আজব ভিক্ষা
একদিন সুন্দর বিকালে, বটতলার আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে বেজে উঠলো রাজঢাক! ঘোষকের গমগমে গলার স্বর প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরতে লাগলো চারিদিক। কানপাতলো সবাই, শুনতে উদগ্রীব।
‘মহান বাদশাহ অধিপতি রাজ ভাণ্ডার খুলে দেবেন। দূর হবে অভাব দুঃখীর। সকল অভাবী ভিখারি তাই পাবে, যা তাদের প্রয়োজন!’
খুব কম মানুষই খুশি হলো এই কথা শুনে। রাজ্যের বাদশাহ ছিলেন দয়ালু। সকলের মঙ্গলের খেয়াল তিনি এমনিতেই রাখতেন। তবুও টুকটাক কিছু অভাব তো সবারই থাকে। কিন্তু বাদশাহর ঘোষক বলেছে, ‘অভাবী ভিখারি তাই পাবে, যা তাদের প্রয়োজন!’
রাজ্যের সব লোক তো আর ভিখারি নয়। আছে কিছু, হাতে গুনা দুই-চার জন। তারাও মন্দির-মসজিদ দরজায় কিংবা বাজারে হাত পেতে যা পায় তাতে দিন অনায়াসে চলে যায়। এখন রাজার দান পেয়ে যদি আর অভাবই না থাকে তবে তো কারো কাছে কিছু চাওয়াই হবে দায়! অতশত ভেবে কেউই মন থেকে খুব খুশি হতে পারছিল না! যা চায়, দিবে তাই? যাদের সত্যই অভাব ও প্রয়োজন তারাও ছিলো দুশ্চিন্তায়। সত্যি দিবে নাকি দেওয়ার পর আবার কোন শর্ত জুড়ে দিবে? যার যার যেমন মন, তারা ভাবছিলো তেমন।
কৃষক ভাবে, খেটে যা পাই তা থেকেই তো আমিই রাজার খাজনা মেটাই। শাকাহারী পণ্ডিত ভাবে, অভাব আমার কিছু আছে তবে হাত পাতবো কিভাবে ভিখারির মত? ভিখারি ভাবে, একবার রাজার দান নেওয়ার পর যদি কর্ম করে খেতে হয়? মহা মুশকিল! এত বড় ঘোষণা হলো তবুও কোথাও নাই খুশির আমেজ। তবে কি রাজার ঘোষণায় সত্যিই কেউ খুশি নয়? সামান্য খুশি হয়েছিলো কেউ কেউ। তবে দারুণ খুশি হয়েছিলো একজন। প্রচণ্ড খুশি। তিন কুলে তার নাই কেউ। জন্ম ভিখারি। হাত পেতে ভিক্ষা করে বলে ভিক্ষাও পায়ও কম। আর দেখতেও চেহারায় নাই মায়া-মায়া ভাব, কণ্ঠও কর্কশ তাই সুর তুলে ভিক্ষাও চাইতে পারে না। মানে এক কথায় ভিখারি জাতের সবচেয়ে অধম সে। দারিদ্র্য যেন তারে করুণা করে। শুধু সেই অধম ভিখারি হলো খুশি।
‘যাক বাবা এইবার তবে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইলো বলে।’ মনের আনন্দ প্রকাশ করে সেই অধম ভিখারি। গঞ্জের বাজারে বসে ঘোষণা শুনে বেশ উৎসাহ পায় সে।
‘আরে বাবা! রঙ দেখো। বাজারের এত মানুষের ভিড়ে যে সারা দিনে মাত্র দুই পাই পয়সা ভিক্ষা পায় তার কত খোয়াব’। বলে পাশেই বসা এক ল্যাংড়া ভর্ৎসনা করে অধম ভিক্ষুককে।
‘কালে কালে কত খেল দেখবো। বামুনের শখ হয়েচে আকাশ ছুঁবে। হুহ’। বলে অধমকে নিরুৎসাহিত করে পাশে বসা অন্ধ ভিখারিনী। তারা তিনজনে এক সাথে বসে ভিক্ষা চাইছিলো। ল্যাংড়া ভিক্ষুক আর অন্ধ ভিখারিনী যথেষ্ট ভিক্ষা পেলেও অধম তাদের তুলনায় কিছুই পায় নাই, এবং রোজই এমন কমই সে পেয়ে থাকে। কোনদিন অধমকে কেউ অবশ্য অভিযোগ করতেও দেখে নাই।
জনম ভিখারি যে জন, সে কোন কাজ শেখার সুযোগ পায় নাই। ভালোবেসে কেউ ডেকে নেয় নাই কোনদিন। জন্ম থেকে পথে বড় হয়েছে একা একা, হাত পেতে খেয়েছে। এখনো তাই করে। অন্ধ, ল্যাংড়া ভিখারিরা লোকের সহানুভূতি পায়। যার সব থেকেও কিছু নাই সে যে লোকের সহানুভূতিটুকুও পায় না!
বেলা ডুবে গেলে হাট ভেঙ্গে যায়। সবাই বাড়ির পথ ধরে। এমন কি ভিক্ষুকেরাও। শুধু থেকে যায় অধম। হাটের থেকে কেনা দুই মুঠো চিড়া আর সামান্য গুড় কিনে তাই চিবিয়ে পেট ভরে পানি গিলে বটমূলেই শুয়ে পড়ে। তার যাবার না আছে ঘর, না অন্য কোন ঠাঁই। না কেউ আছে তার অপেক্ষায়! বটমূলে শুয়ে মনে মনে ভাবে, যে যত কথাই বলুক না কেন সে যাবে বাদশাহর দরবারে আর বাদশাহকে বলবে তার অভাবের কথা। এক শূন্য জীবনের কথা। কিন্তু সত্যই কি বাদশাহ এক ভিখারির আরজি শুনবে? বিশ্বাস হতে চায় না আবার ঘোষকের গমগমে কণ্ঠও কানে বাজে। মনের দ্বিধা কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়— গিয়ে দেখাই যাক না কী হয়? লাভ ছাড়া ক্ষতি তো নাই। গিয়ে বাদশাহকে বলবে অভাবের কথা আর চাইবে এমন কিছু যাতে অভাব মুছে চিরতরে! কিন্তু কী চাইবে? হীরে জহরত? তা রাখবে কোথায়? যদি লুট হয়ে যায়! না না। তবে কি শুধু স্বর্ণমুদ্রা? কিন্তু তা যদি চুরি হয়ে যায়? না না। তবে কি চাওয়া যায়! ভাবতে ভাবতে এক সময় কোন সিদ্ধান্ত নিতে না পেরেই অধম ভিখারি ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমের মধ্যে এলোমেলো স্বপ্ন দেখে। ছটফট করে নিজের অজান্তে।
পাখির কিচিরমিচির আর লোকের কণ্ঠ শুনে ঘুম ভাঙ্গে ভোরের দিকে। দেখে দুইজন লোক নিজেদের মাঝে তর্ক করতে করতে যাচ্ছে কোথাও। অধম কান পাতে। শুনতে পায় লোক দুইটা বাদশাহর কাছে কী চাইলে ভালো হবে তাই নিয়ে তর্ক করছে। অধম ভাবলো যাক ভালোই হলো। তারা কী সিদ্ধান্ত নেয় তা শুনে আমিও বাদশাহর কাছে কিছু চাইবো। কিন্তু স্পষ্ট করে তাদের কথা বুঝতে পারে না। পিছু ডাকে তাদের।
‘ও ভাইয়েরা দাঁড়ান। আমারেও নিয়া যান। আমিও যে এক ভিখারি।’ বলে পিছু ডেকে সেও লোকগুলোর দিকে এগিয়ে যায়।
‘ও! তুমিও যাবে? বেশ তো চলো না। তা তুমি কি চাইবে?’ দুইজনের মধ্যে বয়স্ক লোকটা জানতে চায়।
‘চিন্তা করে তো কিছু মাথায় আসে না। মুরুব্বি, কি চাইবো কন তো?’ বলে পরামর্শ চায় অধম।
‘হা হা হা। এ তো দেখি ভিখারিরও অধম।’ বলে তিরস্কার করে অন্যজন। জবাবে অধম ভিখারি কিছু বলে না।
‘দেখো আমরা খালি পুটলা, বাসন, থালা সব নিয়ে নিছি। বাদশাহরে বলবো আমার থলিতে চাল ডাল, বাসনে মোহর আর থলেতে স্বর্ণমুদ্রা ভরে দেন।’ বলে মুরুব্বি ভিখারি তার আয়োজন দেখায়।
‘আমি বলি কি সব থলে বাসনে হীরা-জহরত চেয়ে আনলে হয় না?’ বলে প্রতিবাদ করে অন্য ভিখারি।
‘আরে বাদশাহর লোক কি আর চালের থলিতে হীরা দিবে? তারা কি তোর মত ভিখারি?’ বলে প্রতিবাদ জানায় মুরুব্বি ভিক্ষুক। দম নিয়ে যোগ করে, ‘আর এক থালা স্বর্ণমুদ্রা পেয়ে গেলে পরে বাকি জীবন তো জমিদারী হালে কেটে যাবে। একটা চালের বস্তা নিলাম যেন জমিদারী কেনার আগে কয়দিন খেয়ে বেঁচে থাকা যায়।’ এই কথার পর আর কথা চলে না।
‘তা তুমি কিসে করে ভিক্ষা আনবা? থালা বাটি কই?’ জানতে চায় অন্যজন।
‘আমার তো কিছুই নাই। বাদশাহ যা দেন দুই হাত ভরে নিবো।’ পথ চলতে চলতে উত্তর দেয় অধম ভিখারি।
‘হাহাহাহা। এমন বেকুব লোক আগে আমি দেখি নাই। তুমি দেখেছো কাকু?’ বলে হেসে লুটিয়ে পরে অন্য ভিখারি।
‘আল্লাহর দুনিয়ায় এমন বালাও আছে?’ বলে মুরুব্বিও হেসে গড়ায়। অধম কিছুই বলে না। তার বলারই কিছু নাই।
‘এই নাও।’ বলে একটা তলা ছাড়া ঝুড়ি অধমের হাতে তুলে দিয়ে অন্য ভিখারিটা বলে, ‘আমার এই ঝুড়ি তো কোন কাজে আসবে না, এটা দিয়েই তুমি ভিক্ষা এনো।’ বলে দুইজনে আবার কিছুক্ষণ হেসে গড়ায়। অধম ভিখারি তাদের তাচ্ছিল্য গায়ে মাখে না। তলাবিহীন ঝুড়িটা হাত বাড়িয়ে নেয় সে।
‘চল চল। দেরী করা চলবে না। বাদশাহর লোকেরা কি ফকিরের জন্য বসে থাকবে? ফুর্তি ছেড়ে এবার পা চালা।’ মুরুব্বি তাড়া দেয়। আর কোন কথা না বলে পা চালিয়ে তিনজনে দ্রুত হাঁটতে থাকে। অধম নিজের জন্য কী চাইবে না জেনেই, তলাবিহীন একটা অকেজো ঝুড়ি নিয়ে হেঁটে যায় বাদশাহর দরবারের দিকে।
তারা রাজপ্রাসাদের সদর দরজায় পৌঁছালে প্রহরী জানতে চায়, ‘কারা তোমরা? কি চাও?’
‘ঘোষকের রাজ ঘোষণা শুনে এসেছি। আমরা তিনজনেই ভিখারি।’ জবাব দেয় মুরুব্বি ভিখারি।
অবশেষে কেউ এলো তবে। আমরা তো ভাবছিলাম রাজ্যের ভিখারি সব উবে গেছে। চলো আমার সাথে।’— বলে প্রহরী পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় প্রাসাদের অন্দরে। চাকচিক্য-পরিচ্ছন্ন প্রাসাদের ভিতরে নিজেরে বড় বেমানান লাগে তাদের। পা এগুতে চায় না। গলা শুকিয়ে আসে। না জানি বাদশাহর লোকেরা কী বলে! সুরম্য প্রাসাদের চারপাশ দেখে পালিয়ে যেতে মন চায় তাদের।
‘এখানে বলো কী চাও।’ বলে প্রহরী এক জায়গায় তাদের রেখে চলে যায়। সেখানে রাজকীয় পোশাক পরিহিত সুদর্শন এক লোক। রাজকীয় তার বসন। চেহারায় আছে রাজ আভা। তবে কিসের অভাবে যেন বোঝা যাচ্ছে সে বাদশাহ নয়।
‘কার কী চাই বলো।’ বলে সুদর্শন লোকটা জানতে চায়।
‘আজ্ঞে হুজুর… আপনার কাছে আমার চাওয়া—বস্তায় খাবার, থালায় হীরা আর থলেতে স্বর্ণমুদ্রা চাই হুজুর।’ বলে মুরুব্বি নিজের থালা, বস্তা বাড়িয়ে দেয়।
সুদর্শন লোকটা মাথা নাড়ে।
‘চাওয়া মত সবই পাবে তবে....।’
‘তবে.... ’ প্রতিধ্বনিত হয় ভিখারিদের কন্ঠে।
‘তবে বাদশাহর কাছ থেকে পাওয়া দান যদি চুরি হয় বা লুট হয় মানে রাজ সম্পদ যদি সঠিক ব্যবহার না করতে পারো বা যদি আগলে রাখতে ন পারো তবে কিন্তু কঠিন শাস্তি।’— হুশিয়ার করে দেন রাজকর্মচারী।
‘শাস্তি?’ ফের কথার প্রতিধ্বনি হয় বাকি তিনজনের কণ্ঠে।
‘হু শাস্তি। বিনাশ্রমে যা চাও নিবে আর তা রক্ষা করবে না, এ কেমন অযৌক্তিক কথা?’ ঝাঁঝালো কণ্ঠে জানিয়ে দেন সুদর্শন রাজকর্মচারী।
‘আমার কিছু চাই নে হুজুর। বয়স হয়েছে। কে চড় মেরে সব নিয়ে নিবে। আমার কিছু চাই না, তবে অনেকটা হেঁটে এসেছি যদি দয়া করে এই বেলা পেটপুরে খেতে পাই তাতেই অনেক।’ বলে মুরুব্বি নিজের আগের চাওয়া বদলে নতুন চাওয়া জানায়।
‘আমারো কিছু চাইনে। একটু খাবার হলেই লাখো শুকরিয়া।’ শর্ত শুনে অন্যজনও নিজের চাওয়া বদলায়।
‘হুম ঠিক আছে। খাবার পাবে। বাদশাহ কাউকে অভুক্ত ফেরাবেন না। আর এই যে! তুমি চুপ করে আছো কেন? আর হাতে এই তলাবিহীন ঝুড়ি কেন? এতে কী হবে?’ সুদর্শন লোকটা এবার অধম ভিখারির দিকে কৌতুহলে নজর দেয়। কিছুক্ষণ ভেবে বলতে শুরু করে অধম ভিখারি।
‘আসলে আমি জন্ম ভিখারি। পথেই জন্ম। ধুলায় বাস। নিজের বলতে কিছুই নাই। দুঃখী জীবনের শেষ হবে, এই চাওয়া থেকেই বাদশাহ হুজুরের দরবারে আসা। আর এই তলাবিহীন বেকার ঝুড়িটাও অন্যের কৃপায় পাওয়া। এতে কি হবে তা নিজেই জানি না হুজুর।’ বলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে অধম।
‘এমন অধম তো জীবনেও দেখি নাই। তাজ্জব ব্যপার। আচ্ছা এখন বলো বাকি দুইজনের মত খাবার চাও নাকি অন্য কিছু?’ সুদর্শন লোকটা অধমের চাওয়া জানতে চায়।
‘নির্ভয়ে বলবো হুজুর?’ অধম জানতে চায়।
‘নির্ভয়েই বলো। শুধু শর্ত মনে রেখো।’
‘হুজুর। আমার তো কিছুই নেই। কিছু দিলে রাখবো কোথাও এমন পাত্রও নাই। হীরা বেঁচে জমিদারী কিনবো এমন খোয়াবও নাই। এ যেন নাইয়ের মধ্যেই কিছু নাই! এক কথা বলি কি, শর্তও রক্ষা হবে আবার আমার অভাবও যাবে এমন একটা জিনিসই আমি চাই।’ বলে অধম নিজের চাওয়া জানায়।
‘আরে সে তো খুব ভালো কথা কিন্তু সেই জিনিসটা কী?’ জানতে চান রাজকর্মচারী।
‘আজ্ঞে জি হুজুর মানে সেটা অমূল্য জিনিস। খুব সম্মানিত এবং নিজেরই আছে রক্ষার ক্ষমতা।’ বলে আবার হেয়ালী করে অধম।
‘তা বুঝলাম, কিন্তু কোন নাম পরিচয় নাই কি সেই জিনিসের?’ রাজকর্মচারী এবার অধৈর্য হন।
‘আপনি জ্ঞানী লোক। বুঝতে পারছেন না হুজুর কি হতে পারে সেই জিনিস?’ হেয়ালী জারি রাখে অধম।
‘না। স্পষ্ট করে বলো, না হয় ভাগো।’ ধমকে ওঠে রাজকর্মচারী। এক অধম ভিখারির হেয়ালী সইবার লোক নন তিনি।
‘আজ্ঞে বাদশাহ।’ বলে অধম।
‘হ্যা, কি হয়েছে বাদশাহর?’ জানতে চায় সুদর্শন রাজকর্মচারী।
‘মানে বাদশাহ।’ আবার বলে অধম। তার দৃষ্টি নত কিন্তু স্থির।
‘আরে কি বাদশাহ-বাদশাহ করছো। মাথা খারাপ নাকি তোমার? কি চাও তা বলে বিদায় হও।’ সুদর্শন লোকটা তখনো অধমের কথার মাথামুণ্ডু বুঝতে পারে নাই।
‘আমার চাওয়া তো পষ্ট বললাম হুজুর।’ বলে অধম।
‘মানে?’ সরু চোখে সতর্ক চাউনিতে তাকায় এবার সুদর্শন লোকটা।
‘জ্বে হুজুর। আমি বাদশাহর ভাণ্ডার থেকে বাদশাহরেই ভিক্ষায় চাইছি হুজুর। আমাকে বলা হয়েছে যা চাই তাই পাবো, শুধু রক্ষা করা লাগবে। আমি বলেছি অমূল্য ও ক্ষমতাধর জিনিস চাই যে নিজেরে রক্ষা করতে জানে। আপনি নাম জানতে চাইলেন, আমি বললাম আমি বাদশাহ আলমপনারেই ভিক্ষায় চাই।’ আর কোন ভণিতা না করে স্পষ্ট কণ্ঠে অধম ভিখারি তার আর্জি জানায়।
এই কথা শুনে উপস্থিত বাকি দুই ভিক্ষুক না খেয়েই প্রাণ ভয়ে পালিয়ে যায়। না জানি দুঃসাহসী অধমের সাথে আসার কারণে শাস্তি পেতে হয়। সুদর্শন লোকটা কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অধম যেমন করে সারা জীবন ভিক্ষা চেয়ে এসেছে তেমনি মাথা নিচু করে হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকে।
পর্দার ওপার থেকে হুকুমের স্বরে কে যেন দরাজ কণ্ঠে বলে উঠে, ‘উজির, এই লোক শর্ত মত যা চাইছে তাকে তা দিচ্ছো না কেন?’
‘আমি আমার বাদশাহ আলমপানাকে কি করে কারো ভিক্ষার পাতে দেই হে বাদশাহ আলমপানা! এ যে আমার এখতিয়ারে নাই। এ যে রাজধর্মের এখতিয়ারে নাই।’ বলে নিজের অপারগতা জানান সুদর্শন উজির।
‘তবে কি বাদশাহর ওয়াদা বৃথা যাবে? রাজ ঘোষণা হবে লোকের হাসির খোরাক? বাদশাহর ওয়াদার বরখেলাপ হলে প্রজাদের আগামী কেমব হবে?’ পর্দার ওপার থেকে আবার আসে বাদশাহর কন্ঠ।
‘আমি অপারগ জনাব। আপনিই এর সমাধান দিন।’ বলে আত্মসমর্পণ করে সুদর্শন উজির।
পর্দা ছেড়ে বেরিয়ে আসেন বাদশাহ আর অধম ভিখারি তখনো স্থির, নত দৃষ্টিতে হাত পেতে দাঁড়ানো।
‘শোন ভিখারি। আমি বুঝেছি তোমার হারানোর কিছু নাই আর তাই এমন জিনিস চাওয়ার সাহস করতে পেরেছো। তোমার সাহস ও জ্ঞানে আমি খুশি। সত্যিই তুমি একজন ভিখারি কারণ তুমি চাইতে শিখেছো।’ বলে বাদশাহ অধম ভিখারির প্রশংসা করেন।
‘আমি বড় দুঃখী জাহাপনা। জীবনে হারানোর মতোও কিছু পাই নাই আমি, তাই ব্যথার মত চিরসঙ্গীও আমার নাই। কেউ নাই।’ বলতে বলতে অধমের চোখে নামে অশ্রুধারা।
‘কে বলেছে নাই। তুমি বাদশাহকে জিতে নিয়েছো। আজ থেকে এই বাদশাহ তোমার বন্ধু। এই বাদশাহর যা আছে জানবে তোমারও তাই আছে। শুধু রাজধর্ম মেনে কখনো প্রজার অনিষ্ট করা যাবে না হে বন্ধু। কারণ বস্তুর ধর্ম নষ্ট হলে সে তার পরিচয় হারায়।’ বলে বাদশাহ রিক্ত অধম ধুলো মাখা ভিখারিকে আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেন আর অধম ভিখারি প্রথমবার নিজের আপনজন ও বন্ধু হিসাবে কাউকে পায়। তাও আবার খোদ বাদশাহকে!



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন