আ প্যাসেজ টু ম্যাডনেস

অ+ অ-

 

তেমন কিছু না।
একটা ঝাঁকড়া পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, 
যাতে মাথা যন্ত্রণা আর না করে,
যাতে রাতে ঘুম আসে প্রমিসিং প্রেমিকার মতো।
যাতে ওর মাথার ভিতরে যতো ফ্যাসিস্ট, 
আর দুনিয়ায় ফ্যাসিস্টদের যতো মাথা,
সব কাটা পড়ে একযোগে, রাতারাতি...

এইসব ওর সুখ-কল্পনা ছাড়া কিচ্ছু না আদতে। 
ছিমছাম সংবেদনের মতো ও শুয়ে থাকে শক্ত তোশকে, 
যতো ঘুম আসে না, ততোই ঘুমের আকাঙ্ক্ষা বাড়ে, 
ততোই মাথা যন্ত্রণা করে, দপদপ করে জ্বলে ওঠে ঘিলু, 
যেনো পৃথিবীর কেন্দ্রে শায়িত ও, কিংবা 
ওর মাথাটাই পৃথিবীর কেন্দ্র, 
উত্তপ্ত, 
পীড়িত;

যেনো এক দৌড়ে পাকিস্তান মাঠে চলে যেতে পারলে বেশ হতো;
সন্ধ্যায় ও ওইখানেই স্থিরমূর্তির মতো বসে বসে
কমপক্ষে এক লাখ বাদাম খেয়েছে, 
বাদামের খোসাগুলি গ্যালারির মার্বেল পাথরে
শায়িত, মূহ্যমান;
ওর মনে হয় ওই খোসাগুলিই আদতে সুখি, 
গায়ে-হুল-ফোটানো বাতাসের মধ্যেও কেমন শুয়ে আছে ওরা, 
চুপচাপ, স্থির, 
পরিত্যক্ত; 
এইরকম হালকা যেকোনো বস্তু, যেকোনো খোসা হতে পারলেই 
উতরে যাওয়া যেতো; 
ফল না, ফল খুব ভারি। 

তেমন কিছুই না। 
একটা ঝাঁকড়া পদক্ষেপে যদি ছুঁড়ে ফেলা যেতো
অন্তঃসার, ভিতরের দামি দামি কাতরতাগুলো, 
একটা আলতো ছোঁয়ায় যদি দুইটা হাতকে দুইটা ডানা, 
আর পেটের সব নাড়িভুড়ি, আর মাথার হলুদ, পিত্তের মতো তিতা,
খুনী চিন্তাগুলোকে শাদা, তুলতুলে পালক বানিয়ে ফেলা যেতো, 
তাহলে ঘুম আসতো, 
আর সন্ধ্যা নামার পরেই ঝিম ধরে বসে থাকতো ও, 
কেননা উড়বার কোনো বাসনা তখন থাকে না, যেমন নেই এখনো, 
বস্তুত ও হালকা হতে চায়, তাই পাখি হতে চায়। 

এই সুখ-যন্ত্রণাগুলো অতীতের সাথে মিলায়ে মিলায়ে পড়তে পারলে 
ওর অতীতটাও হয়তো আরো সহনীয় হতো,
এই যে এতো তিরস্কার, আর
মাঝেমাঝে ফিসফিস করে বলা, ‘ওহে সারাৎসার, দীর্ঘ দিনের যাপনের শেষে
তুমিও আর স্বরূপে থাকো না, বরং দেখলে মনে হয় 
চৌচির হয়ে গেছো ব্যর্থ পিতার অন্তঃকরণের মতো;
ওহে সারাৎসার, আমি তবু প্যারাসিটামল খেয়ে, অকারণে ফেক্সো খেয়ে, 
খানিকটা আরোগ্য-বিলাস করি, ঘুমানোর প্রাকটিস করি,
তোমার তো সে সুযোগও নেই;
তুমি যে মরবা, আমার মতন ছিন্ন হয়ে যাবা, তা-ও সম্ভব না; 
কারণ সারাৎসার মরে না, কিংবা মৃত্যু তোমার যোগ্য না, 
তুমি আমারে যতো আটকায়েই রাখো, 
আমি পালাবোই...’

এইসব ছেঁদো কথা বলতে বলতে ও ঘেমে ওঠে, 
ওর মাথায় ঘুরেফিরে হানা দিতে থাকে যাবতীয় উজবুক, 
আর সুমহান সব নিশানা:
জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডের মতে, ‘মুসলমানরা কোনো দিনও ইন্ডিয়ান হতে পারবে না, 
মানে ওদেরকে হতে দেওয়া হবে না আর কী'- সত্যিই।
তা, ও ভাবে, জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে কি জানেন, যে, 
একজন বিষণ্ণ মানুষকে মুসলমান বানিয়ে ফেলা খুব সহজ; 
একজন বিষণ্ণ মানুষকে ইন্ডিয়ান বানিয়ে ফেলা খুব সহজ; 
এ কথা কি জানতেন মহন্ত বাবা লালদাস, যে,
একজন বিষণ্ণ মানুষকে একই সঙ্গে কাক আর কাকতাড়ুয়া বানিয়ে ইচ্ছামতো খেলা করা যায়? 
এইটা তো বেশরম ইন্ডিয়ান রাষ্ট্রও জানে না। নাকি জানে? 
আসলে পৃথিবীর সকল রাষ্ট্র, সকল ক্ষমতাই এই জ্ঞানে আগাপাশতলা সমৃদ্ধ। 

অবশ্য ও আদার ব্যাপারী মাত্র; এহেন রাজনৈতিক ডিলেমার জট ছাড়াতে গিয়ে 
আরো নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে, এই ভয়ে ইদানীং ও মুখই খোলে না, 
ঘিলুও ঝাঁকায় না, 
এমনিতেও মাথা-যন্ত্রণায় কাতর, আর পিঠের নিচে শক্ত তোশক
কারণে অকারণে গুঁতা মারে, 

আর টেবিলের নোটবুক ওকে বলে, ‘দগদগে ঘিলুর আবার পরিচয় কী? 
তুমি আজীবন যে তোতলা মুসলমান, 
সেই ভীরু, তোতলা মুসলমানই থেকে যাবা; মানে,
তোমার নিহিলিজম একটা সেতুই মাত্র, মুসলমান টু মুসলমান, 
খালি সেতুর উপরে তুমি একেলা, এইটাই যা দুঃখের’, 
আর ও মেনে নেয়,
ওর ভিতরের যাবতীয় নিহিলিস্ট জড়তা, 
আর আত্মার হাজার হাজার বন্ধ দরজা সরে দাঁড়ায় কাষ্ঠহাসি হেসে:
ও দেখে, ও সে-ই; আদিম, 
নিঃসঙ্গ, 
কিছুটা ভাবালু; 
সকাল বেলায় কপোতাক্ষের ঘাটে মসজিদে দাঁড়ায়ে সূর্যোদয় দেখে
আবার, 
আর কিছু পচা পিত্ত ওর চোখ বেয়ে নেমে আসে,
আর ওর ঘুম ভেঙে যায়, 
ঘোর ভেঙে যায়, 
স্বপ্ন ভেঙে যায়; 

ভীষণ গহীন এক ডালিমের বুক থেকে থোকা থোকা লাল
ছুটে আসে ওর দিকে; 
‘আহা আগামসি লেন', বলে ও উপুড় হয়ে 
কল্পনায় ডুবে যায় চুপিচুপি, 
‘এই দেহে কতোগুলো ব্যধি আছে? অন্তত এটা জানা গেলে
আর কতোদিন আছি, জানা যাবে,
ওহে, আগামসি লেন, বলো দেখি, ঠিক কী জাতীয় রোগে
আক্রান্ত আমি? এই মাথা যন্ত্রণার পরের কাহিনী বলো, 
দেখি কোনোমতে সহ্য করা যায় কিনা...’ 

এই রোগে অনেকেই আগেও ভুগেছে, মানে এই যে, নিরীহ এই
মানবিক দেহ, এ নিছক দেহ নয়, বরঞ্চ
রোগের আড়ত, 
বৃহত্তর, বৃহত্তম অগণন রোগ: এই যে ভাবনা, 
এ-ই তো আসল রোগ, ও-ও জানে, কিন্তু সেই জানা
ইনভিজিবল কোনো হাতের রবারে মুছে যায়, আর
ও যে আসলেই তীব্র রোগগ্রস্ত—এই সত্যটাই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে পুরাতন, 
মামুলি, গা-সওয়া; 
কোনো পাকিস্তান মাঠ, কোনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 
আদৌ আরোগ্য নিয়ে আসে না কোনোই, 
কোনো প্যারাসিটামল
ওর মাথা যন্ত্রণার, কিংবা ওর নিরুদ্দেশ নাস্তির হদিস জানে না;

একটা ঝাঁকড়া পদক্ষেপে
এসব নির্মূল হয়ে যাবে হয়তো, আসলে ও
বোঝে না কী ফায়দা বেঁচে থেকে; কিংবা আমেরিকা গিয়ে 
ও কি ওর উচ্ছৃঙ্খল ঘিলুর শাসন থেকে মুক্তি পাবে?
কিংবা সারাৎসার ভেঙে টুকরো টুকরো করে 
পালকের মতন পারবে উড়ে যেতে?
‘আমি পাখি না পালক, নাকি এয়ার ভাইস মার্শাল, নবাব’—
এই চিন্তা ঠিকই জারি থাকে; 
দুই আঙুলের মাঝখানে পেন্সিলের মতো ওর ইগো
এসে দাঁড়ায়,
আর আঙুলগুলো সর্বক্ষণ ছাড়া ছাড়া হয়ে থাকে, 
যেনো সর্বক্ষণই আড়মোড়া ভাঙে, 
আনমনা থাকে, 
এবং কখনোই মুষ্টিবদ্ধ হওয়া যাকে বলে, 
আত্মবিশ্বাস যাকে বলে, 
তা ওর পক্ষে সম্ভবপর হয় না, 
হয়তো নিহিলিস্টের আঙুল কখনোই আত্মাকে, আত্ম-কে ধারণ করতে পারে না, 
ঈশ্বর ওর মুঠোর মধ্যে আসেন না ভুলেও— 

তাই আহামরি বিস্ময়ে ও কেঁপে উঠবে না কখনোই, 
মানুষের দিকে ওর চলাচল সবসময়ই এইরকম ধীর,
পর্যুদস্ত, 
আর স্বল্প থেকে যাবে; 
প্রায়শই হাত থেকে পড়ে যাওয়া কাচের বাটির মতো
ও এগিয়ে যায় মানুষের কাছে, 
অপেক্ষা করে নুয়ে পড়ার, ভাঙনের;
কিন্তু তল পায় না, পতিত হয় না কখনোই; 
বরং উগ্র, উচ্চ হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে ভাসতে ভাসতে
আরো ফাঁপা হয়ে ওঠে ও, 
আরো তুলতুলে,
আর একসময় পরিণত হয় বেলুনে, 
হালকা, নিশ্চিত, বধযোগ্য;
পাখি না, আবার পাহাড়ও না; 
ফল না, আবার খোসাও না; 
এমন একটা বেলুন, যে কিনা ধাক্কা খেয়ে পিছিয়ে আসে মাত্র, 
কখনোই মুখোমুখি হয় না— 

অথচ কিছুটা কাল ও মানুষের মুখোমুখি হতে চায়;
ছাঁদের ওপর থেকে ফুলের মতো ছোটো ছোটো,
রঙিন মানুষ, 
সহজ মানুষ দেখে উপচে পড়তে চায়
ছাঁদের কিনার থেকে, যেনো 
এই সেই ঝাঁকড়া পদক্ষেপ, 
এই সেই পাকিস্তান মাঠ আর টিএসসির রগরগে আলোর খপ্পর থেকে
পলায়ন, 
এই সেই হলুদ, নির্লিপ্ত, নিঃসঙ্গ ইগো, 
যার কখনোই ঘুম আসে না, আর
যারা পুরো মাথাটাই যন্ত্রণা, 
কিংবা একটা ব্লাকহোল, যেখানে সব চিকিৎসাই হারিয়ে যায়, 
সব ওষুধই পরিণত হয় নয়া নয়া যন্ত্রণায়— 

আর তবু ও শীতের রাতে 
ঘুমানোর নতুন নতুন কায়দা হাসিল করে,
শীতের মাখন চাটে,
শুয়ে থাকে,
সাধনার মতো; 
আর কাল বিকাল চারটায় যে সেমিনার আছে, অন্তত তার আগে
যেনো ঘুম ভাঙে, এই দোয়া করে ও চোখ বোজে, 
চোখের ভিতরে আরো কয়েকটা চোখ
চোখ বোজে, 
আর তাদের ভিতরেও আরো কয়েকটা চোখ... 

এইভাবে সমস্ত দরজা বন্ধ করে যখন শেষ চোখটা ঘুমাতে যায়
তখন সে নিজেও পরিণত হয় আরো একটা দরজায়, 
যে দরজা খুললে দেখা যাবে মাঠ, 
পাকিস্তান মাঠ, 
ধুধু, তারজালে ঘেরা; 
যেখানে ঘুম নেই, বিনষ্টি নেই, মৃত্যু নেই, 
আছে কেবল অনিদ্রা, আশঙ্কা, আর স্বৈরাচারের মতো নিশ্চল, নিষ্করুণ, স্থায়ী জেগে থাকা!