ফরিয়াদ ও অন্যান্য কবিতা
|| জবর কবর ||
জবর কবর বানিয়ে রেখেছি
গোশত ধুয়েছি কুমারি লোহুতে
কচি কচি হাড়, টুকরো টুকরো
মাখিয়ে দিয়েছি চোখের লবণে
ম্যারিনেইট করে নরকবর্ষ
অনলের দিন পক্ষ ব্যাপিয়া
চামড়া খুলিয়া সূক্ষ্মদর্শী
মশলা দিয়াছি সব ভিনদেশি
আঙুলের কুচি গোটা তিন-চার
না-বলা স্বপন আধেক হাজার
ঠিকঠাক মতো কষানোর পরে,
অবদমে রাখা খাসা রঙ দ্যাখো
জিবে জল আসা মউ মৌতাতে।
নামানোর আগে মিহি মিহি করে
ছড়ায়ে দিয়েছি পিরিতির গুঁড়া।
সব ফেলে তুমি কোথায় পালাও—
নিজের রেসিপি, নিজেকে না চেখে—
এ ঘোর কলিতে কোথায় হারাও
তুমি অনন্য, তোমার জন্য, রেখেছি
বাঁধিয়ে অল্প আঁচের জবর কবর।
|| ফরিয়াদ ||
হে খোদা,
আমাকে বাঁচাও তুমি
আমার হাত থেকে।
অবতীর্ণ আরেকটি সন্ধ্যার প্রাক্কালে
কোমল করো তার নৃশংস নখর।
|| তোমার মুখ ||
জীবন নিয়ে ক্লান্ত লাগতেসিল
দুঃখগুলা একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছিল,
আনন্দগুলা দুঃখের সমান—
তোমার চোখের নিচে কালি।
তুমি বললা, আসো আমরা জীবন বদলাবদলি করি।
জামা বদলানোর মত সহজেই জিনিসটা করা গেল।
এমন কি বুঝতেও পারলাম না কখন, কীভাবে—
তোমার দুঃখগুলা অপরিচিত, কিছু কিছু নতুন।
অনেকগুলা মুখ, তাদের মধ্যে আমিও আছি।
তোমার ভীতি, প্রথম প্রেম, পাপ সব দেখা দিল—
একেবারে আনকোরা এক জীবন।
কিন্তু আমার খুবই খালি খালি লাগতে শুরু করল—কী যেন নাই, কী যেন নাই।
তোমার সঙ্গে দেখা হলো, তোমার চোখের নিচে কালি—এখনও।
তুমি বললা, দুঃখগুলার স্বাদ ভালো, টাটকা;
মানুষের মুখগুলা নতুন—কিন্তু কী যেন নাই।
অতএব আমরা আবার জীবন বদলাবদলি করলাম।
আর দুঃখের সবটুকু মুখ হয়ে তুমি ফিরে এলে আমার মধ্যে
আর আমি তোমার মধ্যে—
আমরা বললাম, আমাদের দুঃখগুলা আবার সুন্দর হয়ে উঠসে।
|| ম্যাজিক ||
চলো আমরা ডায়ার উল্ফের মতো
কিছু মৃত মানুষ ফিরাইয়া আনি
কিছু বিলুপ্ত পরিবার, গোলাপি গালের শিশুসমেত যাদের
একদিন আমরা কয়েকটা মুহূর্তের জন্য
আকাশে উড়াইয়াছিলাম
যেন তারা ভরশূন্য, পাখির পালকের চেয়েও হালকা।
সভ্যতার চোয়াল ঝুলাইয়া পড়াপ্রত্নতত্ত্বের নিখুঁত নিদর্শন,
রহস্যময় চিত্রকলা সংকেত এবং বিপন্নপ্রায় প্রাণি ও উদ্ভিদ রক্ষায়
সবিশেষ উদ্বেগের পাশাপাশি,
চলো দেখাই আমাদের আশ্চর্য ম্যাজিক।
কেননা একদিন মানুষের মিউজিয়ামে প্রয়োজন হবে—
বিবিধ নমুনা।
|| কবর ||
গোরখোদকের শরীর ঘেমে ওঠে
শরীর বেয়ে বৃষ্টি নামার ধারা
শবের শরীর ভিজছে নোনাজলে
উইপোকারা খাচ্ছে অন্ধ স্মৃতি
তবু একটি জন্মে অনেক জন্ম রেখে—
আমার স্বপ্নে উঠছ জেগে তুমি।
|| ধ্যান ||
এমন বারুদগন্ধী বিকেল
দেখ, বলার কিছু নাই তো,
তবু ভাবছ, এ-নীরবতা,
বুনোলৌকিক ক্ষণিকতা,
একে ভাঙচুর করে সরায়ে
কিছু বলার তো খুব প্রয়োজন—
আমি ঝুঁকে দেখি শত মাছদের
ছোট ছোট লাল মাছেদের,
তাদের খাবারের অনুসন্ধান
আর খেলাধুলা শত প্রকারের
যেন সবুজ পাতার নিচেতে
এক তরলে রচিত সংসার।
জল-আর্শিতে ওই মুখ দেখে
আমার শীতল শীতল লাগে।
ওই পাড়ের জলজগতে সে
আমারই কোনো বোন তো।
এই পৃথিবীর যত বিচলতা
তার পৃথিবীতে গিয়ে শ্রান্ত।
হয়তো অনেক কথারা
যার থাকে না কোনো অর্থ
তারা আসে, আর খুঁজে পায়
ঘর জলস্য অভিধানে।
তখন ভেজা হাতে হাত
রেখে, স্থলচর গোটা শব্দে,
তুমি নীরবতা ভেঙে বলছ,
‘চলো, ফেরা যাক ঘরে তবে...
এই মৎস্যগন্ধা সন্ধ্যা, নয়
আমাদের গিলে খাবে।’



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন