দায়ী কে?
গাছের মগডালে বসে কোকিলটা কুহু কুহু স্বরে অবিরাম ডেকে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে নাম না জানা পাখিরও বিচিত্র ডাক শোনা যাচ্ছে। দোয়েলটা স্বর বদলিয়ে দুরকমভাবে ডাকছে। মনে হচ্ছে, যেন করুণ সুরে কিছু একটা বলতে চাচ্ছে। ফাতিমার সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। সে সুপারি গাছে হেলান দিয়ে দূর থেকে জরিনা-আম্বিয়াদের নির্ণিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে।
জরিনা-আম্বিয়া-সুফিয়া-সরস্বতী কেরামত চাচার উঠোন ডিঙ্গিয়ে মেঠোপথ ধরে হাসাহাসি করতে করতে অগ্রসর হচ্ছে।
ফাতিমার মনটা খারাপ হয়ে গেল।
একটু জোরে সে সরস্বতীকে ডাক দিল।
‘এই সরস্বতী। এ-ই সরস্বতী।’
কিন্তু তার ক্ষীণকণ্ঠ এতদূর অতিক্রম করে সরস্বতীদের কানে গিয়ে পৌঁছাল না। সে ডানদিকে বেশ খানিকটা সরে গিয়ে আম গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে ‘এ-ই সরস্বতী’ বলে আবার ডাক দিল। কিন্তু সরস্বতী-আম্বিয়া-সুফিয়াদের অট্টহাসিতে তার কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে কালের গহ্বরে চিরদিনের জন্যে হারিয়ে গেল।
সে ফিরে এসে একই কায়দায় সুপারি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থেকে ভাবনার সাগরে ডুবে গেল।
একদিন সরস্বতীদের সঙ্গে সেও স্কুলে যেত। প্রাইমারি পাশ করে ক্লাস সিক্সে ভর্তিও হয়েছিল। স্কুলের সামনে বিশাল বিলবোর্ডে ‘আমি এখন ক্লাস সিক্সে, এখন আমায় ঠেকায় কে’ দেখে আহ্লাদে আটখানা হয়ে যেত। কিন্তু তার এই আহ্লাদে আটখানা হয়ে যাওয়া বেশিদিন স্থায়ী হলো না। বাবার জেলে যাওয়া, তারপর আকস্মিক মৃত্যু, তার সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেল। পড়ালেখায় ইতি টানতে হলো। সৎ মায়ের নির্যাতনের মাত্রাও বেড়ে গেল। বাবা বেঁচে থাকতে তাও দুয়েকবার বাঁধা-টাধা দিতেন। এখন আর কেউ নেই; কথা বলার, বাঁধা দেয়ার!
তার চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে আর দাঁড়াল না। বাড়ির রাস্তার সম্মুখ থেকে পেছন ফিরে আস্তে আস্তে অগ্রসর হয়ে হতাশার সাগরে ডুবে নিজ ঘরে ঢুকে গেল।
|| ২ ||
গর্ভধারিণী মায়ের কথা ফাতিমার তেমন একটা মনে নেই। ওর যখন বয়স ছয়, একদিন ভোরবেলায় বাড়ির আঙিনায় বড় আমগাছটার নিচে মায়ের দড়ি দিয়ে ঝুলে থাকার দৃশ্যটা ওর স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে থাকা বলা যায় মায়ের একমাত্র স্মৃতি। তারপর, চল্লিশ দিনও পেরোয়নি, বাবা নতুন মাকে ঘরে তুলে মেয়েকে বলেছেন, ‘মারে, তর লাগি তর মইজিরে আইনচি। মইজি কইস।’ কিন্তু অবুঝ হ্নদয়ের ফাতিমা কোনো কারণ ছাড়াই নতুন মাকে মইজি বলে সম্বোধন করেনি। এভাবে মাস চারেক যেতে না যেতেই নতুন মা তার বাবাকে বলেছে,‘হরুমরু পুরি আবো মুতোর গন্ধ গেছে না, আর তুমার মাত হুনল না। বড় অইলে বড় বেততমিজ অইব।’
ততদিনে বাবা তার স্ত্রৈণ হয়ে গেছে।
প্রথমদিকে সৎ মা ফাতিমাকে তেমন একটা কিছু বলত না। কিন্তু বৈমাত্রেয় বোন রহিমা হওয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ফজর বানুর খুঁটি শক্ত হয়। বছর খানিকের মধ্যে সে স্বমহিমায় আবির্ভূত হয়। পান থেকে চুন খসলেই বকাঝকা থেকে শুরু করে চুলের মুঠি ধরে নির্যাতন আরম্ভ করে।
ক্রমেই নির্যাতনের মাত্রা বাড়ে।
একদিন শুক্রবার ফাতিমা দাওয়ায় বসে ছোটোবোন রহিমার সঙ্গে খুনসুটিতে ব্যস্ত রহিমার বয়স তখন চার। বড়বোনের চুল ধরে এমনভাবে টানতে শুরু করে, বড়বোন ব্যথা সহ্য করতে না পেরে আলতো করে রহিমার গালে চিমটি দিতেই ফজর বানু তা দেখে দৌড়ে এসে লংকা কাণ্ড বাঁধিয়ে দেয়। রহিমাকে হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে দিয়ে ফাতিমাকে চুল ধরে টেনে নিয়ে যায়। তারপর বাঁশের কঞ্চি দিয়ে প্রচণ্ডভাবে মারতে থাকে। মারের চোটে ফাতিমা চিৎকার দিয়ে কান্নাকাটি শুরু করলে ঘর থেকে তার বাবা ছুটে আসে। ফজর বানু স্বামীর উপর চটে যায়। বলে,‘এরে চুপচাপ উবাই রও। পুরিরে শাসন করিয়ার।’
আম্বর আলি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। কিছুই বলার সাহস পায় না। ক্রমেই ফাতিমার আহাজারি বাড়তে থাকলে তার ছোটোচাচা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে কঞ্চি কেড়ে নিয়ে ভাবির ওপর চটে যায়। ফজর বানুও তোয়াক্কা করে না; তর্কাতর্কি শুরু করে দেয়। শেষমেশ, ছোটচাচা রণেভঙ্গ দেয়। অশ্লীল একটা গালি উচ্চারণ করে বকতে বকতে চলে যায়।
দেবর চলে গেলে ফজর বানু স্বামীর ওপর ক্ষিপ্ত হয়। বলে, ‘তুমার হরু বাইয়ে তুমার সামনে আমারে বেইজ্জত করল, আর তুমি বলদ বেটায় চাইয়া চাইয়া দেখলায়! কুনো মাত মাতিলায় না।’
আম্বর আলি বিবির কথা শুনে যায়। কোনো টু শব্দ করে না।
এভাবে দিন যায়। মাস যায়। যায় বছরও।
ফজর বানুর গর্ভে আনোয়ার আলির জন্ম হয়। বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ফজর বানুর তোলাও আশি টাকা হয়ে যায়!
ফাতিমার দায়িত্ব বেড়ে যায়। সারাটা দিন বলতে গেলে তার ভাইবোনকে নিয়ে সময় কাটে। ইচ্ছে হলে কোনো দিন স্কুলে যায়, কোনো দিন যায় না। এতকিছুর পরেও সৎমেয়ের প্রতি ফজর বানুর বিদ্বেষ কমে না, বরং কোনো একটা ছুতো পেলেই সেই ছুতো ধরে বকবক করতেই থাকে। ‘ইস্কুলো না গিয়া বাইবোনরে সামলাও। না, জজ-বালেস্টার অইতায়! অতবড় জুয়ান ডেকি পুরি বাড়ির কাম সামলাইতো, না তাইন বালেস্টার অইতা! হেটামারাউনির পুরি...।’
সময় বহতা নদীর মতো বয়ে যায়।
নির্যাতন-গঞ্জনা সহ্য করতে করতে ফাতিমা একসময় ফাইভ পাশ করে সিক্সে ওঠে। নীলপুর গার্লস স্কুলে ভর্তি হয়। মাস তিনেক ক্লাসও করে। একদিন ছুটির সময় বাড়ি আসার পথে কেওড়াতলির মোড়ে ছোটোবোন রহিমার ফুফাতো ভাই সব্বিরের সঙ্গে দেখা হয়। সব্বির কুশলাদি জিজ্ঞেস করে। লজ্জায় ফাতিমা হু হা ছাড়া কোনো উত্তর করে না। দুয়েকদিন পর সব্বির আবার আসে। কেওড়াতলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আম্বিয়া-সুফিয়া-ফাতিমারা তখন ফিরছিল। জরিনা ইশারা দিয়ে ফাতিমাকে বলে, ‘ওউনু তর তাইন। মাতবার অইলে মাতোস না। আমরার কোনো অসুবিদা নায়।’ ফাতিমা কোনো উত্তর করে না। কিশোরীসুলভ চপলতায় মুচকি হেসে আড়চোখে দেখে নিয়ে অগ্রসর হয়ে যায়।
দিন দশেক এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সব্বিরের আর তর সয় না। ফুফুর বাড়ি গিয়ে হাজির হয়। দু-তিনদিন থাকে। ফাতিমার সঙ্গে কথা বলতে চেষ্টা করে। ফাতিমাও কথা বলে। তবে, সব্বিরের চাহনিতে সে ভড়কে যায়। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে সতর্ক করে দেয়। তবুও শেষ রক্ষা হয় না।
সেদিন ছিল সোমবার। সেই সোমবার সন্ধ্যারাতে ভরা পূর্ণিমায় ফাতিমা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বের হলে সব্বির ভাব বুঝে চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। তারপর, অন্ধকারে সুযোগ বুঝে ফাতিমার মুখ চেপে ধরে শুইয়ে দিয়ে উপরে উঠে যায়।
শুরু হয় ধস্তাধস্তি। ধস্তাধস্তি, গোঙানির শব্দে ফাতিমার বাবা, ছোটোচাচা হারিকেন নিয়ে লাঠি হাতে ছুটে আসে। এবং সব্বিরকে ধরে নিয়ে প্রচণ্ড মার দেয়।
সাব্বিরের ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যায়।
অবশেষে, ফাতিমার বাবা আম্বর আলি, ছোটোচাচা আতর আলি জেলে যায়। মামলা-মোকদ্দমা চলতে থাকে। মামলা চালাতে গিয়ে গৃহস্থের ঘরে আর্থিক দীনতা নেমে আসে। তিন কিয়ার ফসলি জমি বিক্রি করে দিতে হয়।
অনভ্যস্ত আম্বর আলি জেলে অসুস্থ হয়ে যায়। একদিন প্রিজন ভ্যানে করে কোর্টে হাজিরা দিয়ে আসার সময় বুকের বামদিকে প্রচণ্ড ব্যথা উঠে তাৎক্ষণিক তার মৃত্যু ঘটে। বড়ভাইয়ের মৃত্যুতে আতর আলিও অসুস্থ হয়ে পড়ে।
পুরো বাড়ি জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে।
ফাতিমার আর স্কুলে যাওয়া হয় না। বাবার মৃত্যুর চেয়ে তার উপর যৌন নিপীড়নের ঘটনা ডালপালা গজিয়ে আশেপাশে দশদিগন্তে ছড়িয়ে যায়। বাবার মৃত্যুর দিন চল্লিশেক পর একদিন সে স্কুলে যায়। পুরো ক্লাসের মেয়েরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। অন্য ক্লাসের মেয়েরাও আসে। ঘটনা কী? জানতে চায়। কেউ কেউ অশ্লীল মন্তব্য করে। গালি দেয়। কিন্তু ফাতিমার মনের অবস্থা নিয়ে কেউ ভাবে না। রাগে, ক্ষোভে, দুঃখে ফাতিমা বাড়ি চলে আসে। আর কোনোদিন স্কুলমুখী হয় না।
|| ৩ ||
ঘর থেকে ফজর বানুর বাজখাঁই গলা শোনা যায়।
‘কইয়ার আমার সব্বিরে কিতা করছিল! তুইন চেনাইতে গেছলে, ই খবর সব্বিরে জানল কিলা! অলক্কী চাইরোবায় ঠাটা ফালাই দিসে। সব্বির গুতারে খাইছে, বাফরে খাইছে, চাচার উফরেও ঠাটা ফালাই দিছে অলক্কীর গরোর অলক্কীয়ে।’
ফাতিমা কিছু বলে না। দাওয়ার এক কোণে মাটিতে বসে অঝোরে কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে গর্ভধারিণী মায়ের কথা মনে হলেই বিলাপ করে কেঁদে ওঠে। বলে, ‘মারে, তুমি বাঁচি থাকলে আমার ই দশা অইল না অইলে। আমারে গলা টিফি মারি তুমি মরলায় না কেনে গো, মা।’
মাকে বাবা বাঁচতে দেয়নি। ছোটোচাচির কাছ থেকে সব শুনেছে সে।
তখন ছোটোচাচি সবেমাত্র নতুন বউ হয়ে এসেছে। বাসর রাতের পরের দিনের পরের দিন রাতে চিৎকার-চেচামেচি শুনে স্বামীকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেই স্বামী তার অবলীলায় হরু বাইসাবোর কথা বলে গেছেন। বলেছেন,‘ইতা হরু বাইসাবোর খাসলত। বাবি ওগু উফতা। ওউ তাইন তাইরে ডাণ্ডা মারি ঠাণ্ডা রাখইন।’
ফজর বানু চুপ করে না। ঘর থেকে বের হয়ে দাওয়ায় ফাতিমাকে দেখে ‘হু, ডংয়ে বাঁচি না’ বলে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ছোট জায়ের ঘরে যায়। মিনিট দশেক পরে ফিরে এসে ফাতিমাকে দেখে আবার বকবক করতে থাকে।
ফাতিমার মন একেবারে ভেঙ্গে যায়। সে কোথাও শান্তি পায় না। ছোটোচাচিও সব দুর্গতির জন্যে তাকে দায়ী করেন। বড়চাচাও দেখে না দেখার ভান করেন!
তার পৃথিবী ছোটো হয়ে আসে। বেঁচে থাকা অনর্থক মনে হয়। সে মায়ের ডাক শুনতে পায়। মরে যাওয়ার আগে মরে যায়!
তারপর ঘণ্টা দশেকও পার হয় না। সে মায়ের ডাকে সাড়া দেয়।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন