ট্রমা ও অন্যান্য কবিতা
|| চান্দের গাড়ির ড্রাইভার ||
আমি প্রায় ভালো থাকি,
মানে ভালো থাকার একটু নিচে থাকি।
আর আঙ্গুর ফলকে টক ঘোষণা করা সেই
শিয়ালের মতো ভাবি, সমুদ্রের তলদেশে
একটু নিচে থাকাই উত্তম। তাহলে
ছোঁ মেরে নিয়ে যেতে পারবে না মাছরাঙা কিংবা ঈগল।
আমি প্রায় ভালো থাকি,
মানে ভালো থাকার একটু নিচে থাকি।
হয়তো আমার জীবন যাপনে মসলা কম।
তবু তা স্বাস্থ্যসম্মত, দূরে থাকবে যম।
জোয়ান বায়েজের মতো নব্বই বছরেও
গেয়ে উঠতে চাই প্রেমের গান। মাটিতে শিকড়
পেতে আকাশে চাষ করি ডানার বাগান।
আমি প্রায় ভালো থাকি,
মানে ভালো থাকার একটু নিচে থাকি
কিন্তু উপরে থাকি খারাপ থাকার।
দুইদিকের অতি উচ্ছ্বাসের মাঝখানে এক
শান্তশিষ্ট পাহাড়ি পথ। দুইপাশের চড়াই-উৎরাই
সাবধানে এড়িয়ে নিয়ে যাই গাড়ি,
আমি এক চান্দের গাড়ির ড্রাইভার।
|| ট্রমা ||
কোনো একদিন নিশ্চয়ই মরে যাব আর
হয়তো শিগগিরই নিহত হব—এই দুইটা বাক্যের
মধ্যেখানে এসে বসে থাকে ট্রমা।
নিজের কি অপরাধ জানি না
ভেড়ার পালের স্তবক মানি না—
একটা পাথরখণ্ডের ওপর রক্তের দাগ
অগুণতি সমুদ্র মিলে তবু ধুয়ে দিতে পারে না—
সমুদ্রে গোসল করতে নেমে হারানো কানের দুলের মতো
তারা হারিয়ে ফেলেছিল তাদের চোখ।
সেই থেকে ভালোবাসার নাম হলো দুর্ভোগ।
বৃষ্টির পানি বৃক্ষ জন্মানোর সহায়ক।
মানুষ যদি না বাঁচে তবে সৃষ্টিশীলতাও বন্ধ হোক।
|| এক পৃষ্ঠা শূন্যতা বা চাঁদের হাসিমুখ ||
শূন্যতা দেখতে ঠিক কী রকম ভাবতে ভাবতে
আমি পূর্ণতাকে ভেবে ফেলি। পুকুরের পানিতে
বৃষ্টির কণা ঝরে ঝরে ছোটো থেকে বড়ো শূন্য
তৈরি করতে করতে মিলিয়ে যায়। ফলত এসব
জলজ শূন্য পুকুর, খাল-বিল, নদীতে পানি
বাড়িয়ে দেয়। শূন্যতা কেমন হতে পারে ভাবতে ভাবতে
নীলাকাশে তাকাই। কিন্তু সেখানেও শূন্যতা দেখি না—
দেখি মেঘেদের মায়াবতী গ্রাম, পাখিদের কোলাহল।
শূন্যতার কথা ভাবতে ভাবতে সিলিং-এর দিকে তাকাই।
দেখি এক কিশোর কবিবন্ধুর মুখ, যে শালিকের ভাষা
বুঝতে পারতো। তার গলায় টাইয়ের মতো ঝুলছিল
যে শূন্যতা, সেখানে আমি আসলে মৃতদেহ না—
একটা শালিককে দোল খেতে দেখছিলাম।
‘এক শালিকে যাত্রা নাস্তি, দুই শালিকে সুখ’
কে যেন দূর থেকে সুর করে এই ছড়া পড়ছিল।
শূন্যতা আঁকব বলে আমি সাদা পৃষ্ঠার দিকে তাকাই
কিন্তু সাদা পৃষ্ঠাও তো শূন্য না। যে শূন্য সাদা কাগজ
আমি কিনে রেখে দিই ছবি আঁকব বলে, সবগুলোই
ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়ে যায় আঁকিবুকিতে। তাই মনে হয়
শূন্যতা আপেক্ষিক, পূর্ণতাই দীর্ঘমাত্রিক। এমনকি
তোমার অনুপস্থিতি যে শূন্যতা সৃষ্টি করে রাখে সারাক্ষণ
তারাও পূর্ণ হয়ে থাকে তোমাকে চাওয়ার তৃষ্ণায়।
এক পক্ষ ধরে একটু একটু করে চাঁদ বড়ো হতে হতে
যখনই শূন্যতার বৃত্ত পূর্ণ করে, তোমরা তাকে পূর্ণতা
বা পূর্ণিমা বলে ডাকো। কই, শূন্যতা তো ডাকো না!
|| দুইজন বৃদ্ধা পাশাপাশি শুয়ে আছে ||
দুইজন বৃদ্ধা পাশাপাশি শুয়ে আছে। তাদের একজনের
জরায়ু থেকে অন্যজনের জন্ম। কিন্তু এখন তারা পাশাপাশি শুয়ে আছে
জমজ বোনের মতো জড়োসড়ো হয়ে। বিধবা, রংহীন কাপড়ে
নিজেদেরকে জড়িয়ে। এখন তারা অনেক কথাই বলতে পারে,
যা একদিন সংকোচের শামুক হয়ে মুখের মধ্যে জিভের মতো বাস করতো।
এখন তাদের সারা গায়ে ব্যথা, হৃদয়ে তবু সোনালু সকালের কথা।
চুল বিনুনি করতে করতে সেসব তারা বলে চলে।
একজন আরেকজনের জরাযু থেকে জন্ম নিলেও এখন তারা
এক নদী থেকে জন্ম নেয়া অপর নদীর মতো পাশাপাশি বয়ে চলে।
|| আমাদের আড্ডা হোক অতিসত্ত্বর ||
আমার ফুসফুসের সাথে আমার কখনো দেখা হয় নাই।
আমার ধমনীর সাথে আমি কখনো কথা বলি নাই।
আমার অন্ত্র, যকৃত, হৃৎপিণ্ড, পাকস্থলি!
বহুদিন একসাথে থেকেও অপরিচিতের মতন
মারা যাব আমরা। অথচ কোথাও নীল পদ্মবনে ফুটেছিল
সাদা এক টুকরো মেঘ, সহস্র সমুদ্রচারীর সমুদ্রগমন শেষে
কাউকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল অতৃপ্ত সাগর। পার্কের ঘাসের ময়দানে
হয়তো কোনো এক স্বপ্নে দেখা হতে পারতো আমার সাথে আমার হৃদয়ের।
দুজনে মিলে একটা বিড়ি ফুঁকতাম, একটা আইসক্রিম খেতাম ভাগ করে।
কিন্তু আমার সাথে আমার পাঁজরের হাড়ের কোনো মত বিনিময় হয় নাই।
আমার সাথে আমার স্তনের কখনো খুনসুঁটি হয় নাই।
প্রকাণ্ড চাঁদ উঠলে ঝোপঝাড়ের উপরে, তখনও সন্ধি হয় নাই
আমার সাথে আমার বেয়াড়া মগজের। অচেনা পড়শীর মতো
আমরা থেকে যাব একই পাড়ায়, তবু কথা বলব না
আত্মগরিমায়। ধ্যানভঙ্গ মুনির মতো প্রার্থনা করব
এক মুঠো অকালবৃষ্টির, যাতে আমার সাথে আমার সকল ইন্দ্রিয়গুলোর
সেদিন বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আড্ডা হয় নিখোঁজ কোনো বকুলতলায়।
|| ঢ্যাঙ্গা ঢ্যাঙ্গা পায়ে ||
পার হয়ে যায় আরো একটা দিন ঢ্যাঙ্গা ঢ্যাঙ্গা পায়ে,
যেন এক নির্জন শতাব্দী। মোবাইলের স্ক্রিনে খেয়াল করে
না তাকালে হয়তো জানাই হতো না দিনটার নাম কী,
তারিখ কত। টাইম ল্যাপস ভিডিয়োতে মেঘেদের
দূরে সরে যাওয়ার মতো চলে যায় একেকটা দিন
আর আমি বহুগামীর মতো তাদের সবারই প্রেমে পড়ে যাই।
একটা দিনকে মিস করতে করতে আরো একটা
নতুন দিনকে মিস করার সময় চলে আসে।
এভাবেই চলছে আমার দিনকাল।
তোমার কী খবর মহাকাল?
তুমিও কি অনেকদিন ধরে আসব আসব করতে করতে
আসার আগেই হারিয়ে যাবা? আর আমি কি অন্যকে
হারানোর ব্যথা ভুলতে ভুলতে তোমাকেও হারানোর ব্যথার
মহাশূন্য নীলে ঢুকে পড়ব একটা সবুজ টিয়া হয়ে?



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন