শোকার্ত রুমাল

অ+ অ-

 

এক তরুণী খুব ভোরে একজন সন্তের কাছে এসে বস্লো। সন্ত তাকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি কিছু বলবে? তরুণী মাথা নেড়ে তার বেদনার্ত মুখটা তুলে ধরে বল্ল, আমি আমার প্রিয়জনের বিচ্ছেদে ভীষণরকম দুঃখ পেয়েছি, কিন্তু কিভাবে এই শোক যাপন করতে হয় তা আমি জানি না। আমাকে আপনি বলুন কিভাবে আমি তার নামে শোক করবো! সন্ত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, তোমাকে ধন্যবাদ; আজ তুমি না এলে আমার একটি দুয়ার বন্ধই থেকে যেতো! তরুণী বল্ল, কোন দুয়ার? সন্ত বল্ল, শোকের! আমি জানিই না কিভাবে শোক করতে হয়! বরং দুঃখ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নেবার কৌশল আমাদের আয়ত্ত করানো হয়েছে; আর বোকার মতো আমাদের বিশ্বাসী মাথায় আসেইনি শোককেও যাপন করা যায়! তাকে বুকে মাথায় নিয়ে বাঁচা যায়, ঘোরা যায়! তারমানে আপনি জানেন না? সন্ত বল্ল, না। আমি শোক যাপন কি তা জানি না। তবে তোমার মুখ দেখে আমি বুঝতে পারছি তুমি তীব্র বিষাদে আছো। এইতো তোমার শোক যাপন। অথচ আমার দিকে দেখো, একফোঁটা শোক নেই, আনন্দের আহ্লাদ নেই; আছে শুধু একটা প্রাচীন পাথরের মতো বসে থাকা। তরুণী যখন উঠে যাচ্ছিলো, সন্তও তার সঙ্গে উঠে পড়লো। তরুণী বল্ল, আপনি যাচ্ছেন কই? সন্ত বল্ল, আমার তো আপনজন আর কেউ নেই! এই মঠ আমার নিত্যদিনের আশ্রয়। এটাকে ছেড়ে যাচ্ছি, তাতে যদি বিচ্ছেদের যন্ত্রণা হয়! তারপর সেখান থেকে যদি জানতে পারি শোক যাপন!

 

ভীষণ দুঃখ নিয়ে এক তরুণ পাহাড়ের কোল ঘেঁষে যাওয়া এক রাস্তার পাশে বসে ছিলো। তাকে দেখলেই বোঝা যাচ্ছিলোএকদম দিশেহারা দশা। এক ফকির তার কালো বোঁচকা নিয়ে যেতে যেতে থমকে তরুণের দিকে তাকিয়ে বল্ল, একজোড়া বন্দি পায়রা ছেড়ে দে আকাশে! তরুণ ঢাল বেয়ে নেমে বাজারে গিয়ে একজোড়া পায়রা কিনে এনে ছেড়ে দিলো হাওয়ার মধ্যে। পায়রা দুটো ডানায় ঝাপট তুলে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো, আনন্দ আর শান্তিতে ভরে উঠলো তরুণের মন। পরদিন তরুণ সেই পাহাড়ের কোলে গিয়ে বসে থাক্লো ফকিরের দর্শন নেবে বলে! কিন্তু তাকে পেলো না। তারপর থেকে তরুণ সেই ফকিরকে মনে মনে খুঁজে যেতে লাগ্লো! অনেক বছর পর একদিন সেই তরুণ যখন মাঝবয়সী হয়ে গেলো সে দেখলো ট্রেন লাইন ধরে এক তরুণী হেঁটে যাচ্ছে উলটো দিক থেকে আসা ট্রেনের দিকে! মাঝবয়েসী লোকটা দৌড়ে গিয়ে মেয়েটার পিছুপিছু হাঁটতে হাঁটতে বল্ল, একজোড়া খাঁচার পাখিকে মুক্ত আকাশ দিয়ে যাও অন্তত! মেয়েটা থমকে দাঁড়ালো। সেদিনের পর সেই তরুণীটি মাঝবয়েসী লোকটাকে খুঁজতে লাগ্লো কিন্তু দেখা পেলো না, যে তাকে একটা আকাশ দিয়ে গেছে।

 

দুঃখ একদিন বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। এক মহিলা তাকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করলো, এমন মনমরা মুখ নিয়ে যাচ্ছ কোথায়? দুপুরে খাওয়া জোটেনি? দুঃখ মাথা নেড়ে জানালো, জোটেনি! মহিলা কলতলা দেখিয়ে বল্ল, হাতমুখ ধুয়ে এসো! তারপর মহিলা ভীষণ যত্নে তাকে খায়িয়ে-দায়িয়ে বল্ল, ঘুম পেলে শুয়ে পড়ো ঐ মাদুরে! দুঃখের চোখে জল এসে গেলো, এমন মমতা মাখিয়ে কেউ তাকে যত্ন করেনি কোনদিন! ঘুম থেকে উঠে দুঃখের মনে হলো, এই বাড়িটা তার নিজের আর ঐ মহিলা তার মা। তারপর থেকে মহিলার সংসারে দুঃখের স্থায়ী বসবাস শুরু হলো। এক জীবনে দুঃখ তাকে ছেড়ে যায়নি।

 

গুরুর মৃত্যুতে প্রধান শিষ্য এতোটাই শোকাহত হলেন যে, গুরুর প্রতি ভক্তি জানান দিতে তিনি মৌনতা গ্রহণ করলেন। একযুগ কেটে গেলো তিনি কথা বলেন না। তাকে লোকেরা দেখতে আসেন। এক যুগ পর তিনি অনুভব করলেন গুরুর প্রতি ভক্তি এবং তার বিয়োগের শোক যাপন হয়েছে, এবার কিছু কথা বলে যেতে হবে, কেননা তারও বয়স হয়ে গেছে। কিন্তু তিনি অনুভব করলেন,তিনি যে কথা বলবেন এই খবর তার শিষ্যদের কাছে লিখে জানান দেবার পর থেকে তারা অস্থির হয়ে আছে, তারা আফসোস করছে যে, তাদের নির্বাক গুরু জবান খুলে নির্বাকতার সৌন্দর্য এবং খ্যাতি দুটোই বিসর্জন দেবে! তারা আর বলে বেড়াতে পারবে না তাদের এক গুরু আছেন যিনি মৌনতা যাপন করছেন দীর্ঘ বছর! ফলে এবার শিষ্যদের জিতিয়ে দিতে বা তাদের আহ্লাদ টিকিয়ে রাখতে বাকি জীবন আর কথাই বললেন না সেই গুরু!

 

পোষা টিয়ে পাখিটা মারা যাবার পর এক কিশোরী কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ হয়ে পড়লো। তার বাবা রঙ তুলি এনে মেয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বল্ল, তুমি পাখিটার একটা ছবি এঁকে ফেলো! মেয়েটা বিস্মিত হলো। তারপর সে ছবি আঁকলো, খাঁচার মধ্যে মরে পড়ে থাকা টিয়ের। তারপর তার বাবা বল্ল, তুমি প্রতিবছর মরা টিয়েটার একটা ছবি আঁকবে আজকের দিনে! মেয়ে বল্ল, ছবি আঁকবো কেন? বাবা বল্ল, যাতে তোমার প্রিয় পাখিটা তোমার কাছে জমা থাকে! তাকে হারিয়ে ফেললে তো হবে না! মেয়েটা হাউমাউ করে কেঁদে ফেল্লো!

 

বিষাদের পায়ে শিকল দিয়ে এক মেয়ে নিজের পায়ের সঙ্গে বেঁধে রাখতো। বিরক্ত বিষাদ তাকে বলতো, আমাকে ছেড়ে দিলে তুমি শান্তি পেতে! মেয়েটা বলতো, শান্তিই যদি পাবো তবে সে আমাকে কেন ছেড়ে গেলো? আর তোমাকে যখন রেখেই গেলো তাহলে তোমাকে আমি কোন দুঃখে ছাড়বো?

 

বারান্দা থেকে মহরমের মাতম দেখে এক কট্টরপন্থী লোক গজগজ করতে করতে ঘরে ঢুকে বললেন, এসবের কোন মানে হয় না! স্ত্রী বল্ল, দুপুর তো গড়িয়ে যাচ্ছে ভাত খেয়ে নাও? লোকটা বল্ল, ছেলেকে ডাকো! স্ত্রী বললেন, সে তো ঘরের দরজা দিয়ে ঘুমাচ্ছে, ভোরে শুতে গেছে! বিরক্ত হয়ে লোকটা ছেলের দরজা নক করে ঘুম থেকে তুলে ডেকে আনলেন খাবার টেবিলে! ঘুম জড়ানো চোখে ছেলে বল্ল, এসবের কোন মানে হয় না! আমি আমার মতো খেয়ে নিতাম উঠে, তোমরা তোমাদের সময় মতো খেয়ে নেবে! বিরক্ত বাবা বল্ল, মানে হয় কি-না যদি তুমি বুঝতে তাহলে আমার হৃদয় তোমার হতো! তখনো মাতমের ডঙ্কার শব্দ শোনা যাচ্ছিলো।

 

কাঁদতে কাঁদতে এক মেয়ে দিঘির জলে মুখ ধুতে গেলো। দিঘি বলে উঠলো, দোহাই লাগে কাঁদবে না! মেয়েটা তাজ্জব হয়ে বল্ল, তুমি কথা বলতে জানো? দিঘি বল্ল, জানি। দুঃখেই তো আমি জল হয়ে জন্মেছি! আর তোমরা সবাই কান্না নিয়ে আমার কাছে আসো জল বাড়াতে! আবার বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করো। অথচ আমি একটু শুকিয়ে জলশূন্য হয়ে নিজের দুঃখকে মুছতে পারি না!

 

এক দরবেশ একটা মরা হরিণকে জ্যান্ত করলো স্পর্শ করে! এই দৃশ্য দেখে একজন মা ডুকরে কেঁদে ফেললেন! দরবেশ মহিলার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, মা আপনি কাঁদছেন কেন? আমি কি কোন আচরণ দিয়ে আপনাকে কষ্ট দিয়েছি? মহিলা মাথা নেড়ে বল্ল, আমার ছেলেটা ১০ বছর আগে সাপে কাটায় মারা গেলো। আপনি থাকলে তখন তারে জিন্দা করা যাইতো! দরবেশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আজ থেকে আমি আর কোন প্রাণীর ক্ষত সারাবো না, কাউকে জীবিত করবো না, কারণ আমি একজন মায়ের মনের দুঃখকে আবার জ্যান্ত করেছি! বলেই দরবেশ চলে গেলো। যাবার সময় দরবেশের লাঠিটা মাটিতে পড়ে গেলো আর মুহূর্তে লাঠিটা সেই মহিলার সাপেকাটা ছেলে হয়ে গেলো! কিন্তু দরবারেশ কোথায়? সবাই তাকে খুঁজতে লাগ্লো! কারণ লাশটা সাপে কাটা, আর তাকে জ্যান্ত করতে পারে ঐ দরবেশ; কিন্তু তিনি গায়বে! মহিলা ছেলের লাশ জড়িয়ে কাঁদতে লাগ্লেন। সবাই দেখল দরবেশের লাশ জড়িয়ে মহিলা কাঁদছে!

 

দুঃখকে জানতে এক লোক এলো দরিদ্র এক গ্রামে। সেখানে ঘর তুলে থেকে গেলো সে দুঃখকে জানতে। অনেক বছর পর যখন তিনি বৃদ্ধ তার খুব দুঃখ হলো কারণ, তিনি সারাটা জীবন দিয়েও দুঃখকে জানতে পারলেন না, আর এখন তিনি ফিরেও যেতে পারবেন না কারণ বয়স হয়ে গেছে, দুঃখ তবু তার জানা হলো না।

 

মৃত্যুর কার্ণিশে বসে বারবার তার মনে হয়েছে নিজেকে ফুরিয়ে দেয়ার যথেষ্ট সময় আছে; জীবনের পরের দৃশ্যটা দেখে নেয়া যাক! এরকম করতে করতে একদিন তার মনে ভীষণ আনন্দ হলো। কারণ তিনি অনুভব করলেন, সারাটা জীবন ঢেলে তিনি শেষ দৃশ্যের অভিনয়টাই করেছেন! মৃত্যু এবার তাকে নেবে। তার খুব শোক হলো তার যবনিকার ব্যথায়!