সুফি কবি বুল্লা শাহের কবিতা

অ+ অ-

 

|| ভূমিকা ||

বুল্লা শাহ (১৬৮০–১৭৫৭) ছিলেন পাঞ্জাবের সুফি, দার্শনিক ও মানবতাবাদী একজন বিখ্যাত সুফি কবি। তার পুরো নাম সৈয়দ আব্দুল্লাহ শাহ কাদরি। তিনি পাঞ্জাবের ভাওয়ালপুরের উচ নামক ছোট্ট গ্রামে ১৬৮০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম শাহ মুহাম্মদ দরবেশ। তিনি পেশায় একজন শিক্ষক ছিলেন। স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম হিসেবেও কাজ করতেন। বুল্লা শাহের গভীর ও গীতিময় পদগুলেঅ আজও  সময়, ভাষা এবং ভূগোলের সীমানা অতিক্রম করে পৃথিবীর নানা স্থানে গাওয়া হয়। বুল্লা শাহের কবিতার মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে সর্বজনীন প্রেম। আত্মার সাথে পরমাত্মার, সৃষ্টির সাথে স্রষ্টার, গুরুর সাথে ভক্তের আর প্রেমিকের সাথে প্রেমীর প্রেমই হচ্ছে তার কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য। তার কবিতাগুলো কাফি বা সুফি ধারার।

লাহোরের বিখ্যাত সুফি সাধক শাহ্ ইনায়েত কাদিরির সঙ্গে দেখা হওয়ার পর বুল্লা শাহ্ তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু শাহ্ ইনায়েত পেশায় ছিলেন একজন মালী। ফলে সে সময়কার সমাজ ব্যবস্থা বিষয়টি গ্রহণ করেনি। সামাজিক কলঙ্ক ও বহু বিতর্ক সত্ত্বেও, বুল্লা শাহ কখনোই দমে যাননি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বন্ধন হিসেবে শুরু হওয়া এই সম্পর্কটি একসময় গভীর আধ্যাত্মিক সংযোগে পরিণত হয়েছিলো। মূলত গুরু-শিষ্যের এই প্রেমই বুল্লা শাহের কাব্যকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। 

বুল্লা শাহের প্রতিটি কবিতায় রয়েছে তার গভীর জীবনবোধের প্রতিফলন। তিনি কুরআন ও হাদিসের পাশাপাশি আরবি ও ফার্সি সাহিত্যও অধ্যয়ন করেছিলেন, ফলে তার চিন্তাচেতনের মধ্যে ধর্ম ও দর্শন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। তার এই মানবতাবাদী বৈশিষ্ট্যের কারণেই তাকে ‘পাঞ্জাবের লালন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। বর্তমানে পাঞ্জাবের কাসুরে তাঁর সমাধিস্থলটি অসংখ্য ভক্ত ও অনুসারীদের তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। কবিতায় ধর্মীয় গোঁড়ামি, আচার-অনুষ্ঠানকে উপেক্ষা করে বুল্লা শাহ্ আজীবন সত্য ও প্রেমের সন্ধান করে গেছেন। আর এই কারণেই সে সময়ের মোল্লারা তাকে কাফের ফতোয়া দিয়েছিল। এমনকি ১৭৫৭ সালে তার মৃত্যুর পর জানাজা পড়তেও অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।  

   

বুল্লা শাহের কবিতা

অনুবাদ ও ভূমিকা || ফারহানা রহমান

 

চোখ বেঁয়ে অঝোরে ঝরছে অশ্রু।। 

সে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে,
আর সে নিজেই ছেড়ে গেছে 
কী দোষ ছিল আমার?

না রাতে না দিনে 
কখনোই কি আমি 
শান্তিতে একটু ঘুমাতে পারি?

অঝোরে ঝরছে শুধু আমার দুচোখ
তলোয়ার আর বর্শার চেয়েও 
বহু তীক্ষ্ণ এই প্রেমের বাণ!

প্রেমের মতো নিষ্ঠুর 
আর কেউ হয় না;
এ এমনই ব্যাধি 
যা কোনও ডাক্তারই সারাতে পারে না,
 
কোথাও শান্তি নেই, 
এক মুহূর্তের জন্যও নয়, 
কী ভয়াবহ তীব্র এই বিচ্ছেদ বেদনা!

হে বুল্লা শাহ,
স্রষ্টা যদি রহমত বর্ষণ করতেন—তার,
দিনগুলো কতই না দ্রুত পাল্টে যেত আমার!
সে যে চলে গেল, নিজে থেকেই চলে গেল, 
কী দোষ ছিল বলো আমার? 

 

ভালোবাসার তীর।।
প্রেমের তীক্ষ্ণ বাণে বিদ্ধ হয়েছি আমি
কী করবো আমি?
না পারছি বাঁচতে 
না পারছি মরতে
শোনো তবে আমার এই মর্মভেদী আর্তনাদ!

আমি শান্তি পাই না রাত্রিতে
আর দিনেও না
আর এক মুহূর্তের জন্যেও থাকতে পারি না প্রিয়তমকে ছাড়া।
ভালোবাসার তীরে বিদ্ধ হয়েছি আমি
বলো কী করবো এখন আমি?
অনন্ত এই বিচ্ছেদের আগুন!
কেউ অন্তত যত্ন নিও আমার প্রিয়তমকে 
তাকে না দেখে বাঁচি কীভাবে বলো?
প্রেমের তীরে বিদ্ধ হয়েছি আমি
কী করবো আমি?