তোমার অনুপস্থিতি ও অন্যান্য কবিতা
|| প্রত্যাখ্যানের উপনিষদ ||
মানুষ কখনো নক্ষত্রহীন শূন্যতার সন্তান হয়ে যায়,
যেখানে প্রতিধ্বনি পর্যন্ত নিজের নয়।
হাত বাড়ায়—অথচ আকাশ থাকে অবিচল,
বাতাসও ফিরিয়ে দেয় তার অনুরোধের ছায়া।
যাদের কণ্ঠে একদিন উচ্চারিত হয়েছিল অনুকম্পার মন্ত্র,
তাদের চোখে আজ শুধু কাঁচের শীতলতা।
বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটাও যেন স্বার্থের দ্রবণ,
যেখানে মানবতা দ্রবীভূত হয়ে যায় নীরবে।
অসহায় মানুষ তখন মহাকালের ভিখারি,
তার পথের ধূলিও জানে নৈঃশব্দ্যের ধর্ম।
দরজাগুলো হয়ে ওঠে দর্শনের প্রতীক,
যা খুলে না, তবু জানায়—প্রত্যাখ্যানই আত্মার প্রথম জাগরণ।
তার অন্তরে জ্বলে এক ক্ষীণ, অদৃশ্য দীপ,
যার শিখা পোড়ে না, কেবল নিজেকেই পুড়িয়ে আলোকিত করে।
সে বলে—‘অন্ধকারই আলোর প্রথম পাঠশালা,
হতাশাই শেখায় অস্তিত্বের মর্যাদা।’
তবু আজ, এই নিষ্প্রাণ নৈশ আকাশে,
আমি একাই শুনি নক্ষত্রের মৃত-প্রার্থনা,
আর নিঃশব্দে লিখি আমার নিজস্ব উপনিষদ—
অসহায়তাই আমার ধর্ম,
নীরবতাই মুক্তির রূপক।
|| নীরব পথের পথচারি ||
অরণ্যের অন্তরালে কেউ হেঁটে যায় ধীরে—
পায়ের নিচে ভাঙে সময়ের হাড়, নিঃশব্দ অস্থিরতার মতো।
গোধূলির রক্তরঙে ভেসে যায় ধানক্ষেতের মুখ,
মাটির ঘ্রাণে জেগে ওঠে অচিন দিনের গোপন নিঃশ্বাস।
নদী নিস্তরঙ্গ—তবু জলে কাঁপে এক মায়াবী প্রতিমা,
যেন স্মৃতির নিজস্ব ছায়া তাকিয়ে আছে বিস্মৃতির জলে।
আমি ছুঁই সেই তরঙ্গ—আঙুলে লাগে নীরব হিমের ছায়া,
যেন পৃথিবী নিজেই শ্বাস নেয়, আমার ভেতর নেমে এসে।
দূরের পাখি ডাকে—কিন্তু তার দৃষ্টিতে নেই কোনো উঁচু পথ,
শুধু এক অনির্দিষ্ট আলোর ক্ষতচিহ্ন, দিগন্তের প্রান্তে।
বৃক্ষেরা জানে—পতনও এক প্রার্থনা, মাটির প্রতি নতজানু স্বীকারোক্তি,
পাতারা তাতে রাখে সময়ের গোপন অর্ঘ্য।
কোনোদিন হয়তো এই পথেই আমি বিলীন হবো,
যেমন পিঁপড়া নিজ গন্ধে হারায়, নরম মৃত্তিকার স্বপ্নে।
তবু জানি—আলো ফিরে আসে ধীরে, নীরবতার ভাষায়,
যেন অচেনা হাত ছুঁয়ে যায় কাঁধে, কিছু না বলেই।
আমার ভিতরে আজও দোলে এক অচেনা নীরব সুর,
নিঃশব্দে, অথচ সমস্ত
যা মাটি, জল ও বাতাসে চিরকাল জমে থাকে।
ঘাসে শিশির জমে, মাটির ঘ্রাণে ঘুম নামে,
তাদের নিস্তব্ধতা আমার চেয়ে অনেক বেশি জীবন্ত।
পৃথিবীকে ভালোবাসা মানে তার নীরবতাকে স্পর্শ করা,
আর তাতে নিজের হারানো সত্তার প্রতিচ্ছবি দেখা।
কোনো একদিন আমি হয়ে যাবো এদেরই মতো—
পাতা, আলো, জল, অশ্রুহীন আকাশের নীল শ্বাস,
যেখানে তুমি যদি আসো, চিনতে পারবে না আমায়;
তবু এক অদৃশ্য গন্ধ থাকবে—
শিউলি ফুলের নিচে জমে থাকা অতীতের মতো,
যা মাটি, জল ও বাতাসে চিরকাল অম্লান।
নদীর মতো প্রবাহিত হয় সময়—নিঃশব্দ স্বপ্নের ঢেউয়ের মাঝে।
আমি শুনি সেই প্রবাহে এক নীহারিকা–সুর,
যেন মৃত্যু ও জীবনের মধ্যবর্তী কোনো ভাষা।
রাতের কুয়াশায় হারিয়ে যায় আমার ছায়া,
সে কি আমি? নাকি আমার স্মৃতির জন্মছবি?
প্রতিটি গাছের ফাঁকে জমে থাকা অন্ধকার
আমার অনন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায় পৃথিবীর পাশে।
আমি বুঝি—বেঁচে থাকা মানে হারিয়ে যাওয়া ক্রমাগত,
তবু না–হারানো এক আশ্রয়ের নরম প্রতীক্ষা।
তাই হয়তো নিঃশব্দতাই একমাত্র ভাষা,
যেখানে আত্মা নদীর মতো বয়ে চলে, নিঃশব্দ স্বপ্নের ঢেউয়ের মাঝে।
|| তোমার অনুপস্থিতি ||
তোমার অনুপস্থিতি আজ আকাশে ঝুলে থাকা অসমাপ্ত চাঁদের মতো,
তার আলো পড়ে কেবল কাঁপতে থাকা পুকুরের জলে, নিঃশব্দে।
আমি সেই জল, যেখানে তোমার প্রতিফলন আজও ভেসে বেড়ায়,
অথচ বাতাসের হাত এসে প্রতিনিয়ত তা মুছে ফেলে যায়।
নিঃসঙ্গতার শরীরে ঝুলে আছে তোমার ফেলে যাওয়া শব্দের মালা,
প্রতিটি শব্দ যেন অদৃশ্য আগুনে পোড়া অক্ষরের মতন।
আমি সেই দাহে রাতকে পুড়িয়ে বানাই একেকটা প্রার্থনার ছাই,
যার ধোঁয়ায় উঠে আসে তোমার মুখ, স্বপ্নের মতো ভাসমান।
জানালার বাইরে আজও ঝরে পড়ে সাদা বৃষ্টির স্মৃতি,
প্রতিটি ফোঁটা যেন তোমার কণ্ঠের মৃদু ভাঙা প্রতিধ্বনি।
তোমার অনুপস্থিতি এখন ঘরের ভিতর এক নিঃশব্দ প্রাণী,
যা প্রতিরাতে আমার বুকের ভিতর নড়ে ওঠে নিঃসৃত কষ্টে।
আমি তোমার ছায়াকে জড়িয়ে ঘুমোই, অথচ ছায়া তো ছুঁই না,
কেবল অনুভব করি এক ঠান্ডা স্পর্শ, মৃত্যুর মতো স্থির।
তুমি চলে গিয়েও থেকে গেছো বাতাসের গন্ধে,
ঠিক যেমন রোদ চলে যায়, তবু গাছের পাতায় থাকে তার উষ্ণতা।
বিরহ আমার শরীরে এক গোপন নদীর মত বয়ে চলে,
যার স্রোত শব্দহীন, অথচ তীরে বাজে কান্নার ঢেউ।
আমি সেই তীর, যে জানে না কাকে ডাকে জল,
তবু প্রতিবার শুনে ফেলে প্রিয় কণ্ঠের হারানো সুর।
আজ রাত্রি হলো এক দীর্ঘ নৌকা, দিগন্তহীন ভেসে থাকা,
আমি মাঝি, আর তোমার স্মৃতি সেই অন্ধকার নক্ষত্রপুঞ্জ।
কেবল দূর থেকে দেখি—আগুনে জ্বলছে একাকীতার প্রদীপ,
যার শিখায় পোড়ে আমার সমস্ত রক্তের উপমা।
তবু আমি জানি বিরহ মানেই শেষ নয়,
বরং এক মহাশ্বাস,
যেখানে অনুপস্থিতির ভিতরেই জন্ম নেয় নতুন প্রেমের আলোকছায়া।
|| হরাইজনের ওপারে প্রেম ||
দিগন্তের ওপারে এক নিঃশব্দ আলোকরেখা
দেখলে মনে হয়, সেখানে সময়ের ধূলিকণা ঝরে,
তবু কাছে গেলে বোঝা যায়,
এ এক অনন্ত প্রতিধ্বনির মায়াজাল,
যেখানে অস্তিত্ব নিজেই নিজেকে ভুলে যায়।
দুটি রেলরেখা চলে,
একই আকাশের ধূসর তলে,
একই অনন্ত পথে—
তবু তাদের মাঝে লুকিয়ে থাকে
অসীমতার নরম বিভাজনরেখা,
যা কোনো দিন ছোঁয়া যায় না,
তবু অনুভব করা যায়
এক তীব্র নিঃশব্দতায়।
তাদের ফাঁক—দূরত্ব নয়, বরং আরাধনা,
এক নিষিদ্ধ স্পর্শের পবিত্র পরিসর,
যেখানে আকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে
গলে যায় অদৃশ্য জ্যোতির ছায়ায়।
রাত নামে নিঃশব্দ,
চাঁদের দুধসাদা নৈঃশব্দ্য ঝরে পড়ে ধাতব গায়ে,
রেলরেখা তখন জ্বলে ওঠে
যেন আদিম স্মৃতির গোপন ক্ষত—
যা কখনো নিভে না,
শুধু অন্য এক সময়ের ভাষায় দগ্ধ হয়।
সেই ফাঁকের ভেতর জন্ম নেয়
এক নীরব রহস্য,
যা উচ্চারণের জন্য নয়,
বরং শোনার জন্য—
অন্তর্গত শ্রবণে,
যেখানে হৃদয় নিজেই নিজের প্রতিধ্বনি শুনে।
ভোরের আগে, পৃথিবী নিঃশব্দে ঘুমায়,
রেলরেখা তখনও জেগে থাকে—
তারা জানে, সব দিগন্তই এক মায়া,
সব মিলনই এক প্রলম্বিত দূরত্ব,
যেখানে দেখা মানে আরও দূরে হারিয়ে যাওয়া।
তবু তারা এগোয়,
নৈঃশব্দ্যের ভিতর দিয়ে,
যেন প্রতিটি পদক্ষেপে সময় নিজের অক্ষ ঘুরে যায়,
আর আলো এক মুহূর্তের জন্য
নিজেকে ভুলে যায় অন্ধকারের বাহুতে।
প্রেম সেখানে আর আবেগ নয়—
না অশ্রু, না কামনা,
বরং এক অদৃশ্য ধ্বনি,
যা বয়ে যায় হৃদয়ের অতল গহ্বরে,
যেখানে আলোরও মৃত্যু ঘটে
এক কোমল অন্ধকারে।
আর হয়তো সেই অন্ধকারেই
হরাইজনের প্রকৃত মুখ খোলে—
যেখানে সব রেলরেখা থেমে যায়,
সব শব্দ বিলীন হয়,
আর রয়ে যায় শুধু এক নিঃশব্দ স্পন্দন,
আমি আছি, কিন্তু আমাকে ছুঁতে গেলে
তুমি নিজেই বিলীন হয়ে যাবে আমার ভেতর।
|| প্রাচীন সূর্যোদয় ||
তুমি আকাশের বুকে বিশালতা উপমা,
তোমার দৃষ্টিতে লুকিয়ে থাকে মহাবিশ্বের নরম নীল।
তোমাকে ভাবলেই মনে হয়—
সৃষ্টির শুরু হয়েছিল কোনো নিঃশব্দ প্রেম থেকে।
তোমার চোখে আছে স্বপ্নের অতল ছায়া,
যেখানে আমি প্রতিদিন ডুবে যাই,
আর ফিরে আসি নতুন আলোয় ভেজা মানুষ হয়ে,
যে জানে, ভালোবাসাই একমাত্র নীরব সত্য।
তুমি যেন সময়ের আগে জন্ম নেওয়া এক ফুল,
যার গন্ধে ঘুমিয়ে যায় সমস্ত ভয়,
যার পাপড়ির ছায়ায় আমি খুঁজে পাই
আমার চূড়ান্ত প্রশান্তি—
যেমন বৃষ্টি খুঁজে পায় মাটি,
যেমন নদী খুঁজে পায় সাগরের বুক।
তোমার হাসি—এক প্রাচীন সূর্যোদয়,
যা আমার হৃদয়ের অন্ধকারে
রঙ মেখে দেয় অদৃশ্য আলোর মতো।
তোমার নীরবতা— সেই সুর,
যা কোনো কণ্ঠ জানে না,
তবু প্রতিটি জীবন্ত প্রাণ তাকে অনুভব করে,
যেন নিঃশ্বাসে ঢুকে যায় সঙ্গীত হয়ে।
তুমি আমার ভেতরের অজানা সাগর,
যেখানে আমি নিজেকেই হারিয়ে পাই,
তোমার কণ্ঠে জেগে ওঠে সেই ঢেউ,
যা পৃথিবীকে শেখায় নরম হয়ে বাঁচতে।
তোমার উপস্থিতি—এক পবিত্র বৃষ্টি,
যা মুছে দেয় আমার অস্তিত্বের ধুলো,
আর তোমার অনুপস্থিতি—
এক প্রার্থনা, যা শেষ হয় না কখনো,
যেমন রাত শেষ হয় না চাঁদের অপেক্ষা ছাড়া।
তুমি সেই রহস্য,
যার ভেতর আমি ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছি,
যেমন জ্যোৎস্না মিশে যায় নদীর জলে—
অদৃশ্য হয়ে, অথচ থেকে যায় আলো হয়ে।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন