ঘটনা যেভাবে গল্প হয়ে ওঠে

অ+ অ-

 

ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়া ১১ বছর বয়সী কিশোরী আরাবি ইসলাম সুবার খোঁজ মিলেছে। সে নওগাঁর এক ছেলের সাথে পালিয়ে গিয়েছে।

তার ঘর ছেড়ে পালানো ও খোঁজ পাওয়ার পরে এ ঘটনাটাকে বহু ধরনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়।

বাবার দৃষ্টিকোণ থেকে: সন্তানরে লালন পালন করা কতো যে কষ্ট। হায় রে হায়! কতো কষ্ট কইরা মাইয়াডারে বড় করলাম। শেষমেশ হেয় আমারে এমন শরমের মধ্যে ফালাইলো। আল্লাহ আমারে মরণ দিলা না কেরে!

মায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে: অতোটুকুন মাইয়া, ভুলের কি বুঝে আর শুদ্ধর কি বুঝে?  আমার মাইয়ারে আমার কোলে আইনা দেও। ভুল শুদ্ধ কিচ্ছু বুঝি না।

আত্মীয়স্বজনের দৃষ্টিকোণ থেকে: দোষ কইলে বেকতেরেরই দোষ, মায়ের দোষ,বাপের দোষ, মাইয়ার দোষ, সমাজের দোষদোষের শেষ নাই। আর না হইলে কেউয়েরই দোষ নাই। সব কপালের ফের। কপালের দোষেই অতো বড় ঘটনা। না হইলে মাত্র মায়ের দুধ ছাড়ছে যে মাইয়া হে এই কাম করে কেমনে!

পাড়া প্রতিবেশীর দৃষ্টিকোণ থেকে: সময়ডা খারাপ, সাংঘাতিক খারাপ। কেমুন যে ডর লাগে, ডরে ঘুম আহে না! এই মাইয়ার বয়সী তো আমরারও পোলাপাইন আছে। কার পোলাপাইন যে কখন কী ঘটাইব কেডায় জানে!

পুলিশের দৃষ্টিকোণ থেকে: পুলিশের বিপদের শেষ নাই। কুত্তার লাহান দৌড়ানি লাগব আবার ব্যাখ্যাও করন লাগব। কথা কইলে সমস্যা, আবার না কইলেও সমস্যা। এই যে মাইয়ার বয়স এগারো, পোলাও নাবালক প্রায়, এই অবস্থায় এখন পুলিশ  আর কী করতে পারে! আপনারা গার্ডিয়ানরা যেইডা ভালা মনে করেন হেইডা করেন। আমরার কাজ আমরা করছি, মাইয়ার খোঁজ আছিল না খোঁজ আইনা দিছি। এর বেশি করতে গেলে চাকরি খুয়াইমু, সাংবাদিকরা আমরার বারোটা বাজাইয়া ছাড়ব।

সাংবাদিকের দৃষ্টিকোণ থেকে: সাংবাদিকের সামাজিক দায়িত্ব পালনের আরেকটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হল। প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর সংবাদ সবসময় গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার প্রয়োজন। মিডিয়া যদি সুবার ঘটনাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে প্রচার না করতো তাহলে পুলিশ এতো একটিভ হতো না, সুবাকেও হয়তো পাওয়া যেতো না। এই কারণে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া প্রয়োজন। আমাদের সরকারগুলো এই সহজ ব্যাপারটা বুঝতে চায় না। সবসময় সাংবাদিকের কলম ছিনতাই করতে চায়, কন্ঠ রোধ করতে চায়।

রাজনৈতিক নেতার দৃষ্টিকোণ থেকে: দেশটা কোথায় যে এসে পৌঁছেছে, ভাইরাল না হলে আইনের চোখে পড়ে না। এমন করে তো চলতে পারে না। সবার বুঝা উচিত যে, সঠিক রাজনীতি ছাড়া নাগরিকের সুস্থ স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এই যে এগারো বছরের মেয়ে হতাশা থেকে সাময়িক উত্তেজনার বশে বাপ মায়ের হাত ছেড়ে টিকটকারের হাত ধরে ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেল, বর্তমানের ঘুনে ধরা নষ্ট রাজনীতি তো ঠিক এই কাজটাই করে। মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে নষ্ট করে সাময়িক উত্তেজনার দিকে ঠেলে দেয়। এই বিকৃত রাজনীতি যতোদিন চলবে মানুষের সম্ভাবনা এভাবে অংকুরে বিনষ্ট হবে, নাগরিকের জীবনে স্বস্তি শান্তি নিরাপত্তা থাকবে না। নাগরিককে শান্তি আর নিরাপত্তা কে দেবে? প্রশাসন। প্রশাসন কে চালাবে? রাজনীতি। ফলে সঠিক রাজনীতির সন্ধান করাই আমাদের সবচে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সঠিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমাদের শিশু কিশোরের সুস্থ স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিকোণ থেকে: অর্থনীতি বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যাপার না। প্রতিটি হিউমেন রিলেশানে অর্থনীতির ভাল মন্দ পরিস্থিতি সুস্পষ্ট ভূমিকা পালন করে। এগারো বছরের যে মেয়েটা বাপ মায়ের ঘর ছেড়ে অন্যের হাত ধরে পালিয়ে যায় খোঁজ নিয়ে দেখেন সে পরিবারে অবশ্যই অর্থনৈতিক হতাশা বিরাজমান। শুনলাম মেয়েটার মা গুরুতর অসুস্থ, তার মায়ের চিকিৎসা করানোর জন্য তার বাবা প্রচণ্ড স্ট্রাগল করছেন। এরকম অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এ ধরনের অস্বাভাবিক ও  অদ্ভুত ঘটনা ঘটারইতো কথা। ফলে জীবনমানে বৈষম্যহীন অর্থনীতি ছাড়া নাগরিকের জীবনযাপন কোনোভাবেই নিরাপদ হতে পারে না।  

মনস্তত্ত্ববিদের দৃষ্টিকোণ থেকে: আমরা যদি এভাবে ভাবি মেয়েটির কিসের অভাব ছিল তাহলে বোধ হয় এই ঘটনার কারণটা বুঝতে পারব। কেন এতো অল্প বয়সে বাবা মাকে ছেড়ে একটা ছেলের সাথে পালাতে হল? একদিকে তো এগারো বছর বয়স একটা মেয়ের জীবনে হাইলি সেন্সিটিভ সময়। কোনো কোনো মেয়ের এর মধ্যেই পিরিয়ড শুরু হয়ে যায়, কারও আরেকটু দেরি হয়। প্রত্যেকের এ সময়ে বাইরের পৃথিবীর প্রতি একটা দুর্বার টান তৈরি হয়, একটা থ্রিলিং এক্সপেরিয়েন্স গেদার করতে চায়। এজন্য এমনকি বড় সড় রিস্ক নেয়ার জন্যও মন তৈরি হয়ে ওঠে। তার ওপর এখন ফেইসবুক ইউটিউবের যুগ। ধরেন ইউটিউবে একটা ড্রামা দেখে একটা কচি বয়সের ছেলে মেয়ে যদি সেটা তার জীবনে প্রয়োগ করে ফেলে তখন তাকে আপনি কি দোষ দেবেন? তাছাড়া বাংলাদেশের পরিবারগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশু কিশোরদেরকে স্বস্তিদায়ক পরিবেশ দিতে পারে না। এমনও তো হতে পারে মেয়েটি নানান অস্বস্তি আর চাপ থেকে মুক্ত হতেই পালিয়ে গিয়েছিল। আবার এটা যদি প্রেম হয়, শুধু প্রেম, হতেও পারে, হ্যা এগারো বছরেও এটা স্রেফ প্রেম হতে পারে, যদি হয় তখন বাল্য বিবাহ আইন যেমন একটা বড়সড় প্রশ্ন হয়ে ওঠে তেমনি ছেলেমেয়েদের মনোদৈহিক ব্যাপারগুলো নিয়ে নতুন গবেষণা বিবেচনার প্রশ্নও আসবে। মানে এ ধরনের ঘটনায় ব্যক্তি সমাজ আইন এমন জটিলভাবে জড়িয়ে থাকে যে অনেক কিছুই নতুন করে ভাবতে হয়।   

কবির দৃষ্টিকোণ থেকে:
অতটুকু চায়নি বালিকা!
অত শোভা, অত স্বাধীনতা!
চেয়েছিল আরো কিছু কম,
আয়নার দাঁড়ে দেহ মেলে দিয়ে
বসে থাকা সবটা দুপুর, চেয়েছিল
মা বকুক, বাবা তার বেদনা দেখুক!
অতটুকু চায়নি বালিকা!
অত হৈ রৈ লোক, অত ভীড়, অত সমাগম!
চেয়েছিল আরো কিছু কম!
একটি জলের খনি
তাকে দিক তৃষ্ণা এখনি, চেয়েছিল
একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!

নিঃসঙ্গতা: আবুল হাসান

প্রেমিকের দৃষ্টিকোণ থেকে: সে আমাকে ভালোবাসে তাই আমি তাকে ভালোবাসি। আমি কইলাম, লও ঘুরতে যাই, হে কইলো আইচ্ছা চল। আর কিচ্ছু জানি না। আপনাগোর বাকি কথার জবাব দিতে পারুম না আমি, এইসব জটিল জটিল কথা আপনারাই বুঝতে থাকেন, আমারে জিগায়েন না।

সুবার দৃষ্টিকোণ থেকে: আমার কী হইছে জানি না, কিচ্ছু ভাল্লাগে না, কিচ্ছু না

এভাবে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটাকে দেখলে বা বিচার করলে অনুরূপ ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা যে বাড়ে কিংবা কমে সে কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কেননা যে কোনো বিশেষ ঘটনা ঘটার সময় তার কারণগুলো অতিক্রান্ত হয় অথবা কারণগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে পড়ে। ঘটনা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার পরে সে ঘটনার পিছনে আবার কারণগুলো ধীরে ধীরে জড়ো হতে থাকে। মোহাম্মদপুরের এগারো বছর বয়সী কিশোরী আরাবি ইসলাম সুবার ঘটনাটাকে যদি আমরা বিশেষ ঘটনা মনে করি, টেলিভিশন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারের কারণে যেহেতু বিশেষ মনে না করার সুযোগ নাই, তাহলে বুঝতে পারব যে এই ঘটনার প্রকৃতপক্ষে কোনো কারণ নাই। এই ঘটনা কারণ কিংবা যুক্তিকে অতিক্রম করে গিয়েছে অথবা বহু বহু মানুষের কথাবার্তায় ও বিশ্লেষণে এখন এতো এতো কারণ আছে বলে মনে হচ্ছে যে কোনো কারণকেই নির্দিষ্ট করা যাচ্ছে না। ফলে এ ঘটনার সাথে কিছু মিল অমিল সহ এ ধরনের আরও আরও ঘটনা সুবার মতো কিশোর-কিশোরীদের জীবনে ঘটে থাকতে পারে। এখন, এইটুকু বলা যায় যে টেলিভিশন ও সোশাল মিডিয়া একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে যেভাবে সবকিছু ভুলে যায় সেভাবে সুবার ঘটনাকেও ভুলে যাবে। তারপর এ ঘটনা হয়তো এক আতংকের গল্প আকারে সুবার পরিবার ও আত্মীয় স্বজনের মুখে চুপিসারে বর্ণিত হবে এবং তারও পরে আরও কিছু কাল গেলে সময় যে অচেতনতা নির্মাণ করে সে অচেতনতার বশে সবাই তা নিশ্চিত ভুলে যাবে। কিন্তু  তারা যা ভুলতে পারবেন না তা হল ঘটনা ও গল্পের পার্থক্য। ঘটনা কিভাবে গল্প হয়ে ওঠে তা একবার জানা হয়ে গেলে আর কখনোই ভুলা যায় না, তখন ঘটনা ও গল্পের জটিল বিন্যাস মস্তিষ্কের লক্ষ কোটি নিউরণের অব্যক্ত অভিসন্ধিতে মিশে যায় আর তা সময়ে সময়ে প্রকাশিত হয় কালো কৌতুকের নিয়মে।