রিয়া বোন আমার
‘রিয়া, বোন আমার, তুই আমাকে ডায়েরি কিনে দিয়েছিস আত্মজীবনী লেখার জন্যে।
আমি অতি সংক্ষেপে সেই আত্মজীবনী লেখার চেষ্টা করছি।
তবে, তুই আমার কথা রাখবি। কথার বরখেলাপ করবি না। তোর ওপর আমার আস্থা আছে। আর আস্থা আছে বলেই একদম সত্যি কথা বলতে যাচ্ছি, যা আমার জীবনে ঘটেছে। সত্যি কথা সাধারণত আত্মজীবনীতে কেউ লেখে না। গোপন রাখে। আমি বেশ কিছু আত্মজীবনী পড়েছি ঢাউস আকারের। কবি-সাহিত্যিক, লেখক, রাজনীতিবিদ এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এসব লিখেছেন। তাঁরা একান্ত ব্যক্তিগত জীবন এড়িয়ে গেছেন। নিজের বদনাম হয়, নিজের মানহানি হয়, এমন কথা তাঁরা ঘুণাক্ষরেও উল্লেখ করেননি। আসলে নিজের স্বজনদের কাছে লজ্জায় কুঁকড়ে যাবেন, তাই তাঁরা ইচ্ছেকৃতভাবে এসব কথা টপকে গেছেন।
আমি জানি, তুই আমার কথা রাখবি। আমার মৃত্যুর পর, আমার এই ডায়েরি, আমার এই না বলা কথা ইচ্ছে করলে কাউকে দেখাবি, অথবা দেখাবি না। এটি একান্ত তোর ওপর রইলরে, রিয়া।’
***
আমার যখন বয়স বছর দুই, তখন আমার বাবার সঙ্গে আমার মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। আমরা নানিবাড়িতে চলে আসি।
বাবার স্মৃতি আমার স্মরণে নেই। আর থাকার কথাও না। তিনি সরকারি চাকরি করতেন।
বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়ির একবছর পর বাবা আমার দেহ ত্যাগ করেন। পরে বড় হয়ে শুনেছি, বাবা আমাকে খুব আদর করতেন। আমাকে ছাড়া তাঁর একমুহূর্তও চলত না। তাই আমাকে ছেড়ে তিনি একদম ভেঙ্গে পড়েছিলেন।
রাগের মাথায় মাকে মুখে একতালাক, দুইতালাক, তিনতালাক দিয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন সমাজ এটাকে তালাক হিসেবে ধরে নিয়ে তাঁদেরকে আর এক হতে দেয়নি। মায়েরও একগুয়েমি ছিল। ফিরে আসার চেষ্টাচরিত্র একদমই করেননি। অবশ্য সেই সময়কালে হিল্লেবিয়ে ছাড়া ফিরে আসা সম্ভবও ছিল না।
এখন এখানে আমি আমার নানাজির কথা একটু বলে নিই।
আমার নানাজি ছিলেন আলোকিত মানুষ। সেই বিশের দশকে ইংরেজ আমলে ক্লাস নাইন পর্যন্ত অধ্যয়ন করেছেন তিনি সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। ইংরেজ আমলে ক্লাস নাইন পর্যন্ত অধ্যয়ন করেছেন বলে যে আলোকিত মানুষ ছিলেন তিনি, তা কিন্তু না। শুনেছি তিনি সর্বগুণে গুণান্বিত একজন মানুষ ছিলেন। নিজ সম্প্রদায়ের উন্নতির জন্যে নিজের জায়গা-জমি বিক্রি করে নিজ গ্রামে একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। যেটি এখন দ্যুতি ছড়াচ্ছে। নিজেকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যে তাও নিজ নামে স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত করেননি তিনি। করেছেন নিজ গ্রামের নামে। তাঁর বাড়িতে একটি পাঠাগারও তিনি স্থাপন করেছিলেন। এবং নিজ ভূমিতে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় খোলার অনুমতিও দিয়েছিলেন তিনি।
ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন তিনি। কাজিরবাজারে তাঁর দুটি আড়ত ছিল। তবে তাঁর ধনকে তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন।
এহেন মানুষের মেয়ে যখন স্বামীগৃহ থেকে ফিরে আসে তিনি তখন বসে থাকবেন? না, তিনি বসে থাকেননি। বছর দুয়েকের মাথায় মেয়েকে আবার সরকারি চাকরিজীবী পাত্রের সঙ্গে পাত্রস্থ করেছিলেন। সেই ঘরে আমি একনাগাড়ে মায়ের সঙ্গে বছর পাঁচেক বসবাস করেছি। তারপর আমার ভাইবোন হলে আমি আর থাকিনি। নিজ ইচ্ছায় নানির বাড়িতে ফিরে এসেছিলাম।
আর যখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি সেই সময় নানাজি শহরে বাড়ি বানিয়ে চিরতরে গ্রামের পাঠ চুকিয়ে শহরে চলে এসেছিলেন। তারপর নানাজি এবং নানিজি বছর দুয়েক বেঁচে ছিলেন। মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া কলেরায় তাঁরা ইহজীবন ত্যাগ করেছিলেন। সেই সময়ে কলেরা মহামারি ছিল। গ্রামকে গ্রাম মানুষ দুই-দশ দিনের ভেতর শেষ হয়ে যেত। ওষুধও সেরকম ছিল না। লোকে তুকতাক, তাবিজ-কবজ, পানি পড়ার ওপর নির্ভর করত। পির-ফকির, হুজুরদের কাছে যেত। তখন এদের জয়-জয়কার ছিল। যাইহোক, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। সে প্রসঙ্গে আমি যাচ্ছি না।
আমার মামারা ছিলেন তিন ভাই। নানাজি-নানিজি মারা যাওয়ার বছর খানেক পর তাঁরা পরস্পর আলাদা হয়ে যান। এবং সহায়-সম্পদ নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ, মামলা-মোকাদ্দমায় জড়িয়ে বড়মামা ছাড়া বাকি দুই মামা আর্থিকভাবে কাহিল হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে মেজোমামা সংগ্রাম করে আর্থিক অবস্থা ফেরালেও ছোটোমামা আর তেমন স্বচ্ছল হতে পারেননি।
আমি ছোটোমামার পরিবারের সঙ্গে থাকতাম। ছোটোমামা যেরকম আদর করতেন, ছোটোমামিও ঠিক তেমনি সেরকম আদর করতেন। এখানেই আমি বড় হয়ে উঠি। পড়াশোনা করি। আমার পড়ালেখা ক্লাস নাইন অবধি। তারপর আমার পড়ালেখা শেষ হয়ে যায়। সে আমলে কজনই আর পড়ত বিশেষ করে বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকের মধ্যে! আর বাঙালি মুসলমান মেয়েদের তো খুঁজেই পাওয়া যেত না। ওই শিক্ষিত পরিবারের মেয়েরাই কেবল পড়ত। বাবা আমার বেঁচে থাকলে, মায়ের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি না হলে হয়ত আমিও পড়তাম। অন্যরকম জীবন হতো আমার।
যাইহোক, আমার ছোটোমামার তিন ছেলে আর তিন মেয়ে ছিল। মেজোছেলে আমার থেকে বছর চারেক বড় ছিল। ওই আমাকে বিভিন্নভাবে ডিসটার্ব করত। আমারও তখন বয়স কম, মনটা উড়ু উড়ু ছিল। কাজেই ভালোই লাগত এসব কিছু। মাঝেমধ্যে ওর কথার জবাবও দিতাম। এভাবেই চলছিল। ও তখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে বসে আছে। একদিন ওরা সকলেই ওদের নানির বাড়িতে গেল এই বিকেলে ফিরে আসবে বলে। আমি ওদের সঙ্গে গেলাম না। রয়ে গেলাম। বাড়ির কাজ করতে থাকলাম। সে গেল কী গেল না তা জানি না, তবে সে দুপুরে ফিরে এলো। ফিরে এসে মিনিট পনেরো বাদে আমাকে একগ্লাস পানি দিতে বলল। আমি পানি নিয়ে গেলাম। আর তখনই সে আমাকে জোরে ভোগ করল।
আমি একটা কমবয়েসি মেয়ে। আমার তো বাড়ি না। মামার বাড়িতে থাকি। আর সে আমার মামাতো ভাই। কাজেই, কীভাবে বাঁধা দিই! চিৎকার দিই! তখন তো পরিবেশ এখনকার মতো ছিল না। এখন তো যেকোনো মেয়ে কথা বলতে পারে। বাঁধা দিতে পারে। তখনকার পরিবেশ সব মেয়েদের প্রতিকুল ছিল। কাজেই চুপ হয়ে থাকলাম। ঘণ্টা খানেক বাদে সে আবার আমাকে ভোগ করল।
এভাবে সময় ও সুযোগ পেলেই সে আমাকে ভোগ করত। আর এভাবে ভোগ করলে যা হওয়ার তাই হলো। গর্ভবতী হয়ে পড়লাম। প্রথম বমি করার দিন ছোটোমামি সন্দেহ করলেন। তারপর আমাকে জেরা করে সবকিছু বার করলেন। এবং, শেষমেশ অতি গোপনে ধাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে জরি-বুটি খাইয়ে আমার গর্ভপাত করালেন। আর সব দোষ দিলেন আমাকে। বললেন,‘আমার পুয়ার (ছেলের) সর্বনাশ করতে লাগছোস, নটি-হারামজাদি। তোরে অত বালা পাইতাম, আর তুই আমার সর্বনাশ কররে!’
তখন আমার চোখ দিয়ে দরদর করে অশ্রু ঝরছে। আমি কী করি? ভাবলাম মায়ের কাছে চলে যাই। এবং ভাবছি দিন সাতেকের ভেতর মায়ের কাছে চলে যাব। মা যদি ফেলে দেন তাহলে ফেলে দেবেন। তারপরও মায়ের কাছে আশ্রয় নেব। কিন্তু ভাগ্য আমার এত খারাপ যে পরদিনই খবর এলো মা আমার হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। আমার একুল-অকুল কোনো কুলই রইল না। হতভাগী হয়ে গেলাম।
তারপর আপদ হিসেবে ধরে নিয়ে আমাকে বিয়ে দেয়ার জন্যে ছোটোমামা-ছোটোমামি উঠেপড়ে লাগলেন। কত মানুষ-কত পরিবার আমাকে দেখে গেল! আমি কিছুটা সুন্দর হওয়ায় সকলেই আমাকে পছন্দ করল, কিন্তু সঙ্গে যৌতুকও চাইল। ছোটোমামা-ছোটোমামি যৌতুক দেবেন না বলে পণ করলেন। আর আমি তো তাঁদের মেয়ে নই যে ধানী জমি বিক্রি করে ভালো পাত্রে পাত্রস্থ করবেন। কাজেই, ভালো পাত্রে পাত্রস্থ আর হলো না। শেষমেশ, অনেক চেষ্টাচরিত্র করে ব্যবসায়ী এক দোজবরে পাত্রের কাছে আমাকে সঁপে দিলেন।
তখন আমার বয়স ১৬, আর ওই দোজবরের বয়স ৩২। বছর চারেক ভালোই চলছিল আদরে-সোহাগে। দোজবরে আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝত না। রেখেছিল সে কিন্তু আমাকে তার ভাড়া করা এক বাসায় বলা যায় রাজরাণী করে। সপ্তাহের বেশিরভাগ দিনই আমার সঙ্গে থাকত, আর আদর সোহাগে ভরে দিত।
আস্তে আস্তে তার কাছ থেকে জানলাম, তার তিন মেয়ে। ছেলে নেই। আর বংশের প্রদীপ জ্বালানোর জন্যেই সে আমাকে বিয়ে করেছে। বংশের প্রদীপ মানে ছেলে হলেই সে আমাকে তার বাড়ি নিয়ে যাবে। প্রয়োজন হলে সতীন সুরতুন্নেসাকে তালাক দেবে। একদিন আহলাদ করে বলল, ‘বউগো, তুমারে আমি রাজরাণী করিয়া রাখছি। সারাজীবন রাজরাণী থাকবায় আমারে একটা পুয়া দেও।’ এভাবে বছর চারেক আমার ভালোয় ভালোয় কাটল। কিন্তু কোনো সন্তান-সন্ততি হলো না।
আমার সতীন তখন পর্যন্ত আমাকে দেখেনি। আর আমি কোথায় বসবাস করি তা সে তখন পর্যন্ত জানত না, অর্থাৎ দুই সতীন দুই জায়গায় বসবাস করতাম। সে থাকত বাড়িতে। একদিন কীভাবে সে খোঁজ পেয়ে আমার সকাশে এলো। বলল, ‘তুমার মা-বাফে কিলা (কীভাবে ) হতীনআলা গরো (ঘরে) বিয়া দিলা! আমার সর্বনাশ করলা।’
বললাম, ‘আমার মা-বাফ নাই গো, বুয়াই। মা-বাফ থাকলে ইলা (এরকম) অইলো না অইলে। মামা-মামির দুয়ারো মানুষ।’
কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ‘তুই দেকি হতভাগী। আইচ্ছা, তুই আমার ছোটোবইন। ছোটোবইনোর লাখাইন থাকিস।’ বলে বেশ কিছুক্ষণ থেকে গল্প-টল্প করে তারপর চলে গেল।
মাজেজা টের পেলাম দিন চারেক বাদে। দোজবর যখন মুখ খুলল।
বলল, ‘এই হারামজাদি, তুই আমারে বিষ খাওয়াইয়া মারি লেইতে! তুই নু বিধবা অইবে।’ বলে অকস্মাৎ সে আমার দুই গালে কষে দুই বার চড় মেরে বেরিয়ে গেল। আমি তখন কী করব, কাঁদতে লাগলাম। আমার জীবনে কেউ আমাকে মারেনি। মার খাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার নেই।
মন আমার ভেঙ্গে গেল। তারপর, সে সপ্তাহ খানেক এলো না। যেদিন এলো দেখি একদম ভালো মানুষ। সবকিছু ভুলে গেছে। আমিও সবকিছু ভুলে গেলাম। ভাবলাম পুরুষ মানুষ রাগ সামলাতে পারেনি। মানুষ মাত্রই তো ভুল হয়।
মাস দুয়েক আবার আনন্দ-আহলাদে কাটল।
আমি মাসে একবার ছোটোমামার বাড়িতে যাই। বড়মামা, মেজোমামার বাড়িতেও দুইমাস-তিনমাস অন্তর যেতাম। নিজ থেকেই যোগাযোগ রাখতাম। একদিন হলো কী, ছোটোমামার বাড়িতেই বমি করে দিলাম। এবার কিন্তু আনন্দ বয়ে গেল সবখানে।
কিন্তু তার দেখি আনন্দ নেই। কিছুই বলে না সে! আনন্দে হা, হা করেও ওঠে না সে। একদিন বিষয়টি নিয়ে কথা বললাম। সে জ্বলে উঠল। এবার আমিও ছাড় দিলাম না। ভয়ঙ্করভাবে সে বকল, রাগারাগি করল। তারপর আমার তলপেটে লাথি মারল। আমি জ্ঞান হারালাম। যখন জ্ঞান ফিরে পেলাম তখন আমি হাসপাতালে। আমার অ্যাবোরশন হয়ে গেছে।
ছোটোমামা-ছোটোমামিকে সবকিছু অবহিত করলাম। তাঁরা আর আমাকে দিলেন না। বাড়িতে নিয়ে এলেন। সেও খোঁজখবর আর করল না।
একসময় বিচ্ছেদ হয়ে গেল।
এখানে একটি কথা উল্লেখ করিনি, তা হচ্ছে আমার ছোটোমামার বড়ছেলে দিন পনেরো বাদে বাদে আমার ওখানে যেত। আমার খোঁজখবর নিত। ভাই তো বোনের বাড়িতে যেতেই পারে। আর এখানে শয়তানটার সন্দেহ হয়েছে। দেখিস, এখনও ভাইটা আমার কাছে আসে। ছেলে পাঠিয়ে আমাকে তাঁর বাড়ি নিয়ে যায়।
যাইহোক, এবার আমার সকল মামা আমার ভালোর ব্যাপারে একমত হলেন। আমি ছোটোমামার ওখানে থাকলেও তাঁরা আমার খোঁজখবর নিতেন। ঈদে কাপড়-চোপড় দিতেন। ভালো-মন্দ খাওয়াতেন। এবং কদিন পর পর ডেকে নিতেন।
এভাবে বছর তিনেক কাটালাম।
ও আরেকটি কথা তোকে বলিনি। আমার ওই ভাই ওই ঘটনার পর বছর চারেক বেঁচে ছিল। তারপর সে জানি না কী কারণে আত্মহত্যা করে।
তারপর তো তোর দাদাভাইয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে গেল।
তোর দাদাভাই একজন ভালো মানুষ ছিলেন। তবে ভাবিস না, এটি তাঁর প্রথম বিয়ে। আমার মতো তাঁরও এটি দ্বিতীয় বিয়ে। তাঁর প্রথম বউ বাচ্চা প্রসব করতে গিয়ে বাচ্চাও মারা যায়, সেও মারা যায়।



ঘটনা সামান্য কিন্তু বর্ণনা বিশাল, প্রায় পত্রিকার রিপোর্ট-এর মতো। ফলে প্রথম অংশ পড়তে কষ্ট হয়েছে।
হায়দার হোসেন
মে ০২, ২০২৪ ০৪:২৬