মৃত মানুষের শহরে
রাত নামলে শহরটা যেন অন্য এক শহর হয়ে ওঠে। দিনের কোলাহল, মানুষের ভিড়, গাড়ির হর্ন—সব কিছু আস্তে আস্তে সরে গিয়ে হাসপাতালের পেছনের ডোমঘরটাকে আরও স্পষ্ট, আরও নগ্ন করে তোলে। সাদা টিউবলাইটের নিচে তখন কেবল লোহার ট্রলি, ফরমালিনের তীক্ষ্ণ গন্ধ, পুরোনো দেয়ালের স্যাঁতসেঁতে দাগ, আর নিথর শরীরের এক নিঃশব্দ সারি, যেন সময় নিজেই এখানে এসে থেমে গেছে।
সেই ঘরেই কাজ করত মায়া।
মায়ার বয়স তখন ছাব্বিশ। খুব সুন্দরী নয়, আবার অসুন্দরও নয়। তার চোখ দুটি ছিল অদ্ভুত রকম শান্ত—যেন বহুদিন ধরে সে কোনো গভীর, স্থির জলের দিকে তাকিয়ে আছে, যে জলে কোনো ঢেউ ওঠে না। গ্রামের বাড়িতে বৃদ্ধ মা আর ছোট ভাইকে রেখে সে শহরে এসেছিল। বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের সমস্ত ভার এসে পড়েছিল তার একার কাঁধে। প্রথমে হাসপাতালে আয়ার কাজ খুঁজেছিল। পায়নি। শেষে ডোমঘরে মৃতদেহ গোছানো, কাপড় বদলানো আর পরিচয় শনাক্তে সহায়তা করার চাকরিটাই নিতে হয়েছিল তাকে।
প্রথম দিন যখন মৃতঘরে ঢুকতে হয়েছিল, বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল তার।
লোহার টেবিলের ওপর শুয়ে ছিলেন একজন বৃদ্ধ। চোখ বন্ধ, ঠোঁট সামান্য ফাঁক—যেন মানুষটি সত্যিই ঘুমিয়ে আছেন, একটু পরেই জেগে উঠবেন! মায়া অনেকক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিল, ভেতরে ঢোকার সাহস জোগাড় করতে।
পাশের বৃদ্ধ ডোম বলেছিল—‘ভয় পাস না মা। এরা আর কাউরে কিছু করতে পারে না।’
মায়া সেদিন বুঝেছিল, জীবিত মানুষকে যতটা ভয় পায় মানুষ, মৃত মানুষকে বোধ হয় তার চেয়েও বেশি ভয় পায়। অথচ মৃতদের কোনো দাবি নেই, কোনো অভিযোগ নেই। তারা কেবল পড়ে থাকে—মানুষের সমস্ত ব্যস্ততা, সমস্ত ছোটাছুটির শেষে একটি নীরব, অপরিবর্তনীয় বাক্যের মতো।
কয়েক মাসের মধ্যেই মায়া অভ্যস্ত হয়ে উঠল।
একদিন এল সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া এক তরুণ। বয়সে মায়ার কাছাকাছি। মুখের একপাশ থেঁতলে গিয়েছিল। পকেট থেকে পাওয়া গেল একটি বাসের টিকিট আর ভাঁজ করা এক টুকরো কাগজ। তাতে লেখা—‘আজ ফিরতে একটু দেরি হবে। অপেক্ষা কোরো।’
মায়া লাইনটা পড়ল, আর কথাটা যেন তার নিজের বুকের ভেতর গিয়ে বাজল।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে মাকে ফোন করেছিল—‘মা, তুমি ঘুমাইছ?’
—‘না রে। তুই খাইছিস?’
—‘হ্যাঁ।’
মায়া মিথ্যা বলেছিল। সে খায়নি। গলার কাছে কী একটা যেন দলা পাকিয়ে বসেছিল, নামছিল না কিছুতেই।
পরদিন আবার ডোমঘর। আবার লাশ। আবার ফরমালিনের গন্ধ। আবার কারও শেষ মুখ। দিনগুলো একে অন্যের গায়ে লেপ্টে যেতে লাগল—শিশু, বৃদ্ধ, নারী, যুবক; দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, অজ্ঞাতপরিচয়। কখনো এমন লাশও আসত, যার পরিচয় নিতে কেউ আসত না। কয়েকদিন পর সেই মুখটাও থেকে যেত মায়ার মনে, কোনো কারণ ছাড়াই, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই!
মৃত মানুষের মুখগুলো যেন তার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেছিল। প্রথমে খুব ক্ষীণ স্বরে, প্রায় শোনাই যেত না।
রাতে বিছানায় শুয়ে চোখ বুজলেই একটা মুখ ভেসে উঠত। তারপর আরেকটা। তারপর আরও অনেক, একের পর এক, যেন কোনো নিঃশব্দ মিছিল। কেউ কিছু বলত না। শুধু তাকিয়ে থাকত।
মায়া ঘুম ভেঙে উঠে পানি খেত। জানালা খুলে অনেকক্ষণ বসে থাকত অন্ধকারের দিকে চেয়ে। নিজেকে বোঝাত—সবই তার মনের ভুল, ক্লান্তির খেলা।
কিন্তু ভুলগুলো দিন দিন আরও স্পষ্ট, আরও জীবন্ত হয়ে উঠতে লাগল।
এক রাতে ডোমঘরে এল এক অজ্ঞাত নারীর লাশ। বয়স ত্রিশের বেশি নয়। গলায় দাগ, চুল এলোমেলো। মায়া যখন সেই চুল গুছিয়ে দিচ্ছিল, হঠাৎ তার মনে হলো, মৃত নারীটি চোখ মেলে তাকাল তার দিকে।
মায়া চমকে সরে গেল।
চোখ বন্ধই ছিল। নিশ্চুপ। সে নিজেকে বোঝাল—আলো-ছায়ার খেলা, আর কিছু নয়।
কিন্তু তারপর থেকে প্রতিটি লাশের বন্ধ চোখই যেন তাকে অনুসরণ করতে লাগল, দেয়ালের ওপাশ থেকে, ট্রলির নিচ থেকে। সে মৃতদের চোখ বন্ধ করে দিতে ভয় পেতে শুরু করল। মনে হতো, চোখ বুজিয়ে দিলেই তারা অন্ধকারের ভেতর তাকে খুঁজতে বেরোবে।
মায়া রাতে ঘুমাতে পারত না।
একদিন ভোরে মা ফোন করে বলল—‘তোর গলা এমন কাঁপতেছে কেন?’
মায়া বলল—‘কিছু না, মা।’
—‘তুই ঠিক আছিস তো?’
অনেকক্ষণ চুপ থেকে মায়া বলল—‘মা, মানুষ মরলে কোথায় যায়?’
ওপাশে মা নীরব হয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল—‘আল্লাহর কাছে যায়।’
মায়া জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল, অন্ধকারের দিকে।
—‘তাহলে যারা আমাকে দেখে, তারা কোথায়?’
মায়ের কণ্ঠ হঠাৎ কেঁপে উঠল—‘তুই কী বলছিস রে?’
মায়া আর কিছু বলেনি।
তারপর থেকে সে মৃতদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। প্রথমে মনে মনে। পরে আস্তে আস্তে মুখে, ফিসফিস করে, যেন কেউ শুনে না ফেলে।
—‘তোমার বাড়ি কোথায়?’
—‘তোমার মা আছে?’
—‘তুমি কি কারও জন্য অপেক্ষা করছিলে?’
—‘তোমাকে কেউ নিতে আসবে তো?’
সহকর্মীরা হাসত। কেউ বলত, মেয়েটার মাথা গেছে। কেউ বলত, এতদিন এই কাজ করলে এমন তো হবেই। কিন্তু কেউ দেখত না মায়ার চোখের নিচের সেই গাঢ় কালো দাগ। কেউ দেখত না, দুপুরবেলা খাবার সামনে নিয়ে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিশ্চল বসে থাকে। কেউ জানত না, রাতের বেলা সে নিজের ঘরের দরজা ফাঁক করে দেখে নেয়—বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে কি না।
এক বর্ষার রাতে এল এক অজ্ঞাত তরুণীর লাশ। মুখটা প্রায় অক্ষত। মায়া তাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। মেয়েটির চোখ বন্ধ, ঠোঁট সামান্য বাঁকা যেন কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেছে চিরকালের মতো। মায়ার বুকের ভেতর হঠাৎ অচেনা একটা শব্দ হলো, ভাঙা কাচের মতো।
সে মেয়েটির কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল—‘তুমি আমার মতো দেখতে।’
আসলে মেয়েটি তার মতো দেখতে ছিল না। কিন্তু সেদিন মায়ার কাছে মনে হয়েছিল, মৃত মেয়েটির মুখই যেন তার নিজের মুখ। তার নিজের ভবিষ্যৎ। তার নিজের শেষ পরিণতি, আগেভাগেই লেখা হয়ে গেছে যেন কোনো এক লোহার টেবিলে।
সেই রাতেই প্রথমবার মায়া চিৎকার করে উঠেছিল—‘চোখ খুলো না!’
সবাই ছুটে এল। কিন্তু তখন সে মেঝেতে বসে কাঁপছিল, দুই হাতে নিজেকে জড়িয়ে।
তারপর থেকে মায়া আর স্বাভাবিক রইল না। সে মাঝরাতে হাসপাতালের করিডোরে হাঁটত, খালি পায়ে, নিঃশব্দে। কখনো মর্গের দরজার সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকত। কখনো ফিসফিস করে কারও সঙ্গে কথা বলত, যাকে আর কেউ দেখতে পেত না।
একদিন তাকে দেখা গেল তিনটি খালি ট্রলির সামনে দাঁড়িয়ে বলছে—‘তোমাদের মধ্যে কে আগে এসেছিল?’
কেউ উত্তর দেয়নি। মায়া হেসে ফেলল—‘ঠিক আছে। তোমরা বলতে চাও না।’
তারপর সে হঠাৎ কেঁদে ফেলল, নিঃশব্দে, কাঁধ কাঁপিয়ে।
তার মা শহরে এসে মেয়েকে নিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু মায়া যেতে রাজি হলো না।
—‘আমি গেলে ওরা একা হয়ে যাবে।’
মা জিজ্ঞেস করল—‘কারা?’
মায়া হাসপাতালের অন্ধকার করিডোরের দিকে তাকিয়ে বলল—‘ওরা।’
মা কিছু দেখতে পেল না। শুধু দেখল, তার মেয়ের চোখের ভেতর জমে আছে এক গভীর, নিঃসঙ্গ ভয়।
মায়াকে কয়েকদিনের জন্য বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। গ্রামের বাড়িতে ফিরে প্রথম রাতে সে গভীর ঘুমে ডুবে গেল, যেন শহর তাকে এতদিন ঘুমোতেই দেয়নি।
ভোরে মা দেখল, মায়া বিছানার পাশে চুপচাপ বসে আছে। জানালার বাইরে তাকিয়ে সে মৃদু হাসছে—‘মা, দেখো।’
—‘কী?’
—‘ওরা চলে যাচ্ছে।’
মা জানালার বাইরে তাকাল। কুয়াশার মধ্যে শুধু একঝাঁক বাঁশঝাড়। আর কিছু নেই।
মায়া আস্তে করে বলল—‘আজ কেউ আমাকে ডাকেনি।’
তারপর তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। অনেকদিন পর সে সত্যিকারের কাঁদল, গোপন কোনো বাঁধ যেন ভেঙে গেল একসঙ্গে।
সেদিন মায়া বুঝতে পারল—সে মৃতদের ভয় পায় না। সে ভয় পায় জীবিতদের। কারণ জীবিতরা চলে যেতে পারে, দূরে সরে যেতে পারে, ভুলে যেতে পারে। মৃতরা পারে না। মৃতরা শুধু অপেক্ষা করে। অন্তত তার মনে তাই মনে হতো, বারবার, একই কথার মতো।
কয়েক মাস চিকিৎসার পর মায়ার অবস্থা কিছুটা ভালো হলো। সে আর ডোমঘরে ফিরল না। একটা ছোট্ট ফুলের দোকানে কাজ নিল।
প্রথম দিন দোকানে বসে সে অনেকক্ষণ গোলাপের দিকে তাকিয়ে ছিল—লাল পাপড়ি, নরম গন্ধ, জীবনের এক উষ্ণ, স্পন্দিত শ্বাস, যা তার অনেকদিনের চেনা-জগতে ছিল না।
একজন ক্রেতা এসে বলল—‘আপা, একটা সাদা ফুল দেবেন?’
মায়ার হাত কেঁপে উঠল। সাদা ফুল। তার মনে হলো, দূরে কোথাও একটা লোহার দরজা ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। সে চোখ বুজল। কিছুক্ষণ পর আবার চোখ খুলল।
তার সামনে কোনো মৃতদেহ নেই। শুধু একগুচ্ছ সাদা ফুল, নিরীহ, নিষ্পাপ, রোদের আলোয় ভেজা।
মায়া ফুলগুলো তুলে দিল ক্রেতার হাতে—‘নিন।’
ক্রেতা চলে গেল। মায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
জীবন তাকে পুরোপুরি ফিরিয়ে দেয়নি। মৃতদের ঘর তার ভেতরে একটা দরজা খুলে রেখে গিয়েছিল, যে দরজা বোধ হয় আর কোনোদিন সম্পূর্ণ বন্ধ হবে না। তবু সে বাঁচতে শিখছিল, প্রতিদিন একটু একটু করে, ভাঙা কাচের ওপর দিয়ে হাঁটার মতো সাবধানে।
কারণ মানুষ কখনো কখনো মৃত্যুকে সম্পূর্ণ ভুলতে পারে না, কিন্তু তার পরেও বেঁচে থাকার একটা অর্থ খুঁজে নিতে শেখে। মায়াও খুঁজছিল—একটা ফুলের গন্ধে, মায়ের ডাকে, সকালের নরম রোদে, আর সেই সমস্ত মুখের বিপরীতে, যারা একদিন তার চোখের ভেতর নিঃশব্দে বাসা বেঁধেছিল।
তাদের কেউ আর তাকে ডাকত না।
তবু গভীর রাতে, হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে, মায়া কখনো কখনো ফিসফিস করে বলত—‘তোমাদের জন্য আমি বেঁচে আছি।’
তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে সে অপেক্ষা করত ভোরের। ভোর এলে মৃতদের মুখগুলো ধীরে ধীরে মুছে যেত কুয়াশার মতো। আর পৃথিবী আবার ফিরে যেত জীবিত মানুষের হাতে, রোদ আর শব্দ আর নিঃশ্বাসের ভেতর, যেখানে মায়া প্রতিদিন সকালে নতুন করে বেঁচে থাকার একটা কারণ খুঁজে নিত।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন