শিল্পে সুঁই-সুতোয় গাথা প্রাত্যহিক সংগ্রামের বুনন

অ+ অ-

 

একজন শিল্পীর মূল কাজ নতুন নতুন চিন্তার উদ্ভাবন, সেই চিন্তার প্রতিফলন এবং দর্শককে চিন্তার খোড়াক জোগানো। আমাদের চারপাশে এমন সব বস্তু বা আঙ্গিনা রয়েছে, যা সাধারণভাবে আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। শিল্পী সেই সাধারণত্ব খুঁড়ে, খুঁজে আনেন শিল্পের রস।

আমাদের দৈনন্দিন জীবন-সংস্কৃতির বিষয়-আশয়কীভাবে জীবনের সাথে বস্ত্র, সময়ের সাথে প্রাত্যহিক সংগ্রামের বুনন, কঠিনতম বাস্তবতার সাথে সম্পৃক্ত আধার-আধেয়কে শৈল্পিক রূপ গেঁথেছেন শিল্পী ইয়াসমিন জাহান নূপুর। বেঙ্গল শিল্পালয়ে অনুষ্ঠিত তার প্রদর্শনীর শিরোনাম নীরবতার সরবতা। টেক্সটাইলকে শুধু একটি মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং ইতিহাস, স্মৃতি ও প্রতিরোধের জীবন্ত ভাষা হিসেবে উপস্থাপন করেন তিনি। শৈশবের ঘরোয়া অভিজ্ঞতা, মায়ের সেলাই, কাঁথা, ও সূচিকর্মের ভেতর দিয়ে বস্ত্রের সঙ্গে এক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় তার। এগুলো কেবল অলংকরণ নয়, বরং শ্রম, নারীত্ব, ভালোবাসা এবং সামাজিক ইতিহাসেরও বহিঃপ্রকাশ।

শিল্পের করণ-কৌশলের দিক থেকে নূপুরের উপস্থাপনা সুন্দর। তিনি টেক্সটাইলের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেন ঔপনিবেশিক শোষণ ও লুপ্ত ঐতিহ্যের চিত্র। মসলিনের কিংবদন্তি ও জামদানি তাঁতীদের দুঃখগাথা, তার শিল্পে প্রকটভাবে উঠে আসে। ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার সেই সাথে পুনঃনির্মাণের আখ্যান রচনা করেন তিনি তার কাজের মাধ্যমে। যেখানে বস্ত্র হয়ে ওঠে প্রতিরোধ ও লিঙ্গ-রাজনীতির বিশ্লেষণ। 

নূপুর বলেন, আমার বেড়ে ওঠার সময়টা ছিল নকশি কাঁথা, হাতে বোনা পাটি, আর মায়ের ভালোবাসায় তৈরি নানা ধরনের বস্ত্র, এসব ঘিরে। এটা শুধু আমার অভিজ্ঞতা নয়, দেশজুড়ে বহু মানুষের জীবনেরই অংশ। আমাদের গল্প বহন করে এসেছে এই বস্ত্র আর সুতা। শৈশবে এসব মনে হতো খুবই সাধারণ। এখন বুঝি, এগুলো কেবল শিল্প নয়, জীবন্ত বস্তু। নীরবে বহুস্তরীয় ইতিহাস বহন করে। যেখানে আছে শ্রম, ভালোবাসা, প্রতিরোধ আর টিকে থাকার ব্যক্তিগত কাহিনি।

শিল্পী নূপুরের কাহিনি নিছক ব্যক্তিগত নয়, এতে আছে ক্ষয়ে যাওয়া ঔপনিবেশিক রাজনীতির চিহ্ন, নারীর অধরা সংগ্রামী জীবন, ঘরকন্নার বাইরে সংবেদনশীল নারীত্বের ইতিহাস। শিল্পী যেমন বলেন—‘আমার পুরো কাজ জুড়ে আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি যা প্রায়শই অদৃশ্য থাকে। চিৎকার করে নয়, বরং ধীর ও ধারাবাহিক এক উপস্থাপনায়। আমার প্রক্রিয়া গঠিত হয় ছোট ছোট অঙ্গভঙ্গি, স্তরবদ্ধ গঠন, আর বিনয়ী প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে। কাপড়ের মাধ্যমে আমি কাজ করি ঔপনিবেশিকতা, অভিবাসন, ক্ষতি ও নারীত্বের ইতিহাস নিয়ে। রাজনৈতিকভাবে, আবেগতাড়িতভাবে, ও শৈল্পিকভাবে আমি ফোকাস করি তার উপর। প্রতিটি সুতো একটি স্মৃতি, একটি চিহ্ন, শ্রমের প্রমাণ, অথবা হারিয়ে না যাওয়ার এক অস্বীকৃতি।

শিল্পের কাজ উত্তরণের সঙ্গে বদলে যাওয়া, একই সঙ্গে বদলে দেওয়া। যেমনবিষয় থেকে অবয়ব,ক্যানভাস থেকে উপস্থাপনা সবই শিল্পের নতুন পথের সূচনার প্রয়াস। নূপুরের ভাষ্য, শুরুতে আমি আমার শিল্পচর্চায় কাপড় ব্যবহার করিনি, যদিও চারপাশে ছিল এসব ঐতিহ্য। আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে যখন আমাদের এলাকায় পাঁচজন বেকার জামদানি তাঁতি আমার পরিবারের সহায়তায় তাঁদের কাজ ফিরে পেতে চাইলেন। তৈরি হলো তিনটি তাঁত। আমি দেখলাম, শুনলাম, গবেষণা করলাম। একটা জামদানি শাড়ি কীভাবে গড়ে ওঠে? সুতোর পর সুতো, মোটিফের পর মোটিফ? সুতোর ইতিহাস কী? তাঁতের ছন্দ, হাতের স্মৃতি, সবই আমাকে টানতে লাগল। আর ভাবাল, কোন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও লিঙ্গভিত্তিক শক্তিগুলো ঠিক করে দেয় কোন ঐতিহ্য বাঁচে, আর কোনটা হারিয়ে যায়?

শীঘ্রই টেক্সটাইল হয়ে উঠল আমার একমাত্র মনোযোগের ক্ষেত্র। শুধু মাধ্যম হিসেবে নয়, প্রক্রিয়া হিসেবেও। কাপড়ের স্পর্শগত ভাষা আমাকে মুগ্ধ করল। তার টান আর কোমলতা, গোপন রাখার ক্ষমতা, গল্প বহনের সামর্থ্য, ঘরোয়া অন্তরঙ্গতা আর একসাথে এর বিশালত্ব। সেলাই, বুনন, রং করা, মেরামত, এসব কেবল পদ্ধতি নয়; এগুলো ধৈর্য, কোমলতা, স্থায়িত্ব ও স্মৃতির বহিঃপ্রকাশ। বুননের গ্রিডে, পরস্পরকে ছেদ করা সুতোগুলো ধারণ করে গঠন ও রূপক। যেখানে হাতের যুক্তি আর আকারের জ্যামিতি পাশাপাশি থাকে। গঠন আর অনুভব, তৈরি করা আর চিন্তা এই দ্বৈততায় আমার আগ্রহ জন্মে, কীভাবে বস্তু নিজেই ভাষা হয়ে উঠতে পারে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে স্পষ্ট হয় আমার বোরকার সিরিজে। সাধারণত যা সংযম আর আড়ালের প্রতীক, সেই বোরকা আমার কাজে হয়ে ওঠে গল্পের ক্যানভাস, ভাস্কর্যরূপী এক কাঠামো। এখানে আমি ব্যবহার করি জরির কাজ। যে সোনা ও রুপার সুতো এক সময় উৎসবের প্রতীক ছিল। এই জরির কাজ আমার কাজে সৌন্দর্যের নয়, বরং ব্যাঘাতের মাধ্যম। এটা দৃশ্যমানতা ও অদৃশ্যতার দ্বন্দ্বকে চিহ্নিত করে, দেখার ও শোনার মধ্যকার টানাপড়েনকে স্পষ্ট করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে, বোরকা আর পোশাক থাকে না। এটি হয়ে ওঠে এক প্রতিরোধের ক্যানভাস, যেখানে দৃশ্যমানতা হয়ে ওঠে আলোচনার বিষয়।

কিউরেটর তানজিম ওয়াহাব জানান, নূপুরের কাছে শিল্পচর্চা মানে ধ্যানের মতো, আবার এক ধরনের পারফর্মেন্সও বটে। প্রতিটি সূচের নড়াচড়া নিখুঁত, তবু ভুল আর উদ্ভাবনের জন্য উন্মুক্ত। এখানে কিছুই মোছা যায় না। প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি মিশে যায় কাজের পরতে পরতে। হাত আর মন একসাথে চলে। হাত তৈরি করে সূক্ষ্ম জ্যামিতি, মন স্মরণ করে নদী, ভূদৃশ্য, আর অন্তরঙ্গ পরিবেশ।

গ্রাফ পেপারে করা তার ড্রইংগুলো মনে করিয়ে দেয় জামদানি বুনন, ইসলামিক টাইলের নকশা, কিংবা গৃহস্থালির শাড়ির লেস। কাপড়ে আঁকা তরঙ্গময় মোটিফগুলো ডেকে আনে নদীর স্মৃতি। সোনালী সুতোর ঝিলিক যেন ঔপনিবেশিক জাঁকজমকের ছায়া। কিছু কাজ চুপচাপ ফিসফিস করে বলে। দয়া, আত্মীয়তা, এইসব শব্দ যেন অস্থির পৃথিবীতে ভাঙা স্বরের মতো কাঁপে। আবার কিছু কাপড় ঝুলে থাকে খোলা ও ঢেকে রাখা অবস্থায় একসাথে প্রকাশিত ও আড়াল করা।

নূপুরের হাতে বোনা কাজ কেবল নৈপুণ্য নয়, এটা এক স্মৃতির বাহক। এক অনিত্যতার ধ্যান, এক মৃদু প্রতিবাদের ভাষা। তার কণ্ঠস্বর হয়তো কোমল, কিন্তু তা থেমে থাকে না। ধীরে, ধাপে ধাপে এগিয়ে চলে, তার গান বয়ে নিয়ে যায় ভবিষ্যতের দিকে। শিল্পকর্মে গাঁথা লেখাগুলো মনে করিয়ে দেয় সেই সূচিকর্ম করা ওয়াল ম্যাট, যেগুলো নীরবে সাক্ষী থাকত ঘরের জীবনের। এখন সেই শব্দগুলো বলে ভেঙে পড়া সামাজিক কাঠামোর কথা, অবিচল দেহের কথা, আর বেঁচে থাকার আর্তি ও শোকের দ্বন্দ্ব। তার প্রতিটি শিল্পকর্ম কবিত্বপূর্ণ, কিন্তু তীক্ষ্ণভাবে বাস্তব।

শিল্পচর্চায় টেক্সটাইল রাজনৈতিক এবং নারীবাদী, এই দুয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কাপড়কে যুক্ত করা হয়েছে নারীসুলভতা, যত্ন, অদৃশ্যতা ও কোমলতার সঙ্গে। শিল্পী নূপুরের কাজে এই কোমলতাই শক্তি হয়ে ওঠে, আর সেলাই বা বুনন হয়ে ওঠে এক শরীরী সমালোচনা। কারুশিল্প বলে যেসব টেক্সটাইলকে অগ্রাহ্য করা হয়, নূপুর সেগুলোকেই উপস্থিতির, প্রতিবাদের, আর ক্ষমতার ক্ষেত্র করে তোলার চেষ্টা করেন। জামদানি বুননের সূক্ষ্মতা, স্বচ্ছতা, আর ইতিহাস প্রবলভাবে আকর্ষণ করে তাকে। প্রতিটি সুতোর ভেতর আছে নদীর স্মৃতি, দুর্ভিক্ষের ক্ষত, ঔপনিবেশিক দাগ, আর মায়ের হাতের ছোঁয়া। ভঙ্গুরতার পাশে স্থিতিশীলতা, দুইয়ের সহাবস্থান খুঁজে পান তিনি।

নোট: ১০ অক্টোবর ২০২৫ বেঙ্গল শিল্পালয়ে শুরু হয়েছে শিল্পী ইয়াসমিন জাহান নূপুরের চতুর্থ একক প্রদশর্নী নীরবতার সরবতা। প্রদর্শনীটি চলবে ২২ নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত।