সুকুমার বড়ুয়ার হাস্যকৌতুক ও ব্যঙ্গার্থক ছড়া
ছড়া সাহিত্যের এক শক্তিশালী মাধ্যম। লেখালেখির অন্যান্য ক্ষেত্রের চেয়ে ছড়ায় অতি সহজে চারপাশ সমাজকে সচকিত করা যায়, চমকে দেয়া যায়, ক্ষোভ-প্রতিবাদকে জানান দেয়া যায়—এমনকি আনন্দানুভূতিকেও ক’পঙ্ক্তির মাধ্যমে চমৎকারভাবে প্রকাশও করা যায়।
আমাদের ছড়া সাহিত্যের সমৃদ্ধ ইতিহাস নির্মাণে অনেক অনেক যশস্বী ছড়া লেখকের সাথে যিনি নিরলস-সার্বক্ষণিকভাবে ছড়া লিখে ছড়াসাহিত্যকে এক মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি সে-ই বিরলপ্রজ বরেণ্য ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া। শুধুমাত্র ছড়া লিখে দেশে-বিদেশে অসামান্য খ্যাতি লাভ করেছেন এই সুকুমার বড়ুয়া—প্রশংসা কুড়িয়ে চলেছেন দীর্ঘ সময়কাল করে।
সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ার ভাণ্ডার-জগৎ ও ব্যাপ্তি বিশাল ও আকর্ষণীয়। ছেলেঘুমানো, ছেলেভুলানো, রাজনীতিনির্ভর, শ্লেষমূলক, হাস্যরসার্থক এমনি নানা বিষয় আঙ্গিকের ছড়া লিখে তিনি পাঠককে ভাবিয়ে তুলেছেন, আমোদিত করেছেন, সচেতন করেছেন, নিজের জীবন-জীবনযাপন সম্পর্কে সজাগ করেছেন। প্রকাশ করেছেন একজন লেখকের দায়বদ্ধতা। তার নানা বিষয় প্রসঙ্গের ছড়ার পাশাপাশি যদি তার হাস্য কৌতুক-ব্যঙ্গার্থক ছড়া আলোচনায় আনি তাহলে আমাদের অবাক হতে হবে যে কী সহজ-সরল ছন্দ ভঙ্গিতে তিনি আমাদের চারপাশের জনমানসের চলমান জীবনের চিত্র তুলে ধরেছেন। হাস্য কৌতুকের মাধ্যমে তিনি বলেছেন অতি সত্য কথা-কিংবা সময়কালের নির্মম চালচিত্র প্রকাশ করেছেন।
এক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের বসত শহর-নগরীতে জমিদারের ভাড়া বাসাতে। মাসের শেষে প্রাণান্ত উপার্জনের সিংহভাগ তুলে দেয়া হয় জমিদারকে। জরাজীর্ণ বাসাবাড়ির জমিদারের চরিত্র নিয়ে তিনি যখন ‘বাড়িওয়ালা’ ছড়ায় লিখেন—‘ফেকু বাড়িওয়ালা/ ভুঁড়ি তার ফোলা/ খেয়ে কাঁচা ছোলা/ গড়েছে টাকার পর্বত/ ভাড়াটের ঘরে জল যদি পড়ে/ জবাবে সে বলে ‘তবে কি পড়িবে শরবত’—তখন সহজেই অনুমেয় অর্থলিপ্সু বাড়িওয়ালার আস্ফালন। তাঁর ব্যঙ্গের খোঁচায় হাস্যরসে জীবনের কী নিদারুণ ছবি ফুটে উঠেছে।
শ্রেণি বৈষম্যে আমাদের সমাজ জীবনে এক শ্রেণির উচ্চবিত্তের মানুষ প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষকে ছলে-বলে-কলে-কৌশলে নানাদিক থেকে নানাভাবে ঠকিয়ে চলেছে—বঞ্চিত করছে নিজেদের অধিকার থেকে, তাদের হীনমন্যতাকে চমৎকার ব্যঙ্গোক্তিতে প্রকাশ করেছেন সুকুমার বড়ুয়া। ‘অমুক’ ছড়ায় ‘অমুক দেশের অমুক/ পরের মাথায় কাঁঠাল রেখে/ কোয়া খাবেন একে একে/ মুচকি হেসে বলেন আবার/ তোমার বোঝা কমুক/ ভাগ্য দোষে আমার পেটেই/ জমেছে বোঝা জমুক।’
‘নমুনা’ ছড়ায় লেখক প্রতিবাদে সোচ্চার। স্বার্থান্বেষী-মতলববাজদের মুখোশ তিনি উন্মোচন করেছেন। যারা গণমানুষের জীবনকে বিষিয়ে তুলছে তাদের কাণ্ড-কুকীর্তি তিনি জনসমক্ষে প্রকাশ করেছেন। তাই লিখেছেন—‘দেখছি রে ভাই দেখছি তোমার/ হক বিচারের নমুনা/ খোলা মাঠে কইয়া দিমু/ কানে কানে কমু না/ তেলা মাথায় পড়ছে তেল/ শুকনা মাথায় পড়ছে বেল/ শামুকরে কও তুফান মেল/ তিস্তারে কও যমুনা।’
নানা অনৈতিক উপায়ে অর্থ-বিত্ত করায়ত্ত করার ঘৃণ্য লালসায় লিপ্ত এক শ্রেণির মানুষ। তাদের কাছে নীতি-জ্ঞান-সৎচিন্তা মিথ্যে। টাকা-সম্পদলিপ্সু এ সব দুরাচার মানুষকে নিয়ে তাইতো ব্যঙ্গ শ্লেষ করে তিনি লিখেছেন ‘ধর টাকা ধর’ ছড়ায়—‘ঘাড়ে ধরে পায়ে পড়ে/ হাজারো চালাকি করে/ খুনি সেজে গুণী সেজে/ ঝাঁপ দিয়ে পড়/ ধর টাকা ধর।’
সুকুমার বড়ুয়া এভাবে জীবন-জগৎ-জিজ্ঞাসার নানা চিত্র নানা ব্যঙ্গরসে অপূর্ব কুশলতায় প্রকাশ করেছেন, তুলে ধরেছেন তাঁর ছড়ায়। বৃষ্টি মুখর দিনে অসময়ে মেহমানের উৎপাত সহ্য করতেই হবে—যাওয়ার সময় ভাঙা ছাতা নিতে চাচ্ছে তা দিতেই হবে (অসময়ে মেহমান), মামাতো ফুফাতো ভাইয়ের অন্যায় আবদার রাখতেই হবে (ভাই), কাজের মুরোদ নেই অথচ কারো কারো কথার মাতবরীতে সবাই অতিষ্ঠ (খাইছে), আমি আগেই আমার কাজ সেরে নেবো—আমার হিস্যা আমি বুঝে নেবো (আমি আগে), পুকুর চুরি করতে পারি, শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে পারি—অন্ধকারে খুনি আর দিনে সন্ন্যাসী সাজতে পারি (সব পারি), দেখা যায় গুণী-খুনী এক সাথে উঠাবসা করছে—হাতে হাত রেখে কোমর দুলিয়ে নাচছে (নৃত্য), প্রতিবেশী আমাদের হাতিয়ে চলতে পারঙ্গম—ঠকিয়ে বেশ মজা পায়—আয়েশ বোধ করে (প্রতিবেশী), সমাজে চোরকে ডাকুরা সুযোগ পেলে মজা করে পেটায় অথচ নিজেরা সাধু সেজে ফুরফুরে মেজাজে ঘোরাফেরা করে (চোর), রাসবিহারী দাসের নাতিরা স্বেচ্ছাচারী হয়ে দিব্যি বসবাস করছে সমাজে কোন কিছুর তোয়াক্কা করে না (রাসবিহারী দাসের নাতি)।
এমনি নানা অনুষঙ্গ, বিষয় বৈচিত্র্য নিয়ে তার অভিজ্ঞান ব্যঙ্গ-হাস্যকৌতুক ছলে ছড়ায় প্রকাশ করে নন্দিত হয়েছেন সুকুমার বড়ুয়া। খুলে দিয়েছেন আমাদের চোখ-কান। সুকুমার বড়ুয়া হাস্যকৌতুক-ব্যঙ্গ ছড়ার মাধ্যমে সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন সমাজের-জনজীবনের নানা অসঙ্গতি-কূটচাল; অনৈতিকতার মারপ্যাঁচ, কখনো কখনো সত্যকথনও সাথে সাথে ঠাঁই করে নিয়েছেন পাঠক মহলে-জনমানসেও।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন