থির হয়ে থাকা সময়ের পাশে ও অন্যান্য কবিতা

অ+ অ-

 

খনন আমার আত্মীয়

ফুটপাথের পুরোনো ইটে জমা শ্যাওলা সিঁটিয়ে আসে,
তড়িঘড়ি করে ডানে বায়ে তাকায় এক বিঘে অশত্থ।
ধপ করে গামলা ফেলে শ্রমিকেরা শক্ত করে গিঁট দেয় গামছাতে
চুলকিয়ে চুল, খসখসে চামড়া, কোদালটা উঁচু করতেই,
রাস্তার ফিসফিসানি
‘গতকাল খুঁড়েছো, আজ আবারও খুঁড়বে?
আমার কোন রূপ এখনো পছন্দ হলো না?’

উন্মুক্ত থাকার কথা আমার, 
তোমরা ফিতেয় বেঁধে চারবেলা উঠাও কারাগার 
যেন আমি চলি তোমাদের ইচ্ছের সুঁতোয়।

তুমি আমার ভাই।

আমার বুকে যতগুলো কোদালের কোপ
তোমার বুক জুড়ে তার চেয়ে বেশি চলে ক্রেন
আমার মতো তুমিও শব্দহীন
একই নিসর্গের দিকে যাবার ইচ্ছে করি।’

আকাশে ঝড়ের মেঘ দুদ্দাড় করে আসে
চড়চড় করে ডিপার্টমেন্ট স্টোরের কাচের জানালা

‘আমরা কি নিজেরা নিজেদের রক্ষা করবো না?

যেদিন তোমাকে আর আমাকে বসিয়ে দেবে এক টেবিলে
আর থরথর করে কেঁপে উঠবে জমিন
সকলেই দর্শক হয়ে থাকবে পরিমাপ করতে 
আমরা কতটুকু আত্মীয় ছিলাম।’

শ্রমিক বলে, ‘আমি সারাদিনই সেই রাস্তায় হাঁটি যে কোথায় পৌঁছায় না।’
পথ বলে, ‘আমিও সেইখানের খোঁজে আছি যা পরম মুহূর্ত।’

বাতাসে বালি কুন্ডুলী পাকায়, ঘোরে, ডানে বায়ে 
অস্থির বালু ছটফট করে পথে, এদিকে ওদিকে কোন দিকে যাবে

‘আমি তো সারাজীবন খুচরো কাপড় কুড়িয়ে বাঁচতে পারি না!’
‘তুমি গতকাল আমাকে খুঁড়েছিলে, মানে তোমাকেও
তুমি আজও খুঁড়ছো, হয়তো আগামীদিনও
তুমি তোমার অনুপস্থিতি পরেই আছো।’

আকাশ ফর্সা হয়ে আসে, সাথে সাথে এইসব বাতুলতা
গর্তের ভেতর বিল্ডিংগুলোর গোপন শিরা বেরিয়ে এসেছে 
যেন তাদের অন্ধকার 
মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে চায়।

এগুলো সেই সমুদ্রতটের বালি, এখন স্থাপত্য, 
কিছুক্ষণের মধ্যে সে তাদের কাঠের ভ্যানে তুলে দেবে

সময় কম, থামে এক সেকেন্ড, এরপর কোদাল নামায় সজোরে
রাস্তা বলে, ‘ভেবো না, আমি এখনও ভেতরে আছি।’

 

অপরাহ্নের সাউন্ড ট্র্যাক

পঞ্চাশ বছর হলো আমি ফিরছি একই রাস্তায়
প্যাডেল-চাপা রিকশাতে, আধ ভাঙ্গা সিমেন্টের পথ নিয়ে খুঁকড়ে খুঁকড়ে।
এই চক্রাকার পথে আগে ঘ্রাণ ছিল, বকুলের গাছগুলো কাটা হলো,
বয়সী গাছেরা ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল রাত্তিরে।
আজ আমারই মতো বছর পঞ্চাশেকের গোটা কয়েকটা গাছ 
যদি না লজ্জা পেতে হয়
দেয়ালের সাথে সেঁটে টিকে আছে কোনমতে।

সন্ধ্যার আজান মোহাম্মদপুরে একসাথে তিন মসজিদ থেকে মিলে মিশে একাকার।
খাবি খাই, কাকে উত্তর দিতে গিয়ে কাকে দেই ভেবে মাঝপথে ছেড়ে দেই।
অপার্থিব মাগরিবের আলো—আসন্ন আঁধার ভুলিয়ে জগৎ মাতাল করা নূর
বারান্দায় বসে দেখি, দিবারাত্রির গ্রহণের মাঝে রোজকার পারাপার। 
আকাশ বদলাতে থাকে রং, অবোধ্য কোন কারণে রূপ নেয় আমার 
পুরাতন ডেস্কটার মতো। বার্নিশ দিতে গিয়ে সরে আসি অস্বস্তিতে,
‘ওটা পঞ্চাশ বছরের পুরোনো’।

আয়রনড কাপড় পরা, লাঞ্চ ব্যাগ হাতে নিয়ে সাঁতটার অন্ধকারে
ভূতগ্রস্থ এক বাহিনী ফিরছে ছোট গলি দিয়ে ছোট ছোট বাসায়।
রান্নাঘরে গ্যাস নেই, দম নেই তার, নেই তার কক্সবাজার যাবার গল্প
কপালের ভাঁজে তখনও অফিস লেগে আছে বলে গৃহে গজগজ 
‘কি কাজ এত?’
তারা জিজ্ঞেস করে না স্যান্ডেলের স্ট্রাইপে কতবার সেলাই, 
মুখবন্ধের অভ্যাস কোথা থেকে?
নিরবতা দিয়ে সব কথা বলে দেয় পঞ্চাশ বছরের সেঁকেলে।

এ তো এক উৎসব বড়লোক প্রবাসী দেখার তাই এয়ারপোর্ট রওনা
বনানীর চার মুখে এসে সব গাড়ি ধীর, 
যেন সময় চায় যে কোন ক্রসিং।
এলিভেটেড ওয়েতে ওঠা হবে না তবু চালিয়ে নিচ্ছে এই
টেম্পু ঢাকা ক-১৯৭৬।
ডানে থাক তদন্ত ছাড়া স্টেডিয়াম, মন ভালো করা রোদ
পরবর্তী ধাপের শুভেচ্ছায় রোড ডিভাইডারে হাজার হাজার রঙ্গন।

 

কাগজের প্রজাপতি 

যদি তুমি এই ঠান্ডাটা টের না পাও, তবে এখনও ভালো আছো।

মাথার ওপরের ফ্লুরোসেন্ট বাতি জ্বলে নিস্প্রভ হলুদ
কালো চেয়ারের রুমটার বাইরে সে আলো কখনও বেরোয় না।
হাতে ধরা কাগজগুলো ঠান্ডা, কাঁটাময় অক্ষর
তুমি শুনছো ইলেকট্রিক কেটলির ঢাকনা চাপানো মুখে
ফুটন্ত পানির গরগর।

পাশে আধখানা প্লাগ পুড়ে যাওয়া টেবিল ফ্যান
তিনখানা ব্লেড তেরছা করে ধরে আছে।
আটকে রেখেছে এক ঝলক বাতাস
যা কখনো শুরু হয়নি।

টেবিলের ওপর ছোট ক্যালেন্ডার
যেন সুপারশপে ফ্রোজেন মাছের কেবিনেট।
জমে বরফ হওয়া, শত সুনামিতেও
তার কিছু করার নেই।

ম্যাটমেটে দেয়ালে বাঁধানো কাগজের প্রজাপতি
অক্ষম ডানা নিয়ে লেগে আছে যেখানে তাকে বসিয়েছে।
দরজার নবে কালসিঁটে দাগ স্পষ্ট ব্ল্যাকহোল,
দখলের জন্য সে তোমাকেই বেছে রেখেছে।

ঘরে এলে রান্নাঘরের থালাবাটি পড়বে হঠাৎ।
ভীষণ জোরে। কিন্তু থেমে যাবে চৌচির হবার কিছু আগে।
শোবে। ধাতব কলে একটা ফোঁটায় পানি পড়বে টপ টপ
কোল্ড ব্লাডেড মার্ডারার, ধীরে সুস্থে ঘুম হারাম করার প্ল্যান।

রুমের এককোণে বোতলে বসানো মানিপ্ল্যান
পানি দিয়ে ফেলে রাখা, যেন অন্য কিছু দিতে নেই।
ঘোলা আলোর মিউজিয়ামে কাঠের নিঃশব্দতায়
অনস্তিত্বরাও টিকে থাকে, মানিপ্ল্যানে পানি দেই।

 

ফুটবল

এক ঝাঁক শোরগোল। খরা হয়ে থাকা মাঠের আজ ফুরসত নাই।
চিয়ারলিডার্স চড়ুইয়ের দল থেকে থেকে একপাশ হতে অন্যপাশে,
ঘাস মাথা খাড়া করে রেখেছে উজ্জ্বল রোদের নিচে।
বহুদিন যার নাই খোঁজ, 
অন্তরালের উঁচু ডাল থেকে নামে নাই।

মেক্সিকান ওয়েভ তুলে সাঁতরায় নারকেল গাছেদের সারি।
বিশ জোড়া সবুজ পায়ের উদ্যম ফুটবল মাঠে,
তালি দিতেছে দর্শক।

এতটুকু উচ্ছ্বাসের জন্য কত মানুষের ভিড়!
যাদের উচ্ছ্বাস জমে গেছে ব্রহ্মপুত্রের সাথে,
একদা কোথাও ছিল, তাদেরও ভিড়।

যাদের কপালের ঘাম, অবিরাম কেনা ধুলো
অব্যাহতি চেয়েছে কিছুক্ষণ।

যাদের অন্তর আষাঢ়ের আকাশের মতো
আধো আলো, আধো অন্ধকারে 
জীবনের পটভূমি বুঝতে যেয়ে গিয়েছে থেমে।
এক অদৃশ্য কেরিওগ্রাফারের প্রতি যাদের শত অভিমান, ক্ষোভ।

যারা অনাদি বয়স হতে হেঁটেছে আশায়
একদিন মাঠ ঘুরে ফুটবল
আসবে পায়ের কাছে।

গোল দেবে বলে নয়, অনেক প্রত্যাখ্যানের পর 
পৃথিবীটা তার দিকে সামান্য হেলেছে।

 

থির হয়ে থাকা সময়ের পাশে

নেইলকাটার দিয়ে কাটি অতীতের নখ। শিরাকে দেবার যার আর কিছু নেই—সম্বন্ধ শুধুই আঁচড়ে—নেইলপলিশে ঢেকে বহুদিন একদিন তাকে মুক্তি দিতেই হয়। রিমুভারের গন্ধ হঠাৎ ধক করে বুকে লাগে। ডান হাত চাপড়ে দেয় আশ্বাস, আরেকটা সফেদ আঁচড়ের জন্য তৈরি। প্রায়ই হারাই কাটারগুলি।

ভাল লাগে না নতুন পাইলিংয়ের শব্দ। জন্ম থেকে লগ্নি করা দুমদুম, পিটিয়ে পিটিয়ে একটা কিছু খাঁড়া করে। তোষকের নিচে মাড়াইয়ের পুরোনো ক্যালেন্ডার, পরিচিত মাকড়সার জাল, মশারির তালি দেয়া দড়ি মুখ। নাইলনের খুপড়ির ভেতরে ঢুকলেও সে জানে, কোথায় হচ্ছে গুনগুন। হাওয়া বন্ধ করা দেয়াল, আলো বন্ধ করা দেয়াল, খাটের মাঝখানে দেবে যাওয়া গর্ত, পোড়া কড়াই বারবার ঘষে ঠিক করবার উপসর্গ। পাইলিংয়ের কাছে কিছু মানুষের আনাগোনা, হাঁকডাক, পুরাতন চুকিয়ে ফেলার তর্জন। ঠিক তার ওপরে থির হয়ে থাকে সময়, পুরোনো থার্মোমিটার আর বাতিল প্রেসক্রিপশন।

গ্রিলের ফাঁকে ঝুঁটি বেঁধে আসে রোদের বুলবুলি। ব্লু ডেইজির ঝোপে ঠোঁটে ঠোঁটে গল্প করে যখন, দেখি বড় উজ্জ্বল হয়ে উঠছে নীল ফুলগুলো। ওদের চোখ ঝলমল। স্বচ্ছ করে যতদিন চেনা যায় ততদিন টলটল। ততদিনই পাহাড় থেকে পড়াকে লাগে ঝর্নাধারা, পুজো হয় সিঁড়িতে সিঁড়িতে, সাদা কালো জীবন নার্গিস-দীলিপ কুমার, চুড়ির শব্দে জ্বলে ওঠে গোধূলি। আয়নার সামনে মুখ টিপে হাসি। একদিন আরো হাসি কিনতে রওনা দেই বাজারে। এখন পরিত্যক্ত শহরে কেউ হঠাৎ কলিংবেল দিলে বলি, কে রে?

ঘরের সামনে প্লাস্টিকের সু র‌্যাক, যেন যুদ্ধ শেষে ফেলা যাওয়া জুতোর সারি, শ্রমিকের চপ্পল। সাইকেলটা কাত হয়ে আছে এমনভাবে যেন দৌড়ে দৌড়ে ক্লান্ত। পর্যদুস্ততার শিকল নিয়েই শুয়ে যেতে চায়। হেরিয়ার, প্রাডোর রাস্তায় দু পায়ের ব্যালেন্স। প্রায়ই যাবো না বলে খিঁচিয়ে থাকে ধূলো মেখে।

ওদিকে চান্দানা সড়কে মহাসমারোহে ফোঁটে কাঞ্চন। গেঞ্জির ড্রয়ারে টান দেই, ছায়াকে কাঁধে তুলে ছোটে কিছু খোলা বাতাসের মুহূর্ত।