ডাহুক মাহুত বেলা

অ+ অ-

 

ঘুমের মধ্যে আমার গলা আর বুকের মধ্যবর্তী অংশটা হঠাৎ খালি হয়ে গেল আর আমার স্বপ্নের মধ্যেই আমি টের পেলাম তীব্র পিপাসা সবকিছু যেন নিউজপ্রিন্ট কাগজের মত শুষে নিচ্ছে আর অনেক অনেক দূরে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে, ঝাপসা, দেখতে পাচ্ছি না, বুঝতে পারছি না কে, কিন্তু মনে হচ্ছে তার কাছে গেলেই আমি জেগে উঠব, আমার কষ্ট কমে যাবে। আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম, স্বপ্নের এই নিয়ম, ভেসে ভেসে চলে যেতে হয়, আমিও ভাসলাম। ভাসতে ভাসতে যাচ্ছি, যাচ্ছি, যাচ্ছি, পথ কমছে না, মানুষটার মুখও স্পষ্ট হচ্ছে না।

জেগে উঠলাম। স্বপ্নের কারণে নয়, বুয়া রুমের ফ্যান অফ করে দিয়েছে ঝাড়ু দেবার জন্য। বসুন্ধরার এদিকে একটা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকি, একা নয়, শেয়ারে। দুটো রুম, একটায় আমি, আরেকটায় নর্থ সাউথের দুটো মেয়ে। আমার রুমটা বড়, বারান্দা আছে, এটাচড ওয়াশরুম। ওরা কমন ওয়াশরুম ব্যবহার করে, ভাড়াও কিছুটা কম দেয়। ফুল ফার্নিশড ফ্ল্যাটের কনসেপ্টটা ভালো। আসো, থাকো, চলে যাও, কিছু আনারও দরকার নেই, নেয়ারও দরকার নেই। পাশের রুমের মেয়েদুটোও ভালো। কিচেন নোংরা করে রাখে না, বুয়া এলে দরজা খুলে দেয়, রুমে ঢোকার আগে নক করে, জিনিসপত্র ধরার আগে পারমিশন নেয়। রুম থেকে বেরিয়ে ফ্রিজ খুলে দুধ বের করলাম, একমগ কফি, মুখ না ধুয়েই, আমার প্রতিদিন সকালের হেভেনলি হ্যাবিট। এই বদঅভ্যাসটা খুব দারুণভাবে সংরক্ষণ করে চলেছি, ওদিকে চুল থেকে ক্লিপ খুলে রাখলে তা আর খুঁজে পাই না। এমনিতে ক্লাস না থাকলে আমি এত সকালে ঘুম থেকে উঠি না, আজ উঠে গেলাম, ছুটির দিন নয় যদিও, ক্লাস কামাই করেছি। ছোটচাচা কাল রাতে ফোন দিয়ে বলল বাবা ঢাকায়, দেখা করতে যেতে হবে।

ঢাকা বলতে ঠিক ঢাকা নয়, উত্তরা থেকে টঙ্গী যাওয়ার রাস্তা ধরে অল্প কিছুদূর এগিয়ে বামের ছোট রাস্তাটা দিয়ে বেরিয়ে একটু কম লোকজনের যে এলাকাটা পাওয়া যায়, ওখানেই বাবার ফার্মহাউজ। আমার দাদা তার তিন ছেলেকে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী বড় তিনটি প্রপার্টি লিখে দেবেন বলে ঠিক করেন, ভাগাভাগির ঝামেলা ছাড়াই যেগুলো তারা ক্রয়, বিক্রয় বা ব্যবহার করতে পারবে। বড় চাচা নেয় গাজীপুর মেইন রাস্তার পাশের ৩৫ শতাংশ জমি, ছোটচাচা বনশ্রীর একটা হাউজিং প্রজেক্টে দাদার পাওয়া চারটা ফ্ল্যাট, আর আমার বাবা বেছে নেয় এই ফার্মহাউজ। অর্থনৈতিক দিক থেকে এটা অ্যাসেট হিসেবে বাকিগুলো থেকে একটু কমদামি, কিন্তু তবুও বাবা এটা বেছে নেয়। কারণ এটার পাশ ঘেঁষে একটা ছোট লেক গেছে আর নিরিবিলি বাস করার পক্ষে পরিবেশটা বেশ উপযোগী। দাদাজান দয়াপরবশ হয়ে তাই তাকে ব্যবহার করতে তার পুরনো গাড়িটা দিয়ে দেন, যদিও গাড়িটা বেশিরভাগ সময় গ্যারেজেই পড়ে থাকে কারণ বাবা নিজেই দেশে থাকে না।

কফি খেতে খেতে রাতুলকে একটা ফোন দিলাম। বললাম, আজকের ক্লাসের স্লাইডটা কালেক্ট করে একটু আমাকে মেইল করে দিতে। রাতুল আমাদের সিআর, ক্লাস ক্যাপ্টেন ধরনের আর কি। ফার্স্ট ইয়ারেই বিয়ে করে ফেলেছে, শ্বশুরের টাকায় পড়াশোনা করছে। বউয়ের সাথে আগে থেকেই প্রেম থাকলেও ও নাকি বিয়েটা তখন করতে চায়নি। ওর শ্বশুর হার্ট অ্যাটাক করে হাসপাতালে ভর্তি ছিল, ভেবেছিল মরে যাবে, কেঁদেকেটে কাজি ডাকিয়ে বিয়ে দিয়ে দিল মেয়ের, পরে আর মরল না। রাতুল বেচারা বিরক্ত, শ্বশুরের ওপর তো বটেই, বউয়ের উপরেও। তবে শ্বশুরের ছেলে না থাকায় জামাইয়ের পড়ার খরচ জোর করে সেই দিচ্ছে, খুব নাকি পছন্দ করে ওকে। বিয়ের পর বউকে নিয়ে হানিমুনে যাবে, শ্বশুর নাকি কক্সবাজার বা সিলেট যাওয়ার ব্যবস্থা করছিল, বউ বাধ সেধে বসল, স্বামীর টাকায় হানিমুন করবে। শ্বশুরের সামনে নাকি কিছু বলেনি, চুপিচুপি ঘরে এসে কান্নাকাটি করে স্বামীকে ধরেছে। রাতুল আর কি করে, ক্লাসে সবাইকে জিজ্ঞেস করল সস্তায় ঘুরতে যাওয়া যেতে পারে কোথায়। বেচারার জন্য এত মায়া লাগল। তখন বাবার ফার্মহাউজে ওদের তিন-চারদিন থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। তারপর থেকে রাতুল কৃতজ্ঞতায় একদম টলমল হয়ে থাকে। একদিন অবশ্য জিজ্ঞেসও করেছিল বাবা-মায়ের কথা, এতবড় বাড়ি খালি পড়ে থাকে, আমিও একা থাকি। বাবা দেশে থাকে না বেশিরভাগ, মা মারা গেছে আমি হওয়ার অল্প কিছুদিন পর। বাবা কী করে তোর? ফুড নিয়ে কাজ করে। রিসার্চ, ক্রিটিকএসব আর কি! দেশে বিদেশে ঘোরে; বড় বড় রেস্টুরেন্ট, কোম্পানি, চ্যানেল, ম্যাগাজিন ডেকে নিয়ে যায়; তাদের জন্য কাজ করে।

কফি শেষ করে একটা উবার ডেকে রেডি হতে বসলাম। কিছুই না, জিন্স, কুর্তি পরে মুখে একটু ফেস পাউডার আর ঠোঁটে লিপবাম লাগিয়ে ব্যাগ নিয়ে জুতো পায়ে বেরিয়ে যাওয়া। উবারে উঠে এড্রেসটা বলে জানালা দিয়ে বাইরে চোখ রাখলাম। ভালো একটা সুপারশপ দেখে কিছু নিমকি জাতীয় নিতে হবে, বাবা ভালোবাসে। এসবই অবশ্য শোনা কথা, বাবার সাথে আমার খুব বেশি একটা থাকা হয়নি। আমি বেশিরভাগ সময় থেকেছি নানাবাড়ি, দাদাজান যদিও আমাকে বেশ ভালোবাসতেন, খরচাপাতি পাঠাতেন, জামাকাপড়, খাবারদাবার নিয়ে প্রায়ই আমাকে দেখতে যেতেন, আর খুব দুঃখ করে আমার নানা নানীকে বলতেন, আপনাদের কাছে বড় ভালো থাকে, দেখাশোনার মানুষ থাকলে আমিই নিয়ে যেতাম, কিন্তু কেউ যে নেই। আসলেই কেউ ছিল না দাদাজানের কাছে। শুধু আবু মিয়া, পুরনো কাজের লোক, একইসাথে দারোয়ান, বাবুর্চি থেকে শুরু করে দাদাজানের অভিভাবক। কেবল দুজন পুরুষমানুষের সংসারে আমার নানা আমাকে রাখতে চাননি। তার নিজের সংসারে আমার নানী ছিল, খালা ছিল, মামী ছিল। খালার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর মামা বিয়ে করলে মামী আসে, সেও খুব দেখেশুনে রাখত। মাঝেমধ্যে দাদাজানের কাছে যেতাম, একবেলা থেকে চলে আসতাম। আসার সময় অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে রাখতেন তিনি, ধীরে ধীরে বলতেন, কিছু চাও দাদু? চাও কিছু? আমি বেশিরভাগ দিনই না করতাম। কেবল একদিন, দাদাজান অসুস্থ হয়ে ছিলেন, প্রবল জ্বর, দেখতে গিয়েছিলাম, চাচারা ছিল, চাচীরাও, তাদের ছেলেরাও। ঘর একটু ফাঁকা পেয়ে দাদাজান আমাকে ডেকে কাছে নিয়ে একইভাবে বললেন, কিছু চাও দাদু? আমি প্রস্তুত ছিলাম, ঠাস করে বললাম এই বাড়িটা লিখে দিতে। ছোট আমি তখন, বাড়ির ব্যাপারে কিছুই জানি না, নানা আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি দেখতেন, প্রায়ই দাদাজান আমাকে জিজ্ঞেস করত কিছু চাই কিনা। নানা এটা কেন করেছিল? লোভ থেকে? নাকি আমার কথা ভেবে? আজও ভেবে পাই না। ওইদিন অবশ্য এত প্রশ্ন মাথাতেই আসেনি। কথাটা বলার পর দাদাজান শূন্য চোখে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন কিছুক্ষণ। তারপর আমার বাহু শক্ত করে চাপ দিয়ে কয়েক মুহূর্ত ধরে রেখে ছেড়ে দিয়ে মুখটা ঘুরিয়ে সিলিংয়ের দিকে চোখ স্থির করে রইলেন, আর কথা বললেন না। আমি কিছুই না বুঝে চলে এলাম, প্রথমে ঘরের বাইরে, তারপর নানাবাড়ি। নানা ফিরতে ফিরতেই জিজ্ঞেস করেছিলেন সব, আমি বলেছি। ওইদিন রাতেই দাদাজান মারা যান। পরে একদিন নানাকে বলতে শুনেছি, নানীকে বলছিলেন, যে নাতনীর আদর কাঁচাই হয়, নাতিদের আদর পাকা, সহায়-সম্পদের সময়ই এগুলো বোঝা যায়।

একটা বেকারি কাম সুপারশপ দেখে গাড়ি থামিয়ে কিছু নিমকি, মুনাক্কা আর আলুর চানাচুর নিয়ে আবার গাড়িতে এসে বসলাম। গাড়ির ভেতরে এসি নেই, মানে আছে, নষ্ট। তাই জানালা খোলা রাখতে হচ্ছে। কিন্তু রাস্তার ধুলো আরও ভয়ংকর। হাঁচি শুরু হয়ে গেল আমার। ডাস্ট অ্যালার্জির সমস্যা আছে, আরও সমস্যা পোকামাকড়ে। মশামাছি আশেপাশে উড়লেও নাকের মধ্যে সুড়সুড় করে। দাদাজান আমাকে ভালোবাসতেন বলেই মনে হয়, তার আর কোনো নাতনী ছিল না। আমার নাম রেখেছিলেন আমার দাদীর নামে, নামটা খুবই ভয়ংকর পুরনো দিনের, চাঁদ সুলতানা। আমি অবশ্য আমার ডাকনামটাই সবাইকে বলি, ডাহুক। নামটা রেখেছিল বাবা। বাবার আমার ব্যাপারে কখনোই কোনো উৎসাহ ছিল না। কেবল নাম রাখার বেলাতেই তার আগ্রহ দেখা গিয়েছিল। ঠিক করেছিল মেয়ে হলে ডাহুক, ছেলে হলে মাহুত। দাদাজান বিরক্ত হয়েছিলেন যথেষ্ট। হাতির দেখাশোনা করে মাহুত, এটা আবার কেমন নাম! এরচেয়ে তো মাসুদ রাখা ভালো। কিন্তু বাবা মাহুতেই আটকে থাকল। ভাগ্য ভালো, ছেলে হয়নি, হয়েছি আমি, নইলে মাহুত নিয়ে আমার বাপদাদার একটা ফাটাফাটি হয়ে যেত।

চাঁদ সুলতানার নামে, মানে দাদীর নামেই দাদাজানের বাড়ির নাম ছিল চাঁদমহল। দাদাজান যখন মারা যান তখন বাবা প্যারিসে, আসতে পারল না। এই কয়েক বছর আগে বাড়িটা চাচারা একমত হয়ে একটা বিল্ডার্স কোম্পানিকে দিল। এসব কিছুই আমার জানার কথা নয়, কিন্তু দাদাজান মারা যাবার পর একজন মানুষই আমার নিয়মিত খোঁজখবর রাখত, ছোটচাচা। প্রতি সপ্তাহেই ফোন দেয়, কথাবার্তা বলে, শোনে। আর অনেকদিন পরপর ফোন রাখার আগে দাদাজানের মতই ধীরে ধীরে বলে, কিছু লাগলে বইল, মা। আর চিন্তা করবা না কখনো। আমরা থাকতে তোমার ঠক হবে না, মেয়ে দেখে তুমি বঞ্চিত হবা না। তোমার বড় চাচারও একই মত। জানালাটা শেষমেশ আটকেই দিলাম, মুখের ভেতরটা বালি ঢুকে কিচকিচ করছে। ড্রাইভারকে রাস্তা বলে বলে দিতে হচ্ছিল উত্তরা ঢুকে কিছুদূর গিয়েই। দুপাশে বড় দুটো বিলের মাঝ দিয়ে ফার্মহাউজে যাবার রাস্তাটা মনে হচ্ছিল সিঁথি কেটেছে। গেটের সামনে গিয়ে গাড়িটা থামলে ব্যাগ থেকে টাকা বের করে ভাড়া মিটিয়ে দিলাম, সাথে কিছু টিপ্পনি। গেটের দেয়াল ঘেঁষে কলিংবেল, বাজালে কেয়ারটেকারের বাসায় শোনা যায়। ভেতরেই একপাশে কেয়ারটেকার থাকার ছোট্ট একটা বাসা, সেখানে দাদাজানের দেখাশোনা করত যে আবু মিয়া, দাদাজান মারা যাওয়ার পর সে এসে থাকত, এদিকটা দেখাশোনা করত। এখন তার ছেলে নসু বউ নিয়ে থাকে, একটা ছোট দুবছরের বাচ্চাও আছে ওদের। কলিংবেল দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম, একটুপর গেটের ফাঁকা দিয়ে নসুকে আসতে দেখা গেল। গেট খুলেই নসু সালাম দিয়ে হাসল। ওরা কেমন কি আছে জিজ্ঞেস করতে করতে মনে হলো কিছু নিয়ে আসা উচিত ছিল, ওদের জন্য বা ওর বাচ্চাটার জন্য। নসু দরজা অব্দি এগিয়ে দিয়ে চলে গেল, এবার মূল দরজার কলিংবেলে একটা চাপ দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। চারপাশটা সুন্দর এখানকার, নসুরা আরও সুন্দর করে রেখেছে, নিয়মিত বোধহয় সব পরিস্কার করে। গাছগুলো সবুজ, ফুলগুলো রঙিন, হাঁস-মুরগি দৌড়াদৌড়ি করছে। পেছনের দিকের সবজির খেতটার খবর কি কে জানে, যাওয়ার সময় উঁকি দিয়ে যেতে হবে। আরেকটা পুকুরও আছে, বাবা একসময় ভেবেছিল ওটাকে সুইমিংপুল বানিয়ে ফেলবে, সময় পায়নি, খুব ব্যস্ত মানুষ। স্কুলে থাকতে টিচাররা প্রথমে ভেবেছিল আমার বাবা-মা কেউ নেই। তারপর যখন জানল, বেশ অবাক হয়েছিল। হেডমিস্ট্রেস নানাকে বলছিল যেন বাবাকে বলে আমাকে একটু সময় দিতে, আমি খুব চুপচাপ একা একা থাকি, অন্য বাচ্চাদের মতো না। নানা চাচাদের জানিয়েছিল, চাচারা বাবাকে, বাবা পাত্তা দেয়নি। রাগ করে ছোটচাচা একাই আমাকে ইন্ডিয়া ঘুরতে নিয়ে গেল। কলকাতা আর দার্জিলিং গিয়েছিলাম, ওটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের স্মৃতি, কারণ ওই প্রথমবার আমি আকাশ থেকে বরফ পড়তে দেখেছিলাম। মনে আছে, ফিরে এসে ছোটচাচা যখন আমাকে নানাবাড়ি দিতে গেল, নানাকে হাতজোড় করে বলছিল, মাফ করে দিয়েন, তালই। না আপনার মেয়েটার খেয়াল আমরা রাখতে পারছি, না আমাদের মেয়ের খেয়াল আমরা ঠিকমতো রাখতেছি। আমাদের ভাই স্বার্থপর, আমরা না, ইনশাআল্লাহ আমরা থাকতে ও বঞ্চিত হবে না। চাচাকে কখনো ভালো করে থ্যাংক ইউ বলা হয়নি, এবার গিয়ে বলতে হবে, বলতে হবে যে আমার শৈশবের সবচেয়ে সুন্দর অংশটা তার দেয়া।

দরজা খুলে বাবা বোধহয় কিছুক্ষণ চিনতেই পারল না। তারপর ও মাই গড, লিটল বেবি ওয়াটারবার্ড, হোয়াট এ সারপ্রাইজ! বলে চিৎকার দিল একটা, অথবা বলা যায় চিৎকার দেয়ার ভঙ্গি করল। আশ্চর্য, খুশি খুশি ভাব করছে কেন বাবা, এমন তো নয় যে সে ডেকে এনেছে, চাচা না বললে তো আমি জানতেও পারতাম না। তবুও হাসলাম, হাসিটা মনে হলো অজান্তেই বেরিয়ে এসেছে। কেউ জানে না, কিন্তু বাবাকে আমি খুব ভালোবাসি, খুব চাই, ছোটবেলায় আরও চাইতাম। চিঠি লিখতাম, সেগুলোকে প্লেন বানিয়ে বাবার কাছে উড়িয়ে দিতাম, কাগজের প্লেন উড়ে প্যারিস চলে যেত কি, নিজেকে বোঝাতাম, যাচ্ছে যাচ্ছে যাচ্ছে! খুব ইচ্ছে করল বাবাকে একটু জড়িয়ে ধরতে, কিন্তু দীর্ঘ অনভ্যাসে তা আর হলো না। বাবা দেশে আসত মাঝেমধ্যে, দেখা হতো, আমার জন্য চকলেট আনত, অনেক অনেক চকলেট। বড় হওয়ার পর বুঝলাম সেগুলো সবই ছিল দেশ থেকে কেনা ইম্পোর্টেড চকলেট। বাবার কখনোই বিদেশ থেকে আসার সময় আমার কথা মনে পড়ত না। শেষ যেবার এসেছিল আমার জন্য কয়েকটা ফ্রেঞ্চ পারফিউম আর একটা ডিজাইনার ব্যাগ এনেছিল, সাথে চকলেট তো আছেই। আমি সেবার অনেক খুশি হয়েছিলাম, এত যে চোখে পানি চলে এসেছিল। পরে শুনি তার মনে ছিল না, তাকে ছোটচাচা বারবার ফোন দিয়ে বলে দিয়েছে যেন অবশ্যই আমার জন্য কিছু নিয়ে আসে। তখন নাকি সে তার তখনকার অফিসের এক ইন্টার্নকে টাকা দিয়ে বলেছে মেয়েদের উপযোগী যা খুশি কিনতে। বাবা সরল, হাসতে হাসতেই আমাকে এসব বলছিল সেবার আর আমি ভিতরে ভিতরে শীতের পাতার মতো ঝরে যাচ্ছিলাম।

বাবার সাথে গিয়ে ডাইনিং রুমের একটা চেয়ার টেনে বসলাম। তুমি আমার কোনো খোঁজই নাও না, কেন বাবা? এটা তো ভালো, বেবি। তোমার তো খুশি হওয়া উচিত, তোমার বয়সী মেয়েরা এরকম ফ্রিডম ক্রেভ করে। আমি নিজেও করতাম। আমি তোমার মতো ফ্রিডম পেলে লাইফে অনেক কিছু বেশি করতে পারতাম। আব্বা আমাকে সেই ফ্রিডম দেয়নি, ব্লাকমেইল করেছে সারাজীবন। আমি সেরকম বাবা হতেই চাই না। আমি আর জিজ্ঞেস করলাম না কিসের ব্লাকমেইল, কারণ আমি জানি এইসব পুরনো ব্যাপার, আমাকে খালা বলেছে। বাবাকে দাদাজান ব্লাকমেইল করে মায়ের সাথে বিয়ে দিয়েছিল। বাবা একদমই বিয়ে করতে চায়নি, বিদেশে যেতে চেয়েছে, কিন্তু দাদাজানের কথা ছিল অন্তত একটা নাতি কিংবা নাতনীর মুখ দেখাতে না পারলে তিনি বাবাকে বিদেশে যাবার টাকা দেবেন না। তাই বাবা বাধ্য হয় মাকে বিয়ে করতে। তোমার মা ভালো মানুষ ছিলেন, তার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। উনি মারা না গেলে আমার জীবনটা প্যাচে পড়ে যেত। উনি মারা যাওয়ার পর আমি কিছুদিন বিবাগী মার্কা আচরণ করলাম, তাতেই না আব্বা তাড়াতাড়ি আমাকে বিদেশে পাঠাল। এখানে কি ভালো কোনো জায়গা আছে নাকি ফুড ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে কাজ করার? এরা টমেটো সস বলে কুমড়ার ঘ্যাট বিক্রি করে।

বাবা একটা মগ নিয়ে এলো, হট চকলেট, সামনে রাখলো, আর একটা প্লেটে চিপস, ওয়াসাবি কোটেড মটর আর কাজুবাদাম। ব্রেকফাস্ট করেছ? কফি শুধু। তাহলে এটা খাও, একটু পরে কিছু বানিয়ে দিচ্ছি। আমিও বেশিক্ষণ হয়নি উঠেছি, রাতে শুতে দেরি হয়েছে বেশ। তুমি কি নিয়ে পড়ছ? ফার্মাসি। বাহ, দারুণ। তোমার জন্য কিছু আনতে মনেই ছিল না, যদিও প্ল্যানই ছিল না দেখা করার, আচ্ছা ওয়েট। বাবা উপরে চলে গেল, একটু পর নেমে এলো একটা বক্স নিয়ে। হ্যান্ডমেইড সোপস। একজন আনতে বলেছিল, বলব ভুলে গেছি, তুমি নিয়ে যাও। আমি চাইলেই বলতে পারতাম, বলতে পারতাম যে চাই না তোমার উপহার, নিজের মেয়ের খোঁজটুকু অব্দি রাখতে পার না, কিন্তু পারলাম না, বাবার বেলায় এমন হ্যাংলা কেন হয়ে যাই, হাত বাড়িয়ে বক্সটা নিলাম। একবার ইচ্ছা করল বাবাকে বলি, মা নাকি চেয়েছিল আমি ডাক্তার হই, ডাক্তারিতে সুযোগ হয়নি তাই ফার্মাসি পড়ছি। ইচ্ছা করল বলি যে আমার বয়সী মেয়েরা ফ্রিডম চায় পায় না বলেই, বেশি পেলে আবার চাইত না। কিন্তু চুপ করে রইলাম, মুখে কাজু গুঁজে রইলাম। তুমি চাইলে এখানকার পড়াশোনা শেষ করে বাইরে যেতে পারো হায়ার এডুকেশনের জন্য। আ হোল ডিফারেন্ট থিং ইজ গোয়িং অন আউট দেয়ার। লাইফ চেঞ্জ হয়ে যাবে একদম। ইউএস ট্রাই করো, বা অস্ট্রেলিয়া, ইউকে? ফ্রান্স? জিজ্ঞেস করলাম, বাবা দেখল আমি চোখ তুলে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। ওয়েল, ইউ ক্যান ট্রাই ফ্রান্স, বাট আমার ভরসায় যেও না, হ্যা! ইফ ইউ নিড হেল্প আমি আলাদা ব্যবস্থা করে দেব। বিসাইডস, তোমার সাবজেক্টের জন্য ইউএস বা অস্ট্রেলিয়া বেস্ট হবে।

আমি চুপ করে রইলাম, মনে মনে বললামআই ওয়ান্ট টু গো টু ফ্রান্স, বাবাআই ওয়ান্ট টু গো টু ইউ। ওদিকে বাবা বলেই যাচ্ছে, আব্বা আমাকে কোনোদিন বোঝার চেষ্টাই করেনি। ইউ নো, তুমি ছেলে হলে নাম রাখতে চেয়েছিলাম মাহুত। বাট বাবা কিছুতেই বুঝল না, বারবার বলছে হাতি পালা লোক, হাতি পালা লোক, আমার ফিলোসোফিটাই বুঝল না। শোনো, সাবকন্টিনেন্টে হাতি চিহ্নের মানে হলো সমৃদ্ধি আর আমি মাহুত হিসেবে মিন করেছি যে সমৃদ্ধি, সুখ, শান্তিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। বাবা বুঝলই না। তারপর বিয়ের ব্যাপারটা, আমি বারবার বলেছি, আমি লাইফে এগুলো চাই না, বিয়ে-সন্তান এগুলো আমার আকাঙ্ক্ষা নয়, আই ডোন্ট ওয়ান্ট দিইজ, কিন্তু না, বুঝবে না, ব্লাকমেইল করা লোক একটা।

আমার চোখে পানি চলে এল। বাবা বলতেই থাকল, বলতেই থাকল, কিভাবে সে একাই ভালো থাকে, একা থাকতে চায়, অন্য যেকেউ (আমিসহ অবশ্যই) তার কাছে কতটা অগুরুত্বপূর্ণ, বলতেই থাকল। আমি উঠে দাঁড়ালাম। একি, উঠবে নাকি? হ্যাঁ, ছুটির দিন তো নয় আসলে, ক্লাস রয়েছে। ওহ, হ্যাঁ, ছুটির দিন তো নয়। আচ্ছা, যাও তাহলে। কিছু বানাতে হবে না, ভালো হলো। আমি জাস্ট কুকিজ খেয়ে নেব। যেন কিছুই শুনছি না এমনভাবে দরজা অব্দি হেঁটে গেলাম, বেরিয়ে যাচ্ছি এমন সময় বাবা পিছু ডাকলো। শোনো ডাহুক, কি যে বলি, এদেশে এগুলো একদম যেন প্রাকটিসেই নেই, এভাবে হুটহাট আর এসো না, হ্যাঁ? কল দিয়ে এসো। মানুষজন এটেন্ড করতে ভালো লাগে না, বুঝলে, একটু একা থাকতে চাই। আই হোপ তুমি বুঝবে, তুমি একটা এডুকেটেড মেয়ে। লাইক, দেখাদেখি করতে চাইলে তো জানাতাম, তাই না? যাক, আচ্ছা, অনেক কথা হলো, যাও হ্যাঁ, সি ইউ।

আমি কোনোমতে ঘাড় নেড়ে মাথা ঘুরিয়ে নিতেই পেছনে দরজা বন্ধের আওয়াজ পেলাম। চোখের পানি বের হতে দিলাম না, মাথা চিৎ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বাষ্প করে উড়িয়ে দিতে চাইলাম। নসুর ডাকে সামনে তাকিয়ে দেখলাম আনমনে হাঁটতে হাঁটতে আমি মূল গেটের সামনে। নসু হাসি হাসি মুখে বলল আবার আসার কথা, কত সুন্দর করেই না বলল, যেন নিজের কেউ। ছারে না আসলে কি আপনেও আসবেন না, আপা? আমরাও তো আপনাগোরই লোক। আসবেন, বেড়াইয়া যাইবেন যখন খুশি, কোনো অসুবিধা হইব না, সব আমরা কইরা দিমু রান্নাবাড়া যা লাগে, আপনে শুধু আসবেন। আমি ম্লান হাসলাম। মনে পড়ল বাবাকে নিমকিগুলো দেয়া হয়নি। একবার পিছনে তাকিয়ে বন্ধ দরজাটা দেখলাম দূরে, বন্ধ হয়ে যাওয়া দরজা, ইচ্ছা হলো না যাই। ব্যাগ খুলে প্যাকেটটা বের করে নসুর হাতে দিয়ে বেরিয়ে এলাম।