মৃতদের পরিবার
বুধবার, ভোর সাতটা। সর্বশেষ যে মহিলাটি গাড়িতে উঠলো আমাদের সাথে, বয়স আনুমানিক বেয়াল্লিশ-তেতাল্লিশ বছর হবে। প্রায় কাকভেজা, পরনের বাসন্তী রঙের শাড়ি বৃষ্টিতে ভিজে গাঢ় খয়রি রঙ ধারণ করেছে। অবশ্য আমাদের সবারই কমবেশি একই অবস্থা হয়েছিল। এসির বাতাসে আমাদের ভেজা কাপড় অনেকটা শুকিয়ে গেছে। গাড়িটা বেশ আরামদায়কই, হালকা পারফিউমের গন্ধ আছে এখনো। ড্রাইভার হামিদ মিয়া গড়ির অটোমেটিক স্লাইডিং ডোরটি লক করে দিলেন, গাড়িটি চলতে শুরু করল। এখনো পিটপিট করে বৃষ্টি ঝরছে, থেকে থেকেই বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সারা রাতই থেমে থেমে অঝোরে বৃষ্টি হয়েছে। সাধারণত বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি এরকম একটানা বৃষ্টি হয় না। এখন শহরের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা অনেক ভালো, তারপরও গলির রাস্তায়, সড়কের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে পানি জমে আছে। কোথাও কোথাও নালা উপচে পানি সড়ক বিভাজকের কাছাকাছি চলে এসেছে। সঙ্গত কারনেই গাড়ি খুব ধীরে ধীরে চলছে। আমাদের সবার গন্তব্যই শহরের অন্যপ্রান্তে উত্তরার বিভিন্ন সেক্টরে, জ্যামজট পেরিয়ে প্রায় এক ঘন্টার পথ। আমরা সবাই মূলত লোকাল বাসের যাত্রী। বৃষ্টির কারনে রাস্তায় বাস কম, দু’য়েকটা আসছে দীর্ঘ সময় পরপর, বাধ্য হয়েই এই ব্যবস্থা। আর এমন কাকভেজা হয়ে বেশীক্ষণ অপেক্ষা করাও মুশকিল।
আমার আর সবশেষে উঠা মহিলার মাঝে বসা বয়স্ক ভদ্র মহিলার বয়স সত্তোর-বাহাত্তর হবে হয়তো, সাদা চুলের মাঝে মাঝে দু’য়েক গোছা কালো চুল উকিঝুকি দিচ্ছে। কোলে বসা শিশুটি সম্ভবত শ্রবণ প্রতিবন্ধি অথবা বোবাও হতে পারে, ওকে কথা বলতেও শুনিনি। বয়স ছয়-সাতের বেশী না। আমরা সরকারী হাউজিং এস্টেটের পাশ দিয়ে যাচ্ছি, দেয়ালের ভেতরে সারিবাঁধা কৃষ্ণচূড়ার গাছের ডালে ডালে আগুন লেগেছে। শিশুটি দাদির আঙ্গুল ধরে টেনে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে, দাদি হেসে ভাঙ্গা ভাঙ্গা উচ্চারণে বললেন, কৃ-ষ্ণ-চূ-ড়া। মেয়েটির টোল পড়া গাল ছুঁয়ে আদর করে দিলাম, আমারও প্রিয় ফুল কৃষ্ণচূড়া। ভদ্রমহিলা হেসে জানালেন বাচ্চাটি উনার নাতনি। কাঁধের ব্যাগটি সামনে দুই সীটের মাঝে রাখা। ঘিয়ে রংয়ের তাঁতের শাড়ি পরেছেন, পোশাক-পরিচ্ছদ মলিন হলেও বেশ পরিচ্ছন্ন। হাতের স্বচ্ছ ফাইলটিতে কিছু কাগজপত্রের সাথে প্রতিবন্ধী ভাতার কাগজও উঁকি দিচ্ছে।
হঠাৎ একটু জোরে ব্রেক করতেই, পেছনে বসা ছেলেটির হাত থেকে মোবাইলটা ছিটকে পড়ে গেল নীচে পয়ের কাছে। কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শোনায় মগ্ন ছিল, ওর পাশে বসা মেয়ে দুইটা খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠল। ছেলেটা চিৎকার করে বলল, ‘আরে ভাই আস্তে!’ এই ছেলেটাই সর্বপ্রথম গাড়িতে উঠেছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ড্রাইভার ‘উত্তরা পঞ্চাশ টাকা, উত্তরা পঞ্চাশ টাকা’ বলে বলে ডাকছিল, আমি প্রথমে সাহস করতে পারছিলাম না। ও ওঠার পর বয়স্ক মহিলাটি বাচ্চাটিকে সাথে নিয়ে গিয়ে উঠে বসে, তারপর আমিও উনাদের পাশে গিয়ে বসলাম। আমাদের দেখাদেখি মেয়ে দুইটা উঠে পিছনের ছেলেটার সাথে গিয়ে বসল। এই মেয়েদের একজনের পরনে স্কুল ইউনির্ফম, বয়স চৌদ্দ-পনের হবে হয়তো। অন্যজন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, কথাবার্তায় বোঝা গেল ওরা দু’জন আপন বোন। গাড়ি ছাড়তে দেরি দেখে ছেলেটা বারবার ড্রাইভারকে তাড়া দিচ্ছিল, ‘ভাই আমার প্রেজেন্টেশন আছে, একটু তাড়াতাড়ি করেন’। পেছনে ফিরে ভালোভাবে তাকিয়ে খেয়াল করলাম, এদের দু’জনের গলায় ঝুলানো আইডি কার্ডের গাড় নীল রংয়ের রিবনে একই বিশ্ববিদ্যায়ে লোগো প্রিন্ট করা। দু’বোন ফিসফিস করে কিসব বলাবলি করছে, আর কিছুক্ষণ পরপর স্কুল পড়ুয়া মেয়েটি কাঁচভাঙ্গা হাঁসিতে ফেটে পড়ছে।
সারা রাতের বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে য়াওয়া রাস্তার খানাখন্দ এড়াতে একটু পরপর ব্রেক চাপতে হচ্ছে ড্রাইভারকে। যে দু’য়েকটা সিএনজি অটোরিকসা চোখে পড়ছে সবকটারই সাইলেন্সারে পানি ঢুকে বন্ধ হয়ে আছে, বেচারা ড্রাইভারদের বেহাল দশা। ধীরে ধীরে বাতাস বেড়ে যাচ্ছে, আবার চারদিকে অন্ধকার হয়ে আসছে। বৃষ্টি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বিকট শব্দে বাজ পড়লো কোথাও, সামনে বসা বয়স্ক ভদ্রলোক জোরে জোরে শব্দ করে দোয়া পড়া শুরু করলেন। উনি পেনশনের টাকা তুলতে যাচ্ছেন, বয়স আশির কাছাকাছি। বেচারা গাড়ীতে উঠতেই পারছিলেন না, ড্রাইভার নেমে গিয়ে নিজে ধরে উঠিয়ে দিয়েছিলেন। আমাদের ড্রাইভার একটি বেসরকারি কারখানার কর্মকতাদের অফিসে আনা নেওয়া করেন, এই গাড়িটি উনার নিজের। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফিরে জমানো টাকা ও ব্যাংকের কাছ থেকে লোন নিয়ে গাড়িটি কিনেছেন। গাড়ির ইনকামে ব্যাংকের কিস্তি ও সংসার চলে। গাড়িটি মেন্টেইনেন্সের জন্য গ্যারেজে নিয়ে যাচ্ছেন, পুরোপুরি ঠিক হলে আবার অফিসের ডিউটি শুরু করবেন।
আমরা একটি ফ্লাইওভারে উঠবো, কিন্তু ল্যান্ডিংয়ে অনেক পানি জমে আছে। গাড়িটি প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, গোঁ গোঁ করতে করতে কোনক্রমে ফ্লাইওভারে উঠা গেল। তবে এর মধ্যে গাড়ির অযাচিত আচরণ সহ্য করতে না পেরে ছোট্ট মেয়েটি বমি করা শুরু করল। ফ্লাইওভারের প্রায় মাঝামাঝি জায়গায় আমরা। নীচে রেললাইন, স্তরে স্তরে সাপের মতো অনেকগুলো রাস্তা, আমরা সবার উপরে। আশেপাশে কোন ঘরবাড়ি, গাছপালা নেই। আমি ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললাম, সে রাজি হলো না। একেতো বাইরে বাতাসের তান্ডব, তার উপর নির্ঘাত ক্যামেরায় ধরা পড়ে যাবে। বিনা নোটিশে বড় অংকের মামলা ধরিয়ে দেবে। বলল, ‘বরং জানলার কাঁচ খুলে মাথাটা বাইরের দিকে দিন, যা করার বাইরে করুক। আর চোখেমুখে বাতাস লাগলে ঠিক হয়ে যাবে। আমি গাড়ি আস্তে চালাচ্ছি’। এদিকে এরমধ্যেই আমার জামাকাপড়ের বারোটা বেজে গেছে। ড্রাইভারের কাছ থেকে টিসু নিয়ে যতোটুকু সম্ভব পরিষ্কার করলাম, মেয়েটিও এর মধ্যে অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসছে। ড্রাইভারকে বললাম এক বোতল পানি দাও, ওকে পরিষ্কার করে দিতে হবে। দাদি এক হাত দিয়ে যতোটা সম্ভব ধরে রেখেছে নাতনিকে। ড্রাইভার পানির বোতল এগিয়ে দিল...
আচমকা তীব্র গতিতে ছুটে আসা চোখ ধাঁধানো আলোর ঝলকে সব যেন অন্ধকার হয়ে গেলো। ক্যামেরার ফ্লাশ লাইটের মতো, অতিরিক্ত আলো এসে চোখে পড়লে এরকম হয়। গাড়িটি এলোমেলোভাবে কিছুদূর গিয়ে থেমে গেল। পিছনে বসে থাকা ছেলেটি, যে চোখ বন্ধ করে হেডফোনে গান শুনছিল, কিছু বুঝে উঠার আগেই তার শরীরে আগুন লেগে গেল, হতভম্ব হয়ে বসে আছে। পাশে দু’বোন একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করছিল, দাউদাউ করে জ্বলছিল, জামা-কাপড়, চোখ, চুল। ভয়ঙ্কর শব্দে গ্যাস সিলেন্ডার ফেটে গেল, ফুয়েল ট্যাংকের আগুন একসাথে পুরো গাড়িতে ছড়িয়ে পড়লো। স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি, একে একে সবার শরীরই পুড়তে শুরু করেছে, আমারও। ঝলসে যাচ্ছে চামড়া, খসে পড়ছে মাংস, চর্বি। সবার শেষে উঠা মহিলাটি, যে সবচেয়ে চুপচাপ ছিল, গাড়িতে ওঠার পর একটি শব্দও বলেননি—তিনিও চুপচাপ পুড়ছিলেন। বিষধর গোখরার মতো বাতাসে দুলছিল আগুনের লেলিহান শিখা। সামনে বসা বৃদ্ধ লোকটি অসহায়ের মতো ধুঁকে ধুঁকে পুড়ে যাচ্ছেন। প্রতিবন্ধি নাতনিকে বুকে জড়িয়ে একসাথে ছাঁই হচ্ছেন দাদি-নাতনি দু’জনে। বাতাসে ধোঁয়ার কুণ্ডলি ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। পোড়া মাংসের গন্ধ, গাড়ির টায়ার, প্লাস্টিক, ফোম, পোড়া রংয়ের বিধঘূটে গন্ধে ভারি হয়ে উঠছে আশপাশের বাতাস। আমি চুপচাপ দেখছি। একেবারে ছাঁই হয়ে আগুন নিভে যাওয়ার আগে একটা দু’টা করে গাড়ি জমা হচ্ছে দু’পাশে। গাড়ি থেকে নেমে দূর হতে দেখছেন কেউ কেউ, হয়তো ফোন করছেন জরুরী সেবায়। খুব মনযোগ সহকারে মোবাইলে ভিডিও করছেন ক’য়েকজন।
আগুন প্রায় নিভুনিভু, এমন বৃষ্টিভেজা ঠান্ডা ঠান্ডা দিনে দূর হতে আগুনের হালকা আঁচ আমি বেশ উপভোগ করছি। কেউ একজন আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, ‘আপনার গোফগুলো সুন্দর ছিল, পুড়ে গেল’। মুচকি মুচকি হাঁসছেন ভদ্র মহিলা, হ্যাঁ ইনি সবার শেষে গাড়িতে ওঠা সেই মহিলা। আমি হেসে উত্তর দিলাম, ‘আপনার বাসন্তী শাড়িও’। ডানে বাঁয়ে তাকিয়ে দেখি বাকিরা সবাই আছে, চুপচাপ শুনছেন উনাকে। উনি ডির্ভোসী, স্বামী একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বিদেশে চলে গেছে। ছেলেটার একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ হবে, তাই এ নিয়ে এখন আর তেমন আফসোস হয় না। ওর বয়স এখন এগারো হওয়ার কথা, মায়ের কথা নিশ্চয়ই জানতে চায়। পরিবার বলতে আর তেমন কেউ নেই, ডির্ভোসের পর আত্মীয় স্বজনরা কেউ আর খোঁজ রাখেননি। বন্ধু-বান্ধব, পরিচিত জনরা দায়িত্বের ভয়ে কাছে ঘেঁষে না। একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় চুক্তি ভিত্তিক কাজ করেন। স্বামী পরিত্যাক্তা মধ্য বয়সী নারীরা সমাজে একাকী বসবাস করলেও তাদের জীবন ঠিক নির্জন না। এ শহরে একা একা লড়াই করে বেশ বেঁচে ছিলেন, এখন মরে গিয়েও বেশ আছেন।
বাম পাশের বয়স্ক ভদ্র মহিলা বলতে শুরু করলেন, সাংসারে আমরা দু’জন ছিলাম ভাঁড়ার ঘরের অব্যবহৃত পুরাতন ঘটিবাটির মতো। দাদি-নাতনি এক কোনে পড়ে থাকতাম, কারো কখনো প্রয়োজনও হতো না, খোঁজও নিতো না। আমার ছেলের আরো তিনটা সন্তান আছে, সংসারে লোকের অভাব নেই, দু’য়েকজন কম পড়ল কিনা খোঁজ নেয়ার সময় কই। মাসের কেবল একটি দিন আমাদের সুখ ছিল, আজকের মতো। নাতনির প্রতিবন্ধি ভাতা তুলতে ব্যাংকে যেতাম যেদিন—সেইদিন। মাঝে মাঝে ভাতা তুলে মেয়ের কাছে চলে যেতাম, মেয়ে-জামাই গাজীপুরে একটি কারখানার শ্রমিক, দুই এক দিন যত্নও করতো। তারপর বিরক্ত হওয়ার আগে আমরা আবার ফিরেও আসতাম।
সামনের সিটের বয়স্ক ভদ্রলোকের ছেলে মেয়েরা পরিবার নিয়ে বিদেশে থাকেন। চাকরি হতে অবসরের পর নিজের বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী ভালোই ছিলেন। হঠাৎ করে স্ত্রী মারা গেলেন, ছেলেটা এসে বাড়িটা ডেভোলাপারকে দিয়ে গেল, আর উনাকে দিয়ে গেল বৃদ্ধাশ্রমে। মাসে নিয়ম করে এক দুইবার খোঁজ নেয়, আশ্রমের খরচও পাঠিয়ে দেয়। এখানে উনি ভালোই আছেন, একা থাকতে হচ্ছে না। আজ খুব সকালে বেরিয়েছেন, বৃষ্টির দিন তাই তখনো কেউ বিছানা থেকে ওঠেনি। পেনশনের টাকা কটা তুলে আশ্রমের সবার সাথে একবেলা ভালোমন্দ খাবার ব্যবস্থা করবেন। প্রতি মাসেই তাই করেন।
পিছনের ছেলেটা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র। সম্ভ্রান্ত পরিবারের একমাত্র ছেলে, বাবা গ্রামের স্কুল শিক্ষক। হাইস্কুলে গণিত পড়ান। ছেলেকে শহরে পাঠিয়েছেন উচ্চ শিক্ষার জন্য। মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয় বাবা-মায়ের সাথে। মেসে থাকে, বিভিন্ন বয়সি কয়েকজনের সাথে। কেউ ছোট চাকুরিজীবী, কেউ দোকানের কর্মচারি, ছাত্র আছে দু’য়েকজন। কারো সাথেই তেমন গভীর সম্পর্ক নাই। ভার্সিটির যে বড় ভাইয়ের মাধ্যমে এ মেসে উঠেছে তিনিও দু’তিন মাস আগে চলে গেছেন, এখন আর যোগাযোগ নেই। উনার পড়াশোনা শেষ, ছোটাখাটো একটা চাকরি জুটিয়েছেন কোনমতে। অফিস থেকে এ জায়গাটা দূরে, তাই অফিসের কাছে আরেকটা মেসে উঠেছেন।
মেয়ে দুইটা সড়ক দূর্ঘটনায় মা-বাবাকে হারিয়েছে বছর দুই আগে। একমাত্র বড় ভাই ইউরোপে পড়াশোনা করতে গিয়ে, বিয়ে করে সেখানেই স্থায়ী হয়েছেন। মা-বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে দেশে এসেছিলো। বোনদের হুট করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, চাচা-চাচির কাছে রেখে গেছেন। চাচা-চাচি অনুরোধের ঢেকি গিলেছেন মাসে মাসে মোটা অংকের খরচের টাকা পাওয়ার লোভে। বাবা-মা সহ ওরা উত্তরায় থাকতো, সঙ্গত কারণেই দু’জনের স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ও উত্তরায়। প্রতিদিনই দুই বোন একসাথে যাওয়া আসা করে। ওদের খালার বাসা স্কুলের কাছে, মাঝে মাঝে খালার বাসায়ও থেকে যায়।
প্রায় ঘন্টা দু’য়েক পোড়ার পর আগুন নিভে গেছে, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসলো। পুলিশ এসে আমাদের খসে পড়া মাংসের পুড়ে যাওয়া ছাঁই হাতড়ে অবশিষ্ট ক’খানা হাঁড় একে একে লাশের সাদা ব্যাগে ভর্তি করছে। দাদি-নাতনি ও পেছনের সিটের মেয়ে দুইটাকে আলাদা করা গেলো না। সাতটা ব্যাগে আমাদের নয়টা খুলি আর অবশিষ্ট হাঁড়গোড়গুলো ঢুকানো হলো, সারিবদ্ধভাবে গাড়িতে উঠিয়ে মর্গে নিয়ে যাওয়া হলো।
বেশ ভাইরাল হয়েছে আগুনের লেলিহান সুখ। অন্তর্জালবাসীদের কফির কাপে, ডিনারের টেবিলে আমাদের হাঁড় পোড়া ছাইয়ের স্মোক। জমজমাট রিচ, ভিউ, লাইক, কমেন্ট। পুলিশ কর্তাদের গলধঘর্ম অবস্থা। দুইদিন ধরে মর্গে পড়ে আছে আমদের আধপোড়া হাঁড়গুলো, সৎকারের তাড়া নেই। আমাদের মাঝে হামিদ মিয়া, আমাদের ড্রাইভার, গাড়ির নম্বর প্লেট দেখে তার পরিচায় সনাক্ত করা গেছে। টিভির স্ক্রলে লেখা উঠছে, গত বুধবার রাজধানীর উত্তরাগামী ফ্লাইওভারে আনুমানিক সকাল আটটায় একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে বজ্রপাতে দগ্ধ হয়ে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। গাড়ির ড্রাইভার ছাড়া বাকি আটজনের কারো পরিচয় সনাক্ত করা যায়নি, পরিবারের সাথে কথা বলে জানা গেছে তিনি একটি বেসরকারি কারখানার কর্মকর্তাদের প্রতিদিন আনা নেওয়া করতেন। তার কারখানায় ফোনে যোগাযোগ করেলে কর্তৃপক্ষ জানায়, গাড়িটি মেরামতের জন্য গ্যারেজে নেওয়ার কথা ছিল, তাই বদলি হিসাবে অন্য আরেকটি গাড়ির ব্যবস্থা করেছে কর্তৃপক্ষ। এ ব্যাপারে তারা আর কিছু জানেন না। এদিকে হাসপাতালের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা যাত্রীদের মরাদেহের নমুনা প্রাথমিকভাবে বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে দু’জন বৃদ্ধ পুরুষ-মহিলা, দু’জন মধ্যবয়সি নারী-পুরুষ, দু’টি যুবক-যুবতি, একটি কিশোরী ও একটি শিশু ছিল। গাড়িটিতে দগ্ধ হওয়া যাত্রীরা সবাই একই পরিবারের সদস্য হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডিএনএ টেস্টে বিস্তারিত জানা যাবে।
আপনারা নিশ্চয় ভাবছেন, লোকটা সবার বিষয়েইতো বিস্তরিত বলল, নিজের কথা কখন বলবে? আমার নাম পরিচয় জানতে অপেক্ষা করছেন উৎগ্রীব হয়ে। বিশ্বাস করেন, মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও আমার তেমন কোন পরিচয় ছিল না। হ্যাঁ, সংসারে এরকম পরিচয়হীন কেউ কেউ থাকে, যারা সারাজীবন আরাধনায় থাকে নিজের পরিচয়ে বাঁচতে। কিন্তু আমি, মৃত্যুর পর এখন এই অজ্ঞাত মৃতদের পরিবারের আমিও একজন। এই পরিবারে আরো দুইজন সম্মানীত বয়োজেষ্ঠ আছেন, দায়িত্বশীল গৃহকর্ত্রী আছেন, দু’টি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো যুবক-যুবতী, চঞ্চলা হরিণীর মতো কিশোরী ও একটি মায়াবী দেবশিশু আছে। এই পরিবারে সবাই সবাইকে নিজেদের দুঃখ বলতে পারে এবং সকলেই তা মনোযোগ সহকারে শোনে। এই পরিবারে সুখ আছে।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন