নিঃসঙ্গতার বোধ ব্যক্তির অস্তিত্বের সঙ্গে জড়ানো: আদনান হাবিব
‘নতুন গল্পের সন্ধানে’ শিরোনামে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক জার্নাল প্রতিধ্বনি আয়োজিত প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করেছে। বিগত ৩০ অক্টোবর ২০২৫-এ প্রকাশিত ১০টি দীর্ঘ তালিকার গল্প থেকে বিচারকমণ্ডলী সংক্ষিপ্ত তালিকার জন্য ৫টি গল্প বাছাই করেছেন। প্রতিধ্বনি এবার নতুনভাবে সংযোজন করেছে—সংক্ষিপ্ত তালিকার পাঁচজন গল্পকারের বিশেষ সাক্ষাৎকার।
সাক্ষাৎকার || সম্পর্কের একটা বিরক্তি থাকে, আবার অভ্যস্ততাও থাকে || আদনান হাবিব
প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় মনোনীত হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন! সংক্ষিপ্ত তালিকায় আপনার নাম দেখার পর প্রথম অনুভূতি কেমন ছিল?
আদনান হাবিব: ধন্যবাদ। সত্যি বলতে কি, খানিকটা অবাকই হয়েছিলাম।
গল্পটি কখন লিখেছিলেন? আর এই গল্পটি লেখার পেছনে বিশেষ কোন ভাবনা বা অনুপ্রেরণা কী কাজ করেছিল?
আদনান: রাজনীতিতে অস্থিরতা থাকলে, হোক দেশে কি বিদেশে, ব্যক্তি মানুষও অস্থির হয়। কিন্তু তার অস্থিরতা তাকে কোথায় নিয়ে যায়? নিজের নিঃসঙ্গতা আর বোরডোম মোকাবিলা করতে গিয়ে ভিতর-বাইরের যুদ্ধকে হয়তো সে গুলিয়ে ফেলে। এই রকম ভাবনা থেকেই ২০২০ সালের মে মাসে গল্পটা লেখা।
গল্পের কাঠামো হিসেবে আপনি সময়ের চক্র বা ‘টাইম লুপ’ কৌশল গ্রহণ করেছেন, অর্থাৎ একটি চরিত্রের একই দিনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এটি বাংলায় সচরাচর দেখা যায় না। সাম্প্রতিককালে, ড্যানিশ ঔপন্যাসিক সলভে বালে তার সাত খণ্ডের উপন্যাস On the Calculation of Volume-এ ‘টাইম লুপ’ কৌশলটি অনবদ্যভাবে ব্যবহার করেছেন, যা বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। এই অভিনব কাহিনী কাঠামো বেছে নেওয়ার পেছনে আপনার প্রেরণা বা সাহিত্যিক উদ্দেশ্য কী ছিল?
আদনান: সলভে বালে’র উপন্যাসটি আমার পড়া হয়নি; সম্ভবত এটা এই বছরই প্রকাশিত হল। আমার মনে হয়েছে, মানুষের দৈনন্দিন বোরডম-কে শব্দের ইমেজে তুলে আনার জন্য টাইম লুপ ইন্সট্রুমেন্ট হিসেবে খুবই কার্যকর।
গল্পটি অনবদ্যভাবে প্রাঞ্জল ভাষায় ভবিষ্যতকালের কণ্ঠে বর্ণনা করা হয়েছে। এই কৌশল প্রয়োগ করলে কাহিনীতে একই সময়ের পুনরাবৃত্তি দেখানো সহজ হয় বলে করা হয়েছে, নাকি একটা বাস্তবতার অনেক রকম সম্ভাব্যতার সুযোগ দেখানো যায় বলে বেছে নিয়েছেন? এই প্রসঙ্গে আপনার ব্যক্তিগত অভিমত কী?
আদনান: ‘ভাত খেয়েছি’ আর ‘ভাত খেতেই থাকব’—এই দুই লাইনের মধ্যে কাল ছাড়াও আরেকটা পার্থক্য থাকে হয়ত। দ্বিতীয় বাক্যে থাকে এক ধরনের বিষণ্ণতা; যেন নিয়তির হাত থেকে কোন মুক্তি নেই! ‘খেয়েই যেতে হবে তাহলে’! এই বোধটাই গল্পে আনার চেষ্টা করেছি।
গল্পে ‘ব্ল্যাকআউট ২০০৯’ এবং ‘নীৎশে’-এর সরাসরি ইঙ্গিত ছুড়ে দিয়ে আপনি কি প্রত্যেক পাঠককে প্রচ্ছন্নভাবে মারুফে রূপান্তরিত হওয়ার আহ্বান করেছেন? অন্যভাবে বললে, পাঠককে কি গল্পের চরিত্র হয়ে ওঠার সুযোগ উন্মুক্ত করে রেখেছেন?
আদনান: নিৎশে যে সুপারম্যানের কথা বলেছিলেন, সেটাই হয়ত সমাজ-রাষ্ট্রে পর্যদুস্ত ব্যক্তি মানুষের আরাধ্য। ইঙ্গিতটাও তাই তেমনই। পাঠক নিজের বোধটা নিজেই তৈরি করে নিবে।
‘একটা জীবন কাটালাম, কাউকে বিদায় বলার নেই।’—এমন অবসাদের স্বরে বলা বাক্য দিয়ে মানবজীবনের নিঃসঙ্গতাকে কি নির্দেশ করলেন? এই নিঃসঙ্গতা কি ব্যক্তিক, না নৈর্ব্যক্তিক প্রকৃতির?
আদনান: নিঃসঙ্গতার বোধ সম্ভবত ব্যক্তির অস্তিত্বের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো।
বাদল ও রিমির বৈবাহিক জীবনে যেমনভাবে অবিশ্বস্ততা একটি দ্বান্দ্বিক বাস্তবতা হিসেবে প্রতীয়মান হয়। তেমনভাবে রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মধ্যেও কি একটি চিরন্তন সংঘর্ষ বিদ্যমান আছে বলে আপনি মনে করেন?
আদনান: অবশ্যই। সম্পর্কের একটা বিরক্তি থাকে, আবার অভ্যস্ততাও থাকে। রাষ্ট্রের সাথেও তাই। তার ওপর ক্ষোভ ষোল আনা, আবার তার সাথেই মানিয়ে নেয়ার দৈনিক একটা তাড়না আমরা অনুভব করি হয়তো।
পাঠক হিসেবে আপনার প্রথম গল্প এবং লেখক হিসেবে আপনার প্রথম গল্প—সেই স্মৃতিগুলোর কথা শুনতে চাই।
আদনান: পাঠক হিসেবে আমার প্রথম গল্প, যতদূর মনে পড়ে ‘রবিনহুড’, কাজী আনোয়ার হোসেন’র লেখা। তখন অনেক ছোট। তবু রবিন হুড আর লিটল জনের বন্ধুত্বের সেই আশ্চর্য বিবরণ এখনো মনে রয়ে গেছে। বিশেষ করে শেষ লাইনটা।
লেখক হিসেবে সম্ভবত আমার লেখা প্রথম গল্প ‘অবিশ্বাস’, ২০০৭ এর দিকে লেখা। আইডিয়াটা ছিল—মানুষ কষ্ট পায় তার এই মুহূর্তের বিশ্বাসের কারণে। তার বিশ্বাস পাল্টালে কষ্টটাও দূর করা যাবে—এই রকম একটা প্রজেক্ট নিয়ে পাইলট করছে একটা কোম্পানি। সেখানে তারা হাজির করে কাজল নামের এক তরুণকে, যে মনে করে সে একটা মেয়েকে ভালবেসে কষ্ট পাচ্ছে। প্রজেক্টের চ্যালেঞ্জ হল, তাকে ভুল প্রমাণ করা। হাতে লেখা ওই গল্প হারিয়ে ফেলেছি অনেক আগেই।
আপনার পাঠ্যতালিকায় কোন কোন দেশি ও বিদেশি গল্পকার বা ঔপন্যাসিক বিশেষ স্থান দখল করে আছেন? কাদের লেখনী আপনাকে গল্প বলতে বা লিখতে অনুপ্রাণিত করেছে?
আদনান: ছোটবেলা থেকে ভক্ত কাজী আনোয়ার হোসেন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, সৈয়দ শামসুল হক আর মাহমুদুল হকের। একইসাথে ভক্ত মিলান কুণ্ডেরা, মার্কেজ আর কোয়েটজের। এদের লেখার ধরন গল্প লিখতে উৎসাহ যোগায়। একদম হালের হান কাং আর এডগার কেরেটের গল্পেও পাই অনুপ্রেরণা।
বর্তমানে আপনি কী পড়ছেন? আর আপনার সৃজনশীলতার পাতায় নতুন কোন লেখার কাজ চলছে?
আদনান: এখন বেশি পড়া হচ্ছে ইতিহাস। কিছুটা কাজের জন্য, কিছুটা নিজের আগ্রহে। আর একটা উপন্যাসের আইডিয়ার সাথে বোঝাপড়া চলছে অনেকদিন হল।
প্রতিধ্বনির সঙ্গে থেকে আপনার সাহিত্য ভাবনা বিনিময় করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
আদনান: আপনাদেরও ধন্যবাদ।
লেখক পরিচিতি
গল্পকার ও চিত্রনাট্যকার। জন্ম ১৪ আগস্ট ১৯৭৬ সালে, চট্টগ্রামে। পড়াশোনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে। লেখালেখি করেন নিজের তাগিদে, নিজের মতো করে; কাছের বন্ধুরাই মূলত সেই লেখার পাঠক। চিত্রনাট্য, প্রযোজনা, সৃজনশীল নির্দেশনা তার কাজের ক্ষেত্র। অনুবাদ করেছেন আলেকজান্দ্রা কোলনতাইয়ের দ্য রেড লাভ।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন