আফ্রিকান ঔপন্যাসিক নাদিন গর্ডিমারের নোবেল সাক্ষাৎকার
পরিচিতি || নাদিন গর্ডিমার
নাদিন গর্ডিমার দক্ষিণ আফ্রিকার স্প্রিং শহরে ১৯২৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা-মা ছিলেন ইহুদি অভিবাসী। মা ব্রিটিশ ও বাবা লাটভিয়া থেকে দেশান্তরি হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসতি স্থাপন করেন। তাঁর রচিত উপন্যাস দ্য কনসারভেশনিস্ট (১৯৭৪) তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে তাঁর অনেক গ্রন্থ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।
উপন্যাস ছাড়াও নাদিন গর্ডিমার একাধারে গল্প ও প্রবন্ধ লিখে গেছেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে তিনি একাধারে উপন্যাস লিখেছেন। প্রায় প্রতিটি উপন্যাসের কাহিনি বর্ণবাদী শাসনের প্রতিরোধের ওপর অবলম্বন করে লেখা। কিন্তু ১৯৯০ দশকের উপন্যাসের কাহিনি বর্ণবাদমুক্ত দক্ষিণ আফ্রিকার সমাজ বাস্তবতা চিত্রিত করেছেন। সমষ্টি নয় একজন ব্যক্তিমানুষের গল্প সব সময় তার কাহিনির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। গর্ডিমারের রচিত সব চিত্ররূপে দক্ষিণ আফ্রিকার ঐতিহাসিক বিকাশের রেখাচিত্র আঁকা হয়েছে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হলো—বার্গার’স ডটার (১৯৭৯), জুলাই’স পিপল (১৯৮১), আ স্পর্ট অব ন্যাচার এবং তাঁর বিখ্যাত গল্প সংকলন হলো জাম্প (১৯৯১) এবং হোয়াই হ্যাভেন্ট ইউ রিটেন: সিলেক্টেড স্টোরিস (১৯৫০-১৯৭২)। নাদিন গর্ডিমার তাঁর অভূতপূর্ব মহাকাব্যিক কথাসাহিত্যের মাধ্যমে মানবজাতির জন্য অসাধারণ কল্যাণ বয়ে এনে আলফ্রেড নোবেলের উদ্ধৃতিকে প্রাসঙ্গিক ও প্রাঞ্জল রেখেছেন। ২০১৪ সালে তাঁর জন্ম শহর দক্ষিণ আফ্রিকার স্প্রিংয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৯১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী নাদিন গর্ডিমারের সাক্ষাৎকারটি ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক সিমন স্ট্যানফোর্ড ২০০৫ সালের ২৬ এপ্রিলে গ্রহণ করেছেন।

নাদিন গর্ডিমার © Achievement.org
আফ্রিকান ঔপন্যাসিক নাদিন গর্ডিমারের নোবেল সাক্ষাৎকার
বাংলা অনুবাদ || পলাশ মাহমুদ
১৯৯১ সালের সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী নাদিন গর্ডিমার আজকের সাক্ষাৎকারে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি।
নাদিন গর্ডিমার: ধন্যবাদ।
দক্ষিণ আফ্রিকার স্বর্ণখনির শহরে জন্মানো নাদিন গর্ডিমারের পূর্বপুরুষের উৎস কোথায়?
নাদিন গর্ডিমার: দক্ষিণ আফ্রিকার অন্য সাধারণ দশজন যে প্রেক্ষাপট থেকে এসেছে, আমিও তেমনভাবে এসেছি। আমার মা ইংল্যান্ড থেকে এসেছে, আর বাবা লাটভিয়া থেকে।
এটা কি গতানুগতিক মধ্যবিত্ত পরিবার বলা যায়?
নাদিন গর্ডিমার: না। আমি যেটা বলতে চেয়েছি, তা হলো সকল সাদা মানুষ ইউরোপের বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছে। প্রথম প্রজন্ম, দ্বিতীয় প্রজন্ম, এমনকি তৃতীয় প্রজন্মের সবাই। তাই আমার পরিবারের প্রেক্ষাপট আলাদা কিছু না। এটা শুধুই একটা নাম্বার।
এই বিষয়ে আপনার অনুভূতি কেমন ছিল? আপনার শৈশবের, তারুণ্যের সময়কালের অনুভূতি কেমন ছিল? আপনি বুঝতে পেরেছিলেন যে দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজাত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত আপনি?
নাদিন গর্ডিমার: আপনি যদি অভিজাত শ্রেণি শব্দটা বলেন, তাহলে এটা আলাদা করে বলার কিছু ছিল না। এটা স্বর্ণখনির শহর ছিল। বর্তমান সময়ের আগ পর্যন্ত; মানে, আমাদের স্বাধীনতা পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আমরা দক্ষিণ আফ্রিকার সাদা মানুষ ছিলাম। সাদা হওয়া মানেই শাসক শ্রেণির মানুষ। এটা অলিখিত বিধান ছিল। সাদা মানুষ হিসেবে আপনি যতোই অমায়িক হোন না কেন, আদতে আপনি শাসক।
প্রথম থেকেই কি আপনি এমন অমায়িক ছিলেন?
নাদিন গর্ডিমার: না, আমি তখনো কোনো বিনয় অনুভব করিনি। কারণ, একটা শিশু যে পরিবেশে বড় হয়, তার একটা আবহ তার আচরণে প্রকাশ পাবে, এটাই স্বাভাবিক। আমি একটা কনভ্যান্ট স্কুলে পড়েছি। স্কুলের সবাই সাদা মানুষ ছিল। সব মেয়ে সাদা ছিল। শনিবার আসলে মেয়েরা সব হাতখরচের টাকা পেত আর থিয়েটারে ছবি দেখতে যেত। ছেলেবেলায় আমি যদিও কখনো যাইনি। আমার যতটুকু মনে পড়ে, কোন কালো শিশুরা যেত না। তাদের ছবি দেখার সুযোগ ছিল না।
এলাকার পৌর-গ্রন্থাগার আমার জীবনে একটা আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল। আমার মা প্রচুর পড়তেন। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন আমাকে আর আমার বোনকে বই পড়ে শোনাতেন। ছয় বছর বয়সে আমাকে একটা শিশুদের গ্রন্থাগারের সদস্য করে দেওয়া হলো। এই লাইব্রেরি আমার শিক্ষার বড় একটা উৎস হয়ে উঠেছিল। ওই লাইব্রেরি না থাকলে মনে হয় না আমি আজকের লেখক হয়ে উঠতে পারতাম। লেখক হওয়ার একমাত্র প্রশিক্ষণ হলো পড়া। আমি যদি কালো শিশু হতাম, তাহলে ওই লাইব্রেরিতে পড়ার সুযোগ পেতাম না।
ছেলেবেলায় কখন বুঝতে পারলেন যে আপনি একজন সুবিধাভোগী এলিট শ্রেণির অংশ এবং একটা বিশাল বৈষম্য বিদ্যমান?
নাদিন গর্ডিমার: আপনি যে আকারে বোঝাচ্ছেন, ঠিক সেভাবে এই উপলব্ধি আসেনি। অভিজ্ঞতা আমাকে এই বৈষম্যকে ধীরে ধীরে বুঝতে সাহায্য করেছে। আমি যে বিরানভূমির পার হয়ে কনভ্যান্ট স্কুলে যেতাম তার বাঁ-পাশে বড় একটা মাইনের খনি ছিল। নাম ছিল স্প্রিং মাইন। এই খনির পাশের আঙিনায় কালো মাইন শ্রমিকেরা থাকত। তারা সারা আফ্রিকা থেকে এখানে কাজ করতে এসেছিল। আমাকে চরম সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে আমি যেন মাইন শ্রমিকদের ধারে কাছে না যাই। ছোটবেলা থেকেই আমাকে কালোদের ব্যাপারে মনের ভেতর একটা ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যদিও বাড়িতে কাজের বুয়া সব কালো ছিল। কিন্তু তারা তো মেয়ে ছিল, তাই তাদের যৌন নিগ্রহের কোনো ঝুঁকি ছিল না। সাদা মেয়েদের কালো পুরুষদের প্রতি যে আতঙ্কে থাকত, তা কাজের কালো মেয়েদেও মধ্যে ছিল না। সাদা মানুষরা সব সময় এই আতঙ্কে থাকত যে, হয়তো কোনো মাইন শ্রমিক তাদের ১০ বছরের মেয়েটার গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
কিন্তু আরেকটা মারাত্মক বিষয় ছিল। কালোদের জন্য একটা মূল্যছাড়ের দোকান ছিল। মাইন কারখানায় কিছু সারিবদ্ধ দোকান ছিল। ওই দোকানে মাইন শ্রমিকদের মূল্যছাড়ে পণ্য ধার দেওয়া হতো। মানে, যারা ওই কারখানা চালাত। এটা করা হয়েছিল, যাতে কালোরা কিছু কেনার জন্য শহরে না যায়। আমি যখন এই মাইন কারখানার পাশ দিয়ে যেতাম, দেখতাম কী করে শ্রমিকেরা আসত আর কেনাকাটা করত। তারা তখনো যাত্রাকালীন পোশাক পরে থাকত, গায়ে কম্বল জড়ানো থাকত, চুলগুলো উষ্কখুষ্ক কোঁকড়ানো থাকত। দোকানে একটা কাউন্টার ছিল। কাউন্টারের সামনে একটা শক্ত তার বাঁধা ছিল। অনেকটা দোকানদার ও কাস্টমারের মাঝে বেড়া দেওয়ার মতো। কাস্টমারটা আঙুলের ইশারায় এইটা বা ওইটা দিতে বলত। দোকানদার ওই মালটা নামিয়ে তাদের দিকে দিত। কাস্টমারদের হাতে ধরে কোনো কিছু দেখার অধিকার বা সুযোগ ছিল না। তারের নিচ দিয়ে সে টাকাটা দিত আর বিনিময়ে তার জিনিস টেনে নিজের কাছে নিত। আমার সেই ১১ বা ১২ বছর বয়সে এই ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত লাগত। কারণ, আমি যখন মায়ের সঙ্গে শহরে কেনাকাটা করতে যেতাম, তখন জুতা বা জামা কিনলে আমরা একটা আলাদা বুথে গিয়ে এটা পড়ে ট্রায়াল দিয়ে দেখার সুযোগ পেতাম। ভাবতাম, কালো মানুষগুলো আমার মতো কেন হাতে নিয়ে দেখার সুযোগ পায় না। তারা কেন শুধু আঙুলের ইশারায় দেখিয়ে দেয়, তাদের কী লাগবে। তারা কেন জিনিসটা হাতে নিয়ে এর মান দেখে পছন্দ করার সুযোগ পায় না। এই রকম আরও কিছু ঘটনা আমার মধ্যে সাদা-কালোর ব্যবধান বুঝতে সাহায্য করেছে।
মদের তল্লাশি ছিল এমনি আরেকটা ঘটনা। আমি সেই ১৯৩০ দশকের শেষ দিকের কথা বলছি। তখন কালোদের জন্য মদ কেনা নিষিদ্ধ ছিল। তাই কালোরা সবাই সব জায়গায় নিজেরাই নিজেদের বিয়ার বানাত। সাদাদের বাড়ির পেছন দিকের আঙিনায় বেশির ভাগ সময় এই কাজ করত। যখন একটু বড় হলাম; মানে, ১১ বছর হবে হয়তো। সেই সময় একদিন একটা তল্লাশির ঘটনা ঘটল। সকাল সকাল আমি জেগে উঠলাম। আমার বাবা-মা জেগে উঠল। আমরা দৌড়ে উঠানে গেলাম। দেখলাম সাদা ও কালো উভয় পুলিশ কাজের লোকদের জিনিসপত্র ছুড়ে ছুড়ে ফেলছে। এই লোকগুলো আমার দুই বছর বয়স থেকে আমাদের বাড়িতে কাজে করে আসছে। পুলিশগুলো তাদের মাদুর, পাটি, গোছানো কাপড় টেনে বের করে বাইরে ছুড়ে ফেলছিল। সব জায়গায় তন্নতন্ন করে বিয়ার খুঁজে ফিরছিল। আমার বাবা-মা চুপচাপ চেয়ে চেয়ে দেখছিল। একবারও জিজ্ঞেস করেনি, তল্লাশি করার অনুমতিপত্র কোথায়? আপনারা কেন আমার ঘরবাড়িতে তল্লাশি চালাছেন? তারা বিনা প্রশ্নে এটা হতে দিয়েছিল। চোখের সামনে কালো নারীদের অপমানিত হতে দেখেছিল। এই ঘটনাকে ভিত্তি করে আমি প্রথম বড়দের গল্প লিখেছিলাম।
তার দুই থেকে তিন বছর পর যখন আমার বয়স ১৫। আমি একটা গল্প লিখেছিলাম, যেটা ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত হয়। সে বছর বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার একটা সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। কেউ জানত না, আমি বয়সে এত ছোট। গল্পে আমি বলতে চেয়েছি আমার সেই মনোবেদনার কথা। আমি যে দুইটা ঘটনার কথা বললাম, এদের একসঙ্গে মিলিয়ে আমি ভাবতে লাগলাম, আমরা যেভাবে বাঁচি, সেই রকম বাঁচা কেন বাঁচি। শুধু রঙের ভিন্নতার কারণে কেন মানুষ যে সুবিধা ভোগ করবে, অন্য মানুষ তা থেকে বঞ্চিত হবে? এই ভাবনা আমাকে মরমে মেরেছে।

ডেসমন্ড টুটু ও নাদিন গর্ডিমার © Achievement.org
আপনি যখন এই অন্যায়কে বুঝতে শুরু করেছেন, এই নিগ্রহকে চোখের সামনে দেখেছেন; আপনি কি তখন দক্ষিণ আফ্রিকার কালো মানুষের জীবনকে ত্রিমাত্রিক দৃষ্টিতে দেখা শুরু করেছেন? আপনি কি অপর পক্ষের দায়কে দেখতে পেতেন, যারা বিভাজিত দক্ষিণ আফ্রিকার ছবি সমর্থন করত বা না দেখার ভান করত? যারা কালো মানুষদের মানব মর্যাদার আলোতে দেখতে চায়নি?
নাদিন গর্ডিমার: হ্যাঁ। এই ত্রিমাত্রিক ছবির সঙ্গে আপনাকে বাস্তব পরিস্থিতির কথাও মাথায় রাখতে হবে। কোন কালো মানুষের সঙ্গে আমার ভাবনা বিনিময় করব বা নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ হবে, এই কথা সেই সময় কল্পনাও করা যেত না। এটা সব সময় মনিব-চাকরের সম্পর্কের মধ্যে ছিল। এমনকি মনিবের বাচ্চাদেরও মধ্যেও এই মনোভাব চলে আসত। কিন্তু সামান্য পড়াশোনা ও সংবেদনশীলতা আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছে এই পৃথিবীতে বর্ণবাদ বলেও একটা ব্যাপার আছে। আর আমি এই বৃত্তে বাস করছি। এই বৃত্তের একটা বিন্দু আমি, অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আমি যখন বড় হলাম এবং অল্প সময়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছিলাম। আমাকে প্রতিদিন ট্রেনে চড়তে হতো। সেই প্রথম আমি কোনো কালো মানুষের সরাসরি সংস্পর্শে এসেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগও কিন্তু শুধু সাদা মানুষদের জন্য ছিল। কিছু কোর্স ছিল, যেগুলো দক্ষিণ আফ্রিকার কালোদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হতো না। তাই বিশেষ সুবিধা হিসেবে স্নাতকোত্তরে পর্যায়ে কিছু কালো শিক্ষার্থীকে সাদাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ দিত। সেই সুবাদে আমি দু-একজন কালো মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। এদের সঙ্গে আমার এমন বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল, যেটা কোনো সমবয়সী সাদাদের সঙ্গে হয়নি।
আমি অতটা ক্রীড়াপ্রিয় ছিলাম না। সাদারা এমন সব বিষয়ে মজে থাকত, যেখানে আমার কোনো আগ্রহ ছিল না। এখানে এমন কিছু কালো মানুষের দেখা পেলাম, যারা লেখালেখি শুরু করেছিল। যারা লেখক হতে চাইছিল। আমাদের এমন প্রকাণ্ড উচ্চাশা ছিল। জীবনকে এক বিশাল দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করলাম। জীবনের রহস্যকে বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম। আমাদের সামাজিক জীবনব্যবস্থাকে নিয়ে প্রশ্ন করতে লাগলাম। আমি অনেক কালো বন্ধু বানাতে শুরু করলাম। আমি তখনই একজন তরুণ লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলাম। আমি একটা ভিন্ন রকম দলে ভিড় করলাম, যেখানে শুধু সাংবাদিক, অভিনেতা ও শিল্পের লোকজন আনাগোনা করে। তারা সাধারণত সমাজের প্রচলিত নিয়ম মানতে চায় না। যেখানে বর্ণবাদকে অবিশ্বাস্যভাবে ব্যবচ্ছেদ করে দেখতে চায়। শুধু কালো মানুষের নিগ্রহকে নয়, একই সঙ্গে সাদা মানুষের মনন ও ব্যক্তিত্বকে ব্যবচ্ছেদ করা আমার জীবনের লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল। শৈশব থেকে ঘরে, স্কুলে, বিশ্ববিদ্যালয়—যেসব জায়গায় বর্ণবাদের ভাবনা ও চেতনা দিয়ে আমি নিমজ্জিত ছিলাম, তার থেকে মুক্ত হওয়ার একটা পথ ছিল আমার লেখা।
আপনি নিজেকে একজন সহজাত লেখক হিসেবে ভাবেন, তাই না। আপনি যেসব লেখকের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছিলেন, তাঁরাও কি এমন সহজাত লেখক ছিলেন?
নাদিন গর্ডিমার: হ্যাঁ।
আপনি জানেন। সাদাদের অন্যায় সমাজস্বীকৃত ছিল। আপনার মধ্যে কোনো ক্রোধ অনুভব করতেন কি? কোন বিষয়টা আপনার লেখার স্বরকে বিকশিত করেছে?
নাদিন গর্ডিমার: হুম। এমন কিছুটা হয়েছে। এর মানে হচ্ছে, আপনি এমন এক সময়ে ফিরে যাবেন, যখন তারা এমন কিছু চিন্তা করলে বিপদে পড়ে যেত এবং কালো হওয়ার ফল ছিল ভয়ানক। ফলে আপনার যে সংযোগটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে শুরু, তা শিল্পের স্পর্শে রাজনৈতিক হয়ে উঠল। আপনার বন্ধুরা সব বিপদের মুখোমুখি হতে লাগল। আপনি পুলিশের জেরার মুখে নিজেকে বাঁচাতে মিথ্যে বলতে লাগলেন। আপনি বলতে লাগলেন যে আপনি তাদের কখনো দেখেননি। কখনো তাদের চেনেন না। যারা বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে ছিল, তাদের মধ্যে নানা স্তর তৈরি হলো। আপনাকে কালো বন্ধু ও অন্যান্য মানুষের জন্য বেঁচে থাকতে হতো, টিকে থাকতে হতো। শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবার দিন ছিল না। তাই এই দুটো দিকই একই সঙ্গে বেড়ে উঠেছিল।
আপনাদের পুরো প্রজন্ম বর্ণবাদের সময়ে বেড়ে উঠেছে। কিন্তু আপনাদের সন্তানেরা ভিন্ন একটা শিক্ষা নিয়ে বড় হয়েছে। আপনাদের মধ্যে কি প্রজন্মগত ব্যবধান তৈরি হয়েছে, যেটা আপনাকে পরিশীলিত লেখক হিসেবে তৈরি হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে?
নাদিন গর্ডিমার: হ্যাঁ। তবে এটা গায়ের রং দিয়ে আলাদা করার কিছু না। আজকের দিনে সাদা শিশু এবং কালো শিশু—উভয়ই স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরে টিভি ছেড়ে দেয়। ঘুমের আগে গল্প বলার রীতি আর নেই। আপনি বাচ্চাদের টিভির সামনে বসিয়ে শিশুতোষ অনুষ্ঠানগুলো ছেড়ে দেন। এই পর্যন্ত। আপনি তাদের আর গল্প পড়ে শোনান না। আপনি যখন ছোট ছিলেন, তখন হয়তো আপনাকে গল্প পড়ে শোনানো হতো, কিন্তু সেটা আপনার প্রজন্মের কথা। তারপর আপনি পড়া শিখলেন, লেখা চিনতে শিখলেন আর শিক্ষিত হয়ে উঠলেন। আমাদের মধ্যে নিরক্ষরতার এক জটিল সমস্যা আছে। আমাদের মাঝে নিরক্ষরতার হার অনেক বেশি। বই পড়ে আনন্দের আস্বাদন ও পাঠকে উপভোগ্য করার মতো সুযোগ কম। স্কুলের পাঠ্যসূচি পড়া অন্যরকম বিষয়। এটা আপনার জন্য আরোপিত কাজ। কিন্তু নিজের খেয়ালে, নিজেকে আমোদিত করতে বইয়ের জগতে প্রবেশ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এটা একটা সর্বজনীন ব্যাপার। সেদিন আমি ইংল্যান্ড ও আমেরিকার আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে পড়ছিলাম। দেখলাম, শিক্ষার মান যথেষ্ট পড়ে গেছে।
তার মানে, আপনি বর্ণবিভাজনের গণ্ডি থেকে নিজেকে সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। আপনি এটাকে সর্বজনীন সমস্যা বলে মনে করেন?
নাদিন গর্ডিমার: ও, হ্যাঁ এটা বর্ণবিভাজনের সঙ্গে একেবারেই সম্পর্কিত না। এই হুমকিটা হলো শব্দের বিরুদ্ধে, লিখিত শব্দের বিরুদ্ধে, বইয়ের ছাপা শব্দের বিরুদ্ধে।
আপনার প্রথম উপন্যাস দ্য লেইয়িং ডেইজ একটা মানুষের বেড়ে ওঠার গল্প। আপনার চারপাশের সমাজ বাস্তবতাকে বোঝার প্রথম লিখিত প্রকাশ, তাই না?
নাদিন গর্ডিমার: আমি লিখে আসছিলাম। আমরা কী রকমভাবে বেঁচে আছি, তার কিছু জিজ্ঞাসার কিছু উত্তর খুঁজে ফিরছিলাম। তারপর তো প্রথম উপন্যাসটা লিখলাম। আমার ১৪টা উপন্যাস এবং ৯ থেকে ১০টা গল্প সংকলনের মাঝে একমাত্র এই বইটা সম্পূর্ণ আত্মজৈবনিক। আমি নিজের জীবনকে লেখার উপাদান করার মতো লেখক নই। আমার গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় প্রেক্ষাপট থেকে এসেছে। এটা প্রথম পুরুষের বয়ানে হতে পারে। নামপুরুষেও হতে পারে। এমনকি দুটির মিশ্রণ থাকতে পারে। কিন্তু আমি আত্মজৈবনিক ঘরানার লেখক নই। কিন্তু আমার প্রথম উপন্যাস অন্য সব লেখকের প্রথম উপন্যাসের মতো আত্মজৈবনিক উপাদানে ভরপুর। আমার মনে হয়, প্রথম উপন্যাস হলো নিজের পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রতি একটা প্রতিশোধ। মনে হয় যেন আপনার বুকের ভেতর থেকে নিজের পটভূমি নামিয়ে হালকা হতে চাচ্ছেন।
আপনি বৈচিত্র্যময় সব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লিখেছেন। আপনার চরিত্রগুলো বিচিত্র। আপনার গল্পের পটভূমি বিবিধ। আপনি লৈঙ্গিক পরিচয় নিয়ে লেখেন। আপনি যৌন পরিচয় নিয়ে লেখেন। আপনার লেখা জাতি, বর্ণ ও বৈচিত্র্যকেন্দ্রিক।
নাদিন গর্ডিমার: কিন্তু আমি যা লিখি, তার সবকিছু ভেতর থেকে লিখি। আমি বাইরে থেকে কোনো কিছুর সম্পর্কে লিখি না। একটা বিষয় কীভাবে মানুষের প্রকৃতি ও আকৃতি ঠিক করে দেয়, তা নিয়ে লিখি। কোনো কিছু সম্পর্কে লেখা মানে, আপনি প্রবন্ধ বা তথ্য সাহিত্য লিখলেও পারেন। এমন কিছু লেখা আমি লিখেছি। কিন্তু আমার গল্প, আমার উপন্যাস কোনো কিছুর সম্পর্কে না...
আপনি ভেতরের লেখক এবং নানামুখী দৃষ্টি থেকে লেখেন। আপনার লুট বই থেকে আমি কিছু গল্প পড়ছিলাম। যেমন ‘মিশন স্ট্যাটম্যান্ট’—এই গল্পটার পটভূমি খুব ভেতর থেকে দেখা হয়েছে। একজন মানুষের জীবনকে খুব কাছ থেকে বয়ান করা হয়েছে। আপনি নানা পরিস্থিতির নানান চরিত্রকে কীভাবে এত ভেতর থেকে, গভীর থেকে দেখতে পারেন?
নাদিন গর্ডিমার: আমি একটা কথাই বলব, আমি জানি না। আমি আসলেই জানি না।
কিন্তু কোনো একটা পদ্ধতি তো আছে। কারণ, গল্পে একজন সাহায্য কর্মীর জগৎ সম্পর্কে বিশদ ও ভেতর থেকে জানা কিছু বিষয় তুলে ধরেছেন। আপনি প্রত্যক্ষ কোনো অভিজ্ঞতা বা ওই বাস্তব পরিস্থিতিতে নিজেকে রেখে চিন্তা করেন?
নাদিন গর্ডিমার: না। আমি কোনো সাংবাদিকের কাজ করি না। আমি এই কাজটা করি না। যদিও আমার এই দীর্ঘ জীবনে নানা রকম মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। যেমনটা বলেছিলাম, আমার মধ্যে অন্য মানুষের জীবনকে জানার আগ্রহ সব সময় কাজ করত। কীভাবে তারা চিন্তা করে? কীভাবে তারা কাজ করে? কীভাবে তাদের একান্ত অনুভূতি প্রকাশ করে? কিন্তু এটা আমি কীভাবে করি, তা ব্যাখ্যা করতে পারব না। আমার মনে হয় না কোনো লেখক ব্যাখ্যা করতে পারবে। এটা হয়ে যায়, ঘটে যায়। কিছু মানুষ আছে, কিছু পরিস্থিতি আছে যখন আপনার গল্পের কোনো চরিত্র জীবনের কোনো একটা দিকে জড়িয়ে পড়ে, যার সম্পর্কে আপনি ততটা বুঝে উঠতে পারেন না। কিন্তু অন্যরা বুঝতে পারে না এবং এই জানাটা উপভোগ করে। কিন্তু আমি একটা বিশদ গবেষণায় নিজেকে এমন নির্মোহভাবে নিবেদন করি যেন কখনো অসাবধানতায় কোনো ভুল শব্দ ব্যবহৃত না হয়। কিন্তু সব সময় সম্ভব হয় না। যেমন আমি কখনো ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখি না। কারণ, আমার পক্ষে এটা সম্ভব নয়। যেভাবে গবেষণা করার দরকার, সেভাবে আমি করতে পারি না।
আপনার পড়াশোনা, মানে, আপনি উইটস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। কিন্তু স্নাতক শেষ করলেন না।
নাদিন গর্ডিমার: না, আমি সেখানে এক বছরের মতো পড়েছি। অনিয়মিত কিছু কোর্স পড়েছিলাম।
এটা কি কিছুটা অদ্ভুত না? মানে, আপনার অবস্থান থেকে, মানে আপনার লেখার প্রক্রিয়া যেভাবে ভেতর থেকে তৈরি হয়ে আসে। নিজেকে লেখক হিসেবে কীভাবে তৈরি করলেন? আপনি আপনার ভাষার শক্তিকে নিজেই তৈরি করেছেন, মানে আপনার বর্ণনাশক্তি, মানে যে বাক্যশৈলী আপনি সৃষ্টি করেন। এই ভাষা কোথা থেকে আসে? এটা কি পরিশ্রম করে শিখতে হয়?
নাদিন গর্ডিমার: বই। মানে, বই পড়তে পড়তে একটা সময় ভেতর থেকে আপনাআপনি তৈরি হয়েছে। সত্য কথা হলো, ছয় বছর বয়স থেকে যে পড়া শুরু করেছি, তার অন্তিম ফল এটা।
এটা কি কোনো আলাদা ডিসিপ্লিন?
নাদিন গর্ডিমার: প্রকৃত ও জীবন্ত ডিসিপ্লিন। তবে পঠন কোনো ডিসিপ্লিন ছিল না। পঠন আমার জীবনে অপরিমেয় আনন্দ ও অশেষ পরমানন্দ এনে দিয়েছিল, যাকে কোনোভাবে বলে বোঝানো যাবে না। আমার মনের মাঝে শব্দের প্রতি একটা তুমুল ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আপনি যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত না হন, তাহলে এই শব্দেরা কোথা থেকে আসে? আমি এই বিষয়টা একেবারেই ভেবে কিছু পাই না। নিশ্চিত করে কিছু জানি না। যদি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকত, হয়তো ভিন্ন ধরনের লেখক হতাম। নিজেকে মাঝে মাঝে প্রশ্ন করি। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায় লেখা উপন্যাসের ভাষার অমসৃণতা আমি টের পাই। হয়তো আমি ভাগ্যবান। একটা জিনিস নিয়ে আমার খুব অনুতাপ হয়, তা হলো অন্য ভাষা শেখা। অন্য অনেক ভাষা শেখার খুব আকাঙ্ক্ষা ছিল।
অন্য ভাষা?
নাদিন গর্ডিমার: হ্যাঁ, মানে ইংরেজি তো আমার মাতৃভাষা। এটা আমার নিজের ভাষা। বিদেশি কিছু ভাষা শিখতে চেয়েছিলাম। কোনো আফ্রিকান ভাষা শেখা হলো না। অন্য সব দক্ষিণ আফ্রিকান মানুষের মতোই আমরা বন্ধুরা একসঙ্গে বসে যখন কথা বলি। সবাই ইংরেজিতেই কথা বলে। কিন্তু আমি যখন রুম থেকে বাইরে যাই আইসক্রিম বা অন্য কিছু কিনতে, যখন ফিরে আসি; দেখি তারা তাদের নিজেদের ভাষায় কথা বলায় মশগুল। কেউ সেতস্ওয়ানা ভাষায় কথা বলছে, কেউ জুলু ভাষায়। তখন আমার নিজের দেশে নিজেকেই বিদেশি মনে হতে থাকত। নিজের কাছের মানুষের ভিড়ে নিজেকে অচেনা লাগত। এই বিষয়টা নিয়ে খুব আফসোস হয়।
একটু আগে কল্পনা করেছেন, যদি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকত, তাহলে আপনি ভিন্ন রকম লেখক হতেন। আপনি যে দেশে জন্মেছেন, যে নাটকীয়তা ও যাতনার মুখোমুখি হয়েছেন, যে অন্যায় ঘটতে দেখেছেন, সে অভিজ্ঞতা না হলে হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন লেখক হতেন।
নাদিন গর্ডিমার: না। আমি ভিন্ন হতাম না। আপনি যদি লেখক হন, তাহলে ক্যানারি পাখির মৃত্যুকে আপনি বৃহৎ প্রেক্ষাপটে দেখতে পারেন। এই ঘটনাকে সমগ্র জীবনচক্রের সঙ্গে সংযোগ করে দেখতে পারেন। এমনকি জীবনের রহস্যের সঙ্গেও মেলাতে পারেন। আমার কাছে লেখালেখির উদ্দেশ্য কী? ব্যক্তিগতভাবে মনে করি জীবনের রহস্যকে উন্মোচন করা। এই জীবনরহস্য যেমন ক্ষুদ্র ব্যক্তি জীবনকে অন্তর্ভুক্ত করে, তেমনি বৃহৎ রাজনৈতিক জীবনকে অন্তর্ভুক্ত করে। এমন সব শক্তির কথা বলে, যা আমাদের আজকের আমিতে পরিণত করেছে। অন্যদিকে আমাদের ভেতরে আরেক ধরনের শক্তি আছে, যারা আমাদের অন্য কিছুতে রূপান্তর করতে চায়।
আমরা কি নতুন কোনো গল্প পেতে যাচ্ছি?
নাদিন গর্ডিমার: জীবনের রহস্য নিয়ে নয়; অন্য বিষয়ে। আমি একজন নাস্তিক। যদি আমার কোনো ধর্ম থাকত, তাহলে হয়তো জীবনের রহস্যের কোনো উত্তর দিতে পারতাম। কিন্তু নাস্তিক হিসেবে বলতে পারি, যেহেতু আমার কাছে ধর্ম বলে কিছু নেই, সেহেতু জীবনের রহস্যের কোনো যথার্থ ব্যাখ্যাও আমার কাছে নেই।
বহু বছর যাবৎ দক্ষিণ আফ্রিকার শিল্প, সাহিত্য, বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা বলে আসছেন। শিল্পের মধ্যে এমন কোনো সম্ভাবনা বা স্বাধীনতা কি আছে, যার ফলে একজন মানুষ নিজের একান্ত গভীর সত্তাকে প্রকাশ করতে পারে। নিজেকে প্রকাশ করতে পারে?
নাদিন গর্ডিমার: আমি সাহিত্যকে ভাবগত দিক থেকে দেখতে চাই না। সাহিত্যের নিজস্ব পরিমণ্ডলে ঘুরপাক খেতে চাই না। পরিবর্তন করাটা অসাধারণ ব্যাপার। আমার সময় থেকে আজকের নতুন প্রজন্ম সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা পরিবেশ ও বাস্তবতায় বড় হচ্ছে। আমার ছেলে এবং নাতি-নাতনি জানবে যে আমার সময়ের অনেক কিছু লিখে প্রকাশ করা হয়নি। জীবনের অনেক রহস্য অনুসন্ধান করে বের করা হয়নি। আমি অনেক স্থির হয়ে অপেক্ষা করছি দেখার জন্য আজকের নবীন লেখকেরা আমাদের সময়ের জীবনকে কীভাবে প্রকাশ করে।
কিছু লেখক আছে, যারা চমৎকার লেখে, কিন্তু তারা অতীত নিয়ে মগ্ন থাকে। বিশেষ করে কালো লেখকেরা। কারণটাও পরিষ্কার। তাদের কাঁধে যে অতীত তার ভার নিয়ে চেপে আছে। অতীত তাদের ঘাড় পেছন দিকে টেনে ধরে আছে। তাদের বাবা-মা, দাদা-দাদীর জীবনকে যেভাবে পাল্টে দিয়েছে, তার থেকে মুক্ত হওয়া শক্ত।
পরিবর্তনের কথা বলছিলাম। তারা পরিবর্তিত হতে পারেনি। তারা ঠিক আগের মতোই লিখে যাচ্ছে। মনে হয় অতীতের সবকিছু তারা প্রকাশ করে ফেলতে চাচ্ছে। ফ্রয়েডিয়ান ভাষায়, এটা অবদমিত সত্তার অতীতে ফিরে যাওয়া। কিন্তু একই ব্যাপার সাদাদের সঙ্গেও হতে দেখলাম। অতীত নিয়ে বইয়ের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। অতীত আমারও অসহ্য লাগে। আমার বাবা-মাও বর্ণবাদী ছিলেন। আমি সব সময় এটা নিয়ে মর্মপীড়ায় ভুগেছি। এমন হয়েছে যে মনোচিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত ছিল। এই অনুভূতি নিয়ে অন্য সবাইকে বিরক্ত করা উচিত নয়। আমি বলছি না, সাদাদের অভিজ্ঞতা অপ্রাসঙ্গিক। অবশ্যই না। এই বিষয়ে আজকের দিনে কী বলছে বা ঘটছে, তা দেখতে খুব আগ্রহী। আমার কাজে ক্ষুদ্র জিনিসকে ক্ষুদ্র মনে হয় না। ছোট ছোট ঘটনার অনেক বড় বড় সামাজিক প্রভাব থাকে।
আমি যেখানে থাকি, তার কাছেই একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। আমাদের সময়ে এখানে সব সাদারা পড়ত। বেশি বড় স্কুল নয়, তবে খুব সুন্দর। আমি যখন স্কুলের পাশ দিয়ে হেঁটে যাই, তখন এদের টিফিনের বিরতি চলে। সব বাচ্চা স্কুল থেকে বাইরে বের হয়ে আসতে থাকে। তার খুবই ছোট ছোট। আমার খুব প্রাণবন্ত লাগে, যখন দেখি একজন সাদা ও একজন কালো বাচ্চা খেলা করছে। আপনি জানেন, ছোটবেলায় আপনারা কীভাবে পাঞ্জা লড়তেন। একজন ছেলের সঙ্গে অন্য একটা ছেলের এমন লড়াই খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু এই খেলাটা একজন সাদা ও কালো ছেলে খেলছে, আমার ছেলেবেলায় এমন দৃশ্যটা অকল্পনীয় ছিল। একসঙ্গে খেলা বা একসঙ্গে ছবি দেখতে যাওয়ার দৃশ্য অসম্ভব ছিল। এখন তো মিশ্র বর্ণের মধ্যে বিয়েও হচ্ছে। একজন সাদা-কালো দম্পতি একসঙ্গে আছে—ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য ও অকল্পনীয়। এটা আমাকে একটা সুখের ঝটকা দেয়।

নেলসন ম্যান্ডেলা ও নাদিন গর্ডিমার © Achievement.org
আপনি তো জনসমক্ষে নিজেকে একজন বর্ণবাদবিরোধী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এখন নতুন যুগ। ২০০১ সালে এমন এক পরিস্থিতি উদ্ভব হলো যে সবখানে আপনার জুলাই’স পিপল উপন্যাসের নাম নিতে লাগল...
নাদিন গর্ডিমার: একটা প্রদেশে।
হ্যাঁ, একটা প্রদেশে।
নাদিন গর্ডিমার: বিষয়টা জাতীয় ব্যাপার হয়ে ওঠেনি।
...ঘটনাটা খুব দ্রুত ঘটে গিয়েছিল। ঘটনাটা খুব ধাক্কা দিয়েছিল। এটা কিছুটা বিচ্যুতি বা ব্যতিক্রম বলতে পারেন। কিন্তু এখনো কি আপনি দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন সমাজ বাস্তবতায় অন্যায় দেখতে পান?
নাদিন গর্ডিমার: হ্যাঁ। অবশ্যই দেখি। আমি জুলাই’স পিপলের মতো ছোট কোনো ঘটনা নিয়ে কথা বলছি না। আমি এইডস নিয়ে কথা বলছি। এই মহারোগের ব্যাপারে সরকারের উদাসীনতার কথা বলছি। সরকারকে এই ব্যাপারে সচেতন হতে দীর্ঘ সময় নিয়ে ফেলেছে। আমাদের যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আছে, সে এখনো এইডসের প্রতিষেধকের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে উদাসীন। কেউ অস্বীকার করছে না যে আপনাকে সুষম খাদ্য খেতে হবে। আপনাকে এমন বসবাসযোগ্য পরিবেশ দিতে হবে, যেন আপনার শরীর যথেষ্ট পুষ্টি পায়। কিন্তু এইডসের ওষুধের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করার বিরুদ্ধে আমি সোচ্চার ছিলাম। একটা তীব্র অনুভূতির ভেতর দিয়ে গেছি। একটা অনুতাপের অনুভূতি এই ভেবে যে আমাদের প্রেসিডেন্ট যাকে নিয়ে খুব গর্ব করতাম; মানে, তার কাজের প্রশংসা করতাম। ভাবতাম সে একজন চমৎকার প্রেসিডেন্ট। এইডস নিরাময়ে ওষুধ গ্রহণ আবশ্যিকতার ব্যাপারে তাঁর উদাসীনতা মেনে নিতে পারছিলাম না। এইচআইভি এবং এইডসের মধ্যে যে সংযোগ আছে, তা প্রমাণিত হওয়ার পরও বিষয়টাকে নগণ্য মনে করার মানসিকতা দেখে মর্মাহত হয়েছি। আমি বিচলিত ছিলাম এটা জেনে যে এমন একজন অসাধারণ মানুষ, বাস্তববাদী মানুষ কীভাবে এমন একটা বিষয়কে এড়িয়ে যেতে পারে।
আপনি খ্যাতিমান সব লেখকের লেখা নিয়ে একটা অসাধারণ গল্পসংকলন লিখেছেন। এটা একটা বৈশ্বিক বিবৃতি ছিল। টেলিং টেইলস বিষয়ে কিছু বলবেন কি?
নাদিন গর্ডিমার: পনেরো মাস আগের কথা। একটা চমৎকার সংগীতানুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল। কিছু পপসংগীতশিল্পী এবং সঙ্গে কিছু ধ্রুপদি সংগীতশিল্পী এক হয়ে গানের আসর করেছিল। এমন বিশাল সংগীতের মঞ্চে এমন চমৎকার পরিবেশনার মাধ্যমে তারা এইডস রোগীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করছিল। জনসাধারণের মাঝে এইডস নিয়ে সচেতনতা তৈরি করছিল। এটা অনেক কাজে এসেছিল। আমি এইডসকে অস্বীকার করার প্রবণতাকে একটা ধাক্কা দিতে চেয়েছিলাম। এই রোগে আক্রান্তদের মধ্যে যে লজ্জার অনুভূতি মিশ্রিত থাকে, তাকে নির্মূল করতে চেয়েছিলাম। আমি দেখলাম, ওই সংগীত পরিবেশনে বুনো ছিল এমনকি গেডলফও ছিল। ওরা সবাই এইডস নিয়ে কিছু না কিছু করছে। আমি ভাবলাম, আমরা লেখকেরা কী করেছি।
আন্তর্জাতিক লেখকদের সংঘ পেন ত্রিশ বছর ধরে অসাধারণ সব কাজ করে যাচ্ছে। যে লেখকেরা রাজনৈতিক শোষণের শিকার বা শাসকদের রোষানলে পড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, তাদের জন্য একটা আশ্রয়, একটা ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে। যদিও অনেক ভালো কাজ করছে, কিন্তু এইচআইভি/এইডস নিয়ে তাদের কোনো টুঁ শব্দ করতে দেখা যায়নি। তারা যেন জানত না কোনো লেখক এই রোগে আক্রান্ত। আমার মনে হলো, অন্য কেউ কেন এই বিষয়ে কিছু করছে না—এই চিন্তা করে ভালো কিছু হবে না। আমি নিজে কী করতে পারি, তাই ভাবতে লাগলাম।
তাই ভাবলাম, একটা সুন্দর গল্পের বই করলে কেমন হয়। এইডস নিয়ে অনেক নির্দেশিকা বই, পাঠ্যবই আছে; যেগুলো একজন রোগীর জন্য কাজে আসতে পারে। কিন্তু বইটা হবে এমন একটা বই, যার গল্পগুলো এইডস নিয়ে হবে না। ভাবলাম, খ্যাতিমান লেখকদের চমৎকার গল্প প্রকাশিত হবে এবং বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসবে। এমন সময় বাজারে আসবে, যখন মানুষ ক্রিসমাস উপহার হিসেবে বইটা উপহার দেওয়ার জন্য কিনবে। বইটা এমন হবে, যেন তারা নিজের জন্যও কিনবে আবার উপহার হিসেবেও দেবে। হঠাৎ আমি ২০ জন লেখককে একটা চিঠি লিখলাম আর বললাম, দেখেন, আমার আইডিয়াটা হলো এই। আপনি কি আমাকে একটা গল্প লিখে দেবেন। আমি ঔপন্যাসিকদের লিখিনি; কারণ, আমার মনে হলো, যারা শুধু ঔপন্যাসিক, তাদের থেকে তেমন কিছু আসবে না। আমি পাঁচজন নোবেল বিজয়ী এবং আরও অনেক লেখককে লিখলাম। উডি অ্যাল্যান থেকে গুন্টার গ্রাস; এমনকি জন আপডাইক। তাঁদের লিখলাম, যাঁদের গল্প পড়ে আমি আনন্দ পাই এবং প্রশংসা করি।
প্রতিক্রিয়া ছিল অবিশ্বাস্য। কেউ আমাকে না বলেনি। সবাই চমৎকার সব গল্প পাঠিয়েছে। তারপর আমি আমার আমেরিকান প্রকাশকের কাছে গিয়ে বললাম: দেখেন, জানি না আপনি ব্যাপারটা কীভাবে নেবেন। কিন্তু আপনি কি এই বইটা প্রকাশ করবেন? শুধু ছাপার খরচটাই পাবেন। আপনি কোনো রয়্যালটি নিতে পারবেন না। লেখকদের কোনো পেমেন্ট করা হবে না। সব আয়ের অর্থ সোজা চলে যাবে ট্রিটমেন্ট অ্যাকশন ক্যাম্পেইনে। কারণ, আমাদের এলাকাটা ভীষণভাবে এইডসে আক্রান্ত। আর ট্রিটমেন্ট অ্যাকশন ক্যাম্পেইন আমাদের এলাকাতেও সেবাদান করে থাকে। আমাকে অবাক করে তারা বলল, ঠিক আছে, চলেন, কাজটা করি। আমার ইংল্যান্ডের প্রকাশকও একই কাজ করল। এখন বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৪টা প্রকাশক এই বই নিয়ে কাজ করছে। গ্রিসে কিছুদিন হলো প্রকাশিত হয়েছে। এই তো সেদিন একটা কপি পেলাম। জার্মানিতে প্রকাশিত হয়েছে এবং ফ্রান্স, ইতালি ও চায়নাতে শিগগির প্রকাশ পাবে। জানেন, পুরো রাশিয়ায় এটা পাওয়া যাচ্ছে।
এটা একটা চমৎকার প্রচেষ্টা ছিল। আমি সব গল্প পড়িনি, তবে যেগুলো পড়েছি ভালো লেগেছে।
নাদিন গর্ডিমার: গল্পগুলো অসাধারণ ছিল। যারা কিনেছে, তারা একদিকে যেমন পড়ে আনন্দ পেয়েছে, তেমনি তারা এটা জেনে আনন্দ পাবে, বইটি কিনে পড়ার পাশাপাশি দুস্থ লোকের সাহায্য করতে পেরেছে। আমি ঠিক জানি না, ওই লেখকদের প্রতি কীভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব। কীভাবে প্রকাশকদের ঋণ স্বীকার করব। কেননা প্রকাশনা আদতে একটা ব্যবসা। ১৪ প্রকাশক এই কাজ করতে রাজি হয়েছেন।
এবার একটু নোবেল প্রসঙ্গে আসি। এই বিষয়ে কিছু বলুন। ১৯৯১ সাল ছিল। কোনো ফোন কল পেয়েছিলেন। জানতেন কি আপনার নাম সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিল? প্রক্রিয়াটা কেমন ছিল?
নাদিন গর্ডিমার: হ্যাঁ। আমি কয়েক বছর ধরে সংক্ষিপ্ত তালিকায় মনোনীত ছিলাম। আপনি হয়তো জানেন যে সাংবাদিকেরা কল করে বলেন, আপনি সংক্ষিপ্ত তালিকায় আছেন। আপনি সম্ভবত নোবেল পেতে যাচ্ছেন। এই ব্যাপারে আপনার কী মতামত। আমি বলতাম, যদি কখনো পাই, তাহলে আপনাকে বলব, গুডবাই। তারপর ফোনটা রেখে দিতাম। সমাপ্তি। তবে এবার অন্য এক কারণে নিউইয়র্কে ছিলাম। আমার ছেলের সঙ্গে ছিলাম। আমি সবার আগে ঘুম থেকে উঠে গেলাম। কারণ, লন্ডনে একটা কল করার দরকার ছিল। দুই শহরের সময়ের ব্যবধান অনেক। তাই ওই সময়টা সুবিধাজনক ছিল। আমি কিচেনের দিকে গেলাম। এখানেই ফোনটা ছিল। এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল। একজন সুইডিশ সাংবাদিক কল করেছিলেন। সুইডেনে আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে হয়তো নাম্বারটা নিয়েছেন। যেখানে ছিলাম, ফোন করে আমাকে বললেন, আমি পুরস্কারটা পেয়েছি। আমার কাছে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো ঠেকল। আমি প্রত্যাশা করিনি। কারণ, ওই বছর আমি বাড়ি থেকে দূরে ছিলাম। তাই কেউ ফোন করে বলেনি যে এ বছর আমি সংক্ষিপ্ত তালিকায় আছি এবং হয়তো পেতে পারি।
প্রথম অনুভূতি কেমন ছিল? আপনার জীবনে কেমন প্রভাব ফেলছে?
নাদিন গর্ডিমার: অবশ্যই এটা চমৎকার একটা পুরস্কার। পৃথিবীর প্রধানতম একটা পুরস্কার। শুধু একটা দেশের লেখকদের পুরস্কার নয়। আমি বুকার পুরস্কারও পেয়েছি, যেটা শুধু কমনওয়েলথ লেখকদের জন্য দেওয়া হয়। পুলিৎজার বা ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড যেটা শুধু আমেরিকান নাগরিকদের দেওয়া হয়। ঠিক আছে। কারণ, এগুলো জাতীয় পুরস্কার। কিন্তু নোবেল পুরস্কারের শক্তি হলো, এটা পৃথিবীর সকল দেশ ও ভাষার বইকে মূল্যায়ন করে। অনেকে এটাকে নোবেলের দুর্বলতাও মনে করে।
সবকিছুর পর নোবেল আমার কাছে ভালো বলেই মনে হলো। যেমন আমি এমন একজনকে চিনি, যাঁর অনেক আগেই নোবেল পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তাঁর লেখার অনুবাদ ছিল না। তিনি পর্তুগিজ লেখক হোসে সারামাগো। তিনি খুবই বিখ্যাত ছিলেন। হঠাৎ একবার ঘোষিত হলো, তিনি নোবেল পেয়েছেন। আমি বলছি, তখনো কেউ তাঁকে চিনত না। পুরস্কারের পর তাঁর লেখা অনুবাদ করা হলো। আমি ভাবলাম, কী চমৎকার ব্যাপার। যে লেখককে কেউ চিনত না, কিন্তু নানা ভাষার পাঠকেরা তাঁকে চিনতে শুরু করেছে।
এই পুরস্কার কি আপনার লেখায় আলাদা স্বর যোগ করেছে? আপনার পাঠকের পরিধি কি বেড়ে গেছে? আপনি কি আরও বেশি স্বীকৃতি পাওয়া শুরু করেছেন?
নাদিন গর্ডিমার: আপনি জানেন, পাঠকের পরিধির বিষয়টা অনেক বিতর্কিত। পাঠকের সংখ্যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারতম্য হয়। যে বছর প্রকাশিত হয়, তখন যে কাটতি থাকে, পরের বছরগুলোতে তা শুধু কভারে লেখা চুম্বকাংশেই সীমাবদ্ধ থাকে। আমার মনে হয় না, এটা খুব বেশি পার্থক্য তৈরি করবে। যদি আপনার নতুন কোনো বই বাজারে আসে এবং ভালো আলোচনা লেখা হয়, তাহলে আপনি হয়তো বিভিন্ন জায়গায় কথা বলার সুযোগ পাবেন। সবাই চিনবে আর বইটার বিক্রি বাড়বে। তখন অনেক অনেক লেখক তৈরি হবে।
আরেকটা কী যেন বললেন। হ্যাঁ, জীবনে বড় কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না। অবশ্যই, এটা আপনার লেখায় একটা আলাদা স্বর যোগ করে। যেমন টেলিং টেইলসের কথা যদি বলি, তাহলে বলব, এই প্রাপ্তি আমাকে সহায়তা করেছে সেই সব খ্যাতনামা লেখকের কাছে গল্প চেয়ে চিঠি লিখতে। ওই সব প্রকাশকের কাছে গিয়ে দাবি নিয়ে দাঁড়াতে। আর এই আমন্ত্রণ। হে খোদা, কেউ তো জানেই না আপনি কিসের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তারপরও বিভিন্ন জায়গা থেকে অসংখ্য আমন্ত্রণ আসতে থাকবে। তিমি মাছ রক্ষার কনফারেন্সে কথা বলার জন্যও আমন্ত্রণ আসবে।
আরেকটা বিষয়, প্রতিবছর আপনি একটা সুবিধা পাবেন। অত্যন্ত গোপনীয় একটা সুবিধা। চলতি বছরের জন্য নোবেল ফাউন্ডেশনকে একজনের নাম মনোনয়ন করার সুযোগ। ১৯৯১ সাল থেকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে করে আসছি। কেউ হয়তো একটা বই পাঠাল আর বলল, অনুগ্রহ করে কি বইটার ব্যাপারে কিছু বলবেন। ১৯৯১ সাল থেকে প্রতি বছর আমি এই সুবিধার সদ্ব্যবহার করেছি। এখন পর্যন্ত আমার মনোনয়ন থেকে দুজন নোবেল পেয়েছেন। প্রথমজন হলেন জার্মান লেখক গুন্টার গ্রাস এবং দ্বিতীয়জন হলেন জাপানের কেনজাবুরো ওয়ে। আমি জানি না, এটা গড় হিসেবে খুব কম হতে পারে।
আপনি আমাকে বলতে পারেন, এ বছর কাকে মনোনীত করবেন? আমি কাউকে বলব না।
নাদিন গর্ডিমার: না। আমি জানি।
এরপর কী? এখন কী করছেন?
নাদিন গর্ডিমার: লেখালেখি করি। এ ছাড়া আমার আর কী করার আছে?
আপনার কি আর কোনো লক্ষ্য আছে?
নাদিন গর্ডিমার: আচ্ছা। সম্প্রতি একটা উপন্যাস লিখে শেষ করলাম। বছরের শেষ দিকে প্রকাশিত হবে।
আর কোনো কিছু?
নাদিন গর্ডিমার: না।
না।
নাদিন গর্ডিমার: আমি যা লিখছি, তা নিয়ে আগে থেকে কোনো কথা বলি না।
সবশেষে বলব। ধরুন, আমি একজন উদীয়মান লেখক। আমি নোবেল ওয়েবসাইটে ঢুকলাম। আমি আপনার এই সাক্ষাৎকার দেখছি। আমার জন্য আপনার সবচেয়ে মূল্যবান উপদেশ কী হবে?
নাদিন গর্ডিমার: আমি সব সময় একই কথা বারবার বলি। পড়ো, পড়ো এবং পড়ো। শুধু পর্দায় জলের স্রোতের মতো ভেসে আসা শব্দ পড়ো না। এটাতে নির্ভরশীল হয়ে পড়ো না।। যখন গাড়িতে থাকো, সেলফোন অথবা অন্য কিছুতে নির্ভরশীল হয়ে পড়ো না। লাইব্রেরিতে যাও আর কাগজের বই পড়ো।
তারপর মঞ্চে যেতে পারো। তুমি এখনো তরুণ। তুমি হয়তো তোমার পছন্দের কোনো লেখককে অনুকরণ করছ। কিন্তু এই পর্যায় একদিন শেষ হবে। যদি তোমার নিজের কোনো স্বর গড়ে ওঠে, তাহলে তুমি তা শুনতে পাবে। এইটুকুই।
আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
নাদিন গর্ডিমার: আমারও ভীষণ ভালো লাগল।
বাংলা কপিরাইট: প্রতিধ্বনি
উৎস লিংক: https://www.nobelprize.org/prizes/literature/1991/gordimer/interview/



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন