মুনেম ওয়াসিফের ‘ক্রমশ’: স্পর্শের বাইরে থেকে দেখা
শিল্প-সাহিত্যের কাছে আমাদের অবদমিত কিছু আকাঙ্ক্ষা থাকে। আমাদের এমন কিছু চাওয়া থাকে যা শেষ পর্যন্ত ইন্দ্রিয়ের সীমানা প্রাচীর ভেদ করে যায়। শিল্প বস্তুত আমাদের একটা শূন্য অবস্থা প্রস্তাব করে। যদিও সেটা আমরা কখনোই ধরতে পারি না। এটা অনেকটা জীবনানন্দের সেই ‘বোধ’র মতো কিংবা জলের মতো একা একা ঘুরে ঘুরে কথা বলার মতো। যে কোনো আর্ট লিটরেচারকে আমি মূলত একটা তন্দ্রাভাবাপন্ন অবস্থার ভেতর দিয়ে পেতে চাই, তাকে স্পর্শ করতে চাই কিন্তু ধরতে চাই না।
মুনেম ওয়াসিফের দৃশ্যশিল্প প্রদর্শনীতে ঘুরতে ঘুরতে ‘ক্রমশ’ সেই ‘স্পর্শের’ অনুভূতিটুকুই যেন পেলাম। অনুভূতি আসলে কখনো পুরোপুরি বোঝানো যায় না। লিখে বা বলে কোনোভাবেই না। তাই আমি যা বর্ণনা করব তা নিতান্তই অন্ধের হাতি দেখার মতো। আমার ধারণা যেকোনো শিল্পের যেকোনো ব্যাখ্যামূলক বয়ানই শেষ পর্যন্ত আসলে হাতি দেখাই। ফলে ছবি ধরে ধরে বা চলচ্চিত্রের ব্যাখ্যা বা বর্ণনা দেওয়ার কাজটা সচেতনভাবেই আমি করব না। আমি কেবল এই প্রদর্শনী দেখার পর যে অনুভূতিটুকু তৈরি হলো তা ধরার চেষ্টা করব। যদিও আগেই বলেছি যে সেটা পুরোপুরি ধরা সম্ভব না।

ছবি: ক্রমশ © মুনেম ওয়াসিফ
‘ক্রমশ’ একই সঙ্গে আলোকচিত্র, ফিল্ম ও ভাস্কর্যের মিশ্র মাধ্যমে তিনটি পর্বে সাজানো। এই পর্বগুলোর নাম—অন্তর্গত, সামান্য ও খেয়াল। আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ শার্ল বোদলেয়ার ফটোগ্রাফিকে নকল নবিশ বলে মনে করতেন। খানিকটা তাচ্ছিল্য নিয়েই তিনি কথাগুলো বলেছেন। কিন্তু ফটোগ্রাফি বোদলেয়ারের সেই স্তর পার করে এসেছে আরও অনেক আগে। এমনকি ফটোগ্রাফি এরই মধ্যে বোধের অনেকগুলো স্তর পেরিয়েও গেছে। সেই পেরিয়ে যাওয়ার একটা নিরবচ্ছিন্ন পর্যায়ে আমরা দাঁড়ায় মুনেম ওয়াসিফের আলোকচিত্রের সামনে। সাদাকালো ছবিগুলো ব্যক্তি আমাকে সেই ফ্রেমের ভেতর নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়, যে ফ্রেমের ভেতর এক সময় আমার রোজকার দিন যাপন ছিল। মুনেম ওয়াসিফের পুরো প্রদর্শনীর পাটাতন পুরান ঢাকা। পুরান বলতে আদি ও অকৃত্রিম অবস্থাকে বোঝানো হয়, সেটাই মূলত পুরো প্রদর্শনীর প্রাণ। কিন্তু আমি চেষ্টা করেছি পুরান ঢাকার গৎবাঁধা বৃত্ত থেকে বেরিয়ে একটা সামগ্রিকতার সন্ধান লাভের। এটা করতে গিয়েই মূলত চমকটা পেয়েছি। দেখতে দেখতেই বুঝতে পারলাম যে, কেউ চাইলে এটাকে পুরান ঢাকা থেকে বেরিয়েও পাঠ করতে পারে।
যেমন এই একই দৃশ্যগুলোই আমরা চুল কাটতে গিয়ে পাড়া মহল্লার সেলুনে বসে দুই টাকার পত্রিকা পড়তে পড়তে কিংবা বাদশা বুলবুল, মনির খান অথবা নাদিম-শ্রবণের গান শুনতে শুনতে দেখতাম। আপনি যখন এসব ছবির ভেতর থাকবেন তখন সেগুলোকে আলাদা কিছু মনে হবে না। কিন্তু যখনই আপনি এর বাইরে যাবেন, তখন সেগুলো নন্দনতত্ত্বের ফ্রেমের ভেতর দিয়ে আপনার কাছে ধরা দেবে। যা আপনাকে উৎফুল্ল করবে, আবেগে ভাসাবে। এটা অনেকটা আপনার অতীতের যাপনের ভেতর থেকে দৃশ্যগুলোকে ফালি ফালি করে কেটে এনে দেখানোর মতো।

ছবি: ক্রমশ © মুনেম ওয়াসিফ
আর এ কারণেই এই ছবিগুলো আমার কাছে শিল্পের স্তর পেরিয়ে স্মৃতি অবধি পৌঁছে যায়। আর যে কোনো শিল্প যখন আপনার স্মৃতিকাতর অনভূতিকে জাগ্রত করে, তখন আপনি নিশ্চিতভাবে তার প্রতি পক্ষপাত অনুভব করতে শুরু করেন। মুনেম ওয়াসিফের ‘অন্তর্গত’ও আমার ভেতর সেই পক্ষপাতটুকু জাগিয়ে তুলতে পেরেছে। তবে মফস্বলীয় যাপনের এই খণ্ডবৈচিত্র্যের দিন পেরিয়ে আমাদের বাস্তবে ফিরতে হয়। আমরা আলোচিত্রগুলোকে তার ফ্রেম বন্দী হওয়ার মুহূর্ত বিন্দু দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। মহল্লার ভেতর মানুষের যাতনাময় রোজকার জীবনে যে জাদুবাস্তবতার উৎপাদন হচ্ছে, সেগুলোই মূলত ধরা পড়েছে এই আলোচিত্রগুলোয়। সামান্য সেই মুহূর্তগুলোয় মূলত দুর্দান্ত টাইমিংয়ের কাছে পরাভূত হয়ে জন্ম দিচ্ছে মহাকাব্যিক সব মুহূর্তের। যা দেখতে দেখতে এক সময় আপনি ঘোরটা অনুভব করতে পারবেন, আর বুঝতে পারবেন মানুষের ক্ষুদ্র জীবন আসলে কতটা মহৎ।
আপনার এই দেখা আরেকটু বিমূর্ততার ভেতর প্রবেশ করবে যখন ‘সামান্য’র সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন। সামান্য কিন্তু মোটেই সামান্য নয়। আমার মনে হয়েছে, এই পর্বটি ব্যাপকভাবে আপনাকে সক্রিয় করে তোলে। যা আপনি সবগুলো ইন্দ্রিয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারবেন। আপনার এমনও মনে হতে পারে যে, এই পর্বে আপনি নিজেও আর্টের একটা অংশ। আপনার উপস্থিতি ছাড়া এই আর্টের আসলে কোনো অস্তিত্বই নেই। কারণ বিমূর্ততার ভেতর দিয়েই এটি আসলে মানুষের নিদারুণ দিনযাপনের সাক্ষী হয়ে আছে। যে কারণে এখানে এসে আমি কিছু সময়ের জন্য থমকেই গিয়েছিলাম। সেই থমকে যাওয়ার বোধটুকু প্রদর্শনী থেকে বেরিয়ে আসার পর অনেকক্ষণ পর্যন্ত আমার সঙ্গে ছিল।

ছবি: ক্রমশ © মুনেম ওয়াসিফ
‘খেয়াল’কে আমার মূলত অন্তর্গত ও সামান্যর এক ধরনের মিথস্ক্রিয়া বলেই মনে হয়েছে। অবশ্যই আক্ষরিক অর্থে না। কিন্তু পরপর দেখতে গিয়ে আমি আগের দুটি পর্ব থেকে এখানে একধরনের উত্তরণ দেখতে পেয়েছি। এই উত্তরণে জহিরীয় ভাষা বিশ্ব দিয়ে গড়া ইগলু ও ইলিয়াসের সবাইকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার দুঃসাহসের ঝলকও দেখি। এটা মূলত দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি জগতের মধ্যে এক ধরনের সেতু তৈরি করে। যা আমাকে ঠিক মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দেয়। অতীতের ডাক ও বর্তমানের আহ্বানের ভেতর দিয়েই আমি নিজেকেও যেন সারাক্ষণ ভনভন করে বাজতে থাকা সুরের ভেতর হারিয়ে ফেলি। যে কারণে এসব আর্ট এতই ব্যক্তিগত হয়ে উঠে যে সেই সুর কেটে যাওয়ার পরও আমরা অনেকটা সময় আর বেরোতে পারি না। আর যখন পারি তখনো এর খানিকটা যেন আমাদের ভেতরেই রয়ে যায়। শিল্পী মুনেম ওয়াসিফের ‘ক্রমশ’ শিরোনামের এই প্রদর্শনীটি চলবে ৩১ মে ২০২৫ পর্যন্ত।
নোট: রাজধানীর বেঙ্গল শিল্পালয়ে শিল্পী মুনেম ওয়াসিফের ‘ক্রমশ’ শিরোনামের প্রদর্শনীটি শুরু হয় ১৮ এপ্রিল ২০২৫ সালে।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন