তাজা থাকার কায়দাকানুন
কে লোকটা?
আমার বর।
মানে! কত নম্বর?
এটা নম্বর ছাড়া।
মানে!
সুরিতা নিজের নাম বললে তখন সবাই ভুলে সুচরিতা শুনত। সুরিতা খুব বিরক্ত হতো। পরে বলেছিল, লোকজন কি দিনে দিনে ঠসা হয়ে যাচ্ছে!
শহরে এত শব্দ! রাস্তায় নামলে তো আর গাড়ির ভেঁপুপেঁপুতে কান ঝালাপালা।
সুরিতার কোর্তাটা বেশ খাটো বহরের। ওড়নাপরা ওকে কোনোকালেই দেখিনি। বয়স তো আমারই সমান। মানে পঞ্চাশ পার। এখনও বেশ শক্তপোক্তই আছে মনে হয়। আগের ছিপছিপে লম্বা গড়নে একটু মাস লেগেছে। বিশেষকরে বুকের জায়গাটা আগের চেয়ে বেশি ভারী দেখাচ্ছে। পিঠছাপানো কালো চুল, খোঁপা করলে ওটা আকারে-প্রকারে ওর মুখের সমানই মনে হতো। ছোট্ট, লম্বাটে, পাতলা মুখ। খাড়া নাক। পাতলা ঠোঁট। এর ভেতরে সবচেয়ে সবার আগে যেটা খেয়াল হবে, সেটাই পরে বলছি—সুরিতার ভাসাভাসা বড় বড় চোখ। সারাক্ষণ চোখ দুটো যেন জলে মেখে আছে, টলটল করছে।
ভালোই তো আছিস!
শুনেই বলে, আচ্ছা মতো খাই, আচ্ছা মতো ঘুমাই, আচ্ছা মতো কাজ করি।
সারাদিন তো আর খাস না?
খিদে পেলেই খাই। একটু পেলে একটু; বেশি পেলে বেশি!... আরেকটা কথা মুখে এলেও গিলে ফেললাম। তুই তো আবার অশ্লীল কথা একদম সহ্য করতে পারিস না। অবশ্য একালের মেয়েরা ধুমসে গালি দেয়, স্ল্যাং বলে।
মানে!
ওই খাই, ঘুমাইয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলা যেতে পারে।
কী সেটা?
লাগাই!
বলেই এত জোরে হাসল, একদম আগের মতো কাঁচভাঙা খিলখিলে হাসিতে একপাশে গড়িয়ে পড়ল। ভাগ্যিস গাড়িটা সিগন্যালে ছিল। নইলে স্টিয়ারিং এদিক-ওদিক হলে অন্য কিছুতে লেগে যেত।
হাসতে হাসতে বলল, ওমা, ওমাই গড! ইয়ু আর ব্ল্যাশিং... একদম কিশোরী বালিকা লাগছে গো!
রাখ তোর ব্ল্যাশিং! কিশোরী বালিকা! বয়স পঞ্চাশ পার! বালিকা!
মালিবাগের বাসের জন্য দাঁড়িয়ে ছিলাম। পাশে একটা গাড়ি এসে থামে। থামতেই গাড়ি থেকে একটা গাট্টাগোট্টা লোক ‘বাই’ বলে নামে, আর হাত তুলে টা টা দেওয়ার ভঙ্গি করে চলে গেল। আর গাড়ির কাঁচ নামিয়ে যে মুখটা বের হয়, সেটি তখন সেই সময়ে একটু অবাক করা ছিল।
আমি তো জানতাম সুরিতা বিয়ে করে বরের সঙ্গে কানাডা চলে গেছে সেই কবে। সেখানে গিয়ে ছাড়াছাড়ি হয় বছর তিনের ভেতরে। পরে আরেকজনের সঙ্গে বিয়ে করে আমেরিকায়। বিদেশে থাকতে বলে একদম ভালো লাগছিল না। সারাক্ষণই মনে হয়, সে এখানকার কেউ না। কেন যে মনে হতো!
কোনো দেশকে নিজের দেশ মনে করার জন্য নাকি সেই দেশের উপন্যাস পড়া ছাড়া উপায় নেই।—এটা তাকে তার দ্বিতীয় বর বলেছিল। আমার আমেরিকার একমাত্র হেনরি মিলারকে আর কিছুটা বল্ডুইনকে ভালো লাগে। মিলার লোকটা নিজে ছিল কট্টর আমেরিকা বিরোধী।
সুরিতা গণিতের ছাত্রী। বরাবরই জিনস আর ফতুয়া পরে। সাজার ভেতরে চোখে কাজল দিত। এছাড়া ঠোঁটপালিশ, নখপালিশ কোনো দিন দিতে দেখিনি। সেই সময় আমাদের সবাই মনে করত দুই বোন। নামেও মিল ছিল; অন্তত শুনলে লোকে মনে করত—সুরিতা পারভীন আর হৃদিতা পারভীন—আমরা দুইবোন। আমরা একই হলে পাশপাশি রুমে থাকতাম। ওর রুমমেটদের চেয়ে আমার সঙ্গে আলাপ ছিল বেশি।
সুরিতা দেখতে যতটা ভালো, দেখায় তারচেয়ে ভালো।—ইংরেজিতে পড়া মিতিয়া কথাটা পেয়েছিল রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বোন’ থেকে না কি ‘মালঞ্চ’ থেকে মনে নেই। সেটা সে সুরিতাকে দেখে আমাকে বলেছিল।
গাড়িতে যেতে যেতেই কথাটা মনে হলো। গুগল করলাম। সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া গেল। ‘দুইবোনে’ই আছে। ‘ঊর্মিমালা দেখতে যতটা ভালো তার চেয়েও তাকে দেখায় ভালো’—এই তো পাওয়া গেছে। পৃষ্ঠার বাঁপশের কোণে ৩৪ লেখা, আর পাশে তো অভ্রতেও দেওয়া আছে।
জীবনে গুগল আর ইউটিউব থাকলে এখন আর কিছু লাগে না।—কথাটা সুরিতার কাছে প্রথম শোনা। বলেছিল, বছর ছয়েক আগে। দুহাজার সাতে যখন সে কানাডা গেল, কেবল ফেসবুক চালু হয়েছে, তখন একসময়, এবার আরো ফ্ল্যাট হয়ে গেল পৃথিবী। রহস্য হাস্য সবকিছুর অবসান ঘটে যাবে।
সুরিতা ছিল একদম শুরুর দিকে ফেসবুকে। আমিই রিকোয়েস্ট পাঠাতে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একসেপ্ট করেছিল। আর তক্ষুণি আলাপ। আরো পরে যখন ফেসুবকের মেসেঞ্জারে ফোন করা শুরু হলো, কদিন খুব ঘন ঘন ফোন করত। শেষ ফোনটা করেছিল, স্মামারররআআ বলে মঞ্চশুদ্ধা ভেঙে পড়া ভিডিওটা দিয়ে। হাসতে হাসতে বলে, এই দৃশ্যটা নাকি আমৃত্যু ওর মনখারাপের ওষুধ হিসেবে কাজে দেবে।
দেশের পরিস্থিতি নিয়ে খুব বিরক্ত ছিল। পরে জানি, তৃতীয় বার বিয়েটাও তার ছুটে গিয়েছিল। মাঝখানে একদমই যোগাযোগ ছিল না। এর ভেতরে আমার মেয়ের বিয়ে, ছেলের বিদেশে যাওয়া নিয়ে খুব চাপ গেছে। সুরিতাই আসলে যোগাযোগ করত। আসলে আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারতাম না, কোন সময় ওকে ফোন করা ঠিক হবে। গ্রিনিচ সময়টময় আমার একদম মনে থাকে না।
সুরিতা ঠিক কোনো দলের রাজনীতি না করলেও নিজেকে নারীবাদী বলত। বলত, আমি কিন্তু ফেমিনিস্ট। এজন্য সবকিছু আমার বিরুদ্ধে; আমিও সবকিছুর বিরুদ্ধে।
আমি বলতাম, তোর এই নারীবাদ কি পড়াশোনা করে, না কি পড়াশোনা ছাড়া?
কী একটা উত্তর দিয়েছিল সুরিতা। এখনও মনে করলে কানগরম হয়। সঙ্গে ফাকটাক কী সব বলেছিল। ওসময় এসব শব্দ আমার কানে নতুন।
বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে অবশ্য সুরিতার একটাই প্রেমিক ছিল—রিকো।
রিকোকে কেন বিয়ে করল না? জানতে চাইলে বলেছিল, রিকোকে সত্যিই ভালোবাসতাম। বিয়ে করে ভালোবাসাটা নষ্ট করতে চাইনি। জগতে একটা-দুটো মানুষের প্রতি চিরদিন নিঃশর্ত ভালোবাসা থাকা দরকার। ওটা না থাকলে সত্যিই আর বেঁচে থাকার কোনো অবলম্বন থাকে না।... আমরা তো সব ফাঁসির আসামি হয়েই আছি। মাথায় যমটুপি পরা। চোখে কিছু দেখি না। একটা লোককেও জীবনে ঠিকমতো চেনা হয়ে ওঠে না। অন্যদের চিনবো কী, নিজেকেই তো চিনি না!... সারাজীবন আমরা অদৃশ্য যমটুপি পরা আর গলায় দাড়ি। আর পায়ের নিচে পাটাতন। সেটা সরিয়ে দিলেই ঘাড়ভেঙে ঝুলে পড়া। ওই পাটাতনটাই প্রেম, অন্তত আমার জন্য। অন্যদের হয়ত সংসার, কারো চাকরি, কারো ব্যবসা।... রিকো সব সময় বলত, ও বাবা! চাকরি আমাকে দিয়ে হবে না। চাকরির কথা শুনলেই জ্বর আসে। অথচ দেখ, রিকো কেবল চাকরিই না; রীতিমতো বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরি! অতঃপর তর তর করে একদম টপে। সামনেই বলে সচিব হবে।
অবশ্য ওতো বরাবরই টপার ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে চাইলে জয়েন করতে পারত।
করল না। ব্যবসা করবে। হাতে থাকবে অফুরন্ত টাকা। ওর বাপ কিন্তু ছিল আমলা। যেসে আমলা নয়। একদম ডাকসাইটে আমলা। পাকিস্তান আমলের সিএসপি। সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিসের লোক। সবকিছুতেই সুপিরিয়র। রিকোর দাদাও ছিল বৃটিশ আমলের ডাক্তার। নানাও আমলা। মাও ছিল সেই রকম জাঁদরেল মহিলা।
আমি বলেছিলাম, তোর ওই নারীবাদী মেজাজে... রিকোর পরিবার কখনো মেনে নিতো না, তুইও তাল মেলাতে পারতি না। আসলে বলতো সুরিতা, তুই কি ভয়ই পেয়েছিলি!
আরে না; ভয়ডর তো আমাকে দেখে ভয় পায়!
তা মন্দ বলিসনি!
ওই যে হিন্দিতে কী কথা আছে না! ডর কি আগে জিৎ হ্যায়!
ওবাবা! তুই আজকাল হিন্দি কোট করছিস!
কেন?
আগে তো ভারতের নাম শুনলে তোর পিত্তি জ্বলে উঠত!
ভারতের নাম শুনলে না; ওদের দাদাগিরি দেখলে, ভারতের লোক তো ভালো। সমস্যা ওদের সরকারগুলার! অবশ্য তুই তো আবার ভারতপ্রেমী। দাদার বাড়ি ইন্ডিয়া। হুগলি না চব্বিশ পরগনা; কোথাকার যেন তোরা?
মুর্শিদাবাদ।
আহারে বাংলা বিহার উড়িষ্যার শেষ নবাবের খানদান! আচ্ছা তোরা সিরাজের বংশধর নোস তো? নাকি মীরজাফরের?
শুনে আমি হাসতে থাকি।
অবশ্য আমরা বাঙালিরা মোটামুটি সবাই মীরজাফরের বংশধর।... নইলে জুলাই-আগস্টে এমন ঘটনার পর এমন দশা হয়! বেইমানি আমাদের রক্তে সাঁটানো। আচ্ছা ওদিকে, এজিদের তরিকাই নাকি আমাদের তরিকা?
অত জানি না!
জানিস না কেন! তোর বাপ না ইসলামের ইতিহাসের প্রফেসর!
আমি তো নই!
সুরিতা নিজের কথা বলতই না। সারাক্ষণ কেমন একটা উদাস উদাস ভাব নিয়ে থাকত। আর মনপ্রাণ ঢেলে দিয়ে উপন্যাস পড়ত। তখন অসীম রায় নাকি ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় লেখক।
‘আবহমানকাল’ বলে দশবার পড়েছিল।
পর পর দশবার!
পর পর না, এখন অব্দি দশবার।
সেই সুরিতা। মাঝে মাঝে বলত, আমার আসলে ম্যাথ নয়, লিটারেচার পড়াই ভালো ছিল।
মন্দ বলিসনি।
আমরা দেখতাম সুরিতার সব আলাপ সাহিত্যের দিকে ঘুরে যায়।
নিজের খরচ নিজে চালাত। গণিত এত ভালো পারত। পুরো ক্যাম্পাসে স্যার-ম্যাডামদের ছেলেমেয়েদের জন্য নীরব একটা কাড়াকাড়ি ছিল সুরিতাকে নিয়ে।
রিকো বলত, মন দিয়ে নিজের সাবজেক্টটা পড়লে সুরিতাই ওদের ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হতো। অবশ্য প্রায় তেমন কোনো পড়ালেখা না করেও ফার্স্ট ক্লাসটা কিন্তু সুরিতার ফসকে যায়নি।
সাইদুল, রিকোর ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আমার স্বামী; সাইদুল বলত, সুরিতা একদম জাতে মাতাল তালে ঠিক। এদিকে ফার্স্ট ক্লাস। ওদিকে আইএলটিএসে স্কোর নাকি সাতের ওপরে।
এসব বলছিলাম।
সুরিতা বলে, তবুও শালা দেখ, জীবনে আমার কিছুই হলো না!
আর কী হওয়ার কথা বলছিস? ভালো রেজাল্ট নিয়ে পড়ালেখা শেষ করলি। এত দেশবিদেশ ঘুরলি। এত মৌজমাস্তি করলি! আর কী চাই তোর?
এইযে তোরা এত বলতিস, আমি নাকি জাতে মাতাল তালে ঠিক! তালে আর ঠিক থাকলাম না কোথায়! ওর কণ্ঠ একটু বিষণ্ণ শোনায়।
সাধারণ আফসোস জাতীয় কোনো কিছু সুরিতাকে মানায় না। যা হলো না, পেল না, একদম ঝেড়ে ফেল ছুঁড়ে ফেলে দিতে এক মুহূর্ত ওর বাঁধে না।
ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে একটা রিসোর্ট বানিয়েছে। সেখানেই যাচ্ছে এখন। গাড়ি থেকে নেমে যাওয়া লোকটা হাইক্লাস পারফরমার। ঢাকার ফ্ল্যাটে থাকলেই ওকে ডেকে নিয়ে আসে। দাম ঠোকে অনেক, কিন্তু একেবারে মনপ্রাণ ভরিয়ে দিয়ে যায়।... তোদের এখনও সব চলে টলে? সাইদুলের সঙ্গে সারাজীবন সাঁটিয়ে গেলি! বেশ অনুপ্রাসে খেলে গেলি! সাইদুল ভালো আছে? তোরা পারলি বাব্বা! এই লিকুইড লাইফ, লিকুইড টাইম, লিকুইড রিলেশানশিপ আর লিকুইড লাভের জগতে পারলি বটে তোরা।
আমরা কেন শুধু? অনেকেই পারছে। বেশির ভাগই পারছে।
পারছে না কচু! না-পারার ফাকিং সহ্য করছে!
আমি একটু চুপ করে থাকি। আসলে কী বলব, বুঝতে পারি না।
সুরিতাও কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। কিছুক্ষণ পর সুরিতাই ফের শুরু করে। বলে, আসলে আমরা ‘কী চাই’ বেশিরভাগ লোকই ঠিক জানি না। ফলে অনেক গুণ-গরিমা নিয়েও বহু লোকের কিছু হয় না। অথচ দেখ, কত সিম্পল মেধা বুদ্ধি এমন কি সামান্য প্রতিভা নিয়ে, যারা এই ‘কী চাই’ আর ‘কী চাই না’টা জানে—তাদেরই সব হয়। আর, ‘কী রাখব’, আর ‘কী ফেলে দেব বা ফেলে দিতে হয়’—এই জ্ঞানের চেয়ে বড় জানা আর কিছু নেইরে হৃদিতা।... আমি মনে করতাম: আমার ইগোটাই সমস্যা; কিন্তু এমন হাজারো ঘটনা দেখাতে পারব—ইগো থাকলে, কোনোটাই আমার ঘটত না।... নিজের ঠিক কোন জিনিসটার কদর করতে হয়—এটা যারা এভারেজের চেয়ে একটু ওপরে, তাদের জানা ছাড়া উপায় নেই। অবশ্য এখন জগতের সর্বত্রই মিডিওকারের যুগ।
দুরো না! সব কালেই লোয়ার, মিডিওকার, গ্রেইটরা আছে।
তা ঠিক; যেমন আবুল হাসান যত বড় কবি; তিনি কি আর সুকান্তর চাইতে বিখ্যাত হতে পেরেছেন! সময়টাও একটা ফ্যাক্টর, তাই না!
তুই কি এখনও সাহিত্য পড়িস?
আগের মতো না। তবে একদম ছেড়ে দিইনি। জানিস তো আমি এ ব্যাপারে সর্বভূক। ক্ল্যাসিক টু ইরোটিকা সব পড়ি।
ইরোটিকা কথাটা সুরিতার কাছেই শুনেছিলাম সেই দুহাজার সাতের দিকে। কোথায় পাস এসব?
নীলক্ষেতে আগে বেশ পাওয়া যেতো। এখন কী দশা জানি না। এনোনিমস নাম দিয়ে পেপারব্যাক। আমি তো বাংলাদেশ থেকেই কিনে নিয়ে যেতাম। মানে পেয়ে গেলে আর কী। ওখান থেকে রাজ্যের কুন্দেরা, নাইপল, সালমান রুশদি, সারামাগো, কুয়েৎজিও কিনেছি। আবার হেনরি মিলার, লরেন্স ডারেল, জেমস বল্ডুইন আর ফাঁকতালে ওইসব ইরোটিকা। ইরোটিকাকে পর্নোগ্রাফি বলি না, এতে ইরোটিকার অপমান হয়। জাপানে তো দারুণ সব লেখক আছে এই জঁরের।
আমি বাবা এসব পড়িনি। জানিও না।... কেন পড়িস এসব?
তাজা থাকার জন্য। ওই সত্যজিৎ রায়ের ভূতের রাজার বরের কথা মনে আছে? গুপী গাইন বাঘা বাইনে? জ্ঞান অর্জন তো করিনি; তাই ও বস্তু বাড়ার সম্ভাবনা নেই; মান পাওয়ার মতো কোনো কীর্তি করিনি; ফলে বেড়ে ওঠার নো চান্স; তাই একমাত্র হলো মনটাকে তো তাজা রাখতে পারা।—সেটাই করি: মন যদি তাজা থাকে/ ক্ষতি নাই, ক্ষতি নাই, ক্ষতি নাই। মন তাজা রাখার জন্য আমার মতে উপায় হলো: হয় গোয়েন্দা উপন্যাস পড়ার নেশা করো; নয়তো ইরোটিকার—দুটো একসঙ্গে করতে পারলে সবচেয়ে ভালো।—নিদেনপক্ষে এই দুয়ের একটা তাজা থাকার জন্য বেছে নিতেই হবে। বহু পরে এসে টের পেয়েছি—বেছে নেওয়ার মানেই বেঁচে যাওয়া, বেশ এক প্রস্থ বেঁচে নেওয়া। হা হা হা! কেবল নিজের জন্য লাগসই একটা জীবন বেছে নিতে পারলাম না, এই যা!
আবারও সুরিতার গলাটা বিষাদভরা শোনাল।
মানানসই, লাগসই, জুতসই, টেকসই একটা জীবন—না হলো আপন, না হলো যাপন... অস্ফুটে বলল আবার।
আমি চুপ করে থাকি। কেবল উইন্ডশিল্ডে চোখ রাখি। সামনের রাস্তা, আরো সামনে বেড়ে যেতে থাকে। গাড়ির সামনের সিটে বসলে, আশেপাশে আর কোনো দিকে বেশিক্ষণ চোখ রাখা, জানেনই তো কী মুশকিল!



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন