বেন ওকরির কবিতা ‘আফ্রিকার শোকগাথা’

অ+ অ-

 

|| বেন ওকরি প্রসঙ্গে ||

‘আমি যা কিছু করি তার সবই কবিতা থেকে আসে। আমি মূলত এক কাব্যিক সত্তা। কবিতা বলতে আমি ছন্দ মাত্রা বা সিলেবেলের কথা বলছি না। এটি আমার কাছে দেখার ভিন্ন ভিন্ন রূপ, অস্তিত্বের ভিন্ন ভিন্ন ধারা, বস্তুগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক, স্পর্শক, পরিসর, ইশারা এবং চারপাশের চাপ ও ফাঁক।’
—বেন ওকরি
২০১৭ সালে ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’ চলাকালে The Luxembourg Review-কে দেয়া সাক্ষাৎকারে নিজের লেখালেখি সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে বেন ওকরি এমনটাই বলেছিলেন। অর্থাৎ কথা সাহিত্যে সমোধিক পরিচিত হলেও বেন ওকরি নিজেকে একজন কাব্যিক সত্তাই মনে করেন। এমনকি তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য ফেমশিড রোড’ সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে আলোচনাকালে নিজের পরিচয় দেন কবি, ঔপন্যাসিক, ছোট গল্পকার, পরিবেশবাদী এক্টিভিস্ট এভাবে।

নাইজেরীয় বংশোদ্ভুত ব্রিটিশ লেখক স্যার বেন গোল্ডেন এমুওবোহো ওকরি ওরফে বেন ওকরি নামে সারাবিশ্বে পরিচিত। পোস্ট-মর্ডান ও পোস্ট-কলোনিয়াল ধারার আফ্রিকান সাহিত্যিকদের মধ্যে তাকে অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার কাজে আধ্যাত্মিকতা, দার্শনিকতা, বাস্তব ও পরাবাস্তবের মধ্যে এক ধরনের সংযোগ স্থাপিত হতে দেখা যায়। অনেক সমালোচক তার বেশকিছু কাজকে আফ্রিকান ম্যাজিক রিয়েলিজম আখ্যায়িত করেন। কেউ কেউ বলেন ফ্যান্টাসি রিয়েলিজম।

বেন ওকরির জন্ম ওয়েস্ট সেন্ট্রাল নাইজেরিয়ার মিন্না শহরে ১৯৫৯ সালের ১৫ মার্চ। পিতা ইয়োরুবা এবং মা অর্ধ-ইগবো গোত্রের হওয়ায় নাইজেরিয়ার অসংখ্য জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে প্রধান দুই গোষ্ঠীর ঐতিহ্যিক পরম্পরা তিনি বহন করেন। শৈশবেই পরিবারের সাথে লন্ডন চলে যান তিনি। কিছুকাল পরে ১৯৬৬ সালে তার পরিবার পুনরায় নাইজেরিয়ায় ফিরে আসে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত নাইজেরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলাকালে বেন ওকরি স্থানীয় কলেজে সেকেন্ডারি লেভেলের ছাত্র ছিলেন। ওই যুদ্ধ বেনের কিশোর মনে গভীর রেখাপাত করেছিল, যা পরবর্তীকালে তার সাহিত্যকর্মে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে জায়গা করে নেয়। ১৯৭৮ সালে বেন ওকরি নাইজেরিয়া সরকারের বৃত্তি নিয়ে এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করতে লন্ডন চলে যান। ১৯৮০ সালে ২১ বছর বয়সে প্রথম উপন্যাস ফ্লাওয়ার্স অ্যান্ড শ্যাডোস প্রকাশিত হওয়ার মাধ্যমে তার সাহিত্যিক যাত্রা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ১৯৯১ সালে দ্য ফেমিশড রোড ট্রিলজির প্রথম উপন্যাস দ্য ফেমিশড রোড-এর জন্য তখনকার মতো সবচেয়ে কম বয়সে (৩২) ম্যান বুকার পুরস্কার পেলে আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক পরিমন্ডলে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। কমনওয়েলথ রাইটার প্রাইজ, আগা খান প্রাইজ, গার্ডিয়ান ফিকশন প্রাইজসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অনেক পুরস্কারই তিনি পেয়েছেন। ইংল্যান্ডসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের নামিদামী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে। ওকরির জন্মদিনে, ২০২৩ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে নাইট উপাধি দেন। তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্য কর্মউপন্যাস: ফ্লাওয়ার্স অ্যান্ড শ্যাডোস, দ্য ফেমিশড রোড, দ্য ল্যান্ডস্কেপ উইদিন, সংস অব এনচেন্টমেন্ট, অ্যাশটোনিশিং গড, ডেঞ্জারাস লাভ, ইনফিনিট রিচেস, ইন আর্কেডিয়া, স্টারবুক, দ্য এজ অব ম্যাজিক, ফ্রিডম আর্টিস্ট, দ্য লাস্ট গিফট্ অব দ্য মাস্টার আর্টিস্টস; ছোটগল্প: ইনসিডেন্টস এট দ্য শ্রাইন, স্টারস অব দ্য নিউ কারফিউ, টেলস অব ফ্রিডম, প্রেয়ার ফর দ্য লিভিং; প্রবন্ধ: বার্ডস অব হ্যাভেন, অ্যা ওয়ে অব বিয়িং ফ্রি, অ্যা টাইম ফর নিউ ড্রিমস; কবিতা: অ্যান আফ্রিকান এলিজি, মেন্টাল ফাইট, ওয়াইল্ড, রাইজ লাইক লায়নস: পোয়েট্রি ফর মেনি এবং অ্যা ফায়ার ইন মাই হেড: পোয়েমস ফর দ্য ডন ইত্যাদি।

১৯৯২ সালে তার প্রথম কবিতার বই অ্যান আফ্রিকান এলিজি প্রকাশিত হয়। আফ্রিকার ঔপনিবেশিক, উত্তর-ঔপনিবেশিক সংকট, নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধ এবং প্রেম ও মৃত্যু সম্পর্কিত চিরায়ত ভাবনার পটভূমিতে রচিত অ্যান আফ্রিকান এলিজি কাব্য সংকলন। অনূদিত কবিতাগুলো এ কাব্য সংকলন থেকে নেয়া হয়েছে।

ছবি: বেন ওকরি ওয়েব সাইটের সৌজন্যে 

 

বেন ওকরির কবিতা ‘আফ্রিকার শোকগাথা’

ভূমিকা ও অনুবাদ || তানভীর রাসেল

 

|| সাউথ আফ্রিকার একটি রাস্তার ছবি দেখে ||

আমাদের আত্মারা প্রতিরাতে হয়ে ওঠে আরও অদ্ভুতুড়ে,
প্রতিশোধের বাসনা বয়ে বেড়ায় তার নিজেরই দীর্ঘ অবসন্ন ছায়া।

দুঃস্বপ্নের গর্ভ থেকে উঠে আসতে পারে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, 
প্রেম আর যন্ত্রণাও হতে পারে ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকা।

রঙধনুকের দূরতম প্রান্তে
ভয়ের রাজ্যে
আমরাই খুঁড়ে বের করব
মানব দুর্দশার আর্তনাদে ভরা 
                       পাত্রটিকে।


|| আফ্রিকার শোকগাথা ||

আমরা সেই অলৌকিক ব্যাপার
সময়ের তিক্ত ফলের আস্বাদ দিতে ঈশ্বরই যা ঘটিয়েছেন।
আমরা মহার্ঘ,
আমাদের যাতনাগুলোও একদিন বিশ্বের বিস্ময় হবে।

যা কিছু আমাকে পোড়ায় এখন
আমার সুখ সেগুলোকেও দেয় সোনালী বৈভব।
তোমরা কি বোঝ আমাদের বেদনার নিগূঢ় রহস্য?
এই যেমন দারিদ্র্যের ভার কাঁধে নিয়েও
দিব্যি গান গাই আর মিষ্টি সব স্বপ্ন দেখতে পারি।

আমরা কখনোই অভিশাপ দেই না আন্তরিক বাতাসকে
                          সুমিষ্ট ফলকে
        কিংবা জলের উপর আলোর বিনীত নাচনকে।
কষ্টের উপকরণগুলোকেও আমরা আশীর্বাদ করি;
                          করি সুগভীর স্তব্ধতায়।
এজন্যেই আমাদের সংগীত এতো মধুর যাকে বাতাসও পারে না ভুলতে।
অনেক গোপন অদ্ভুত ব্যাপার থাকে আমাদের কর্মে,
সময়ই একদিন প্রকাশ করবে সব।

আমিও শুনেছি মৃতদের গান।
তারা গায় যে, এ জীবনই ভালো
হোক তার বিনীত যাপন, সাথে নিয়ে আগুন ও আশা।
এখানেই বিস্ময়।

এখন অদৃশ্য পদক্ষেপের সবকিছুতেই চমক
                       সাগরে সুরের লহরী
                       আকাশ প্রতিপক্ষ নয়
                       নিয়তিই আমাদের বন্ধু।

 

|| ইলে-ইফে, ৮৬ ||

যখন ইফেতে পৌঁছলাম
দুপুরের খরতাপ ছিল অদম্য
যেনবা নেশার হ্যাংওভার, যা কখনোই কাটবে না। 
শহুরবাসীরা তাকালো আমাদের দিকে,
ক্ষুধা মৃত্যু আর ছলনাময় ইতিহাসের উন্মাদনায় 
তাদের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল বিকৃত। 

আর আমরা—উদ্বিগ্ন শহরের আগন্তুক—অপলক বিস্ময়ে দেখলাম
তপ্ত কুয়াশায় মোড়ানো এক স্থবির নগরী,
চোখের নিরব উত্তেজনা নিয়ে নগরবাসী শুধু তাকিয়েছিল আমাদের দিকে। 

ইফেতে পৌঁছানোর পর 
ডুবে গেলাম এক প্রেমময় বিষাদে
ফাঁদে আটকা পড়া প্রজাপতির মতো অবরুদ্ধ সে প্রেম;
হলদে ধোঁয়াশায় মোড়ানো হাওয়ায় উড়ার ক্ষমতাহীন।
পরিত্যক্ত গ্যারেজে গুটিয়ে থাকা কুকুরের মতো
যন্ত্র দানবের ছায়ায় ভেতর খোঁড়াতে থাকা তিন পেয়ে বিড়ালের মতো
আর দুপুরের সেই অদম্য খরতাপের মতো সে প্রেম; 
যেনবা এমন এক জ্বর, যা কখনোই সারবে না।

নোট: ইলে-ইফে হলো দক্ষিণ-পশ্চিম নাইজেরিয়ার ওসুন রাজ্যে অবস্থিত একটি প্রাচীন শহর। ইয়োরুবা মিথ অনুযায়ী এখানেই দেবতা ওবাতালা পৃথিবী সৃষ্টি করেন। শহরটি ১২শ থেকে ১৫শ শতাব্দীতে নির্মিত ব্রোঞ্জ, পিতল ও টেরাকোটার ভাষ্কর্যের জন্য বিশ্বখ্যাত। শহরটিকে ইয়োরুবা সংস্কৃতির আত্মিক রাজধানী হিসেবে গণ্য করা হয়।

 

|| আমি তোমাকে বলব ||

আমি তোমাকে বলব
ভালোবাসার অর্থ
যখন স্থিমিত হবে
শহরের বিধ্বংসী আগুন।

আমরা তোমাকে দেখাব
কঙ্কালের অদ্ভুত সৌন্দর্য
যখন দাফন সম্পন্ন হয়ে যাবে
যখন রক্তমাখা সামরিক সঙ্গীত বেজে উঠবে করুণ সুরে
যখন জাতি নিধনের বিভীষিকার মধ্যে সদ্যোজাত শিশুরা যাবে বেঁচে। 
যখন মায়েরা ভুলে যেতে শিখবে
আর আমরা বাকীরা আশাবাদী চোখে তাকাব দিগন্তের দিকে
যখন নতুন প্রজন্ম প্রশ্ন করতে শুরু করবে রাগ ও প্রতিবাদের ভাষায়;
আমরা তখন ব্যাখ্যা করব
                 আত্মার রহস্য
                 স্পর্শের জাদু
                 চোখে-মুখে আন্তরিক নিঃশ্বাসের সূচনা।

যখন সময় পুড়িয়ে ফেলবে নিজেকে
আর ছাইভষ্ম থেকে জেগে উঠবে বীরেরা 
আর নতুন প্রতিমা গড়া হবে মনের স্থিতির জন্য—
হয়তো আমরা আবার ভালোবাসতে শিখব
যেহেতু আমরা লড়াই করি ইতিহাসের দুঃসহ পরিস্থিতির ভিতর।

 

|| আমাদের আর কোন পথ খোলা নেই ||

আমাদের আর কোন পথ খোলা নেই 
জীবনের জ্বালাময় বাতাসের ভিতর দিয়ে যাওয়া ছাড়া।
এই গুমোট পরিবেশই আমাদের।

রাত্রি অস্বীকার করে আমাদের অংশগ্রহণ
সূর্যের আলো বিদীর্ণ হয় আমাদের যন্ত্রণার ওপর।
কতগুলো দমিত মুখের প্রয়োজন
স্পষ্ট করতে আমাদের উদ্বেগ?
কতগুলো ভাঙ্গা হাত পা হলে
সবকিছুর পুনর্গঠন হবে প্রতীক্ষার নীরবতায়?

একটা শাসন নেমে আসে
আর আমাদের মস্তিস্ক গলে ঝরে পড়ে ছাইভষ্ম
আমরা অগ্নিগিরির কিনার ধরে পা টিপে টিপে হাঁটি।
তর্ক করি সূক্ষ্ম অবোধ্য বিষয় নিয়ে
              নির্দয় দেবতাদের শ্যেন দৃষ্টির নিচে।

আমাদের আর কোন পথ খোলা নেই
শুধু চলতে হবে
চামড়ার সিক্ত ব্যথার নিচে
আর মাথার ওপর জ্বলন্ত আগুন নিয়ে।
আমাদের আর কোন বিকল্প নেই
কিন্তু বাঁচতে হবে আরো তীব্রভাবে
যখন সেনারা জড়ো হচ্ছে 
আর আমাদের ভয়গুলোকে জায়গা দিতে 
                       পৃথিবী হচ্ছে প্রসারিত। 

৩ 

শেকড়ের প্রজ্ঞা প্রাধান্য পাক
যাতে আমরা দেখতে পারি
আমাদের ভয়ে দানবদের বিস্ফারিত চোখ। 
হয়তো তারা বিস্ফোরণ ঘটাবে অদ্ভুত ডেটোনেটরগুলোর
কিন্তু আমরা জবাব দিব
আমাদের জখমজুড়ে মিশে থাকা যাতনাদগ্ধ ভালোবাসা দিয়ে,
সহিংসতার জ্যামিতি ও প্রচল প্রথার বিশ্বাস দিয়ে।
আমরা প্রাচীর ভাঙ্গব
              আয়নায় ধরাবো ফাটল
              ভয় দেখাবো শাদা মোরগকে 
              তার পালক দিয়ে। 
আমরা সেখানে থাকবো
জীবনের সূচনাতেই। 

আমাদের প্রত্যঙ্গগুলো যেন উড়তে চায়।
আমরা রূপান্তর ঘটাব আমাদের পরাজয়ের,
বাড়াব কোণের বিস্তার,
বাড়াব উচ্চতা আর গভীরতা 
             শরীরের বশ না মানা আত্মার। 

মারি আমাদের গোপন নাম ধরে গজরায় 
বিহবল করে যায় দানবিক প্রেমে। 
মনের গভীর কোণে যে রূপান্তর ঘটে,
তা আমাদের উপহার দেয় মানব আকাঙ্ক্ষার তীর
আর দেখায় এক দয়ালু দেবতার স্বপ্ন। 

গোপন অগ্নিগিরির আলো আমাদের ডাকে
আগুন জল একত্রে মিশিয়ে মেজাজ বিগড়ে দেয়।
রাত ভয় দেখায়
সূর্যালোক অভিযুক্ত করে:
               নতুন করে নিশ্বাস নিতে হবে আমাদের
               এবং আত্মাকে করতে হবে সিক্ত—
               শীতল
                       জ্বলন্ত                                           
                               শিশিরে।

                        

|| আর যে শঙ্কিত হয় না ||

যে বাস্তবতার প্রবেশদ্বারে শঙ্কিত হয় না
গুঁড়িয়ে যাবে সে, যা কিছুরই মুখোমুখি হবে এই শহরে।
গোপন অন্ধকূপ আর ক্রমোত্থিত ইতিহাস 
যা কিছুরই মুখোমুখি হবে, গুঁড়িয়ে যাবে। 

প্রতিটি অজানা বাস্তবতার দ্বারে
কাটিয়ে উঠা সম্ভব
ভয় ও বিভ্রম: 
নিয়তিকে চমকে দিয়ে
দেখে নেওয়া সম্ভব
জীবনের অলৌকিক ব্যাপারগুলো।

 

|| ছোট্ট মেয়ে ||

ছোট্ট মেয়ে
এই সবুজ নদীতে
তোমাকে দেখি
নতুন অভিযাত্রার শেষ হাসিগুলো ধুয়ে ফেলছ
জলের নিষ্ঠুরতার তরঙ্গে
ধরছ, আকাশ থেকে নেমে আসা বিস্ময়কর আলোর ঝিলিক। 

ছোট্ট মেয়ে 
এই হিংস্র নদীতে
আমি সবিস্ময়ে তোমাকে দেখি 
ভাসছ দেহে রূপালি আভা নিয়ে
নদীর আগাছা আর মাছেদের ভীরে।
আরও মুগ্ধ হই
দেখি, তুমি ছড়িয়ে দিচ্ছ হাসি সেই নৌকার মাঝির দিকে 
যে পাক খাচ্ছে স্রোতের ঘূর্ণিতে
যে ঘুমের ভেতর ডুবে গিয়েছিল
যে স্বপ্ন দেখেছিল শেকড়ের এবং তোমার।

তোমার মুখের ক্ষতচিহ্নগুলো দেখি
যার ব্যাখ্যা জানা নেই তোমার
কিংবা এসব নিয়ে ভাবিতও নও
কারণ নদী এখন আর কোন প্রতিফলন দেয় না।
তোমার চোখের উত্তাপ আমাকে ডাকে
ওয়াচপোস্ট ছেড়ে যেতে, এই দারুণ খরার দিনে; 
আমি নেমে আসি আর দেখি
ঢেউগুলো জাগিয়ে তুলছে নতুন ভয়, এক ভয়ঙ্কর উপলব্ধি।

সব মাছ চলে গেছে
নদীর আগাছা নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে দূরে
তোমাকে বিচলিত হতে দেখি এই নিস্তব্ধতায়।
যখন পশুদল নদীতে ঝাঁপ দেয় তোমার সঙ্গী হতে:
আমি বুঝতে পারি তোমার ভয়ের কারণ।

ফুলে ঢাকা নদীতে
ও ছোট্ট মেয়ে,
তুমি খুঁজে পেয়েছ আশ্রয় জল-ঘূর্ণির এক কোণে:
মনে হলো এটি তোমার শেষকৃত্যের জন্য 
এমন এক নিরপেক্ষ স্থান,
হাওয়ার ভেতর থেকে তীক্ষ্ম আর্তনাদ ভেসে আসার আগেই 
যা আবিস্কার করবে তোমার গোপন রহস্যকে।

সবকিছু শেষ হয়ে গেছে এখন
পশুদল ভিড় করেছে তীরে
নদীতলের নরম স্তর মৃদু গুঞ্জনে প্রকাশ করছে
এক গভীর অস্বস্তি,
নদী তার প্রবাহ দিয়েছে উল্টে 
আর এখন তুমি ভেসে যেতে পারো সব শহরের দিকে—
এই ক্রমশ অন্ধকারে ঢাকা আকাশের নিচে।

তোমাকে একটা কথা বলতেই হবে:
            আমার ফিরে আসার পথে দেখলাম 
            ওয়াচপোস্ট ধ্বংস হয়ে গেছে
            আর ভগ্নপ্রায় এক নতুন টাওয়ার উঠেছে।
            পাগলদের এক মহোৎসব ছিল সেখানে
            বিভিন্ন ভাষায় সোল্লাসে গেয়েছে সীমাহীন বিশৃঙ্খলার গান—
                          নদীতে যখন প্রবাহিত হচ্ছে
                          তোমার এত এত অশ্রুজল…

 

|| বাতাসের দীপ্তি ||

বাতাসের দীপ্তি 
আমাকে বিরক্ত করে এই আঙুর বাগানে।
এমন তীব্র স্পষ্টতা কি আছে
কোলাহল নিয়ে যা প্রতিদিন জেগে উঠে নদীর বুক থেকে,
যাকে আমরা নিজেদের বলে জানি?

ইয়াম কন্দ রক্তাক্ত করে আমাদের দুঃখকে
মাঠের কাকেরা আর্তনাদ করে হতাশার।
ছুরি-চাকুর জং দূষিত করে আমাদের খাবার
প্রভুরা লুণ্ঠন চালায় ঠান্ডামাথায় হত্যার মাধ্যমে:
প্রামের পবিত্র স্মৃতি মন্দিরগুলোর চারপাশ ঘিরে 
মঙ্গল নৃত্য করে এসবের শিকার যারা। 

বাতাসে ভাসছে শীতল আগুন।
শুনতে পাই, আগুন কীভাবে গ্রাস করছে বীরদের কোমরের জোর
আর নিঃশেষ করছে শহীদদের অন্তর্নিহিত শক্তিকে।
আগুনের নাম লেখা আছে সমাধিফলকে:
জীবনের কন্দমূল আর আমাদের সম্মিলিত ভীরুতা পিষে বের হওয়া সে নাম। 

রাতে মায়েরা চিৎকার করে কাঁদে
শহরের আগুনে হারিয়ে যাওয়া শিশুদের জন্য
নিয়ন আলোয় আর উন্মাদনার অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া শিশুদের জন্য।
আমি শুনতে পাই রাস্তাগুলো থেকে ভেসে আসা কোলাহল: 
                পুরুষেরা হারিয়ে গেছে নথিপত্রের ভীরে
                কিংবা ঘুরে বেড়াচ্ছে সামরিক গুলাগুলির বিশৃঙ্খল তীব্রতার ভেতর।
                একটা প্রজন্ম ভিজে গেছে পেট্রোলে,
                ঝলসে গেছে ক্যাম্প-ফায়ারে বারবিকিউয়ের মতো—
                                                    নির্বাচন
                                                    দাঙ্গা
                                                    আর অভ্যুত্থানের উন্মাদনায়। 

বাতাসের দীপ্তি ভেতরে ভেতরে পোড়ে।
এই ভয়ের কি নাম পরিচয় আছে?
ভয়েভরা এমন কোনো দেশ কি আছে এই ভুমিতে,
যেখানে সবকিছুতেই তৈরি হয় এ ধরনের বাস্তবতা? 

সকালের জ্বলন্ত লোহার ভেতর থাকা 
এক গোপন রহস্যের কথা আমি শুনেছি।
প্রানীরা রক্তের ডিম পেড়েছে,
নারীরা আবিষ্কার করেছে গোপন রহস্য
মাংসের অবিচ্ছেদ্য আবরণের। 
নদীর তলদেশ আর ময়লার ভাগাড়ে থাকা অসংখ্য মৃত্যু
দূষিত করছে আমাদের জগৎ
ব্যর্থতার উত্তেজনাপূর্ণ অনুভূতি দিয়ে।
আমরা কি যোগ দেব তাদের সাথে
কিংবা উদযাপন করব ফাঁকা অফিসগুলোর চিত্র 
আর ক্ষমতার অদূরদর্শিতাকে?

আমাদের জমায়েতের সূচনা বিদ্রোহে পরিণত হোক: 
             আমরা উদযাপন করবো শীর্ণ বুক নিয়ে
             উচ্চে তুলে ধরবো মুষ্ঠিবদ্ধ হাত
             দীপ্তিময় বিস্ময়ে। 

আমি টের পাচ্ছি আলোর আনাগোনা,
ছিটকে বেরুচ্ছে উজ্জ্বল নীল শেকড় আর হলদে কঙ্কালগুলোর মধ্য দিয়ে 
আমরা সেসব হাড়গোড়ে ফেলেছি আমাদেরই আত্মপ্রেমের নিঃশ্বাস। 
মন্ত্র উচ্চারণ করেছি সেইসব কীটদের বিরুদ্ধে 
যারা ধবংস করে আমাদের শান্তিকে। 

সমাধির মাটি কেঁপে উঠে
নদীর তীর ফেলে দীর্ঘশ্বাস
আর আমি জেগে উঠি বিস্ময়ে: 
        —দীপ্তি আমাদের নিজেদের হয়েছে
        —কঙ্কালগুলো পুনরুদ্ধার করেছে ভূমি
        —একটি নতুন উদ্যম ফসফরাসে শ্বাস নিয়ে 
            বেড়ে উঠেছে সময়ের নীল শিকড়ে।