ভাতখাকি

অ+ অ-

 

দৃশ্যটা দেখেও তন্দ্রা কাটে না অফুরতের। চোখের পাতা এমনভাবে লেগে আসে যেন থকথকে পিচুটি মাখা আছে। খুব জিতে গেছে-ভঙ্গিতে ওর ঠোঁটের কোনে পাতলা একটা হাসিও ফোটে। ভাবে, যাক ঘুম এসে যাবে, বিচ্ছিরি স্বাদটা আর ঠোঁটে, জিহ্বায় লেগে থাকবে না।

রাতটা ভালোয় ভালোয় ফুরালেও ভোরবেলায় রেহাই পায় না উমেরা বিবির আদরের ছেলে অফুরত। ভাতের মালসা থেকে হাত উঠিয়ে যেই না ভাতের লোকমা মুখে দেয় ঠিক সেই সময়ে বিশ্রি স্বাদে, গন্ধে মুখগহ্বর ভরে যায়। অনেক চেষ্টা করেও এক গাল ভাত গলা দিয়ে নামাতে পারে না। ছেলের বেগতিক অবস্থা প্রথমে আন্দাজ করতে পারে না উমেরা বিবি। অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলে ওঠে, তোর খালি তাড়াহুড়া আর তাড়াহুড়া, আস্তে আস্তে খা বাপ।

নিজেকে সামলে নিয়ে এবার ধীর ভঙ্গিতে সীম ভর্তা মাখা এক মুঠো ভাত মুখে তোলে অফুরত। লাভ হয় না, পেটের ভেতরে পাক দিয়ে ওঠে। ওর ভয় হয়, মনে হয় পুরো পেট মুচড়ে মুচড়ে দেহ থেকে আলাদা হয়ে যাবে। পা দুটো ভাঁজ করে অফুরত তাই পেটটা দেহ কাঠামোর সঙ্গে চেপে রাখতে চায়। ঝুঁটা হাতের ছাপ বসে যায় ঘিয়া, আকাশি রঙের লুঙ্গিতে। উমেরা বিবি ছেলেকে ধমকে ওঠে, এমন করিস ক্যান? ভাত মুখে দে ছেমড়া। তার ধমকে জোর নেই, অফুরতের হতভম্ব ভঙ্গি তাকেও কাবু করে ফেলেছে।

পেটটা হঠাৎ ভার ভার ঠেকে অফুরতের। এক গাঙ পানি এক চুমুকে খাওয়ার মতো হাঁস ফাঁস লাগে। মুখ হাঁ করে দম নেয় কয়েকবার। তারপর দুই পা সরিয়ে উঠে দাঁড়ানোর মতো জোর সঞ্চয়ের চেষ্টা করে। চেষ্টা সফল হলে মালসাটা দূরে ঠেলে সটান দাঁড়িয়ে যায়। দুই ঠোঁট জিহ্বা দিয়ে চেটে নিতে নিতে অফুরত টের পায়, বিদঘুটে স্বাদ লেগে আছে মুখে। মুখে পোরা ভাতটুকু ভেতরে চালান হয়নি, আলজিহ্বার কাছে আটকে আছে। দাঁত দিয়ে জিহ্বা কাচিয়ে অফুরত থু থু করে উঠানের মাঝখানে ভাত ফেলে।

উমেরা বিবি এখনও ভাত খা বাপ, ভাত খা করে চলছে। অফুরতের ভাতের সানকি জোরে লাথি মেরে উড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। এই অভ্যাস ওর আছে। ফিরুজা ভাত পরিবেশন করলে তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে ভাতের থালায় লাথি মেরেছে কতবার। শুধু ভাতের কারণে না, ঐ নোলঝরা মাগির কাণ্ডকীর্তি এতই তাতিয়ে তুলত যে যখন তখন অফুরতের পা উঠত। মায়ের সামনে আজ পা না উঠলেও, দুই পা দিয়ে অহেতুক ধুপুরধাপুর শব্দ তুলে ও বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যায়।

ক্ষেতে কাজ করতে করতে ক্ষুধাটা জাঁকিয়ে উঠলে বাড়ির দিকে না গিয়ে অফুরত বাজারের দিকে ছোটে। হারেস মিয়ার চালু দোকানে বসে তিনটা রুটি পানি ডাল দিয়ে খেয়ে নিয়ে আরেকটা রুটির অপেক্ষায় চুপচাপ বসে থাকে। পেটে স্বস্তি আসায় অফুরতের মাথার ভেতরে চিন্তার স্রোতে খাবি খায়। নিরোগ দেহ ওর। সুঠাম না হলেও গড়ন শক্তপোক্ত। অসুখ-বিসুখের বালাইও নেই। সব ঠিকঠাক থাকলেও শুধু ভাত খেতে বসলেই কেন এমন হয়? কেন গলা দিয়ে ভাত নামে না? রুটি তো ঠিকই নামে। কিন্তু কদিন আর রুটি খেয়ে থাকবে। ভাতের দেহ ভাত না পেলে টিকবে? কাজের জোরই বা পাবে কোথা থেকে?

গরম গরম ফুলো রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে অফুরতের দুশ্চিন্তা বেমালুম গায়েব হয়ে যায়। বাড়ি ফিরে দেখে উমেরা বিবি গরম ভাত নামাচ্ছে। ভাত খাওয়া পেট রুটিতে পোষ মানে না। হাত না ধুয়েই খেতে বসে যায় অফুরত। উমেরা বিবির কণ্ঠে স্নেহ ঝরে পড়ে, মাংস রান্না করছি বাপ। সকালে খাস নাই ঠিক মতোন। এখন পেট ভইরা খা বাপ। মায়ের আহ্বানে মুখে ভাতের গ্রাস তুলতেই ছটফট করতে শুরু করে অফুরত। হঠাৎ শ্বাসনালীতে কিছু একটা আটকে কাশতে কাশতে নাকে-মুখে রক্ত ওঠার দশা হয়। ছেলেকে সামলাতে গিয়ে উমেরা বিবির দেহের ধাক্কায় মাংসের বাটি উল্টে যায়।

পরেরদিন হাটখান গ্রামের আনাচে-কানাচে পেঁছে যায় সংবাদটা। এই গ্রামের ভাত খেয়ে বেড়ে ওঠা অফুরত আর ভাত খেতে পারছে না-এ কী গুরুতর কাণ্ড! ওদিকে শুধু ভাতই না। অফুরতের কপাল থেকে ঘুমও উঠে গেছে। মাসখানেকের মধ্যেই দুবলাপাতলা হয়ে গেছে অফুরত। উমেরা বিবি একমাত্র সন্তানের রোগ নিরাময়ের জন্য কবিরাজের বাড়ি, পীরের দরগা থেকে শুরু করে সদর হাসপাতালে পর্যন্ত ছুটোছুটি করছে। লাভ হচ্ছে না। অফুরতও চেষ্টা কম করছে না। এই যে সকাল সকাল লাল লাল ঝালে ঝোলে ডুবানো গরুর মাংস দিয়ে পাত সাজিয়ে বসেছে। কাটারিভোগ চাল ফোটা উষ্ণ ভাতের ঘ্রাণে ওর নাসারন্ধ্র শুলশুল করছে। ইচ্ছে করছে একটা আস্ত লেবু চিপে রস ছড়িয়ে নিয়ে থাবা থাবা ভাত তুলে মুখে পোরে। কিন্তু মুঠোতে সাদা ভাত তুলে থমকে যায় অফুরত। বুঝে যায়, এই ভাতও গলা দিয়ে নামবে না। দুঃখে জরো জরো দেহ কুণ্ঠিত হয়ে আসে। বেদনার ভারে চোখ জ্বালা করে।

অফুরত আর্তনাদ করে ওঠে, অ মা, এই গেরাসও নামবো না। উমেরা বিবি ছেলের পিঠে রগভাসা হাত রেখে বলে, নামবো বাপ, নামবো, তুই আস্তে আস্তে খা। ওদিকে জিভে ভাত ছোঁয়াতেই অফুরতের জিহ্বা ভার হয়ে আসে, মনে হয় মুখের ভেতরে কেউ এক দলা মাটি ঢুকিয়ে দিয়েছে। পেছনে ঘুরে মুখে যা ছিল সব ফেলে দেয় ও। এরপর ছুটে গিয়ে পেট চেপে ধরে বসে উঠানের ওপরে বমি করতে থাকে। শূন্য পেট থেকে আঁঠাল থুতু ছাড়া কিছুই বের হয় না।

ছেলের বিস্ফোরণোন্মুখ মুখটা দেখে উমেরা বিবির একজনের কথা মনে পড়ে যায়। ভাতগাঁও থেকে আসা সেই মেয়ে ভাত খেত খুব। ভাত খেয়ে খেয়ে সে একেবারে মাংসে, রসে টুবুটুবু হয়ে উঠেছিল। অনেক অনেক দিন পর তার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠে নিমিষে উমেরা বিবির মনের সব খটকা দূর হয়ে যায়। বুঝে যায় সে, এ সবই ছোটলোকের ঘরের বেটি ফিরুজার কাজ। মরে গিয়ে শান্ত হয়নি ঐ বেটি, তুকতাক চালিয়ে যাচ্ছে। ভাতের খাই মেটেনি হয়তো!

দলা দলা গরম ভাত কোনো তরকারি ছাড়াই খেতে পারত ফিরুজা। দৃশ্যটা দেখলেই উমেরা বিবির মাথায় রক্ত উঠে যেত। একদিন সবার অলক্ষ্যে ভাতের ভেতরে এক খাবলা নুন গুঁজে রেখেছিল। গরম গরম তুলতুলা ভাতের ঘ্রাণ পেয়ে থালার ওপর হামলে পড়ে ফিরুজা ভাত মুখে পুরেছিল। তারপর ওয়াক ওয়াক করে অফুরতের মতোই পেছন ফিরে মুখের ভাত ফেলে দিয়ে বমি করতে শুরু করেছিল। এর পরপরই শাশুড়ি, স্বামী সবাইকে উপেক্ষা করে নির্লজ্জ মেয়েটা নিজের হাতে এক গামলা ভাত সাজিয়ে খেতে বসে গিয়েছিল।

ভাত ভাত করে কম অশান্তি ছিল না এই সংসারে। কিন্তু যার জন্য অশান্তি তার কোনো ভ্রুক্ষেপই ছিল না সেদিকে। শাশুড়ির গজগজানি কানে না তুলে পাক ঘরের চিপায় বসে মুঠো মুঠো ভাত গিলত ফিরুজা। ভাতের সঙ্গে ওর এক বাটি আলু ঘাঁটা আর একটা ডিমভাজি হলেই চলত। বউকে ভাত থেকে ফিরাতে ফকিরালির কাছে গিয়ে ছাই পড়া এনে ভাতের মধ্যে গুঁজে রেখেছিল উমেরা বিবি। এমনই নোলা ছিল ঐ ফকিন্নির ঝির যে ছাইসুদ্ধো ভাত গিলে খেতে খেতে শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে গাল ভরে হেসেছে। ভাতগাঁওয়ের মেয়ে ভাত খাওয়া শিখেছে শুধু আদব-লেহাজ শেখেনি।

শেষ পর্যন্ত পুকুরে ডুবে মরেছিল ঐ হাভাতে মেয়ে। মাঘের মাঝামাঝি তখন। পুকুরের ভেতর থেকে ঠান্ডার ভাঁপ উঠছে। ধোঁয়া ধোঁয়া পুকুর থেকে জলমগ্ন ফিরুজাকে টেনে তোলা হলে আশ্চর্য এক দৃশ্যের তৈরি হয়েছিল। ওর শাড়িহীন দেহের মধ্যে শুধুমাত্র উইঢিবির মতো উঁচু পেটটাই সবার নজরে পড়ছিল। ভাতের পেট অত বড়, অত উঁচু হয়? না ঐ পেটে বাচ্চা আছে? বাচ্চা পেটে নিয়ে কোনো মা কেন ডুবে মরতে চাইবে? না কেউ তাকে ডুবিয়ে মেরেছে? গলায় মালার মতো চেপে থাকা দাগটা দেখে এমন হরেক গুঞ্জন তুলেছিল লোকে।

অফুরত চারদিকে ফের গুঞ্জন শুনতে পায়। ওর ভাতহীন দেহে একটা ঝাঁকি লাগে। পাঁজরের নিচে চাপা গোঙানি তেড়েফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চায়। চোখের মণিতে লুকিয়ে থাকা শয়তানিও ঘোলা হয়ে আসে। অদ্ভুত একটা বেপরোয়া হাওয়া ধাক্কা মারে। অফুরতের শিরদাঁড়া সাঁই সাঁই করে খাড়া হয়ে যায়। কেন যেন মনে হয় দক্ষিণ ভিটা সংলগ্ন পুকুরের পানি ফুলেফেঁপে উঠছে। উথালিপাথালি স্রোতও জাগছে। আতংকে দুই চোখ বন্ধ করে রাখে অফুরত। পরক্ষণেই সংশয়বাদী মনকে নতুন প্রশ্নে চাঙা করতে চায়।

পুকুরে কি স্রোত জাগে? এ কোন বেকুবি ভাবনা! নিজেকে আদামসাদাম বুঝ দিয়ে দুই চোখ টেনে খুলে অফুরত দক্ষিণ দিকে তাকাতেই দেখতে পায় পুকুরের পানাহীন মধ্যভাগে ভাতখাকি ফিরুজা ভাতের থালা হাতে দাঁড়িয়ে আছে।