নিজার কাব্বানির আলোচিত তিনটি কবিতা
|| নিজার কাব্বানি ||
সিরিয়ার জাতীয় কবি ও কূটনীতিক। জন্ম ২১ মার্চ ১৯২৩ সালে, সিরিয়ার দামেস্ক নগরে। পড়াশোনা করেছেন আইনশাস্ত্রে। আরব বিশ্বের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় কবিদের একজন তিনি। সাম্রাজ্যবাদ ও স্বৈরাচার বিরোধিতা তার কবিতার উপজীব্য বিষয় হলেও তিনি আরব বিশ্বের ক্ষমতার অন্বেষণ ও রোমান্টিক ধারার কবি তিনি। ১৯৮১ সালে, লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময় লেবাননের বৈরুতে এক বোমা হামলায় কাব্বানীর স্ত্রী বালকিস মারা যান। বালকিসের মৃত্যু কাব্বানীর মনস্তত্ত্ব এবং কবিতায় গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। তিনি বালকিস নামে একটি ব্যতিক্রমী মর্মস্পর্শী কবিতায় তার শোক প্রকাশ করেছিলেন। মৃত্যুর জন্য সমস্ত আরব শাসনব্যবস্থাকে দায়ী করেছিলেন। তার জীবনের উল্লেখযোগ্য কবিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে, ‘When Will They Announce the Death of Arabs?’ এবং ‘Runners’। তার গ্রন্থ সংখ্যা ৩৪ টিরও অধিক। পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কার। কাব্বানি ৭৫ বছর বয়সে, ১৯৯৮ সালের ৩০ এপ্রিল লন্ডনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

ছবি: দ্য ন্যাশনাল থেকে নেয়া || এএফপি
|| দোনোমনা লোকজন ||
লজ্জার শেষ দেয়াল পড়লো ধসে
আর খুশি হলাম আমরা...
আর নাচলাম
আর কাপুরুষদের শান্তির গানে ধন্য হলাম আমরা...
কিছুই আর আমাদের সন্ত্রস্ত করবে না।
কিছুই আর লজ্জার কারণ হবে না।
কারণ অহংকারের শিরাগুলো আমাদের মাঝে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
ধসে পড়ুক...
পঞ্চাশতম বারের মতো—আমাদের সতীত্ব...
কোন কাঁপকাঁপি... কিংবা কান্নাকাটি ছাড়াই...
কিংবা রক্তের দৃশ্যে আতঙ্ক ছাড়াই...
দুনোমনোভরা কালের ভেতর প্রবেশ করেছি আমরা...
আর সার বেঁধে দাঁড়িয়েছি, গিলোটিনের সামনে ভেড়ার পালের মতো
আমরা ছুটে গেলাম... আর চেঁচিয়ে উঠলাম...
আর নেমে পড়লাম খুনীর বুটে চুমো খাওয়ার প্রতিযোগিতায়...
পঞ্চাশটা বছর তারা আমাদের শিশুদের ক্ষুধার্ত রেখেছে
আর উপবাসের শেষে, আমাদের দিকে ছুঁড়ে দিলো...
এট্টুক একটা রসুন…
গ্রানাডার পতন হলো
—পঞ্চাশতম বারের মতো—
আরবদের হাত থেকে।
আরবদের হাত থেকে ইতিহাসের পতন হলো।
তেজের স্তম্ভগুলোর পতন হলো... কৌমের শাখাউপাশাগুলোরও...
পতন হলো যতো বীরত্বভরা গানের...
পতন হলো সেভিলের...
পতন হলো আন্তিয়খের...
পতন হলো আম্মোরিয়ার...
আর পতন হলো হিট্টনের, একবারেই লড়াইবিহীন।
মেরীর পতন হলো দ্রোহীদের হাতে
আর কেউ রইলো না সেখানে স্বর্গীয় প্রতীকটিকে বাঁচানোর
আর কোন পৌরুষও রইলো না...
আমাদের শেষ প্রিয়জনের পতন হলো
রোমানদের হাতে, তারপর আর কীসের রক্ষায় লড়ছি আমরা?
একজন রক্ষিতাও নেই আমাদের প্রাসাদে...
কে বানাবে কফি... আর কে দেবে কাম...
তাহলে কী রক্ষায় লড়ছি আমরা??
কিছুই অবশিষ্ট নেই আর হাতে...
হাতে আছে কেবল একটা আন্দুলাসই,
তারা চুরি করলো দরজা
আর বেড়াগুলো,
আর স্ত্রীদের, আর শিশুদের,
জলপাই, আর তেল,
আর খোয়াপাথর যতো রাস্তার।
তারা যিশুকে চুরি করেছে, মেরীর শিশুকে,
যখন কিনা সে মায়ের দুধই ছাড়েনি।
তারা আমাদের কাছ থেকে লেবুর স্মৃতিও চুরি করেছে...
আর খোবানি... আর পুদিনার পাতা,
আর মসজিদের বাতিগুলো...
তারা আমাদের হাতে সার্ডিন মাছের একটা ক্যান ধরিয়ে দিয়েছে
নাম (গাজা)...
একটা শুকনো হাড়, নাম (জেরিকো)
একটা সরাইখানা, নাম ফিলিস্তিন,
যার ছাদ নেই, আর খিলানও নেই...
তারা হাড্ডিবিহীন একটা শরীর ফেলে গেছে
আর আঙুলবিহীন একটা হাত...
এমনকিছু ধ্বংসাবশেষও অবশিষ্ট নেই যার জন্য কান্নাকাটি করবো
একটা জাতি কীভাবে কাঁদে…
যাদের অশ্রুটুকুও ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে??
অসলোতে এই গোপন তোষামুদির পর,
বেরিয়ে এলাম আমরা ফাঁপা হয়ে...
তারা আমাদেরকে গমের দানার চেয়েও ক্ষুদ্র একবিন্দু জন্মভূমি মঞ্জুর করেছে...
একটা জন্মভূমি, আমরা পানিছাড়াই যাকে গিলে ফেলতে পারি
এসপিরিনের একটা বড়ির মতো!!...
পঞ্চাশ বছর পর...
আমরা এখন বসে আছি, একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশের ওপর।
হাজার হাজার কুত্তার মতোই... কোনো আশ্রয় নেই আমাদের!...
পঞ্চাশটা বছর পর...
বসবাসের জন্য একটা জন্মভূমি পেলাম না আমরা
মরিচিকাটুকু ছাড়া।
এ কোনো স্বীকৃতি নয়...
যে স্বীকৃতি, ড্যাগারের মতো, আমাদের ভেতরে ঢুকে পড়ে...
এ তো ধর্ষণমাত্র!!...
এই দুনোমনো কোন কাজে আসে??
কোন কাজে আসে এই দুনোমনো??
যখন কিনা জনগণের সচেতনতা বড়ো জীবন্ত
বোমার ফিউজের মতোই...
অসলোর সমস্ত সাক্ষর মিলিয়েও
একদানা সরিষার সমান হবে না!!...
সবুজ শান্তির কী-স্বপ্নই না দেখতাম আমরা।
আর একটা সাদা শুকপক্ষ চাঁদের।
আর এক নীল সাগরের।
আর ছড়ানো পালের...
আর আচমকা দেখতে পেলাম আমাদের
একটা গোবর গাদায়!!...
কারা জিগ্যেস করবে তাদের
কাপুরুষদের শান্তি সম্পর্কে??
তেজি আর সামর্থবানদের শান্তির কথা নয়।
কারা জিগ্যেস করবে তাদের??
কিস্তিতে বেঁচে দেওয়া শান্তির কথা,
কিস্তিতে ভাড়া খাটানোর কথা...
আর লেনদেন...
আর ব্যাবসায়ী... আর শোষণকারী সম্পর্কে??
কারা জিগ্যেস করবে তাদের?
মৃতদের শান্তি সম্পর্কে...
তারা স্তব্ধ করে দিয়েছে পথঘাট...
আর সমস্ত প্রশ্নকে খুন করেছে...
আর সমস্ত প্রশ্নকারীকে...
আর আমরা প্রেমহীন বিয়েতে বাধ্য হলাম...
সেই মহিলাকে যে একদিন আমাদের শিশুদের খেয়ে ফেলেছিলো...
আর আমাদের কলজে চিবিয়েছিলো...
তাকেই নিয়ে গেলাম আমরা হানিমুনে।
আর পান করলাম আমরা... আর নাচলাম...
আর স্মরণ করলাম সমস্তকিছু যা প্রেমের কবিতাতেই ধরে রাখি আমরা।
তারপর আমরা দুর্ভাগ্যের ফেরে জন্ম দিলাম পঙ্গু শিশুদের
ব্যাঙের শরীর পেলো তারা...
আর আমরা দুঃখের ফুটপাতে নিক্ষিপ্ত হলাম
আলিঙ্গনের কোন দেশ ছাড়াই...
কিংবা কোন শিশু!!
কোন আরবই ছিলো না ওই বিয়েতে নাচার জন্য
কিংবা কোন আরবীয় খাবার।
কিংবা কোন আরবী গান
কিংবা কোন আরবীয় লজ্জা
দেশের সন্তানেরা বিয়ের প্রদর্শনী থেকে ছিলো দূরে।
অর্ধেক যৌতুক ছিলো ডলারেই...
ডলারেই ছিলো হীরের আংটিটা...
আদালতের কেরানির ফি-টাও ছিলো ডলারেই
আর বিয়ের কেকটাতো ছিলো আমেরিকারই পাঠানো উপহার...
আর বিয়ের গদি, আর ফুল, আর প্রদীপ
আর মেরিনে’র বাজনা
সব সবই ছিলো আমেরিকায় তৈরি।
শেষ হলো বিয়ে... আনন্দের মাঝে ছিলো না ফিলিস্তিন।
কিন্তু নিজের ছবিটি দেখতে পেলো সে সমস্ত চ্যানেলেই...
আর দেখতে পেলো তার চোখের জল সাগরের ঢেউগুলো সেলাই করছে...
শিকাগোর দিকে... আর জার্সি... আর মায়ামির দিকে
জবাই করা পাখির মতোই চেঁচাচ্ছিলো সে তখন
এই বিয়ে আমার বিয়ে নয়
এই জামা আমার জামা নয়...
এই লজ্জা আমার লজ্জা নয়...
আমেরিকা... কখ্খনোই না
আমেরিকা... কখ্খনোই না
আমেরিকা... কখ্খনোই না
আরবি থেকে ইংরেজি: লেনা জায়োসি ও দিয়া হাদিদ
|| জেরুজালেম ||
কাঁদলাম আমি চোখের জল যতক্ষণ না শুকায়
প্রার্থনা করলাম টিম টিম করে দীপ জ্বলে যতোক্ষণ
যতক্ষণ না ক্যাঁচ-ক্যাঁচ করে ওঠে ভূমি ছিলাম সেজদায়
মোহাম্মদ আর যিশু সম্পর্কেও আমি করলাম জিগ্যেস
ও জেরুজালেম, রসুলদের সৌরভ
আকাশ ও মর্ত্যরে সবচেয়ে ছোট্ট পথ
আইনের দুর্গ, ও জেরুজালেম
পুড়ে যাওয়া কালো আঙুল
আর নিরাশ চোখের এক অপূর্ব শিশু তুমি
রসুলের অনুমোদিত ছায়াময় মরুদ্যান তুমি
তোমার পথগুলো বিষাদছাওয়া
তোমার মিনারগুলো রোদনভরা
তুমি কালো পোশাকে ঢাকা যুবতী রাজকুমারী
জেলখানায় কে ঘণ্টা বাজায়
শনিবারের সকালবেলায়?
কে শিশুদের জন্য খেলনা আনে
বড়োদিনের উৎসবে?
ও জেরুজালেম, দুঃখের শহর
অশ্রæর বিশাল একটা ফোঁটা খেলা করে চোখে
কে তোমার ওপর
আগ্রাসন থামাবে, ও ধর্মসমূহের মুক্তা?
কে তোমার রক্তমাখা দেয়াল ধুয়েমুছে দেবে?
কে রক্ষা করবে বাইবেল?
কোরানকে বাঁচাবে কে?
কে রক্ষা করবে যিশুকে?
কে রক্ষা করবে মানুষকে?
ও জেরুজালেম আমার শহর
ও জেরুজালেম আমার প্রেম
লেবু গাছগুলো আগামিকাল ফুল ফোটাবে
আর জলপাই গাছটিও আনন্দ জানাবে
তোমার চোখগুলো নেচে উঠবে
ফিরে আসবে পরবাসী কবুতরগুলো
তোমার পবিত্র ছাতে
আর ফের খেলতে থাকবে তোমার ছেলেমেয়েরা
এবং বাপ ও ছেলে মিলিত হবে আবার
তোমার রক্তমাখা পাহাড়গুলোর গায়ে
ও আমার শহর
শান্তি আর জলপাইয়ের শহর
আরবি থেকে ইংরেজি: শরিফ এলমুসা ও নাওমি শিহাব নাই
|| আঁকার মাধ্যমে পাঠ ||
রঙের বাক্সটি সামনে এনে রাখে ছেলে আমার
আর একটা পাখি এঁকে দিতে বলে আমাকে।
ধূসর রঙের মধ্যে আমি ডুবিয়ে দিই তুলিটা
আর আঁকি একটা বর্গক্ষেত্র তালা-খিড়কিসহ।
ওর দুচোখ ভরে ওঠে বিস্ময়ে:
‘... কিন্তু এ তো জেলখানা, বাবা,
পাখি আঁকতে কি জানো না তুমি?’
ওকে বলি, ‘ক্ষমা করো বাপ আমার।
পাখির চেহারা যে ভুলে গেছি আমি।’
***
ছেলে আমার তার রঙ পেন্সিল সামনে রেখে
সমুদ্র এঁকে দিতে বলে এবার
আমিও একটা পেন্সিল নিয়ে
একটি কালো বৃত্ত এঁকে দিই।
ছেলে আমার বলে,
‘কিন্তু এ তো কালো বৃত্ত, বাবা!
তুমি কি জানো না সমুদ্র কতটা নীল?’
আমি বলি,
‘ছেলে আমার, আমি তো সমুদ্র আঁকতে পারি
কিন্তু তারা যে আমার মাছ ধরার বর্শি আর নৌকাও নিয়ে গেছে
নীল রঙের সাথে যে কথা বলা নিষেধ করেছে তারা
এমনকি আমাকে মাছ ধরতেও নিষেধ করেছে স্বাধীনতার জলে।’
***
ছেলে আমার ছবির বইটা সামনে নিয়ে আসে
আর একটা গমের শীষ এঁকে দিতে বলে আমাকে।
কলমটা হাতে নিই আমি
আর এঁকে দিই একটি বন্দুক।
আমার মূর্খতায় মুখ ভ্যাঙচায় ছেলে,
আর অভিযোগ করে,
‘বাবা তুমি কি বন্দুক আর গমের শীষের
পার্থক্য জানো না।’
ওকে বলি, ‘বাবারে
গমের শীষের চেহারা তো চিনতাম একদিন
চিনতাম রুটির চেহারা
চিনতাম গোলাপের চেহারাও
কিন্তু এই দুঃসময়ে
এমনকি বনের গাছপালাও তো যোগ দিয়েছে সেনাবাহিনীতে
আর গোলাপেরা গায়ে চড়িয়েছে বিবর্ণ জামা
সশস্ত্র গমশীষ
সশস্ত্র পাখি
সশস্ত্র সংস্কৃতি
আর সশস্ত্র ধর্মের এই কালে
একটা রুটিও কিনতে পারবি না তুই
বন্দুক নেই ভেতরে যার
মাঠে একটা গোলাপও পাড়তে পারবি না
যা তোর মুখের দিকে কাঁটা খাড়া করে নেই
এমন একটা বইও কিনতে পাবি না
যা তোর আঙুলের ফাঁকে ফেটে পড়বে না।’
***
ছেলে আমার বসে বিছানার পাশেই
আর বলে কবিতা শোনাতে।
বালিশের গায়ে আমার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে এক ফোঁটা।
ছেলে আমার তুলে ধরে ওই ফোঁটাটা, আর বিস্ময়ে জানতে চায়:
‘এ তো কবিতা নয়, বাবা, চোখের পানি।’
ওকে বলি,
‘যখন বড়ো হবি রে বাপ আমার, আরব কবিতার সংগ্রহটি পড়ে নিস
কবিতা আর শব্দ-যে যমজ আর আরবি কবিতা-যে
লিখনরত আঙুলগুলোর অশ্রু ছাড়া আর কিছুই নয়,
আবিস্কার করতে পারবি তুই।’
***
ছেলে আমার কলম আর রঙ পেন্সিলের বাক্সটি
সামনে এনে রাখে এবার
আর অনুরোধ জানায় তাকে স্বদেশ এঁকে দিতে একটা।
কেমন কাঁপতে থাকে হাতের তুলিটা আমার।
আরবি থেকে ইংরেজি: দিয়া হাদিদ, রানা বিতার ও রবার্ট বেনসেন
বাংলা অনুবাদ: রথো রাফি



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন