শরীরজুড়ে আছে গ্রহণের নাইইলিজম
দুপুরের অর্কেস্ট্রা বাজিয়ে হন্যে হয়ে ওঠে একটি
অলিভ্-বিকেল। নীরবতার খোঁজে পঙক্তিগুলো
শরতের দিকে হাঁটতে শুরু করে, ভাঁজে ভাঁজে এসে
জমা হতে থাকে স্পর্ধার উঠানে অবলীলায়। শুনসান
নীরবতায় সময়টা যেন হয়ে উঠতে চায় হরবোলা,
এক জমাটবদ্ধ আবেদনের শতরঞ্জি।
প্রেম নামক আগুনের ঔদ্ধত্য দেখতে চেয়েছিলাম —
তাই খুব আগ্রহ নিয়ে বুকের ভেতর পুষে রেখেছিলাম
লাল চন্দনের গাছ। এখন সেখান থেকে চুইয়ে পড়ছে
শুধু রক্ত; প্রবাহ অবিরাম। উত্তাল সমুদ্র সবখানে;
অথচ ক্ষণিকের আবর্তনে পুকুরের গভীরতাই মেপে
দেখা হয়নি কখনো!
বাক্সপেটরা গুছিয়েছি ঈষদুষ্ণ সকালে
ভুলে গেছি দাদরা, দিদি ঠাকরুনকে করা প্রণাম;
কটকটে দুপুরের অভিঘাতে তাই যাত্রা শুরু করবো
অনিশ্চিত সন্ধ্যার দিকে —
ঘোর অমাবস্যা শেষে আকাশে টিকে থাকবে
শুধুমাত্র অমলেট হওয়া একটি মিশকালো চাঁদ;
ককপিটে থাকবো আমি আর এক বুনো মাছরাঙা
পাখি। কুয়াশার ধূম্রজালে হবে চোখাচোখি, দু'জনেই
অসংযত, দু'জনার —
আমার পেছনে পড়ে থাকবে পুঙ্খানুপুঙ্খ এক
অপাপবিদ্ধ নদীর বয়ান, জলসিঞ্চিত এক উপাখ্যান :
যেখানে ছিল ঘরবাড়ি, যৌবন-জোয়ার, টগর ও
ঝাঁটিফুলের ঘ্রাণ। আর ছিল এক কুলকামিনী;
আকুলিত-মন, অনতিক্রম্য সে ঘোর!
ঘোর কিংবা বেঘোর —
সব ফেলে দিয়ে আমি এখন কেবল বুঝে নেবো
অনীতাদি'র কবিতার খাতা; ভেজা বর্ষার দিনে
যেখানে কবিতা ফেটে বেরোয় শুধু মাথাঘোরানো
সুঘ্রাণ! সরিয়ে দেবো সোমত্ত নদীর উপর চেপে বসা
সকল অমঙ্গলপ্রার্থনা; ঝাঁঝালো উত্তাপে সেঁকে নেবো
উড়ন্ত কুয়াশারুটি।
না, এখুনি কোনো ভ্যালিডিকশন নয়;
আগে নীড়ে ফিরে আসুক পরিযায়ী-অপরিযায়ী
পরিচয়ের সকল পাখিরা —
ভাবালুতায় আচ্ছন্ন হোক সকল মনোমন্দির;
চিত্রগন্ধে অবশ হয়ে যাক ঋষিকল্পের দেবালয়।
যদি ইতিহাস ঘেটেঘুটে কাঠুরিয়া হয়ে যাই আর
কাঠরহস্যের কূলকিনারা করতে না পারি, তবে যাত্রা
করবো অমৃতলোকের পানে; পকেটে পুরে নেবো কিছু
ইঙ্গিতবহ ঢেউ — শত ভ্যারাইটির মাঝেও ধার করে
নেবো কিছু চিৎকার, ঐযে- ঐ গৃহত্যাগী
নদীটির কাছ থেকে।
ভাঁটফুলেরা জেনেছিল —
তুমি অর্কিড হতে চাওনি, চেয়েছিলে অর্কপত্র হতে
বুনোফুলের সুবাস নিতে চেয়েছিলে বর্ষণসিক্ত রাতে;
রাতের ব্রজবুলি যদিও আমি আয়ত্ত করতে পারিনি
ঠিকঠাক, তবে হয়ে উঠেছিলাম দুর্দান্ত এক ঘোড়সওয়ার —
ওদিকে আশ্বিনের রাতে সোমত্ত-পুরাণ হয়ে ওঠেছিল
আঁধারভেদি ল্যাম্পপোস্টের আলো; তাড়িত
হয়েছিল কামার্ত সুরে।
চেয়েছিলে মনোগ্যামিক হতে — তবে অপ্সরাদের
পরিকল্পনায় ছিল ভিন্ন ব্যঞ্জনা! পার্থিব এ কোলাহল
ছেড়ে উড়ে গিয়েছিলে গণ্ডদেশ ভুলে, শীতভোরে
উড়েছিলে বসন্তের খাঁজে। ভাঁজপত্রে ছড়িয়েছিলে
পদস্খলনের গীত। সহস্র সংগীতের তান ভুলেছিল
প্রদোষকাল।
আমি মল্লভূমি ছেড়েছিলাম —
সৈকতের বাহুডোরে খুঁজে বেরিয়েছিলাম মলয়পবন
আর শান্তির-শঙ্খ। রাধিকার ভাষা বুঝিনি, বুঝিনি
রূপান্তরের ভাষা — তাই শক্ত করতে পারিনি
রক্ষাবন্ধন। কে তুমি নীহারিকা,
অন্ধকারের ধ্রুবক?
এতোটা পথ পেরিয়ে এসে জানান দিয়েছো আবার
মাধবীলতা হয়ে; তুমি জানো না? — অলিন্দগুলো
ভাগ হয়ে গেছে সে কোনকালে!
তুমি জানো না, বর্ষণ শেষ হয়ে যাওয়া মানে সিক্ততার
অন্তিম লগ্ন নয়। বর্ষণ ফুরিয়ে যাওয়া মানে গ্রহণের
কোনো বিরতি নয়। বেলা ডুবিয়ে অনন্তের পানে যাত্রা
করেছিল যে ডিঙি তার-ও একটি উৎসমুখ ছিল, ছিল
তমালঘেরা ঠিকানা। হোক না সে ঠিকানা এখন
ম্রিয়মাণ, বিষণ্ণ চরাচর; অনন্তের পথে থেকে যাবে
তার পদধ্বনি চন্দ্রিকা হয়ে।
এখন শরীরজুড়ে আছে গ্রহণের নাইইলিজম —
শুরু থেকে হতে পারে আবার শুরু, শেষ হতে, হতে
পারে আবার শেষের শুরু। ভালোবাসার সুতোয় হতে
পারে আস্ত একটি রক্তাক্ত জামা, হতে পারে এ এক দণ্ডযাত্রা,
যেখানে ফুটফুটে জোৎস্নায় রিয়েলিস্টিক
হয়ে দাবড়ে বেড়াবে অতীতের গল্পগুলো :
তুমিযুক্ত ও তুমিবিহীন।
হোক পাঁজরের বয়ান, হোক অলিন্দের বয়ান।
ভীষণ ঝড়ে নড়ে উঠুক চাঁদের সপ্তমী।
নিঃশ্বাসের বীথিকায় ঝরে পরুক দীর্ঘযাত্রার ক্লান্তি —
তুমি জেনে রেখো : শেষপর্যন্ত টিকে থাকবে অমরতরু;
একমুখী মনোমেট্যালিক তীব্র মনোলগ!
শিয়রের নদীটা ডুকরে কেঁদে ওঠে।
এ-কি অমর্ত্যলোকের জাগরণ নাকি বিস্ফোরণ?
এ-কি আশ্বিনের শীর্ণকায় নদী নাকি নতুনের নওরোজ?
সঙ্গীতের ধ্বনি বলে ওঠে — নিঃসঙ্গতায় ভোগা
এ এক বিষণ্ণ ল্যাজারুস!
আমাকে আমার মতো থাকতে দাও; বর্ষণকে দাও
মুক্তি। ফিরে যাক সকল ভালোবাসা সেই পুরনো
টেস্টামেন্টে। মঙ্গল-অমঙ্গলের শিলাগুলো তপ্ত হয়ে
উঠুক, হয়ে উঠুক শব্দগুলো একেকটি স্তব্ধতার
কান্নার-কদম।
কবিতাটি ভালো লাগলো। তবে “আমাকে আমার মতো থাকতে দাও” একটি বহুল চর্চিত লাইন। এটা ঘুরিয়ে বললে ভালো হয় ।
জিললুর রহমান
এপ্রিল ২০, ২০২৬ ১৪:২৪



সুন্দর। তবে “ আমাকে আমার মতো থাকতে দাও;” বাক্যটি বিকল্প বাক্য দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে। কারণ এটা বহুচর্চিত অন্যের ভাষা।
জিললুর রহমান
এপ্রিল ১২, ২০২৬ ১৩:৫২