয়সা দিল। তারা তবু পিছু ছাড়ে না। বিমান উদাসীনভাবে চারদিকে তাকিয়ে মন্দিরের দিকে এগোতে থাকে। চারদিক সুনসান। কেউ কোথাও নেই। বিমান ওদের ভাষা বোঝে না। তাই ইঙ্গিতে ওদেরকে গাড়িতে উঠতে বলল। আর কী আশ্চর্য ! কয়েকজন ছাড়া বাকি সবাই একে একে গাড়িতে উঠে পড়ল। এত সহজে যে কাজটা শেষ করা যাবে সে মোটেই ভাবেনি। সবাইকে উঠিয়ে ও নিজে উঠল। গাড়ি দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলল সামনের দিকে। ওদের গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েকটি বাচ্চা। ধীরে ধীরে তারাও চোখের আড়াল হয়ে গেল।
গাড়ির উর্ধ্বগতি দেখে বাচ্চারা হঠাৎ কেমন চুপ করে গেল। ততক্ষণে ওদের আরো কিছু পয়সা বিমান ওদের দিয়েছে। কিছুদূর যেতে যেতে না যেতেই একটা বাচ্চা ডুকরে কেঁদে উঠল। তার কান্না মুহূর্তের মধ্যে সংক্রামিত হল সবার মধ্যে। গাড়িভর্তি বাচ্চারা ততক্ষণে উচ্চৈস্বরে কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে। বিমানের তখন প্রায় দিশেহারা অবস্থা। ওকে আশ্বস্ত করে ড্রাইভার বলল, আমি কিছু চকলেট কিনে আনছি। তা দিয়ে ওদের কান্না থামান। নইলে আমাদের সমূহ বিপদ।
গাড়িটা এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে ড্রাইভার নেমে গেল। ততক্ষণে বিমান কী করবে, মনে মনে ঠিক করে নিয়েছে। ড্রাইভার খানিকটা চোখের আড়াল হতেই বিমান গাড়ির দরোজা খুলে দিয়ে বাচ্চাদের বলল, তোরা পালা এখান থেকে। বাচ্চারা কী বুঝল কে জানে। গাড়ির দরোজা খুলে দিতেই ওরা উর্ধ্বশ্বাসে দৌড় লাগাল। নিমেষেই ওরা চোখের আড়াল হয়ে গেল। বিমানের সমস্ত সত্তা জুড়ে তখন এক অন্যরকমের অনুভূতি। সঙ্গে কিছু ভয়, কিছু সংশয়।
দূর থেকে ড্রাইভার তখন চকলেটের প্যাকেট হাতে বিমানের দিকে এগিয়ে আসছে। ইতোমধ্যে সুহাসের ফোনকল এসেছে। একদিকে ড্রাইভার আর অন্যদিকে সেই বাচ্চারা যেদিকে ছুটে চলে গেছে—দু’দিকে বিমান কেবল দেখছে আর দেখছে। হাতের মোবাইলটা ক্রমাগত বেজেই চলেছে। বিমান কেমন দাঁড়িয়ে আছে স্থাণুবৎ।
পরদিন বিমানের মৃতদেহ পাওয়া গেল রেল লাইনের ধারে। সেই রহস্যজনক মৃত্যুর কোনও কারণ খুঁজে পেল না কেউ। শেষ পর্যন্ত বেকারত্বের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা নাকি অন্য কারণ এর পিছনে, তা নিয়ে চলল নানান জল্পনা কল্পনা। কেউ কেউ প্রেমে ব্যর্থতার কথাও বললেন।
বেঁচে থাকার রসদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বিমানের মতো একটা নিরীহ ছেলের এমন পরিণতি ঘটবে, কে জানত!
মানবিক কষ্টের সত্যায়ন। যথার্থ অনুভবের বিন্যাস।
ড. সন্দীপক মল্লিক
অক্টোবর ১৬, ২০২৩ ১০:১৪
মানবিক কষ্টের সত্যায়ন। যথার্থ অনুভবের বিন্যাস।
ড. সন্দীপক মল্লিক
অক্টোবর ১৬, ২০২৩ ১০:৩৬
মানবিক কষ্টের সত্যায়ন। যথার্থ অনুভবের বিন্যাস।
ড. সন্দীপক মল্লিক
অক্টোবর ১৬, ২০২৩ ১০:৩৭
আপনার লেখার হাত ভালো। আচ্ছা, এটা যদি এক বিয়োগান্ত প্রহসন হত তাহলে কেমন হত? এই জন্য বলছি যে বেকার জীবনের tragedy আমাদের পরিচিত, যদিও বেছে নেয়া রাস্তাটা অভিনব। আশিস ঘোষ, দিল্লি।
Ashish Ghosh
অক্টোবর ১৬, ২০২৩ ১১:৫৩
আপনার লেখার হাত ভালো। আচ্ছা, এটা যদি এক বিয়োগান্ত প্রহসন হত তাহলে কেমন হত? এই জন্য বলছি যে বেকার জীবনের tragedy আমাদের পরিচিত, যদিও বেছে নেয়া রাস্তাটা অভিনব। আশিস ঘোষ, দিল্লি।
Ashish Ghosh
অক্টোবর ১৬, ২০২৩ ১১:৫৪
গল্পটা ঠিক আছে। আমার মনে হলো, ডেডবডি দিয়ে গল্পটা শুরু করলে একটা প্রচন্ড রহস্য ঘনীভূত হত পাঠকে মননে। রেজাউল করিম, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্তা।
Rezaul karim
অক্টোবর ১৭, ২০২৩ ১৮:০৯
চমৎকার এঁকেছেন অন্ধকার সময়ের রূপ। শ্রদ্ধা। সোমনাথ রায়।
Somenath Roy
অক্টোবর ১৭, ২০২৩ ১৮:১৪
এখন তো শিক্ষিত বেকারদের দিয়ে অনৈতিক কাজ করানো নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে গেছে। ভালো লাগল। ছোটোর মধ্যে পুরো গল্পটা বলা হয়েছে। অভিনব বসু বেঙ্গালুরু।
Abhinaba Basu
অক্টোবর ১৭, ২০২৩ ১৮:৫২
ভালো লেগেছে। বিমানের পরিনতিটা নিজের মনে হচ্ছে!! সায়য়ীদ সুজন, সংগীত শিল্পী।
Sayeed Sujan
অক্টোবর ১৭, ২০২৩ ১৮:০৯



শেষ পর্যন্ত মানবিকতারই জয় হল। খুব ভালো লিখেছেন স্যার...আরও পড়তে চাই
তরুণ কুমার কর্মকার
অক্টোবর ১৬, ২০২৩ ০২:৩৩