শান্তিনগর বেশি দূরে না
|| ১ ||
আমি হয়তোবা রাজপুত্রই; যেমন অলস,
তেমন মূর্খ, তেমনই বেকার,
হালকা বুদ্ধ, হালকা জোকার;
আমার বাসার আশেপাশে ওরা প্রত্নতত্ত্ব, গবেষণা করে;
মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে জটিল ঢাকার অস্তিত্বের উপহাস খোঁজে;
ভয়ে ভয়ে থাকি—
আমি নিশ্চিত রাজপুত্রই; কিছুটা প্রাচীন,
কিছুটা আদিম: অনেক হারানো ধাঁধার সঙ্গে
মাটির গভীরে ওরা আমাকেও
পেয়ে যেতে পারে!
|| ২ ||
আমার পায়ের নিচে সুগভীর বাতাস নিহিত আছে;
আমি লেপ্টে থাকতে চাচ্ছি;
শুধরাতে চাচ্ছি উড্ডয়ন;
কিছু কিছু শিকড়ময়তা হঠাৎ এমন হ্যাচকা টান দিচ্ছে যে,
আমার ডানা ভেঙে যেতে পারে ডালে বেঁধে,
সমুচ্চ অভিযান বানচাল হয়ে যেতে পারে—
আমি চাচ্ছি, হোক; কিন্তু, লিচুগাছে বাদুড়ের মতো
ঝুলে থাকা, মানে স্থির হয়ে ভেসে থাকা,
রাত্রির চটকদার ঘুমঘুম ভাব,
হীন, ঈশ্বরের কামড়ে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত—
আমার ফুসফুসে পরম বাতাস ঢুকে গেছে, আত্মারাম,
আর বোধ হয় কোনোদিন সুনিবিড় লেপ্টে থাকা হবে না।
|| ৩ ||
শুয়ে আছি সমুদ্রের কবরের উপর পা ছড়িয়ে;
মাথার উপরে সিলিং ফ্যানের অনর্গল হিসহিস,
পিঠের নিচে খসখসে ফোম—
বড়োলোকের গদিতে শুয়ে স্বপ্নে দেখছি ওডেসীয়ুস,
ধ্যান করছি সমুদ্রঘন নস্টালজিয়ার:
আহা, আমি নিছকই লজ্জা, সাপুড়ের গোর,
এই অধ্যবসায়ী সিলিং ফ্যান সাপের মতো হিসহিস করতে করতে
অযথা গলা পেচিয়ে ধরবে আমার;
আর পিঠের নিচে জাহান্নামের থকথকে কাদা আর পুজের মতো
নীল, নশ্বর কমফোর্ট-ফোম
আমাকে শুষে নিতে থাকবে ধীরে ধীরে,
আহা, হঠাৎই নিজেকে মনে হচ্ছে বড়লোকের সস্তা প্রাতঃরাশ,
ওডেসীয়ুসের শত্রু,
সমুদ্রের শত্রু,
ক্ষমতা;
আহা, শুয়ে আছি হাস্যকর শীতের রাত্রে খালি গায়ে,
পা ছড়িয়ে, সমুদ্রের দরগায়, আমার খুব গরম লাগছে, খুব গরম লাগছে!
|| ৪ ||
এইখানে ইকারুসও যা, ওডেসীয়ুসও তা।
এর বাইরে একটা ‘তুমি’ আছে,
যেইটা দিয়ে মাঝেমাঝে ঈশ্বরকে ডাকি;
মাঝেমাঝে দু’একটা মেয়েমানুষকেও তুমিই বলি,
যদিও তাদের কারো সঙ্গে আমার আলাপ হয় নাই কোনোদিন,
ফলে সম্মোধনের সম্পর্কও নেই:
মানে, গোটা জগতটা আসলে
আমি, ঈশ্বর আর কয়েকটি মেয়ে—এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
|| ৫ ||
কারো কারো ইকারুস রাতের বেলা ঘুমায় না;
চোখ বুজে ভ্যাবলার মতো
চৈত্র মাসের আলগা হাওয়ায় ছাদে বসে বসে
গল্প করে ফেরেশতাদের সঙ্গে; মানে ফেরেশতারাও সুখি কিনা,
এপার-ওপার নিয়ে ভাবে কিনা,
বা কখনো কিচ্ছু-না’তে আটকে যায় কিনা—
এসব ব্যাপার নিয়ে মনুষ্যমণ্ডলে কথাবার্তা তো হয় নাই তেমন,
তাই ফেরেশতারাও খুশিই হয়;
ডান কাঁধের জন বাম কাঁধে গিয়ে বসে,
বাম কাঁধের জন ডান কাঁধে;
আর আত্মার আড়াল থেকে যারা ইকারুসের সবকিছুই দূরবীনে দেখছিল,
তারাও বের হয়ে আসে এই সময়;
কিচিরমিচির করে, আড্ডা দেয়,
ইকারুস শোনে;
মাঝেমাঝে বাগড়া দেয়, প্রশ্নও করে উসকোখুসকো;
মাঝেমাঝে সুনসান কবরের মতো বসে থাকে ছাঁদের কোণায়;
দেখে যে, ফেরেশতারাও খিস্তি করছে; ‘এই মাগী, চুপ!’ বলে থামিয়ে দিচ্ছে
একজন আরেকজনকে; একজন আরেকজনের খাতা খুলে পড়তে পড়তে
খুন হচ্ছে হেসে, ‘ব্যাটা ইকারুস এতোটাও খারাপ না,
তুই যেমনে লিখেছিস, তাতে মনে হচ্ছে লোকটা ইকারুসই না,
ইবলিস!’; কেউ আবার বলে, ‘ফকিরের সাথে যতো প্রেমই দেখাক,
শালা বড়লোক হতে চায়, বিরাট বড়োলোক;
এই যে এইখানে তার সমস্ত ইচ্ছার কথা লেখা আছে পাদটীকা সমেত;
দ্যাখ, ব্যাটা ভণ্ড; ব্যাটা অস্থির; ব্যাটা নাস্তিক;
আবার কৃষ্ণচূড়াকে ফাতেমাচূড়া বলতেও ইচ্ছুক;
আমাদের উচিত একসাথে মিলে ওর বাম কাঁধে গিয়ে বসে পড়া':
মানে এইরকম অনেক ফাউ কথা তারা বলে,
এ ওর হিসাবে ভুল ধরে;
ও এর কাছে পরামর্শ চায় ইকারুসের মর্জির ব্যাপারে:
ইকারুসকে শুনিয়ে শুনিয়েই;
ফলে ইকারুস যখন মুখ খোলে, তখন ওরা থেমে যায়;
ইকারুস পাপ আর পুণ্যের কথা বললে ওরা খেয়াল করে শোনে;
ইকারুস আত্মহত্যার কথা বললে মিচকি মিচকি হাসে,
কেননা ইকারুসের আত্মহত্যা মানেই তো ওদের ছুটি;
আর সবশেষে যখন ইকারুস চৈত্র মাসের নিঃসঙ্গতার প্রসঙ্গ তোলে,
তখন এমনকি ফেরেশতাদেরও মন খারাপ হয়;
‘আহা, এইরকম বীভৎস একা ফেরাউনও না হোক; আল্লা, মাফ করো’—
বলে তাকিয়ে থাকে ইকারুসের স্যাতসেতে চোখের দিকে,
ডান ডানের কাঁধে ফিরে যায়;
বাম বামের কাঁধে;
একের পর এক ফেরেশতা ঝাঁপিয়ে পড়ে ইকারুসের আত্মার খুপরিতে;
মনে হয়, এই তো উড়বার সময়; এই তো; আলগা বাতাসে
ভুরুভুরু ছাঁদের পানসে মেঝেতে ইকারুস তড়িঘড়ি খোঁজা শুরু করে
ফেরেশতাদের ফেলে যাওয়া ডানা;
পেয়েও যায়;
ভোরবেলার কিছুক্ষণ আগ দিয়ে ঝাঁপ দেয় আকাশে;
ওড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা; চোখ বুজে; চৈত্রের মফস্বল থেকে অনেক উঁচুতে;
মেঘের ফটক খুলে আকাশের ফাতেমাচূড়ায়;
ঘণ্টার পর ঘণ্টা; চোখ বুজে;
কখন যে সূর্য উঠে গেছে, সে খেয়ালও থাকে না;
ফলে সূর্যের বর্ডার পার হতে না হতেই ডানা গলে যায়;
ইকারুস দেখে, এ আসলে নকল ডানা,
খেলনা ডানা, ফেরেশতাদের ভাণ্ডারে হাজার হাজার এরকম আছে;
প্রতি রাতে কিছু কিছু তারা ফেলে যায়,
আর প্রতি রাতেই ইকারুসের যাত্রাভঙ্গ হয় ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর আগেই;
তবু সে হাল ছাড়ে না;
কোনো না কোনো দিন ফেরেশতারা একটা আসল ডানা নিশ্চয়ই ফেলে যাবে ভেবে
ভোম্বল দাশের মতো ছাঁদে বসে থাকে ইকারুস,
অপেক্ষা করে ফেরেশতাদের;
আর প্রতিবারই সূর্যের কাছে গিয়ে নির্মমভাবে ঝরে পড়ে দুনিয়ায়,
থুবড়ি খেয়ে;
বেলা ১০ টার ঘৃণ্য রৌদ্রে অচেতন হয়ে পড়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা;
ইকারুস ঘুমিয়ে গেছে।
যাক, অবশেষে ঘুমিয়ে গেছে।
|| ৬ ||
শান্তিনগর বেশি দূরে না এখান থেকে:
পায়ে হাঁটলে মিনিট চল্লিশ,
রিকশায় বলা যায় না কতক্ষণ;
আর প্রাইভেট কারে গেলে শেষ অব্দি যেখানে থামবে,
তাকে শান্তিনগর বলা একটু মুশকিলই।
হেঁটে গেলেই বরঞ্চ ভালো।
দেরী লাগবে, তবে এই দেরীর সুবাদে
দেখা হয়ে যাবে অন্তত কয়েক হাজার রকমের
কয়েক হাজার মানুষের সঙ্গে:
যাদের অধিকাংশেরই পায়ের নিচে শুদ্ধ হাওয়া,
চুল ছোটো করে ছাটা, ভদ্র কেতায় আঁচড়ানো,
ভিতরটা হাস্যকর, রতিবিম্বময়, বাইরেকার মতোই আকাশকুসুম;
দেখা হয়ে যাবে নম্র গোছের কিছু চুলখোলা নারীর সঙ্গে;
এরা কেউ আপনার না,
হতে পারে, কারোরই না;
বা, এরাও যে মামুলি, কারো না কারোর,
এই চিন্তাটাই কষ্ট দিতে পারে আপনার পুরুষ-সত্তাকে;
বরঞ্চ এদের স্বল্পতা, খোলা চুল আর সেকেন্ড কয়েকের মধ্যেই
নির্বিশেষ হারিয়ে যেতে দেখাটাই আরো সহজ:
কারণ এদের কে শান্তিনগরে যাচ্ছে, কে যাচ্ছে না,
তা তো ঠিক করে জানা সম্ভব না কোনোকালেই।
আপনার পায়ে বেঁধে ঘুম ভেঙে যাবে জয়নাল পাগলের;
যদিও চোখ খুলবে না সে,
চোখ খোলা নিতান্তই বিলাসিতা তার জন্য;
আপনার হেঁটে যাওয়া দেখে উৎসুক হয়ে রিকশাওয়ালারা
জিজ্ঞেস করবে, কই যাবেন? শান্তিনগর?
জবাবে মাথাটা এমনভাবে নাড়বেন, যাতে হ্যাঁ না কোনোটাই বোঝা যায় না,
কেননা আপনি যে কেনো শান্তিনগরে যাচ্ছেন,
সে ব্যাপারে আপনার পরিষ্কার করে কিছু জানা নেই;
যদিও মাথার উসকোখুসকো ঝুল দেখে যে কারোরই সন্দেহ হতে পারে
আপনি জাতিস্মর টাইপের কিছু একটা,
হয়তো পালিয়ে যাচ্ছেন:
তো, শান্তিনগরে যেতে যেতে এই সমস্তই দেখবেন আর কী।
আপনার চেয়ে বাসের গতি যেহেতু বেশি না,
সেহেতু দীর্ঘক্ষণ বাসের জানালায় মুখ বাড়িয়ে দেওয়া অনেকের চোখে
চোখ পড়ে যেতে পারে আপনার;
তাকালেই বুঝবেন এরা কোথাও পৌঁছাতে চায়, আবার চায় না;
নেহাতই বাস জিনিসটা নিরাপদ, আর নিরাপদ বলেই একঘেয়ে,
এরা তাই জানালা দিয়ে উঁকি মারে এদিক-সেদিক:
তুলনায় আপনার গতি একটু বেশি, ফলে আপনারই জান আসলে ঝুঁকিতে:
তবে ইত্যাকার নানাবিধ পর্যটন শেষে শান্তিনগরে যখন পৌঁছাবেন,
তখন হতাশ হবেন হয়তো এই ভেবে যে,
নতুন কিছুই দেখা গেলো না পথিমধ্যে,
আর শান্তিনগর জায়গাটাও কেমন জানি বস্তাপঁচা,
ঢাকা শহরের যেকোনো জায়গাকেই আদপে শান্তিনগর বলে ডাকা যায়:
কিন্তু দেশে-বিদেশে এইরকম বহু শান্তিনগরই তো পাড়ি দিতে হবে আপনাকে,
এইরকমই কয়েক ঝলক, প্রায় উদ্দেশ্যহীনভাবে, ধুলো খেয়ে,
নম্র গোছের মহিলা আর ফুল হাতা শার্ট পরা হতবুদ্ধি প্রাণীকুলের দিকে তাকিয়ে
অন্তত গড় আয়ু পর্যন্ত আপনাকে হেঁটে যেতে হবে;
তো সেই অর্থে, এই শান্তিনগরে যাওয়াটা এক ধরনের প্রশিক্ষণই;
গেলেন, আবার ফিরে আসলেন,
আবার গেলেন,
ব্যাপারটা এমন জটিল কিছু না,
কারণ শান্তিনগর জায়গাটা তো বেশি দূরে না এখান থেকে।
|| ৭ ||
মাঝেমাঝে ঘুম আসে, মাঝেমাঝে ঘুমের তামাশা
চলে ইচ্ছেমতো; সারা রাত্রি
শুয়ে থাকি অন্ধকারে, সমস্বরে, ভাবি:
অতীব জরুরী মতিভ্রম,
যেনো আবছা কম্বলের ওম
পেলেই হৃদয়সহ সকলেরই ঘুম-ঘুম চোখ
অবশেষে ঢলে পড়বে বীর্যমাখা, ব্যাচেলর খাটে:
সারা রাত্রি ঘুম আসে, সারা রাত্রি ঘুমের তামাশা দেখে কাটে।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন