দুই মিস্তিরির দুপুর  

অ+ অ-

 

ধূ ধূ দুপুর ঘাড়ে চেপে আছে রামু এবং আলির, যেন এক অশরীরী আত্মা পিছু ছাড়ছে না কিছুতেই, সেই অশরীরী আত্মা ঠাকুমা বা দাদির বলা গল্পে যাদের কথা শুনে শুনে তারা বড় হয়েছে আর যার জেরে গা ছমছমে এক অনুভূতি নিয়ে দুপুরের বাঁশ বাগানে যেতেও পেয়েছে ভয়, আজকাল যেন নিজের গ্রামের দুপুরের বাঁশ বাগানই ফিরে এসেছে এই ঘোরতর শহরের বুকে।

রামু ও আলি বড় হয়েছে একই গ্রামে পাশাপাশি বাড়িতে, একই সঙ্গে যাপন করেছে অভাব এবং অনন্দ উৎসব। কেঁদেছে, হেসেছে, ঝগড়া করেছে এবং পুনর্মিলন হয়েছে দুজনের। পরিচিতরা তাদের নাম দিয়েছে ‘মাণিক জোড়’ এবং সত্যিই তারা পরস্পরকে ছেড়ে থাকতে পারেনি কখনও।

মেয়েদের আসরে পড়শিদের আশঙ্কা, 
‘দুজনের বিয়ে হোক, বুঝবে!’ 
‘ঠিকই কহেছিস। কিন্তু ওদের বউরা দোস্তি মানতেও পারে।’ 
‘নাও মানতে পারে। দেখিস, মিতেগিরি ছুটবে।’ 
‘এত হিংসেপনা ক্যানে? দুই মিতে ভালই তো আছে, মিলেমিশে থাকাই তো ভাল।’ 
‘আমি হিংসেপনা করছি, না? হক কথা বুললেই যত দোষ!’

কেউ বা মনে করেছে দুজনে একই মেয়ের প্রেমে পড়বে, তখন বুঝবে বাছাধনরা, বিবাদ করেই আলাদা হয়ে যাবে। একটা বিষম মারামারিও হয়ে যেতে পারে। সেইসব ভবিষ্যতের দিনের সম্ভাবনার কথা ভেবে মেয়েদের আসর হয়ে উঠেছে সরগরম।

কেউ বা আরও এককাঠি ওপরে উঠে সরস ও নীচু গলায় আলোচনা করেছে,  

‘ব্যাপারটা কিন্তুক এত সুজাও লয়।’ 
‘ক্যানে রে?’  
‘শুনিসনি? আজকাল তো মেয়ে-মেয়ে, ছেলে-ছেলেতেও সম্পক্ক হয়। টিভির খবরে দেখায় যে!’  
‘কি যে কহিস! তা যদি হয়-ই তো কার কি! অধের নিজেদের মামলা।’ 
‘আস্তাগফেরুল্লা! কী বুলছিস তুই! ইসব কথা শুনলে গেরাম ছাড়া হতে হবে, রামু ও আলির জান লিয়ে টানাটানি চলবে।’  
‘রাম রাম! জান লিয়ে টানাটানির কথা কহিস ন্যা, যত্তসব অসহিলে কথা! গ্রাম শান্তিতে থাক, আল্লা-ভগবান সবার কাছে হাত জোড় করি।’

কিন্তু আলি ও রামুর এসব আলোচনায় কিছুই যায় আসেনি কখনও। আপাতত ঘাড়ে চেপে বসা কলকাতার দুপুর একটা মায়াজালের ভেতর ঘিরে রাখে তাদের। তারা দেখে জনহীন চারপাশ, দেখে শুকনো খটখটে কংক্রিট, দেখে গাছের পাতাগুলোও ম্যাড়মেড়ে হয়ে ঝুলে আছে শূন্যে, দেখে বারান্দায় টবের গাছ রোদে ঝলসে খসখস করছে, হাতে ধরলেই পাতাগুলো ভেঙে যাবে মচমচ শব্দে।

এইসব দৃশ্য ও শব্দ ভেতরে ভেতরে তাদের যেন স্থবির করে দেয়। গ্রামের ফসলের অবস্থা ভেবে শঙ্কিত হয়। মানুষ খাবে কি! তবু কাজ চালিয়ে যায় তারা।

কোমরে মোটা দড়ি বেঁধে ছাদের ওপর থেকে একটা ফ্ল্যাটের জানলার কাছে নেমে আসে আলি আর ছাদে দাঁড়িয়ে রামু সহযোগিতা করে। চল্লিশ ডিগ্রি তাপের ভেতর দুজনেই কাজের ফাঁকে ফাঁকে ঘাম মোছে বার বার। দেয়ালের সাথে দুটো লোহার শক্তপোক্ত ‘এল’ লাগিয়ে নেয় আলি, যার ওপর ধরা থাকবে আস্ত শীতাতপনিয়ন্ত্রণের যন্ত্র, খুব সাবধানে ছোট কার্নিশের ওপর পা রেখে সে কাজ করে।

এইসব সময় রামু ভয়ে ভয়ে থাকে, সাবধানে আলির হাতে বাড়িয়ে দেয় যন্ত্রপাতি। যদিও আলির কোমরে বাঁধা আছে দড়ি আর সে দড়ির অপর প্রান্ত শক্ত করে বাঁধা ছাদের ভেতরের দিকের লোহার পাইপের সঙ্গে, সহজে পড়ে যাওয়ার কথা নয়, তবু সাবধানের মার নেই। রামু বার বার পরীক্ষা করে নেয়, আলির কোমরের দড়ি ঠিকঠাক আছে কিনা। বার বারই দেখে ঠিকই আছে, তবু ভেতরে ভেতরে কেমন একটা অস্বস্তি হতে থাকে তার। অস্বস্তি কাটানোর জন্য সে চারপাশ দেখে, কিন্তু আলির দিক থেকে মনোযোগ সরে না এক মুহূর্তর জন্যও। 

এই ঘোর দুপুরের রোদ দুজনের মাথায় চেপে বসেছে, মাথায় হাত দিয়ে অস্বাভাবিক তাপ টের পায় রামু, এ জ্বরের তাপ নয়, প্রকৃতির অসম্ভব তাপই প্রবাহিত হয়ে গেছে মাথার খুলিতে। শুধু মাথার খুলিই নয়, সস্তার চপ্পল ভেদ করে তাপ ঢুকে পড়ছে পায়ের ভেতর, আসলে শরীরের কোনও অংশই রক্ষা পাচ্ছে না তাপ প্রবাহ থেকে, একটা ফার্নেসের তীব্র আগুনের কাছাকাছি থেকেই যেন কাজ করছে দুজনে।

ছাদ এবং দেয়ালের কংক্রিটের স্পর্শ যেন বা জ্বলন্ত উনুনে বসানো তপ্ত পাত্রের স্পর্শ, ছ্যাক্ করে ছ্যাকা খাওয়ার এক অনুভূতি। তবু তার মধ্যেই দুই মিস্তিরি কাজ করে যেতে বাধ্য, কেননা এটাই তাদের কাজ, এ-ই তাদের রুটিরুজি। রামু তবু বিরক্ত হয়ে ওঠে।
‘দূর শালা! এত গরমের মধ্যে কাজ করা যায়!’

শঙ্কিত আলি উত্তর দেয়,
‘এ কি কথা বলছিস! যত গরম বাড়বে আমাদের কাজ তত বাড়বে।’   
‘তা অবশ্য ঠিকই। এত গরম পড়েছে বলেই তো লোকে এসি লাগাচ্ছে আর কোম্পানিতে আমাদের কাজের বহরও বাড়ছে।’ 
‘তাই তো বলছি। এত গরম না হলে থোড়াই লোকে এসি কিনতো আর আমাদের ডাকতো। এত গরমে লোকে রাতদিন এসি চালাচ্ছে, খারাপ হচ্ছে এসি, ডাক পড়ছে আমাদের। সুবিধাও আছে না, সেটা বোঝ। শীতকাল এসে গেলেই তো অন্য কাজ খুঁজতে হবে। জ্বালা কি কম! তার থেকে এসির কাজই ভাল।’
‘তবে কি জানিস আলি, আমার বড় ভয় ভয় লাগে। বাড়িতে বাড়িতে এসি লাগিয়ে পাপ করছি না তো?’
‘কেন রে? পাপ কেন হতে যাবে?’
‘সেদিন আমি একাই চায়ের দোকানে গেলাম না? কজন ভদ্রলোক চা খেতে খেতে কত আলোচনা করছিল।’
‘কী?’
‘সারা পৃথিবীতে গাছের সংখ্যা নাকি এত কমে গেছে যে পৃথিবীর চরিত্র ওলট পালট হয়ে গেছে।’
‘মা ধরিত্রী কষ্ট পাচ্ছে- একথা ফেলনা না। ছোটবেলায় তোর মনে আছে রামু, গ্রামে কেউ বড় গাছ কাটতে গেলে একশ বার ভাবতো।’ 
‘মনে নাই আবার! ওই যে একবার ফলে ভর্তি গুগলি আমের গাছ কেটে ফেললো গাজি চাচা, সারা পাড়ার লোক চাচাকে বারণ করেছিল…’
‘হিন্দুরা বললো, ‘চাচা, এত পুরনো একটা ফলন্ত গাছ কাটো না, গ্রামের দেবদেবীরা অসন্তুষ্ট হয় যে!’ মুসলমানরা বললো; ‘আল্লার জীব, গাছটা কাটছো কেনে চাচা? ফলন্ত যে! অভিশাপ লাগবে।’’ 
‘চাচা কারও কথাই শুনলো না, কেটে ফেললো। কদিন বাদে মুখে রক্ত উঠে মরেই গেল। গাছের অভিশাপেই মরলো চাচা!’ 
‘আমরা তখন ছোট। তোর মনে আছে রামু, আমরা ওই গাছে উঠে কত খেলেছি?’
‘আর কত পাখপাখালির বাচ্চা যে মারা পড়লো! কত ডিম নষ্ট!’
‘মা পাখিগুলা বাচ্চাদের কাছে উড়ে উড়ে এসে কত হাহাকার করছিল! পাড়ার লোকেরা পাখির বাচ্চাগুলা বাঁচানোর চেষ্টাও করলো। মা পাখিগুলা রোজ এসে বাচ্চাগুলাকে দেখে যেত। কিন্তু বাসা ভেঙে গেলে কি আর পাখির বাচ্চা বাঁচে! দুএকটা ছাড়া সবই মারা পড়লো। আমাদেরও খুব মন খারাপ হয়ে গেল। মনে আছে?’
‘আলবৎ মনে আছে। শোন না, ওই চায়ের দোকানের লোকগুলা বলছিল, লোকে এত এসি কিনছে, এত কারেন্ট খরচ হচ্ছে যে পৃথিবী নাকি আরও গরম হয়ে উঠছে। একথা যদি সত্যি হয় তাহলে আমরা মা ধরিত্রীকে কষ্টই দিচ্ছি।’
‘হক কথা রে রামু! আমারও যে ভয় লাগে না তা না।’
‘ধরিত্রী মা কষ্ট পাবে বলে বছরের একটা সময় মাটি খোঁড়াও বারণ ছিল। এখন এত সব কে আর মানে!’
‘আল্লা-ঈশ্বরের ভয় বোধহয় ঠিকই ছিল রে। অন্তত গাছপালা-পোকামাকড়-পশুপাখি প্রয়োজন ছাড়া লোকে নষ্ট করতো না। প্রয়োজনে গাছ কাটতে হলে আল্লা-ঈশ্বরের কাছে পাপ মোচনের মোনাজাত করতো।’
‘আমরা সারাদিন ধরে এসি লাগাচ্ছি, সারাচ্ছি। ধরিত্রী মাকে কষ্ট দিচ্ছি। পাপ হচে না, বল?’
‘ভয় যে হয় না তা বলবো না। কিন্তু কি জানিস রামু, রুটিরুজির জন্য মানুষ কতকিছুই করে। ঈশ্বর-আল্লা সে কথা কি বুঝবে না?’
‘বুঝুক, না বুঝুক আমরা যে নিরুপায়। লকডাউনে সব কাজ বন্ধ। এই তো কদিন হল আবার কাজ শুরু করলাম। এর মধ্যে এত ভাবলে আমাদের চলবে কেন?’    

বলে বটে রামু, কিন্তু তার গা ছমছমে ভাব কিছুতেই কাটে না। দুজনে মিলে কাজ করছে, যাদের এসি তারা ভুলেও একবার ছাদে আসছে না। তৃতীয় একজন যদি তাদের পাশটিতে এসে দাঁড়াতো তাহলেও হয়তো গা ছমছমে ভাবটা একটু কমতো। কিন্তু এই তাপের মধ্যে ছাদে এসে দাঁড়ানো তাদের সহ্য সীমার বাইরে। অগত্যা রামু গা ছমছমে ভাবটা প্রশমিত করার চেষ্টা করে। আলির কাছে এই অনুভূতি সে লুকিয়েই রাখে। আলিকে দেখে নেয়, মন দিয়ে কাজ করছে, তার কপালময় ঘাম।

কপালের ঘাম হাতের চেটো দিয়ে মুছে নেয় আলি। কিন্তু মুছেও কিছু সুরাহা হয় না, জলের প্রবাহের মতো বেরোতেই থাকে। রামু দেখে আলির কপাল, কি দ্রুত ঘাম জমছে আর ঘামের বিন্দুগুলো এক জায়গায় হয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে আলির মুখময়। নিজের মুখের এই দৃশ্য সে দেখতে পাচ্ছে না ঠিকই কিন্তু অনুভব করছে গড়িয়ে পড়া। পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাম মুছে নিতে নিতে আবারও বিরক্ত হয়ে ওঠে সে, রুমাল পকেটে ঢোকানোর সময়ও দিচ্ছে না, অনবরত ঝরেই যাচ্ছে। বিরক্তিতে ভ্রূ কুঁচকে যায়।

হাতের পাতা দিয়ে চোখ আড়াল করে মুখ তুলে রামু আকাশের দিকে তাকায়। আকাশটা কেমন অতিরিক্ত আলোয় সাদাটে হয়ে আছে। তারই মধ্যে উড়ছে কয়েকটা চিল। চিলেদের কি গরমও লাগে না, ঘামও হয় না? মানুষের মতো পাপপুণ্যর বোধ কি তাদের বিচলিত করে? ভাবতে ভাবতে আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে থাকে। আলির কথা ভুলেই যায়। 

আলির ঠিক তখনই দরকার একটা স্ক্রু ড্রাইভার, এসি-র বাইরের খাপটার একটা স্ক্রু ঢিলে লাগছে, টাইট করতে হবে। রামুর দিকে হাত বাড়ায়। কিন্তু রামু আকাশের দিকে তাকিয়ে।

‘এত কী ভাবছিস!’  
রামুর সম্বিৎ ফেরে।

‘এই চিল দেখছিলাম। ঈশ্বরের কেমন মহিমা! আমরা গরমে-ঘামে অতিষ্ঠ, আর ওরা ঠিক উড়ছে, কত্ত ওপরে!
‘ওরা কি এমনই এমনি উড়ছে রে! আমরা যেমন পেটের দায়ে এই গরমে… ওরাও…’

মুখ নামিয়েই রামু দেখে আলির হাত বাড়ানো, স্ক্রু ড্রাইভার আলির হাতে গুঁজে দেয়। কাজ করতে করতে এমনই অভ্যেস হয়ে গেছে যে আলি কখন কী চায়ছে উচ্চারণ করতে হয় না, ঠিক বুঝে যায় রামু।

আলি বিপজ্জনক কাজগুলো নিজে করে। রামুও এগুলো করতে পারে, কিন্তু আলি কিছুতেই তাকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে না। প্রথম প্রথম তর্ক করতো রামু, নিজেও এই রকম কাজগুলো করতে চায়তো, কিন্তু আলির আপত্তিতে তাকে নিরস্ত থাকতে হয়েছে। এখন এটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

তবু মাঝে মাঝে সে যে একেবারে বিদ্রোহ করে না তা নয়। মাঝে মাঝেই তার মনে হয় আলি তার ওপর কর্তৃত্ব ফলাচ্ছে। যখনই এসব মনে আসে তখনই নিজেকে আলির অধস্তন মনে হয়। তখনই তার একটু রাগারাগি করতে ইচ্ছে করে। প্রত্যেকবারই আলি তাকে সামলায়।

‘আমার চোখের সামনে যদি তোর কিছু হয়ে যায় নিজেকে জীবনে ক্ষমা করতে পারবো না।’
‘আর তোর কিছু হলে? আমার খুব ভাল লাগবে, না?’  
‘অত চিন্তা করিস না। ভালমন্দ কিছু যদি হয়েই যায় আমার মাকে আর বোনকে দেখিস।’ 
‘সে তো দেখবই, কিন্তু আমি একা একা কি করবো বল তো! আমার কথা একেবারেই ভাবিস না।’ 
‘তোর কথাই ভাবি রে, রামু। সেজন্যই তোর খেয়াল রাখি।’   
‘শুধু নিজেকে মহান করার চেষ্টা!’ 
‘কি বোকা রে, তুই! আমার নিজের ছেলেমেয়ে হলেও এরকমই করবো।’ 
‘তবু, এতটাও ভাল না রে। কাজের জায়গায় তুইও কাজ করবি, আমিও করবো। লোকে ভাবে আমি রিস্কি কাজ করতে পারি না।’ 
‘লোকে কি ভাবলো তা দিয়ে তোর আমার হবেটা কি! আমরা গতর খাটিয়ে খাই, গতর খাটিয়েই খেতে হবে। চুপচাপ মন দিয়ে কাজ কর তো। আজেবাজে চিন্তা খালি মাথায়!’

আলি গজগজ করে। তার অতিরিক্ত অভিভাবকপনায় মনে মনে অসন্তুষ্ট হলেও রামু আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ দুজনে কাজ করে। কলকাতার বস্তিতে যে ছোট একটা ভাড়া ঘর নিয়েছে তারা সেখানেও প্রায় সব কাজ করে আলি। নিজেই রান্না করে। বড় মাছের পিস, মুরগির ঠ্যাং, ইত্যাদি যা সেরা সব তুলে দেয় রামুর পাতে। আপত্তি করলেও শোনে না। রামু অবশ্য এসব বিষয়ে খুশিই হয়।

এসি লাগানো শেষ। কোম্পানি থেকে অন্য লোক এসে ইন্সটল করে দেবে। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে। যাদের এসি তারা বার বার জিজ্ঞেস করে নিচ্ছে কখন আসবে ইন্সটলেশনের লোক, যেন মুহূর্তের মধ্যে পেতে হবে শীতল হাওয়ার স্পর্শ। আর ধৈর্য নেই।

কাজ শেষ করে রাস্তায় নেমে আসে দুজনে। পরবর্তী জায়গা থেকে বার বার কল আসছে। এসি খারাপ, সারাতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব পৌঁছতে হবে সেখানে। কিন্তু একি! ত্বকে জ্বালা জ্বালা ভাব। এমন তো কখনও হয়নি! দুজনে পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়। কোনও শব্দ উচ্চারণ না করেও দুজনেই বোঝে একই অনুভূতি পরস্পরকে ছেয়ে ফেলেছে। দুজনের মুখেই ছায়া ফেলেছে ভয়।

রামু দেখে একটা কিম্ভুত কিমাকার দুপুর গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে, চুঁইয়ে যাচ্ছে আশেপাশের গলিরাস্তাগুলোয়, চারপাশে ছড়াতে ছড়াতে ঢেকে দিচ্ছে চরাচর যেন বা এর থেকে নিস্তার নেই। গা ছমছমে ভাব আরও ঘনীভূত হয়। আলিও দেখে একই দৃশ্য। কেউ কোত্থাও নেই। দুজন মানুষ থমকে আছে কেবল।

চারপাশ আগুনের হলকার ভেতর দিয়ে দেখার মতো কাঁপছে, যেরকম দেখা যায় মরুভূমিতে, কিন্তু আগুন নেই। দুজনে দেখছে গরম সাদাটে ধোঁয়ার চাদরে ভরে যাচ্ছে সবকিছু, বাড়ছে শারীরিক অস্বস্তি। দুজনে দেখছে, ধোঁয়ার ভেতর থেকে ভেসে উঠছে এক কাহিল বাছুর, আবছা মতো চোখে পড়ছে এক রক্তের নদী।

গরম ধোঁয়া দুজনকে ঘিরে ফেলছে ক্রমশ। দুজনের চোখ বিস্ফারিত, দুজনে বাকরুদ্ধ। কোনরকমে ভয়ে তোতলাতে তোতলাতে আলি উচ্চারণ করে, 
‘রোজ কিয়ামত!’