প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ

অ+ অ-

 

নতুন গল্পের সন্ধানে শিরোনামে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক জার্নাল প্রতিধ্বনি আয়োজিত প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করতে পেরে আমরা আনন্দিত। মৌলিক ও সৃজনশীল বাংলা গল্পকে বিশ্বের পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য বাস্তবায়নে অংশগ্রহণকারী সকল গল্পকারকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পাওয়া সকল গল্পস্রষ্টাকে জানাই অফুরন্ত শুভেচ্ছা।

বিগত ৩০ অক্টোবর ২০২৫-এ প্রকাশিত ১০টি দীর্ঘ তালিকার গল্প থেকে বিচারকমণ্ডলী সংক্ষিপ্ত তালিকার জন্য ৫টি গল্প বাছাই করেছেন। তালিকাটি বর্ণ-ক্রমানুসারে প্রকাশ করা হলো।

আরব আলীর ডুবসাঁতার  ||  প্রাণকৃষ্ণ চৌধুরী 

কুরছিয়ানা  ||  রোমেল রহমান

ভাল চা বানানোর সঠিক রেসিপি  ||  আদনান হাবিব

মরাকান্দির বিল  ||  আনিফ রুবেদ

মহারাজের গ্রাম  ||  সালেহা ফেরদৌস

প্রাণকৃষ্ণ চৌধুরী রচিত আরব আলীর ডুবসাঁতার গল্পে তুলে ধরেছেন বাংলার হাওড় অঞ্চলের লোকগাথার এবং ভাটির দেশের পালাগানের মর্মস্পর্শী কাহিনী। কুরছিয়ানা গল্পে রোমেল রহমান সূক্ষ্ম ও ক্ষুদ্র টানে এঁকেছেন এই বাংলার মানুষের জটিল মনোজগতের এক দীর্ঘ জীবনালেখ্য। ভাল চা বানানোর সঠিক রেসিপি গল্পটিতে আদনান হাবিব একটি রাতের ঘটনাকে আবর্তিত করে দেখিয়েছেন ঘরের ভেতরে ব্যক্তি-জীবন এবং ঘরের বাইরে রাষ্ট্র-জীবন একই অবিশ্বাস এবং সহিংসতায় জর্জরিত। আনিফ রুবেদ তার রূপকাশ্রয়ী মরাকান্দির বিল গল্পে প্রাণীর স্বরে বলেছেন মানব প্রকৃতির কালোকাহিনী। ভাষার শতরঞ্জিতে খেলেছেন এক দার্শনিক প্রতীতী। সালেহা ফেরদৌসের মহারাজের গ্রাম এক ভোতিক গল্পের আড়ালে আমাদের সমাজের নারী ও শিশুর অসহায়ত্ব এবং আত্মশক্তির নির্মম সত্যকে করেছেন উন্মোচন। গল্পটিতে সমাজের নানা সত্তা ও শক্তির চিরন্তন দ্বন্দ্ব ও দ্বিচারিতাকে প্রকাশ পেয়েছে। সংক্ষিপ্ত তালিকার প্রতিটি গল্পই তার নিজস্ব কাহিনী কাঠামো, বিষয়বস্তু ও ভাষাশৈলীর দিক থেকে অনন্য।

প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর মনোনীত ১০টি গল্প নিয়ে একটি বিশেষ সংকলন প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকাশনার আগে, সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত পাঁচটি গল্পের নির্বাচিত অংশ পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত করা হলো। আমরা আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, প্রতিধ্বনি এবার নতুনভাবে সংযোজন করতে যাচ্ছেসংক্ষিপ্ত তালিকার পাঁচজন গল্পকারের বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা হবে, যেখানে গল্পের পেছনের তাদের ভাবনা ও চিন্তাধারা উঠে আসবে।

আগামী ২৬ ডিসেম্বর প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে। বিজয়ীকে সম্মাননা হিসেবে ১০০ মার্কিন ডলারের সমমূল্যের অর্থপুরস্কার প্রদান করা হবে। বিজয়ী গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে আন্তর্জাতিক সাহিত্য পত্রিকা বা প্রকাশনায় পাঠানো হবে। প্রতিধ্বনির পাশে থাকার জন্য সকল লেখক, নির্বাচিত গল্পকার, শুভানুধ্যায়ী ও পাঠকদের আন্তরিক শুভেচ্ছা। সবার আগামী সুন্দর হোক।

দেখুন  প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর দীর্ঘ তালিকা

 

প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় মনোনীত গল্পের চুস্বক অংশ
 

আরব আলীর ডুবসাঁতার || প্রাণকৃষ্ণ চৌধুরী

যাত্রাদলের কয়েকজন বাঁশে করে ঝুলিয়ে নিয়ে যায় কাছিমটারে। কিভাবে কৌশলে দাম চাইতে হবে কানে কানে বলে দিল মুতালিব চাচা। সেসব বুঝে নিয়ে আরব আলী তাদের সাথে যায়। হেইয়ো হেইয়ো বলে অন্ধকার রাস্তা হাঁটে যাত্রাগানের দল। হাঁটার তালে বাঁশের মটমট শব্দ হয়। তাদের পিছে কিছুটা তফাতে হাঁটে আরব। সে প্রথমে ভাবে এটা বুড়া বাঁশের শব্দ, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয় বাঁশের দোষে নয়, শব্দটার আসল কারণ হল কাছিমের ওজন। আর তা মনে হতেই যাত্রাদলের একেবারে কাছে ঘেঁষে হাঁটতে শুরু করে। হাঁটতে হাঁটতে বাঁশের শব্দ শুনে কাছিমের ওজন অনুমান করার চেষ্টা করে এবং ওজনের সাথে দামের সামঞ্জস্য ঘটানোর জন্য মনে মনে আরও কিছু হিসাব নিকাশ করে নেয়। মাঠের একপাশে যাত্রাদলের বসবাস ও রিহার্সালের ঘর, অন্য পাশে যাত্রার প্যান্ডেল। যত কাছে যায় হ্যাজাক বাতির জ্বলজ্বলে আলো ততোই আরব আলীর চোখে মুখে লেপ্টে যেতে থাকে। টাংগুয়ার মাছশিকারীদের নিভু নিভু বাতির তুলনায় এ বাতি কয় গুণ বেশি আলো দেয় একবার মনে হল এ হিসাবটাও করে নেয়, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, আগের কাছিমটার একটা ব্যবস্থা হোউক পরে এইসব কুঁটিনাঁটি হিসাব করা যাইব নে। মুছলমানের ছেড়ায় কাছিম শিকার কইরা বিপদে পড়ছে, ছেঁড়ারে ভিতরে লইয়া যা, ভাত খাওয়াইয়া আমরার রিহার্সেল দেখা, দরদাম যা করার সকালে করমুনে। কথাবার্তার ধরন দেখে আরব আলী বুঝতে পারে এই লোকই যাত্রাদলের ম্যানেজার। ভাবখানা এমন যে কথা কওয়ার সময় নাই, কালকেই যাত্রা শুরু, ঠিকঠাক মতো রিহার্সেল না হলে বিপদ হইয়া যাইব। লোকটা দ্রুত চলে যায়, আরব আলী কিছু না বলে কাছিম দেখতে আসাদের ভীড়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।

এতো বড় কাছিম দেখে যাত্রাদলের একেকজন একেক ধরনের কথা বলে। সেইসব কথা শুনতে আরবের মজা লাগে। একটা মেয়ে এসে তারে ভাত খাওয়ার কথা বলে, সে হ্যাঁ-না কিছুই না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। মেয়েটা হাসতে হাসতে বেভূতা মানুষ বলে হাত ধরে টেনে নিয়ে ঘরে বসায়। ঘর মানে চারিদিকে চল্লিশ-পঞ্চাশ হাত লম্বা নতুন টিনের বেড়া, মাটিতে বিছানো খড়ের উপর পাতা পাতলা চাদর। দলের সবাই সারিবদ্ধ হয়ে ঘুমায়। কয়েকটা দিন মাত্র, এর বেশি দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না বলে ঘরের নতুন টিনগুলো হ্যাজাকের আলোয় চিকচিক করে। পাছায় সরু খড়ের গুতা লাগলেও বসে থাকতে ভালই লাগছে আরব আলীর। কিন্তু মেয়েটার মতিগতি বুঝতে পারছে না সে। সেই যে এনে বসিয়েছে, এরপর আর কোনো কথা নাই। সে চেয়ে চেয়ে দেখল মেয়েটা গামছা দিয়ে চোখমুখ ডলে নিল, চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াল, একটা ট্রাংক থেকে কিছু টাকা বের করে ব্লাউজের ভেতর গুজে দিল, এরপর আও সাপলুডু খেলাই, বলে হাতে একটা লুডু নিয়ে সামনে এসে বসল। টেকা তাইলে এই ছেড়ির কাছেই থাকে, আরব আলী ভাবে, ম্যানেজারের অপেক্ষা না কইরা এই ছেড়ির কাছ থাইকা টেকা চাইয়া লইয়া গেলেই তো সুবিধা হয়। তোমার পাঠ নাই? কথা কয়টা বলার সুযোগে এই প্রথম সে মেয়েটার মুখের দিকে ভাল করে তাকায়। মনে হল গ্রামের কার চেহারার সাথে যেন মেয়েটার আদলের মিল আছে, কার যেন? কার যেন?আরব আলী ভেবে পায় না। আগেরটায় অভিনয় ভালা হইছে না দেইখা এইডায় ছোডো পাঠ দিছে, আমিও বাঁচছি, আর ভাল লাগে না। লুডোর গুটি সাজায় মেয়েটা, ছোট বড় সাপের মধ্যে ছড়ানো গুটিগুলোরে চান্দা মাছের মতন লাগে আরব আলীর। কাছিমডারে কি আইজ রাইতেই কাটব? কাছিমের আলাপ জিইয়ে রেখে সে টাকার কাছে পৌঁছাতে চায়, একবার আড়চোখে মেয়েটার বুকের দিকে তাকিয়ে দেখেছে গুজে রাখা টাকাগুলা দেখা যায় কিনা। টাকার গভীরে যেতে হলে তো কাছিমের আলাপ তুলেই যেতে হবে। কিন্তু মেয়েটা বিরক্ত হয়, তুমি না মুছলমানের ছেড়া, অতো কাছিম কাছিম করতাছো কেরে?

 

কুরছিয়ানা || রোমেল রহমান

পরের দিন শহরের বাড়িতে শেফালীকে তুলে দিয়ে আসার সময়, আবুল কাসেম বলে; একটা কথা জিজ্ঞাস করি? শেফালী বলে, বলেন! যেই লোকটা তোমার বাড়িতে আসতো সে কে? শেফালী বলে, আমার স্বামী! আবুল কাসেম বলে, এইটা কি তার? শেফালী বলে, জি! আবুল কাসেম বলে, বাচ্চা বিক্রি করে দিচ্ছ কষ্ট হবো না? শেফালী বলে, নাহ! আগে হইলে হইত! আবুল কাসেম ভ্রু কুঁচকে বলে, মানে? শেফালী বলে, প্রথম বাচ্চা ফেইলা দেওন লাগছে। কাজ নাই নিজেরাই খাইতে পারি না। বাচ্চা পালবো কেমনে? আবুল কাসেম বলে, মানে? শেফালী বলে, মানে ব্যাঙ ভাজা! যান বিদায়। আবুল কাসেম বলে, বাচ্চা ফেইলা দিলা? শেফালী বলে, এই বাচ্চাটা তাও তো বাইচা থাকবে। সে যে দুনিয়ায় আছে এইটা তো জানবো। আর মা হওয়ার একটা তৃপ্তি তো পাবো। আবুল কাসেম বলে, কিন্তু কাছে তো পাবা না, কষ্ট হবে না? শেফালী বলে, খালি প্যাচান ক্যা? বললাম তো, এই বাচ্চার জন্য আমি আর আমার স্বামী বাইচা যাবো। সেও বাইচা থাকবে। এই তো আনন্দ। খিদার কষ্ট বড় কষ্ট। আবুল কাসেম বলে, মানে। শেফালী বলে, আপনার উত্তরের খাল আমি বিক্রি কইরা নগদ টেকা কইরা নিয়া ফিরা যাবো। চাইলে আপনার বিল আপনি আমার থিকা কিনা নিতে পারেন। আবুল কাসেম হেসে ফেলে। শেফালী মুখ শক্ত করে বলে, সাহস নাই বুঝলেন... সাহস থাকলে বাঁইচা থাকাটা নিভায় দিতাম, তখন দেখতাম খিদা কার সঙ্গে পাল্লা দেয়। কিন্তু আবার ভাবি, মইরা লাভ কি একটু বাঁইচা দেখি। লোভ জাগে বাঁইচা থাকার। মজা নেয়ার। মরাটা তো এক নিমিষের খেলা কিন্তু বাঁচার মধ্যে আসল কারিকুরি! আবুল কাসেমের ভালো লাগে শেষ কথা গুলো তিনি বেরিয়ে যান। কিন্তু গ্রামের লোকেরা বলে, কেচ্ছার মইধ্যে থাকে আরেক কেচ্ছা... চোখের সামনে ভুল নজরে পড়ে না। সময় হয়ে গেলে, যেদিন শেফালীর ব্যাথা ওঠে। সেদিন সবাই শহরের ক্লিনিকে যায়। শেফালীর স্বামী আসে। চুক্তির পরে আর রাখঢাক করে লাভ নাই। আবুল কাসেম তার স্ত্রী আর আকরাম মাস্টার বসে আছে বাইরে। কখন বাচ্চার কান্না শোনা যায়। এবং একসময় কান্না শোনা যায়, সবাই যখন বাচ্চা দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তখন দেখা যায় পাশাপাশি দুইটা বাচ্চা। আকরাম মাস্টার হেসে ফেলে বলে, কাসেম লাভটা তোমারই হইলো। কিন্তু শেফালীর স্বামীর মুখে শঙ্কা। শেফালীর জ্ঞান ফেরার পরে আবুল কাসেম বলে, শেফালী লাভ তো আমার হইলো। চুক্তিতে কিন্তু বাচ্চার সংখ্যা লেখা ছিল না। শেফালী ম্লান বলে, জি! আবুল কাসেম ধীর কণ্ঠে বলে, তোমারে একটা বাচ্চা দিয়া দিবো কেমন? তবে শর্ত তার বিনিময়ে তুমি উত্তরের বিল আমারে ফেরত দিবা। শেফালীর মুখে সকল রক্ত যেন চুপসে যায়। আবুল কাসেম শেফালীর স্বামীকে বলে, কেমন মরদ আপ্নে? পারবেন না এই বাচ্চা বাঁচাইতে? লোকটা চুপ করে থাকে। ডাক্তার এসে তাদেরকে বলে, আসুন একটু, ডাক্তার জানায় বাচ্চা দুটোর মধ্যে একটা বাচ্চার সামান্য সমস্যা আছে। দুটোই কন্যা সন্তান কিন্তু একটা মেয়ের একটা পা অন্য পায়ের চেয়ে ছোট! আবুল কাসেম এই কথা শোনা মাত্রই কেঁপে ওঠেন। 

 

ভাল চা বানানোর সঠিক রেসিপি || আদনান হাবিব

রান্নাঘরের দেয়ালে আমি ঠেশ দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব। আর দেখব, হয়তো জীবনে প্রথমবারের মত, রিমি কী করে সেই জাদুকরী চা বানায়।

রিমি আমার মুখের দিকে তাকাবে না।

তুমি কি সত্যি সত্যি আমার নাম নমিনি থেকে বাদ দিয়েছ?

হ্যাঁ।

কেন?

আমি চুপ করে থাকব।

কাকে নমিনি করেছ? কাউকে না কাউকে তো করতেই হয়, নিয়ম।

এখনো চুপ করে থাকব আমি।

একটা জিনিস বুঝে দেখ, আমি কিন্তু তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে পারি। ওরা আমার হাতের চা পছন্দ করেছে। আমি যতবার চা খাওয়াতে চাইব, আপত্তি করবে না, এমনকি দেখা যাবে ওরা রাতের খাবারও খেয়ে যেতে চাইতে পারে। একদম বেঁচে যদি নাও যাও, কয়েক ঘণ্টা সময় তোমাকে আমি বেশি দিতেই পারি।

আমি বলব, আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছ রিমি?

ওসব ভারি ভারি শব্দের মানে আমি বুঝি না। তুমি বলবে? না কি আমি এই কাপ চা বানিয়েই ওদের বলব বিদায়?

আমি ভাইয়াকে নমিনি করেছি।

ভাইয়ার তো জায়গা-সম্পত্তির কোনো অভাব নাই। তাকে নমিনি করলা কেন?

আর কাউকে খুঁজে পাইনি বলে।

তুমি যদি বেঁচে যাও আর তোমার একটা গার্লফ্রেন্ড হয়, তখন আবার ভাইয়াকে পাল্টে ওকে করবে নমিনি?

করব হয়ত।

তোমার বাড়িতে জমি বিক্রির মোটা টাকা অ্যাকাউন্টে আছে। এত টাকা কি যার তার কাছে নিরাপদ?

তোমার কাছে নিরাপদ?

কথা বল আমার সাথে, সময় কিন্তু বেশি নেই।

কি বলব?

তুমি সত্যি ভাইয়াকে নমিনি করেছ? বেপরোয়া রিমি তার ফোনটা হাতে নিয়ে আমার নাকের কাছে ঝাঁকাবে শাসানোর ভঙ্গিতে। জিজ্ঞেস করব ভাইয়াকে?

আমি হাসব। কাউকে নমিনি করতে হলে তাকে জানানোটা বাধ্যতামুলক না রিমি। ভাইয়া জানে না।

আমার সাথে দুই নম্বরি করছ! এখনো!... আমি বললে এক্ষুনি তোমাকে ওরা নিয়ে যাবে।

ওরা তোমাকে কী দেখিয়েছে রিমি, আমার মোবাইলে?

রিমি এইবার থমকাবে।

তুমি কথা ঘোরাচ্ছ কেন?

কারণ তুমি আমার জীবনের ব্যাপারে কোন কেয়ার দেখাচ্ছ না!

আমি আরেকবার চা বানাচ্ছি আরও কিছুক্ষণ তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য!

হা হা হা হা। ধন্যবাদ তোমাকে। অসংখ্য ধন্যবাদ।

রিমি ছাকনি দিয়ে চা ছাঁকতে শুরু করবে।

আমি আবার প্রসঙ্গ তুলব। বল রিমি, কী দেখেছিলে মোবাইলে? অমন ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিলে কেন? তোমার মুখ থেকেই শুনি!

এরপরের ঘটনার জন্য আমি প্রস্তুত থাকব না।

রিমি এক ঝটকায় কেটলির গরম চা ছুঁড়ে দেবে আমার গায়ে। নিমেষেই আমার বুকের ওপরের চামড়াটা যেন ভয়ানকভাবে চেপে বসে বন্ধ করে দিতে চাইবে আমার হৃৎপিণ্ড। অসহ্য যন্ত্রণায় আমি কুঁকড়ে বসে পড়ব। না চাইলেও পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে ভয়ানক চিৎকার। ছুটে আসবে শুধু আলাদা রঙের গেঞ্জি পরা, কিন্তু যমজ লোকগুলো।

রিমি বলবে, এই কুত্তার বাচ্চাকে এক্ষুনি নিয়ে যান আপনারা। যে বৌয়ের সাথে ঠিকমত শুইতে পর্যন্ত পারে না, তার এত দেমাগ সাজে না।

 

মরাকান্দির বিল || আনিফ রুবেদ

কয়েক ধাপ এগুতেই সে দেখতে পায় বিপরীত দিক হতে একটা মানুষ এগিয়ে আসছে কিশোরীর শরীরের দিকে। লোকটা কেন আসছে সে বুঝতে পারে না। লোকটা কী ক্ষুধার্ত? এর মাংস খেতে আসছে? নাকি ওই চারজন যা করল এ লোকটাও মৃত মেয়েটার সাথে তাই করবে? শেয়ালটা ধন্দে পড়ে যায়। মানুষের প্রত্যেকটা আচরণ ধন্দে পড়ার মতো; জানোয়ারের দাঁত আঁত সরল কিন্তু মানুষের দাঁত আঁত দুইই জটিল। মানুষের একটা দাঁত অন্য জন্তুর একশ দাঁতের সমান। জানোয়ারের চোখ সরল ও স্বচ্ছ কিন্তু মানুষের চোখই জটিল আর ঘোলাজলের চেয়ে ঘোরালো। ধন্দে পড়লেও লোকটার সাথে দ্বন্দ্বে জিতবে মনোভাব নিয়ে সেও দৃঢ় পায়ে এগুলো।

আগে নয়, লোকটা এতক্ষণে শেয়ালটাকে খেয়াল করল; শেয়ালটার চোখে জ্বলজ্বল করছে লাল লালসা। সে শেয়ালের চোখে চোখ রাখল, শেয়ালটা তার চোখে চোখ রাখল। ও ও সে পরস্পরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল।

একসময় লোকটা একটা হুশ্‌শ্‌ শব্দ করে। শেয়ালটা একটু পিছনে সরে। লোকটা এগোয়। এবার শেয়ালটা সাহস সঞ্চয় করে খ্যাঁক শব্দ করে লোকটাকে ভয় দেখায়। লোকটা থমকে একটু পিছু সরে। শেয়াল এগোয়।

একবার হুশ্‌শ্‌ একবার খ্যাঁক বেশ কিছুক্ষণ চলে। তারা খুব কম এগুতে পারছে কিন্তু আর পেছোয়নি কেউই। নিজের অংশ গ্রহণ করতে দারুণ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে দুপ্রাণী। মাঝখানে রাজকুমারীর মতো শরীর নিয়ে, নগ্ন শরীর নিয়ে ঘাসে পড়ে আছে কিশোরী; যেন রঙিন প্রজাপতির ছেঁড়া ডানা পড়ে আছে।

লোকটা ভাবছে, শেয়ালটা যদি মেয়েটির যে হাতে আংটি আছে সে হাতটা ছিঁড়ে নিয়ে চলে যায় তবে আর ধরতে পারবে না; আংটিটা হাতছাড়া হয়ে যাবে।

শেয়াল খেয়াল করল, লোকটা একটু থমকে গিয়ে পিছু সরলো; লোকটা রণে ভঙ্গ দিয়েছে; মাংসের মীমাংসা হয়ে গেছে; এ মাংস তারই; শরীর থেকে রণতরঙ্গ ঝেড়ে ফেলে শেয়াল।

কিন্তু শেয়ালটা কিশোরীর শরীরে মুখ ঠেকাতে যাবে এমন সময় লোকটা বাঁশের ফাবড়া নিয়ে দৌড়ে এসে শেয়ালের গায়ে বসায়। শেয়ালটা দ্রুত সরে দূরে গিয়ে দাঁড়ায়; ভাগ্য ভালো আগেই দেখে ফেলেছে নইলে শক্ত তরুদণ্ড তার মেরুদণ্ড ভেঙে দিত; আঘাত একটু লেগেছে কিন্তু তেমন না। শেয়াল কিশোর হাঁপায়।

লোকটা আংটিটা খুলে নিয়ে দাঁড়ায়। তার চোখ চকচক করে। এখনো শরীরে তাপ আছে। সে নাকের কাছে হাত দেয়। না, শ্বাস নেই। সে মেয়েটার দিকে তাকাল আবার; শরীরে কোনো পোশাক নেই শুধুমাত্র একফোটা পোশাক রয়ে গেছে কপালে; কপালের মাঝখানে উজ্জ্বল লাল টিপ।

মরে গেছে মেয়েটা বলে দীর্ঘশ্বাস মোচন করে চলে যায়। যেতে যেতে পিছন ফিরে দেখে শেয়ালটা মেয়েটার শরীরের দিকে এগুচ্ছে গুটিগুটি পায়ে; ঘাড় ভেঙে, হাড় ভেঙে খাবে; নে খা, মনের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করে খা। মেয়েটির লাশ রক্ষা করার মতো শক্তি নেই শরীরে; উৎসাহ নেই; বহুদূর থেকে সে আসছে।

মাংসের ব্যাপার মীমাংসিত এখন। তবুও শেয়ালটা আর একবার লোকটার চলে যাবার দিকে তাকায়; লোক চলে যাচ্ছে। কিশোরীর দিকে তাকায়; মেয়েটির বচনক্রিয়া শেষ হয়েছে অনেক আগেই কিন্তু মাংস টাটকা; পচনক্রিয়া শুরু হতে আরও সময় লাগবে। ভক্ষ্য লক্ষ্য করে দাঁত, মাড়ি, চোয়াল প্রস্তুত করে নিল কিশোর শেয়াল।

 

মহারাজের গ্রাম || সালেহা ফেরদৌস

স্বামীর বাড়ি আসার কিছুদিন পরে একরাতে প্রসব বেদনায় ছটফট করে উঠলো ময়না। তুমুল ব্যথায় তলপেট যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। মেম্বার শহরে গেছে কোনো একটা কাজে তাই বড় বউয়ের সাথেই ঘুমিয়েছে ময়না। ব্যথা সহ্য করতে না পেরে রাহেলাকে ডাক দিয়ে বললো, বড় বু ওঠো! আমি মনে হয় মইরা যাইতেছি।

রাহেলার ঘুম পাতলা। জেগে ওঠে ঘরে আলো জ্বালিয়ে দেখে ঘামে ভিজে গেছে ময়নার শরীর। দুই পা বেয়ে নিচের দিকে নামছে রক্ত আর পানি। 

রাহেলা উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,কী হইছে ময়না? তুই তো পোয়াতি না। তাইলে পানি আর রক্ত ভাঙতেছে ক্যান? 

আমি জানি না কী হইতেছে আমার সাথে? আমারে বাঁচাও বড় বু!

রাহেলা ভেবে পেলো না কী করবে এতো রাতে? উপস্থিত বুদ্ধি অনুযায়ী হালকা গরম পানি এনে ময়নার কোমরের নীচ থেকে পা পর্যন্ত ধুয়ে দিলেন। ময়না কিছুটা আরাম পেলো তবে তা অল্প কিছুক্ষণের জন্য। একটু পরে আবার ব্যথায় চিৎকার করে দুই পা দুই দিকে মেলে দিলো ময়না। রাহেলা দেখলো, ময়নার জরায়ু মুখ খুলে গিয়ে সেখান থেকে একতাল সাদা মাংসপিণ্ড তড়িৎ গতিতে নিচে গড়িয়ে পড়লো। আতঙ্কে অজান্তেই চোখ বন্ধ হয়ে গেল রাহেলার। ভয় পেলেও জিনিসটা কী, সেটা দেখার জন্য আবার যখন চোখ খুললো তখন আর কিছু দেখতে পেলো না। ঠাস করে সদর দরজা খুলে আবার বন্ধ হবার আওয়াজ এলো। ভয়ে ভয়ে ময়নার দিকে তাকালে দেখা গেল ময়না হাট করে খোলা ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। রাহেলা আবার দৌড়ে গিয়ে বালতিতে পানি এনে পরিষ্কার করে দিল ময়নাকে। পরিষ্কার করা শেষে ময়নার মাথায় হাত রেখে বললো, কিছু হয় নাই তোর। ভয় পাইস না। কেউ জানবো না এই ঘটনা। ঘুমা তুই। ফজরের আজান শুনে ঘুমে ঢলে পড়লো ময়না। পরদিন বেলা করে ঘুম ভাঙার পর ময়না বললো, আমার পেট খালি খালি লাগতেছে বড় বু। মনে হইতেছে আমার পেট থেকে বাচ্চা বের হইছে।

নাউজুবিল্লাহ! ওইসব আজগুবি কথা আর বলিস না। পেট খালি খালি লাগলে ওইঠা ভাত খা।

ময়না উঠে বসে নিজের পেটের উপর হাত বুলিয়ে আনমনা হয়ে ভাবলো, জিন আর মানুষের সঙ্গমে যদি বাচ্চা হইতো সে কেমন হইতো দেখতে? মানুষের কোনো গুণ পাইতো নাকি পুরাই জিনদের মতো হইতো?