হুয়ান রামন হিমেনেসের কবিতা
|| হুয়ান রামন হিমেনেস ||
হুয়ান রামন হিমেনেস [১৮৮১–১৯৫৮] আধুনিক স্প্যানিশ কবিতার এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ। স্পেনের আন্দালুসিয়ার মোগের শহরে জন্ম নেওয়া এই কবি তাঁর সংবেদনশীল, সুরেলা এবং অন্তর্মুখী কাব্যভাষার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তিনি “poesía pura” বা নির্মল কবিতার ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করেন, যেখানে অলংকারের চেয়ে অনুভূতির স্বচ্ছতা ও অন্তর্লোকের অভিজ্ঞতা বেশি গুরুত্ব পায়।
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Platero y yo একটি গদ্যকবিতা, যেখানে প্লাতেরো নামের এক ছোট গাধাকে কেন্দ্র করে প্রকৃতি, স্মৃতি ও মানবিকতার কোমল জগৎ নির্মিত হয়েছে।
হিমেনেস তাঁর স্ত্রী জেনোবিয়া ক্যাম্প্রুবি [ ১৮৮৭–১৯৫৬] - এর সঙ্গে মিলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর -এর কবিতা স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ করেন, যা ইউরোপে রবীন্দ্রনাথের পরিচিতি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৫৬ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। জীবনের শেষ পর্ব তিনি পুয়ের্তো রিকোতে কাটান, সেখানেই ১৯৫৮ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। হিমেনেসের কবিতা নীরব, গভীর এবং নির্মল সৌন্দর্যের এক অনন্য উদাহরণ।

ছবি © জেন্ডার সৌজন্যে
হুয়ান রামন হিমেনেসের কবিতা
অনুবাদ || লায়লা ফারজানা
|| বৃক্ষ-মানব ||
গতকাল বিকেলে ফিরছিলাম মেঘেদের সাথে—
অটল বৃক্ষকাণ্ডের গভীরতায়
ভাসতে ভাসতে—
গোলাপ-ঝোপের নিচে
(বিস্তীর্ণ গোলাকার কোমলতা)।
সেখানে অশেষ নৈঃশব্দ্য আর অন্তহীন শূন্যতায়
থেমে থাকা বৃক্ষের মত থমকে
দাঁড়িয়েছিলাম আমি—শুনেছিলাম
গাছেদের কথা।
সেই নিভৃত স্থান থেকে উড়ে পালিয়েছিল
একটি একা পাখি,
শেষ গোলাপগুলোর সাথে রয়ে গিয়েছিলাম শুধু আমি—
আমি ফিরে যেতে চাইনি আমার মানবসত্তার কাছে,
যদি তারা আঘাত পায়;
আমি যে তাদের থেকে ভিন্ন এক গাছ।
আমার ভবঘুরে মানব রূপ বৃক্ষেরা মনে রাখেনি;
আমিও নিজের রূপ ভুলে,
মুগ্ধ হয়ে শুনেছিলাম তাদের কথা।
রয়ে গিয়েছিলাম সেখানেই,
নক্ষত্ররা জেগে ওঠার আগে।
তারপর নরম আলোর উড়ানে
ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম সীমানার প্রান্তে—
যখন আকাশে চাঁদ।
বিদায়-বেলায় দেখি—
বৃক্ষেরা তাকিয়ে আছে আমার দিকে;
তারা সব জানে—
তাদেরকে পেছনে ফেলে যাবার
আমার এই প্রবল কষ্ট।
মুক্তোর মতো শুভ্র মেঘেদের মাঝে—
আমি শুনতে পেয়েছি তাদের আওয়াজ,
মৃদু গুঞ্জনে, তারা কথা বলছে
আমাকে নিয়েই।
আমি কীভাবে ভাঙি তাদের ভুল?
কীভাবে বলি—না, আমি তো এক পথিক মাত্র!
আমার সাথে কথা বলো না?
আমি তাদের বিশ্বাস ভাঙতে চাইনি।
তারপর—অনেক পরে—যখন অনেক রাত
আমি শুনি, গাছেরা ডাকছে—
আমাকে।
|| এই সুন্দর, গভীর নগ্নতায় ||
আমি এখানেই থেকে যেতে চাই;
যেতে চাই না অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে।
সেই সমস্ত স্বর্গলোক—
(বলা হয়)— যেখানে উচ্চারিত তোমার কণ্ঠ,
আমার দিবা-স্বপ্ন থেকে আজ বিলীন;
কারণ, এখন আমি গভীরভাবে
অনুধাবন করতে পারি এই স্থানটিকে,
যেখানে আমি বাস করি—
যা এখন সেই পরম সত্তার প্রস্ফুটিত, উন্মুক্ত কেন্দ্র।
আমার বিরাজমান বসন্তের শ্যামলিমা—
কোন আলো পারে আর কোনো সবুজ থেকে
তুলে আনতে এর চেয়ে নির্মল এক সামগ্রিক সুর,
আরও মহান, আরও বিশ্বস্ত এক মহিমা—
অন্তরে ও বাহিরে?
সে ছিল, সে আছে, এবং চিরকাল থাকবে—
সেই পরম সত্য:
তুমি—তোমাকে আমি শুনেছি, দেখেছি,
ধারণ করেছি—
আমার এই একান্ত স্বর্গে;
তুমি—যে সত্যিই এসেছো আমার কাছে
এই সুন্দর, গভীর নগ্নতায়।
|| সবুজ পাখি ||
যদিও এসেছি তবু —
বিলাপ রেখে এসেছি সমুদ্রের কিনারায়
কাঁদতে কাঁদতে।
যদিও এসেছি তবু—
তোমার কাজে লাগব না আমি, কারণ
আত্মা ফেলে এসেছি সেখানেই।
যদিও এসেছি তবু—
‘ভাই’বলে ডেকো না আমাকে—
আমার আত্মা এখনো সেখানে কাঁদছে।
|| পূর্ণিমা ||
খোলা দরজা, ঝিঁঝিঁ পোকার গানে—
তুমি কি নগ্ন,
বেরিয়ে পড়েছ
খোলা মাঠের সেই উদাত্ত আহ্বানে?
অবিনশ্বর অমর্ত্য জলের ধারায়—
সবকিছুর ভেতরে এবং বাইরে
তুমি কি নগ্ন,
বইছো সেই বাতাসে?
শ্রীমঞ্জরী ঘুমায়নি,
শ্রমজীবী পিঁপড়া ব্যস্ত নিরন্তর —
তুমি কি নগ্ন,
ছেয়ে আছো সেই ঘর?
|| নাবিকের আদর্শ সমাধিলিপি ||
তোমার সমাধির সন্ধান মেলে
নভোমণ্ডলে।
—তোমার মৃত্যু
নক্ষত্র থেকে ঝরে পড়া বৃষ্টির মতো।
সমাধিফলক তোমাকে ভারী করে না—
মহাজাগতিক স্বপ্নে তোমার সমাধি।
তুমি অজ্ঞাত, নির্বিকার
সবকিছুর মধ্যে—
তুমি মৃত
আকাশে, সমুদ্রে,
আর পৃথিবীতে—
|| ফিরে আসব না ||
আমি আর ফিরে আসব না,
তবু—
মৃদু উষ্ণ, শান্ত নীরব রাত
তার একাকী চাঁদের আলোয়
পৃথিবীকে ঘুম পাড়াবে।
আমার দেহ আর সেখানে থাকবে না,
তবু—
খোলা জানালায় এক প্রস্থ শীতল বাতাস
আমার আত্মাকে খুঁজবে।
জানি না,
আমার বর্ধিত দ্বিগুণ অনুপস্থিতির শেষে
কেউ কি অপেক্ষা করবে?
কিম্বা কে সোহাগ আর অশ্রুতে
চুম্বিত করবে আমার স্মৃতি?
তবু—
থাকবে নক্ষত্র আর ফুল,
থাকবে দীর্ঘশ্বাস, আশা,
আর গাছের ছায়ায় ঢাকা পথগুলোতে
থাকবে প্রেম।
আর পিয়ানোটিও বাজতেই থাকবে
আজকের এই নিরুদ্বেগ রাতের মতো
তবু—
জানালার পাশে মগ্ন হয়ে শোনার মত
কেউ থাকবে না।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন