ঋতুপর্ণ ঘোষের অ-জনপ্রিয় সিনেমা ‘অসুখ’!
ক্ষণজন্মা ঋতুপর্ণ ঘোষ আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন পরিচালক যিনি ৪৯ বছরের জীবদ্দশায় মাত্র ১৯টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করার সুযোগ পেয়েছেন। তার মধ্যে ১২টিতেই পেয়েছেন জাতীয় পুরষ্কার। হবে না-ই বা কেন! তার হাতে যেন বহমান জীবনের একটি অতি সাধারণ ঘটনা হয়ে উঠে সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ ইলিমেন্ট। ঋতুপর্ণ পরিচালিত সবগুলো সিনেমাই কাহিনী আর নির্মাণশৈলীতে একটি অন্যটি থেকে স্বতন্ত্র। তাই নিজের বিশ্বাসের জায়গাকে একপাশে সরিয়ে নিপাট নিরপেক্ষ দর্শক হয়ে তার গল্প বলা দেখতেও আমার বেশ লাগে।
ঋতুপর্ণের নির্মিত সিনেমা চোখের বালি, নৌকা ডুবি কিংবা আবহমান, চিত্রাঙ্গদা নিয়ে খুব আলোচনা সমালোচনা হলেও তার একটি সিনেমা অত্যন্ত চমৎকার স্টোরিলাইন, চিত্রনাট্য আর গুণী অভিনেতাদের সন্নিবেশ থাকার পরেও তেমন আলোর মুখ দেখেনি বলা যায়। পরিচালক যদিও এ সিনেমায় শ্রেষ্ঠ ফিচার ফিল্ম হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার জিতে নিয়েছেন, তবে যাদের জন্য সিনেমা বানানো তারাই যদি না দেখে তা মোটামুটি অসফলই বলা যায়, অন্তত আমার দৃষ্টিকোণ থেকে। এক্ষেত্রে কেউ কেউ বলতে পারেন, আর্ট ফিল্ম বা যেগুলো মোটা দাগে মেইনস্ট্রিম চলচ্চিত্র নয় বা কমার্শিয়াল সিনেমা নয়, সেগুলো তো বানানোই হয় নির্দিষ্ট কিছু টার্গেট অডিয়েন্সের জন্য। এ নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে, তবে যে সিনেমা নিয়ে কথা বলার জন্য এত জল ঘোলা করছি, সেটি আরও অনেক বেশি আলোচনা হওয়ার যোগ্যতা রাখে।
সিনেমাটির নাম অসুখ। কোভিড চলাকালীন সময় ইউটিউবে দেখেছি। বেশ কয়েকবার দেবশ্রী রায়ের কান্নারত থাম্বনেইল দেখে কেন যেন সিনেমাটি দেখার ইচ্ছা জাগেনি। কিন্তু কয়েকবার এড়িয়ে যাওয়ার পরও ঋতুপর্ণের কাজ বলে আর না দেখে পারলাম না। তাছাড়া এ সিনেমার কথাও পড়িনি কখনো, সেটিও এড়িয়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ। কিন্তু দেখার পর মনে ভরে গেল আর চোখ ভরে গেল অশ্রুকণায়। বাবা-মাকে ভালবাসেন, বাবা-মায়ের অপাত্য স্নেহে বেড়ে উঠা প্রতিটি মানুষকেই এই সিনেমা নাড়া দেব, এ কথা নিশ্চিত করে বলতে পারি।
অসুখ কিছুদিন আগে আবারও দেখলাম। দেখে মনে হলো, অত্যন্ত চমৎকার এই সিনেমাটি নিয়ে কিছু লিখে অন্তত নিজের এই ভালো লাগাটুকু ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। যারা ঋতুপর্ণের সিনেমা দেখেন, তারা নিশ্চয়ই জানেন, তার গল্প বলার একটা আলাদা ঢং আছে। সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার কাজ তিনি বেশ ভালো জানেন। তার সাথে ব্যাকগ্রাউন্ডে যুক্ত হয় কবিতা আর গানের এক অপূর্ব মিশেল। কবিতা-গানগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রবি ঠাকুরের হয়। পারিপার্শ্বিকের সাথে সঙ্গতি রেখে এই কবিতা-গানগুলোও যেন জীবন্ত হয়ে উঠে। মাঝে মাঝে তো মনে হয়, সিনেমাটিই যেন আস্ত এক কবিতা।
অসুখ সিনেমার কাহিনী খুবই সাধারণ। বাবা-মেয়ের গল্প। বাবা হিসেবে অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর তার কন্যা হিসেবে দেবশ্রী রায়। মায়ের সাথে মেয়ের সম্পর্কের বিষয়টি তেমন গুরুত্ব না পেলেও এই সিনেমায় দেবশ্রী রায়ের মায়ের ভূমিকায় ছিলেন কলকাতার কিংবদন্তী বাচিক শিল্পী গৌরী ঘোষ। এক লেখায় পড়ে জেনেছি, ঋতুপর্ণ ঘোষের বাবা-মার আদলেই গড়ে তুলেছেন অসুখের বাবা-মা চরিত্র দুটিকে। সিনেমায় দেবশ্রি রায়ের নাম রোহিনী, বাবা-মা ডাকেন রুনু বলে। জনপ্রিয় নায়িকা রোহিনী একাই সংসারের সব খরচ জোগান। অত্যন্ত অনিচ্ছায় বাবা-মাকে মেয়ের খরচে চলতে হয়। কিন্তু রোহিনী বাড়িতে আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতই সাধারণ কাপড়চোপড় পড়েন। বাবাকে নিয়ে একসাথে খেতে বসেন। কারণ মা শয্যাশায়ী হয়ে হাসপাতালে। খাবার শেষে বাবার প্লেট রান্নাঘরে রেখে যেতে ভোলেন না। প্রেমিকের সাথে রেগে রেগে কথা বললে বাবা শাসন করেন। ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমোতে চাইলেও বাবা তাতে আপত্তি করেন। একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সব কায়দাকানুনই তাদের বাড়িতে বিদ্যমান। সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের ভালবাসা বা স্নেহ বোঝাতে আসলে যে ছোটখাটো কিছু উপাদানই যথেষ্ট, অত্যন্ত প্রাকৃতিক এই বিষয়টি বোঝাতে আসলে যে কোন মেলোড্রামার প্রয়োজন নেই অসুখ তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। যেমন কাগজে রোহিনীর কোন ছবি ছাপা হলে তা পেপার কাটিং করে সযত্নে রেখে দেন বাবা। হাসপাতালে শয্যাশায়ী থাকার পরও তেলুগু ভাষায় লেখা সংবাদপত্রে ছাপা রোহিনীর ছবি মায়ের জন্য নিয়ে আসতে ভুল করেন না মেয়ে। এত নিঁখুত ভালবাসার স্পর্শ বাবা-মা ছাড়া আর কে দিতে পারে?

অসুখ সিনেমার একটি দৃশ্য
ঘুমের ওষুধের কারণে মেয়ের স্মৃতিভ্রষ্ট হচ্ছে বাবার এমন অভিযোগ শুনে মা রবিঠাকুরের এক কবিতা পড়েন, দেখার জন্য রোহিনী কী আসলেই সব ভুলে যাচ্ছে কিনা। এছাড়া রোহিনীর বাবা-মায়ের যে ভালবাসাপূর্ণ সম্পর্ক সেটিও সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক। কিন্তু একটা মেডিকেল টেস্ট নাড়িয়ে দেয় বাবার প্রতি মেয়ের বিশ্বাসের ভিত। অনেকদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পরও যখন মায়ের কোন রোগ ধরা পড়ে না, ইমিউন সিস্টেম দূর্বল হওয়ার কারণে সেকেন্ড অপিনিয়ন হিসেবে আরেকজন চিকিৎসক তাকে এইচ আইভি টেস্ট করাতে বলেন। ঠিক তখনই মেয়ের মনে দানা বাধে সন্দেহের বীজ। এর পেছনের কারণকে আরও যুতসই হিসেবে উপস্থাপন করতে কিংবা রোহিনীর মানসিক অবস্থাকে বুঝতে তার প্রেমিককে কাহিনীতে রেখেছেন পরিচালক। যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন কলকাতার স্বনামধন্য কণ্ঠশিল্পী শিলাজিৎ। রোহিনীর সাথে সম্পর্কে থাকা অবস্থায় আরেক নবাগতা অভিনেত্রীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন রোহিনীর প্রেমিক। মূলত প্রেমিকের এই স্বীকারোক্তি থেকেই সিনেমার শুরু। নিজের প্রেমিকের কাছ থেকে বিশ্বাস হারিয়ে সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়েন রোহিনী। কিন্তু শেষটা হয় মেয়ের সন্দেহ ভুল প্রমাণ হওয়ার মাধ্যমে। এটিই সিনেমার শেষ দৃশ্য। যেদিন রিপোর্ট আসে, সেদিন রোহিনীর এক সাক্ষাৎকারও ছাপা হয় পত্রিকার পাতায়। সেই সাক্ষাৎকার পড়ে বাবা জানতে পারেন প্রেমিকের বিশ্বাস ভাঙার কথা। মেয়ের কাছে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে এসে তাকে জানান রিপোর্ট নেগেটিভ আসার কথা। এ কথা শুনে বাবার হাত ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন মেয়ে। বারবার ক্ষমা চাইতে থাকেন বাবার কাছে কিন্তু নিতান্তই সাদাসিধে বাবা বুঝতে পারেন না মেয়ে কেন তার কাছে ক্ষমা চাইছেন। অত্যন্ত সাধারণ এই দৃশ্য আবেগাপ্লুত করতে বাধ্য যে কাউকে।
অথচ বাবা-মেয়ের সম্পর্কের গভীরতা বোঝাতে কিছু মানুষ এত পরিশ্রম করেন যা মাঝেমধ্যেই হয়ে যায় পন্ডশ্রম। কিছুদিন আগে মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীর লেডিস এন্ড জেন্টলম্যান দেখলাম। সেই সিরিজের শেষ দৃশ্যে বাবা-মেয়ের একটি আবেগঘন দৃশ্য থাকে। সেখানে অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিন বাবার চরিত্রে অভিনয় করা মামুনুর রশিদকে এত বেশি কথা বলতে থাকেন যে এক পর্যায়ে তা বিরক্তির জন্ম দেয়। সেই দৃশ্য দেখলে যে কারো মনে হবে, চরিত্রগুলো এত কথা বলে কেন? অথচ, কিছু না বলেও যে অনেককিছু বুঝিয়ে দেওয়া যায় তারই স্পষ্ট ছাপ রেখেছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ।
অবিশ্বাসের বীজ কতটা ভয়াবহ তা ঋতুপর্ণ দেখাতে চেয়েছেন নাকি কেবল দৃশ্যের বুননে দৃশ্যের জন্ম দিয়েছেন তা তিনিই জানেন। তবে মধ্যবিত্ত পরিবারে বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্ক, তাদের টানাপোড়েন কিংবা একে অন্যের পাশে থাকার যে প্রচন্ড আকুতি তা-ই যেন নিখুঁত শিল্পীর পাকা হাতে এঁকেছেন পরিচালক।
সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কথা বলতে গেলে সবাই ছিলেন নিজেদের জায়গায় অনন্য। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অন্যতম সেরা অভিনয় এই সিনেমায় দেখেছি তা বললেও ভুল হবে না। চলনবলন, কথাবার্তায় একজন সাধারণ ছাপোষা মধ্যবিত্ত বাবা। হাঁটাচলা দেখলে মনে হবে সেখানে আত্মবিশ্বাসের কমতি আছে, মেয়ের টাকায় চলতে হয় বলে কিছুটা হীনমন্যতাও আছে তবে চরিত্রে আত্মসম্মানবোধের কমতি নেই। দেবশ্রী রায়ের অভিনয়ও ছিল এক কথায় অনবদ্য। মেয়ের চোখের ড্রপ দেওয়া থেকে শুরু করে অন্ধকারে মেয়ে ভয় পেলে বাবা হাত বাড়িয়ে দেয়, রাতের খাবারটাও দু’জন একসাথে খায় কিন্তু মনে বাবার প্রতি সন্দেহ, এমন টানাপোড়েনের চরিত্র যেন দেবশ্রী রায়ের জন্যই লেখা। তবে যারা তার অভিনীত উনিশে এপ্রিল দেখেছেন তারা অভিনেত্রীর অভিনয় দক্ষতা বেশ ভালোই জানেন। তাছাড়া বাচিক শিল্পী গৌরী ঘোষের অভিনয়ও ছিল গোছানো, পরিণত। তবে এ সিনেমাতেও বিতর্ক পিছু ছাড়েনি ঋতুপর্ণ ঘোষের। কারণ বাচিক শিল্পী গৌরী ঘোষের নিজের গলা বাদ দিয়ে ডাবিংয়ে নিজের গলা ব্যবহার করেন পরিচালক। গৌরী ঘোষ যিনি নিজের কণ্ঠস্বর দিয়ে মানুষের কাছে সমাদৃত তার নিজের কণ্ঠ ব্যবহার না করা তো তার পরিচয়কে ব্যবহার না করারই শামিল, তাই না? কিন্তু একটি সৃষ্টিকর্ম কেমন হবে সে ব্যাপারে পরিচালক একেবারেই স্বাধীন। তাই নামিদামি পরিচালকদের ক্ষেত্রে এমন স্বাধীনতা বা স্বেচ্ছাচারীতার বদনাম অহরহ শোনা যায়।
পর্দায় না থেকেও একজনের অস্তিত্ব পুরো সিনেমায় পাওয়া গেছে আর তিনি হলেন অপর্ণা সেন। সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ডে ব্যবহার করা কবিতার আবৃত্তিতে ছিলেন তিনি। দৃশ্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই কবিতাগুলো দৃশ্যটিকে আরও প্রাসঙ্গিক, আরও মর্মস্পর্শী করেছে তা বলাই বাহুল্য। যেমন—
আমি ছিলাম ছাতে তারায় ভরা চৈত্রমাসের রাতে। হঠাৎ মেয়ের কান্না শুনে, উঠে দেখতে গেলেম ছুটে। সিঁড়ির মধ্যে যেতে যেতে প্রদীপটা তার নিবে গেছে বাতাসেতে। শুধাই তারে, “কী হয়েছে, বামী।” সে কেঁদে কয় নিচে থেকে, “হারিয়ে গেছি আমি।’
কিংবা অপর্ণা সেনের ভরাট কণ্ঠে বাজতে থাকে,
শীতের বেলায় দুই পহরে দূরে
কাদের ছাদের ’পরে
ছোট্ট মেয়ে রোদ্দুরে দেয়
বেগুনি রঙের শাড়ি,
চেয়ে চেয়ে চুপ ক’রে রই—
তেপান্তরের পার বুঝি ওই,
মনে ভাবি ঐখানেতেই
আছে রাজার বাড়ি।
প্রেমিকের সাথে কথোপকথনের সময় ভেসে আসে “ভালবেসে যদি সুখ নাহি, তবে কেন মিছে ভালবাসা” গানের সুর… যেন মনে হবে এতক্ষণ দর্শক এই সুরেরই অপেক্ষায় ছিল।
ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমায় বাবা-মা সবসময়ই খুব গুরুত্বপূর্ণ। মেমোরিজ ইন মার্চ, উনিশে এপ্রিল, চিত্রাঙ্গদা, আবহমান প্রতিটি সিনেমাতেই বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের নিবিড় স্নেহময় সম্পর্ক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক কোনরকম অতিনাটকীয়তার আশ্রয় না নিয়েই।
উনিশে এপ্রিল সিনেমার জনপ্রিয়তার কথা মাথায় রেখেই হয়ত ঋতুপর্ণ ভেবেছিলেন, অসুখ সিনেমাটিও মানুষ বেশ সাদরে গ্রহণ করবে। কিন্তু তা হলো না। তবে মানুষ গ্রহণ করুক বা না করুক, এত চমৎকার নির্মাণের জন্য ঋতুপর্ণের কাছে তার ভক্তশ্রেণী আমার মতই কৃতজ্ঞ থাকবে বৈকি।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন