আত্মার কাটা দাগ

অ+ অ-

 

|| ১ ||

আগার ফিরদাউস বার-রো-ই জমিন আস্ত
হামিন আস্ত-ও হামিন আস্ত-ও হামিন আস্ত।
—আমির খসরু

আত্মারে ফালি ফালি করে দেখানোর সু্যোগ নাই। নয়তো কাটা দাগগুলো দেখে ভয় পেয়ে যেতে। এই সব দাগ প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়ে, কোনোটাই সারে না। মানুষের সবকিছুই তো আত্মা। তার দোজখ আর বেহেশত দুটোই। সেই আত্মাকে বিশ্বাস করে গায়েবে মিশে গিয়েছিলেন হাল্লাজ। আর পাখিদের নিয়ে সমাবেশ বসিয়েছিলেন আত্তার। খসরু বলেছিলেন, আমি আর তুমি আলাদা কেউ নয়৷ আত্মার সঙ্গে এভাবেই আত্মার মিলে যাওয়া। অথচ সেই আত্মাকেই মানুষ ভুলে থাকে সবচেয়ে বেশি। নিজেই হয়ে উঠে বিভৎস আততায়ী। একের পর এক কাটা দাগ আত্মাকেই ভুলিয়ে দেয় নিজের কথা। যা তাকে পৌঁছে দেয় দান্তের সেই নরকের দ্বারে, যেখানে না শান্তি আছে, না শাস্তি। এ যেন নিজের ভেতর জ্বলতে থাকা অন্য এক অন্তহীন দোজখ।

 

|| ২ ||

একটা দুপুর হাল্লাজের কাছ থেকে ধার এনেছি। তার বুকে গেঁথে দিয়েছি আনাল হকের ছুরি। একটা দুপুর ততটা দুপুর নয়, যতটা সে ভান করে। এইসব দুপুরেই স্কুল পালানো আত্মহত্যাপ্রবণ মেয়েদের আমরা ডাকি। তারা বেসুরো গলায় গান গায় আর তুমুল বৃষ্টিতে পাখিদের ধার দেয় আলাদা আলাদা নাম। এইসব দুপুর আমার ঢের চেনা। উত্তরের জঙ্গলে নিজেকে হারিয়ে ফেলা ডাহুক, তারাও ফিরে আসে বুকে হাল্লাজের লেখা কালাম নিয়ে। এসেই বলে যাই আর মেয়েগুলোকে ডাকে ভুল নামে। মুচকি হেসে বলি, এইসব দুপুর আমার ঢের চেনা।

 

|| ৩ ||

গিরদে আত্তার গশতে মাওলানা /শরবত আয দস্তে শামস বুদশ নূশ
—রুমি

আকাঙ্ক্ষার বীজ রেখে কেউ চলে গেছে বহুদূর। আমি সেই বীজের খোঁজেই এসেছি। পিঠে বাধা আছে পিতামহের অহংকার আর অভিশপ্ত পূর্বপুরুষদের ভস্ম। কেউ কেউ আসে, হাতে থাকে ঘোড়ার লাগাম। ছেড়ে দিলেই হয়, তবু ধরে রাখে। এই পথে ঘোড়া আড়াই ঘর গেছে। সাদীর মতো আত্তারকে দেখার লোভে আকাঙ্ক্ষার দুয়ারে বসে থেকেছে সুদীর্ঘ কাল। আমিও এসেছি আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে রাখা বীজের খোঁজে। দেখ, অতিপুরুষদের আলখাল্লা ফেলে রেখে এসেছি সেই পেছনে। বাতাসে জমে থাকা কুয়াশার দাগ মুছে কেউ লিখে দিয়েছে সন্ধ্যা আর সন্ধ্যা মানেই গুনগুন করে গেয়ে উঠবেন বেগম আখতার।

 

|| ৪ ||

ভালো কখনোই আমাদের খুব একটা লাগেনি। ভালো না লাগার ভেতরেই যাবতীয় বসবাস। আরেকবার দেখব বলে, পৃথিবীতে ফিরে আসতে চেয়েও পারি না। একটা বাবলের ভেতর বসে সারাক্ষণই বাচ্চা ফুটিয়ে তা দিতে থাকি। সে যাওয়ার সময় অনেককিছু বলে গিয়েছিল। বরাবরের মতো অমনোযোগী ছিলাম, অনেক কিছু খেয়াল করিনি। আর বাকি সব ভুলে গেলাম স্মৃতি বিভ্রাটের কারণে। ভুলে যাওয়া সেসব কথা এখনো আমার আশপাশে উড়ছে। তীব্র রাজনৈতিক আখ্যানের পাশে দাঁড়িয়ে ভেংচি কাটছে। বলছে, পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার ফিরে আসা এখানে থেকে যাওয়ার চেয়ে কঠিন। তবু চেষ্টা করতে দোষ কি! একটা হাওয়ার ঝলকানিই তো। বিকেল হলেই বিষণ্ণ এলজেব্রাগুলো ডোরা ছাড়াই ফিরে আসে। এক সময় সন্ধ্যার কালোর সঙ্গে মিলিয়ে যায় তারা৷ এরপরও যারা ভেবেছিল, এপ্রিল মাসগুলো পৃথিবী থেকে মুছে দেবে, তারা দিব্যি বেঁচে ছিল। অথচ রাত গভীর হলে এখনো কেউ না কেউ বাড়ি ফিরে আসে।