প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর পুরস্কৃত গল্প রোমেল রহমানের ‘কুরছিয়ানা’

অ+ অ-

 

...‘আদি কথনভঙ্গিতে সামষ্টিক স্বরে লৌকিক বাংলা গদ্যে মানুষের সহজাত প্রকৃতিকে প্রতিকৃত করার নিপুণতার জন্য’ রোমেল রহমানের কুরছিয়ানা গল্পকে পুরস্কৃত করা হলো... 

প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর পুরস্কৃত গল্প

কুরছিয়ানা || রোমেল রহমান

 

প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কারের নেপথ্য কথা...

নতুন গল্পের সন্ধানে শিরোনামে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি বিষয়ক জার্নাল প্রতিধ্বনি আয়োজন করেছে প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫ প্রতিধ্বনির এটি প্রথম আয়োজন। পুরস্কারটি বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বাংলাভাষী লেখকদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। আমাদের পুরস্কারের লক্ষ্য মৌলিক ও সৃজনশীল গল্পকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং বাংলা সাহিত্যকে বৈশ্বিক পর্যায়ে তুলে ধরা। শুধু লেখক নয়, প্রতিধ্বনির কাছে সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ লেখকের লেখা।

প্রতিধ্বনিতে দেশ-বিদেশের অসংখ্য গল্পকার তাদের সৃষ্টিশীল গল্প জমা দিয়েছেন, যা ছিল শৈল্পিক নৈপুণ্য ও বিষয় বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। গল্পগুলোর বিষয়বস্তুতে যেমন ফুটে উঠেছে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে আজকের গণঅভ্যুত্থান, মানব জীবনের নানা লৌকিকতা থেকে অলৌকিক সঙ্গ-প্রসঙ্গ, ঠিক তেমনি সমকালীন সমাজ বাস্তবতা থেকে রহস্যাশ্রয়ী পরাবাস্তব কল্পনা। তাদের ভাষায় ছিল প্রথা থেকে নিরীক্ষার নানা আঙ্গিকে বিন্যস্ত কাহিনীর রচনাশৈলী। লেখকদের অভূতপূর্ব সাড়ায় আমরা অভিভূত ও অনুপ্রাণিত। অনেক সুন্দর সুন্দর গল্পপাঠের সুযোগ পেয়েছি। বিচিত্র ধরনের গল্পপাঠে পেয়েছি বিচিত্র কাহিনীর দারুণ অভিজ্ঞতা।

প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এ গল্প জমা পড়েছে ৩ শতাধিক। সংবেদনশীল ইচ্ছা, নিবিড় শৈল্পিক আকাঙ্ক্ষা ও নিরপেক্ষ পদ্ধতিতে বিচারকগণ তিনটি স্তরে নামহীনভাবে গল্পগুলো বেশ কয়েকবার পাঠ করে প্রাক-বাছাইয়ে ১০৭টি গল্প নির্বাচন করেছেন। প্রাথমিক বাছাইয়ে ছিল ৫০টি গল্প। সেখান থেকে প্রাক-দীর্ঘ তালিকায় ছিল ২০টি গল্প। চূড়ান্তভাবে দীর্ঘ তালিকার [লিংক দেখুন] জন্য ১০টি অনন্য গল্প বাছাই করেছেন বিচারকগণ। দীর্ঘ তালিকা থেকে বাছাই ৫টি গল্পের সংক্ষিপ্ত তালিকা [লিংক দেখুন] প্রকাশিত হয় ২৮ নভেম্বর ২০২৫।

আজ ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫, প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন হলো। চূড়ান্ত বিজয়ীর নাম ঘোষণা করতে পেরে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। পুরস্কারের নিয়মানুযায়ী, সম্মাননা হিসেবে ১০০ মার্কিন ডলার বা সমমানের বাংলাদেশী টাকা প্রদান করা হবে। প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এ যারা গল্প পাঠিয়ে, বিচার প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে, এবং নেপথ্যে-প্রকাশ্যে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন আমরা সবার কাছে অশেষ কৃতজ্ঞ। প্রত্যাশা করি, ভবিষ্যতেও আপনাদের সার্বিক সহযোগিতা ও ভালোবাসায় প্রতিধ্বনির যাত্রাপথ আরও সুদূর ও সুন্দর হবে। স্মর্তব্য যে, প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর চূড়ান্ত বিচারক ছিলেন লেখক, অনুবাদক ও সমালোচক পলাশ মাহমুদ।

আমরা সবিনয় আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর বিজয়ী রোমেল রহমানের গল্প কুরছিয়ানাকুরছিয়ানাগল্পকার রোমেল রহমানকে আমাদের আন্তরিক অভিনন্দন। আদি কথনভঙ্গিতে সামষ্টিক স্বরে লৌকিক বাংলা গদ্যে মানুষের সহজাত প্রকৃতিকে প্রতিকৃত করার নিপুণতার জন্য বিচারকগণ রোমেল রহমানের কুরছিয়ানা গল্পকে নির্বাচিত করেছেন। পুরস্কৃত গল্প কুরছিয়ানা নিয়ে আমরা চূড়ান্ত বিচারক পলাশ মাহমুদের অভিমত উপস্থাপন করেছি। প্রতিধ্বনিসঙ্গে থাকার জন্য সকল লেখক, নির্বাচিত গল্পকার, বিচারক ও পাঠকদের জানাই প্রাণঢালা শুভেচ্ছা। সবার আগামী সুন্দর হোক।

সাখাওয়াত টিপু || প্রকল্প পরিচালক

 

কেন কুরছিয়ানা গল্পেকে নির্বাচন করা হলো?

সাহিত্যের অবারিত প্রান্তরে অসংখ্য গল্পের মধ্যে কোনো একটি বিশেষ গল্পকে অবিসংবাদিতভাবে নির্বাচন করা দূরূহ। উপরন্তু বিজয়ী শব্দটি ব্যবহার করাও সমুচিত নয়। বিজয়ীর মধ্যে প্রতিযোগিতা করার চাপ আছে। যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব আছে। অন্ততপক্ষে সাহিত্যকে আমি এমনভাবে বিচার করার বিরোধী। এক্ষেত্রে আমি বিজয়ী শব্দের পরিবর্তে প্রশংসনীয় শব্দটি ব্যবহার করায় অধিক আগ্রহী। তাই তো গল্প প্রতিযোগিতা না বলে গল্প পুরস্কার বলাকে অধিক শ্রেয় মনে হয়েছে। আমি মনে করি, যেই মুহূর্তে কোনো একটা গল্প লেখা শেষে পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়, সেই মুহূর্ত থেকে গল্পটি তার স্বতন্ত্র সত্তার অধিকারী হয়। নির্দিষ্ট কোনো লেখক বা নির্দিষ্ট কোনো পাঠকের অধীনে থাকে না। গল্পটি হয়ে ওঠে জগতের সবচেয়ে স্বাধীনতাভোগী সত্তা। গল্পটি সকল সময়ের, সকল দেশের, সকল ভাষার এবং সকল পাঠকের জন্য উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। একটি গল্প বাংলা ভাষায় একজন বাঙালি পাঠককে যে রকম অভিজ্ঞতা দিবে, সেই একই গল্প হয়তো ভিন্ন ভাষায় একজন ভিন্ন পাঠককে দিবে ভিন্নরকম অনুভূতি। একটি গল্প পুরস্কারের বিচারক হিসেবে আমার এই অভিমত হয়তো স্ববিরোধী। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করিযতক্ষণ পর্যন্ত আমি একজন নৈর্ব্যক্তিক পাঠক হয়ে উঠতে না পারি; ততক্ষণ পর্যন্ত আমি বলতে পারি না যেএই একশটা গল্পের মধ্যে এই একটা গল্প অনন্য। যদি বলে থাকি; সেটা শুধু আমার জন্যই অনন্য বলে ধরে নিতে হবে। তাই একজন লেখকের যেমন দায় আছে আদর্শ লেখক হয়ে ওঠার, একটা গল্পের যেমন দায় আছে লেখকের সৃজনশীলতাকে সঙ্গী করে একটা আদর্শ গল্প হয়ে ওঠার, তেমনি একজন পাঠকের দায় আছে গল্পটিকে ধারণ করে একজন আদর্শ পাঠক হয়ে ওঠার। ঠিক এই দৃষ্টিকোণ থেকে রোমেল রহমান রচিত কুরছিয়ানা গল্পের একজন আদর্শ পাঠক হয়ে উঠেছি। যার ফলে কুরছিয়ানা গল্পটিকে প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর অপেক্ষাকৃত অধিক প্রশংসাযোগ্য গল্প হিসাবে অভিমত দিয়েছি।

কুরছিয়ানাগল্পের অভিনবত্ব হলো এর কথনভঙ্গি। এই গল্পের স্বরভঙ্গি আদিরীতিতে গড়ে উঠেছে। পৃথিবীর প্রথম যে মানুষটি তার পাশে বসা সঙ্গীটিকে যেই ভঙ্গিতে একটা ঘটনার বর্ণনা করেছে, সেই প্রথম গল্পের ভঙ্গিতে বলা এই কুরছিয়ানা। প্রশ্ন আসতে পারেএই গল্প যদি আদিরীতিই বলে থাকে; তবে আর অভিনব হলো কী করে? যদিও তুলনাটা দুর্বল মনে হবে, তবুও বলবোঅনাদিকাল ধরে পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ জন্ম নেয়ার পরও প্রতিটি মানবশিশু জন্ম যেমন আমাদের কাছে নতুন লাগে, তেমনি করে কুরছিয়ানার স্বর আমার কাছে অভিনব লেগেছে। কারণ, আদিস্বর সম্ভবত একক ও প্রত্যক্ষ ছিল। কিন্তু কুরছিয়ানার স্বর সামষ্টিক ও পরোক্ষ। আদি গল্পে কথক সরাসরি নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতোযা সে দেখেছে, যা তার জীবনে ঘটেছে কিংবা যা তার কল্পনায় বিকল্প বাস্তবতা হিসেবে ধরা দিয়েছে। কিন্তু কুরছিয়ানার কথকরা যা বলছে, তার সত্যতায় বিশ্বাস করা বা না করা সম্পূর্ণ পাঠকের উপর অর্পণ করে দিয়েছে। কারণ এখানেও লেখক গল্প বলার আরেক আদি মাধ্যম প্রয়োগ করেছেন। তা হলো স্মৃতি ও শ্রুতি নির্ভরতা থেকে গল্প বলা। অর্থাৎ কুরছিয়ানার কথকরা শুধুমাত্র অন্য কারো অভিজ্ঞতাকে বর্ণনা করছে। যেমন লোকেরা বলে, বা আমরা গ্রামের বুড়ো লোকদের মুখে শুনি, অথবা গ্রামের বুড়ো নকশালপন্থীদের কাছে যখন আমরা শুনি কিংবা যদিও আমরা দেখিনি কিন্তু গ্রামের লোকেরা বলে’—এর মতো বর্ণনাভঙ্গি কিংবা কথকের স্বর একটা মঞ্চের আবহাওয়া তৈরি করে। বহুমানুষের স্মৃতি থেকে বলা কাহিনী শুনে, বহুকথকের স্বরে বলা গল্পটি যখন পড়ি, তখন আমারও মনে হয়না, শুধু আমি একাই গল্পটি পড়ছি না। বরং কানের কাছে কারা যেন বলে যাচ্ছে। আর আমি শুনে যাচ্ছি। আশ্চর্যজনক ভাবে এমনও মনে হয়েছেআমি একা শুনছি না। আমার পাশে আরও কিছু শ্রোতা হয়তো বসে আছে। তারাও শুনছে। যে পাঠক গল্পটি এখনো পড়েনি অথবা আমার মতোই এখন পড়ছে। এই যে সমবেত কথকের ভঙ্গিতে বলে গল্পটি পাঠককে একটা সমবেত শ্রোতা হয়ে উঠার এক অনুমেয় জীবন্ত-অভিজ্ঞতা দেয়। এটিই কুরছিয়ানার অভিনবত্ব। সামষ্টিক স্বরে লৌকিক বাংলা গদ্যে বলা গল্পটি হয়ে উঠেছে সাবলীল এবং স্মরণীয়।

কুরছিয়ানার সামষ্টিকতার বৈশিষ্ট্য যে লেখক শুধুমাত্র কথনভঙ্গিতে প্রয়োগ করেছেন তা নয়। এই সামষ্টিকতা তিনি কাহিনী রেখা, গল্পের কাঠামো এবং লৌকিকধারার গদ্য তৈরীতেও ব্যবহার করেছেন। এই সাহিত্যিক প্রচেষ্টা জনাব রোমেলের লেখক সত্তার সচেতন আরোপ হতে পারে। অথবা গল্পের যে একটা সৃজনশীল বিকাশ থাকে তার ফলাফল হতে পারে। সাধারণত গল্প নির্মাণে লেখকের স্বায়ত্তশাসন থাকে। এখানে লেখক প্রকৌশলী বা স্থাপত্যবিদের মতো গল্পের কাহিনী, কাঠামো ও কথন নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখেন। আবার কখনো কখনো গল্প নিজেই তার কাহিনী, কাঠামো ও কথনের আত্ম-নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। লেখক শুধুমাত্র একজন কো-পাইলট হিসাবে আর্বিভূত হন। যদিও আমি গল্পের শুরু বা গল্পের শেষ আছে বলে মনে করি না। তবুও অর্থের স্পষ্টতার জন্য বলবোগল্পের শেষাংশ লেখক ইন্জিনিয়ারিং করলেও, বাকিটা অংশ গল্প নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেছে বলে অনুভূত হয়েছে। লেখক কেবলমাত্র গল্পের গতিকে অনুসরণ করেছেন।

জগতে মানুষের জন্ম ও বেঁচে থাকাটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। অর্থাৎ শুধুমাত্র বেঁচে থাকাটাই মূখ্য নয়। জীবনযাপনের পূর্বকাল এবং উত্তরকালও গুরুত্বের দাবি রাখে। আমার জীবনের গল্প আমার জন্মের আগেই শুরু হতে পারে। আবার আমার জীবনের গল্প আমার মৃত্যু দিয়েই শেষ হয়ে যায় না। এমনও বাস্তবতা আসতে পারে যে, আমার মৃত্যুই হয়তো অন্য কোন মানুষের জীবনের গল্পের শুরুর কারণ হতে পারে। জন্ম, জীবনযাপন ও মৃত্যু মানুষের এই তিনপর্ব মহাকালের অসীম রেখা ধরে যার যার নিজস্ব বাস্তবতার গতিতে সমান্তরাল বয়ে চলে। কুরছিয়ানা গল্পের আঙ্গিকে আমি জীবনের এই আঙ্গিকের আবছা প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছি। এই শৈল্পিক প্রকাশ রোমেল রহমানের নিপুণতার স্বাক্ষর; নাকি গল্পের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ তা কুরছিয়ানার কাছ থেকে পাঠক নিজেই জেনে নিবেন। আমি মনে করি—‘কুরছিয়ানা গল্পের চুড়ান্ত বিচারক আমি নই, বরং কুরছিয়ানার আদর্শ পাঠকেরা। সেই পাঠকদের সময় ও জীবন বাস্তবতাই গল্পের অন্তিম বিচারক।

পলাশ মাহমুদ || চূড়ান্ত বিচারক

 

ছবি © লেখকের ফেসবুক থেকে নেয়া

লেখক পরিচিতি || রোমেল রহমান

গল্পকার ও লেখক। জন্ম ১১ নভেম্বর ১৯৮৯ সালে, খুলনায়। পড়াশোনা হিসাব বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত গ্রন্থকবিতা: বিনিদ্র ক্যারাভান, আরোগ্যবিতান, বর্ষামঙ্গল; গল্প/গদ্য: মহামারী দিনের প্যারাবল, প্রোপাগান্ডা, বাঘ, দাস্তান; নাটক: চম্পাকলি লেন ও অন্যান্য নাটক। নিয়মিত লেখেন বাংলাভাষার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং ওয়েবজিনে। গল্পে পেয়েছেন পেন বাংলাদেশ সাহিত্য পুরস্কার ২০২০। তিনি বসবাস করেন খুলনায়।

 

কুরছিয়ানা || গল্পের সারাংশ

বিত্তবান ও নিঃসন্তান দম্পতি আবুল কাশেম ও জোনাকীর জটিল, বহুস্তরীয় জীবন-জালে হঠাৎ আবির্ভাব হয় দারিদ্র্যে ক্লিষ্ট শেফালীর। আর তারই সূত্র ধরে বদলে যায় গল্পের পুরো দৃশ্যপট। আবুল কাশেমের বংশধারার নিষ্ঠুর ইতিহাস পাঠককে কৃষ্ণগহ্বরের মতো টেনে নেয় এক গভীর আকর্ষণে। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে আয়নাল, জয়নাল, মিছরি বেগম, চিনি, মধুএই সব চরিত্রের জীবন-আখ্যান। ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে সময়ের অমোঘ সংঘর্ষের এক মহাকাব্যিক আলেখ্যই হলো এই কুরছিয়ানা

 

কুরছিয়ানা || গল্পের চুম্বক অংশ

পরের দিন শহরের বাড়িতে শেফালীকে তুলে দিয়ে আসার সময়, আবুল কাসেম বলে; একটা কথা জিজ্ঞাস করি? শেফালী বলে, বলেন! যেই লোকটা তোমার বাড়িতে আসতো সে কে? শেফালী বলে, আমার স্বামী! আবুল কাসেম বলে, এইটা কি তার? শেফালী বলে, জি! আবুল কাসেম বলে, বাচ্চা বিক্রি করে দিচ্ছ কষ্ট হবো না? শেফালী বলে, নাহ! আগে হইলে হইত! আবুল কাসেম ভ্রু কুঁচকে বলে, মানে? শেফালী বলে, প্রথম বাচ্চা ফেইলা দেওন লাগছে। কাজ নাই নিজেরাই খাইতে পারি না। বাচ্চা পালবো কেমনে? আবুল কাসেম বলে, মানে? শেফালী বলে, মানে ব্যাঙ ভাজা! যান বিদায়। আবুল কাসেম বলে, বাচ্চা ফেইলা দিলা? শেফালী বলে, এই বাচ্চাটা তাও তো বাইচা থাকবে। সে যে দুনিয়ায় আছে এইটা তো জানবো। আর মা হওয়ার একটা তৃপ্তি তো পাবো। আবুল কাসেম বলে, কিন্তু কাছে তো পাবা না, কষ্ট হবে না? শেফালী বলে, খালি প্যাচান ক্যা? বললাম তো, এই বাচ্চার জন্য আমি আর আমার স্বামী বাইচা যাবো। সেও বাইচা থাকবে। এই তো আনন্দ। খিদার কষ্ট বড় কষ্ট। আবুল কাসেম বলে, মানে। শেফালী বলে, আপনার উত্তরের খাল আমি বিক্রি কইরা নগদ টেকা কইরা নিয়া ফিরা যাবো। চাইলে আপনার বিল আপনি আমার থিকা কিনা নিতে পারেন। আবুল কাসেম হেসে ফেলে। শেফালী মুখ শক্ত করে বলে, সাহস নাই বুঝলেন... সাহস থাকলে বাঁইচা থাকাটা নিভায় দিতাম, তখন দেখতাম খিদা কার সঙ্গে পাল্লা দেয়। কিন্তু আবার ভাবি, মইরা লাভ কি একটু বাঁইচা দেখি। লোভ জাগে বাঁইচা থাকার। মজা নেয়ার। মরাটা তো এক নিমিষের খেলা কিন্তু বাঁচার মধ্যে আসল কারিকুরি! আবুল কাসেমের ভালো লাগে শেষ কথা গুলো তিনি বেরিয়ে যান। কিন্তু গ্রামের লোকেরা বলে, কেচ্ছার মইধ্যে থাকে আরেক কেচ্ছা... চোখের সামনে ভুল নজরে পড়ে না। সময় হয়ে গেলে, যেদিন শেফালীর ব্যাথা ওঠে। সেদিন সবাই শহরের ক্লিনিকে যায়। শেফালীর স্বামী আসে। চুক্তির পরে আর রাখঢাক করে লাভ নাই। আবুল কাসেম তার স্ত্রী আর আকরাম মাস্টার বসে আছে বাইরে। কখন বাচ্চার কান্না শোনা যায়। এবং একসময় কান্না শোনা যায়, সবাই যখন বাচ্চা দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তখন দেখা যায় পাশাপাশি দুইটা বাচ্চা। আকরাম মাস্টার হেসে ফেলে বলে, কাসেম লাভটা তোমারই হইলো। কিন্তু শেফালীর স্বামীর মুখে শঙ্কা। শেফালীর জ্ঞান ফেরার পরে আবুল কাসেম বলে, শেফালী লাভ তো আমার হইলো। চুক্তিতে কিন্তু বাচ্চার সংখ্যা লেখা ছিল না। শেফালী ম্লান বলে, জি! আবুল কাসেম ধীর কণ্ঠে বলে, তোমারে একটা বাচ্চা দিয়া দিবো কেমন? তবে শর্ত তার বিনিময়ে তুমি উত্তরের বিল আমারে ফেরত দিবা। শেফালীর মুখে সকল রক্ত যেন চুপসে যায়। আবুল কাসেম শেফালীর স্বামীকে বলে, কেমন মরদ আপ্নে? পারবেন না এই বাচ্চা বাঁচাইতে? লোকটা চুপ করে থাকে। ডাক্তার এসে তাদেরকে বলে, আসুন একটু, ডাক্তার জানায় বাচ্চা দুটোর মধ্যে একটা বাচ্চার সামান্য সমস্যা আছে। দুটোই কন্যা সন্তান কিন্তু একটা মেয়ের একটা পা অন্য পায়ের চেয়ে ছোট! আবুল কাসেম এই কথা শোনা মাত্রই কেঁপে ওঠেন। 

পড়ুন   সাক্ষাৎকার || মানুষের গল্প ছাড়া কাল তো অসহায় || রোমেল রহমান

         প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ 

         প্রতিধ্বনি গল্প পুরস্কার ২০২৫-এর দীর্ঘ তালিকা প্রকাশ

কপিরাইট © প্রতিধ্বনি