শূন্য ঘরের নামতা ও অন্যান্য কবিতা

অ+ অ-

 

|| শূন্য ঘরের নামতা ||

এই ঝড়ের রাতে 
তুমি ট্রেনে চেপে যাচ্ছো
নায়াগ্রা থেকে নিউইয়র্কে,
আর আমি রাত পাহাড়া দিচ্ছি।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশে
অতিক্রম করছে ঘূর্ণিঝড় ‘শক্তি’, 
বুক পেতে দাঁড়িয়ে
দানবরূপী ঢেউ সামাল দিচ্ছি।

বাঁশের আড়ায় আঁচল বেঁধে
অপেক্ষা করছি—
ঢেউ যদি আসে 
আমাকে ভাসিয়ে নিবে আগে,
তুমি চলে যাচ্ছো নিউইয়র্কে।

ম্যানহাটন, ব্রুকলিন, কুইন্স অথবা
টাইমস স্কয়ার বা সেন্টাল পার্কে
তোমাকে দেখা যাবে সচরাচর,
মাঝেমধ্যে ক্যাসিনোও ঘুরতে যাবে।
আর আমি প্রতি জলোচ্ছ্বাস শেষে
বারবার আঁচল গুজব কোমরে,
ঘর বাঁধব বিরান চরে,
কেউ যদি ভুল করে কোনোকালে
চলে আসে পুরনো ঘরে!

 

||  গৃহ সন্ন্যাস ||

প্রেমের পাঠ চুকিয়ে
ত্রস্তপদে হেঁটে যাচ্ছে যুগল
ঘরকন্নার দিকে,
প্রেমের খেলনা-বাটি
কল্পনাপ্রসূত ঘর,
পুতুল পুতুল সন্তান
সব নিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটছে
মানব সংসারের দিকে।

হাতে হাত, প্রেমের প্রতিজ্ঞা
কঠিন দৃঢ়তায় মোড়া
জীবনাজীবন একসাথে থাকা!
কবুলবদ্ধ জীবনে
হাসনাহেনা ফোঁটাচ্ছে
ঘর নামক আঙিনাতে,
প্রেয়সীর চুলের কাছে
জুঁই-বকুল আর 
আদিম সভ্যতায় শিশু।
ওরা খেলতে খেলতে
ভালোবাসায় চাষ করছে
জান্নাতুল ফেরদাউস,
মাতৃজঠরের স্বাদে
প্রেমিকাও কবুল।

 

||  কমনীয় অপেক্ষা ||

আমার একদম দেখতে ভাল্লাগে না
নতুন বিবাহিত আহ্লাদী জীবন, 
লাল পেড়ে শাড়ি, জামদানি
ঘোমটা টানা আঁচল,
কনিষ্ঠা আঙুলে বাধা বর
তরতর করে বেড়ে ওঠা শরীর।
বৌ বৌ গন্ধের হিম, ভোরের সূর্যস্নান
মাথাভর্তি লম্বা চুল, চুলের আদুরে ঘ্রাণ 
আদরের অত্যাচারে গলে যাওয়া বিকেল।

অসহ্য সব হাওয়া,
যেন গঙ্গোত্রী থেকে নেমে আসা!
লজ্জাবিহীন সব আবদার অলিতে-গলিতে 
ফুসকার দোকানে, ল্যাম্পপোস্টের নিচে
চুড়ির ডালায়, শহরের আদেখলেপনা রুফটপে
স্বীকৃত সবখানে, টিকিট পেয়ে গেছে জীবনের 
অসহ্য লাগে এসব দেখলে!
লাত্থি মেরে ভেঙে দিতে ইচ্ছে করে
জীবনের সব যুদ্ধ-ফুদ্ধ খেলা
মরে যেতে ইচ্ছে করে;
এত সুখ কী পায় মানুষ এক জীবনে?

 

||  সর্বনামে আমরা ||

কী করে আমরা ভেঙে ভেঙে গুটিয়ে গেলাম
কী করে সমান্তরাল পথে বিচ্যুতি এলো,
ঘর আলাদা হলো; মন ভাঙলো
পদ্মা তীরবর্তী কিছু হাওয়া এলোমেলো বয়ে গেলো।
আমাকে জবরদস্তি উপড়ে ফেলা হলো সংসার থেকে
অনাগত সন্তানের জন্মে নিষেধাজ্ঞা জারি হলো।
আমার নামের পদবী পরিবর্তন করে বাবার পদবীতে ফিরিয়ে দেয়া হলো,
এর কোনোটাই বুঝে উঠতে পারলাম না।

হুট করে একদিন দেখলাম আমার কেড়ে নেয়া পদবী
আমারই পরিচিতার নামের পাশে জুড়ে গেলো!
টিমটিমে আলো জ্বেলে পদ্মাপাড়ে বাসর হলো!
সেই থেকে তারা আমার ঘরে উঠে গেলো!
আমার শুভ্র বিছানা আর মোলায়েম পাপোশে 
নিয়মিত পরতে থাকল এক জোড়া মানব-মানবীর হর্ষ ধ্বনি।
যুগলবন্দী জীবনে তারা পরিচিত হয়ে গেলো ‘আমরা’ সর্বনামে।
সেই থেকে আমি বুঝে গেলাম ভালোবাসা এবং সংসার জীবনের ক্ষণস্থায়ী অংহকার।