কফি হাউসের আন্তিগোনে
১
কত দিন পর মনে হল একটা অন্য জগতে এলাম। পাড়াগাঁয়ের মানুষ, কলকাতায় কদাচিৎ আসা হয়। পৈতৃক চাষাবাদ আর কয়েকটি টিউশানি করে আমার চলে যায়। যৌবনে ওই গ্রামে আমি ছিলাম একমাত্র স্নাতকোত্তর পড়ুয়া। সেই সময় কবি হবার অনেক ব্যর্থ চেষ্টা করেছি। কবিতা আর না লিখলেও সাহিত্যিকদের সঙ্গে আড্ডা মারার অভ্যাস ছাড়তে পারি না। কলেজ স্ট্রিটে অনেকদিন পর এলাম আমি। বন্ধুবর এবং পত্রিকা সম্পাদক তমোনাশের ডাকে। তিনবার পত্রিকা প্রকাশ হয়—বইমেলায়, নববর্ষে আর পূজোসংখ্যা। আজ তার শারদীয়া সংখ্যা বেরুবে। পাঠকসংখ্যা যাই হোক, উৎসাহ অপরিসীম। এটাই ভাল লাগে।
বহু আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় কফি হাউসে এসেছিলাম। আজ এসে যা আমাকে মুগ্ধ করল তা হল জনসমাগম। একতলা বা দোতলায় পা রাখার জায়গা নেই, চেয়ারে বসার জায়গা নেই, টেবিলে কফির কাপ রাখার জায়গা নেই! খাবার নাম করে চেয়ারে বসলেও, টেবিলটা মাঝে রেখে আদানপ্রদান চলছে। প্লেটে মোটা পাউরুটির ওপর এক চিলতে মাখন। খাওয়ায় মন নেই কারো। ত্রিশের নিচে কিছু ছাত্রছাত্রী আর ষাটের ওপর কিছু সাহিত্যপাগল মানুষ। পত্রিকাটি হাতে নিয়ে যখন লেখকদের ছবি তোলার পালা চলছে, আমার তখন হঠাৎই চোখে পড়ল পাশের টেবিলে একটি মেয়ে সিগারেট ধরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে। কোথাও দেখেছি দেখেছি মনে হচ্ছে। আবার চিনতে পারছি না। আলোছায়ার ব্রিজটা পেরিয়ে যেতে পারছি না। মেয়েটি তরুণী—মুখে লাবণ্য ছড়িয়ে আছে।
কোথায় দেখেছি?
আজকাল মফঃস্বলের মেয়েরাও দেখি শহরে এলে মলে বা সিনেমা হলে বা কখন কখন অফিস থেকে বেরিয়ে সিগারেটে এক টান দিয়ে দেয়। পুরাতনী বলুন আর জ্যাঠামিই বলুন, আমার কাছে কেমন দৃষ্টিকটু লাগে। তমোনাশ বলে, তুই এখনো সেকেলই রয়ে গেলি শুভ। আমি তাকে বুঝিয়ে পারি না, যে তামাক খাওয়া শরীরের পক্ষে ভাল নয়। এটা কেবল নেশামাত্র। আধুনিকা হতে গেলে এটা কেন লাগবে? যাই হোক, মেয়েটির পরিচয় জানতে চাওয়ার আরেকটি কারণ, তমোনাশ আমাকে একটা বিশেষ কাজ দিয়েছিল। বলেছিল, শুভ তোকে একটা গল্প দিতে হবে বইমেলা সংখ্যায়। একটা চরিত্র খোঁজ। ধরুন ওই মেয়েটিকে যদি আমরা সেই বিশেষ চরিত্র হিসেবে ভাবি, তবে আমরা ওর একটা নাম ঠিক করব। ধরুন, তা হল সমাদৃতা।
কিন্তু পরিচয় একটা হয়ে যায় যখন মেয়েটি পাশের টেবিল থেকে আমাকে অন্য একটি টেবিলে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলে,
—আমাকে খুঁজছিলেন? আমি সমাদৃতা।
অবাক হয়ে যাই। কথা খুঁজে বলি,
—আচ্ছা সমাদৃতা, তোমায় তুমি বলছি, কারণ তুমি আমার থেকে অনেক ছোট।
—আচ্ছা স্যার।
—কফি খাও? কফি অর্ডার করি?
—আরো কিছু নিলে ভাল হয়। সকাল থেকে কিছু খাইনি।
টোস্ট অমলেটের অর্ডার দিলাম। আমার দৃষ্টিতে হয়ত অবিশ্বাস ফুটে উঠেছিল, যা দেখে সমাদৃতা বলল,
—বিশ্বাস করুন সত্যি খাইনি। দাদু আমায় হেট করে। দাদুর সঙ্গে ঝগড়া করে বেরিয়ে চলে এলাম।
দাদু তাকে ঘৃণা করে। বলে কী তরুণী? কৌতূহল হলেও ভদ্রতার খাতিরে রেখে ঢেকে জিজ্ঞাসা করতে হয়। আমি এক প্লেট ডিম টোস্টের অর্ডার দিলাম। কিন্তু খাবার আসতে দেরী হয়, সেই অবকাশে বলি,
—দাদুর সঙ্গে ঝগড়া করাটা তোমার ঠিক হয়নি।
—কেন হয়নি? দাদু আমায় ভালবাসে না।
—কেন বাসে না? তুমি কি একই নাতনী?
—হ্যাঁ। আসলে মা মারা যাবার পর থেকে দাদু আর ভালবাসে না।
মা মারা গিয়েছে শুনে থমকে গেলাম। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম,
—কী নাম তোমার মায়ের?
—অরুণিমা।
একথা সেকথার পর সে একটা গল্প শুরু করল। কিংবা বলা ভাল গল্প নয় একটা জীবনকাহিনী। সাল, তারিখ আর চরিত্র নিয়ে আগুনের একটা আশ্চর্য আখ্যান। এই কাহিনীর শুরু হয়তো বহুবছর আগে, কিন্তু এর প্রথম দৃশ্য হল যেদিন অরুণিমা বাপের বাড়ি ফিরে এল।
২
বাপের বাড়ি ফিরে আসার কারণ ছিল। সমাদৃতাকে নিয়েই ফিরে এসেছিল অরুণিমা। পড়ন্ত বিকেল। জানলার গরাদে একচিলতে রোদ। বাইরে রাস্তায় কেউ রিক্সার ভাড়া নিয়ে বচসা করছে। ধরুণ আমরা দেখছি অরুণিমা বাবাকে বলছে,
—বাপি আমাদের জীবনেই এসব হল কেন বল তো?
অরুণাভ তখন সবে পানীয়ের বোতলটা থেকে হলুদ রঙের তরল পদর্থ কাঁচের গ্লাসে ঢেলে চুমুক দেবার কথা ভাবছিলেন। এই বিশেষ দার্শনিক প্রশ্নবাণে তাঁর উস্কোখুস্কো চুলে হাত দিয়ে, আরো উস্কোখুস্কো করতে করতে বললেন,
—যাক গে ওসব ভেবে কাজ নেই। তুই বরং স্কুলে একটা চাকরির চেষ্টা কর। খাওয়া-দাওয়া কর। মনটা ভাল থাকবে। সমাদৃতাকে এসব নিয়ে ভাবতে দিস্ না।
অরুণাভ পানীয়তে ধ্যানস্থ হয়ে যাবার আগে—যখন মাত্র কয়েক ফোঁটা পেটে পড়েছে, তখন একদম বাস্তবসম্মত উপদেশ দেন। সে কথা অরুণিমা জানে। একটু পরেই তাকে আর চেনা যাবে না। তার জড়ানো কথা আর বোঝা যাবে না—পূর্ণিমা-অমাবস্যা, জল-ডাঙা, দিন-রাত সব এক হয়ে যাবে। হয়তো মত্ত অবস্থায়, নাতনী সমাদৃতাকে বলে বসবেন,
—সমু, দেখ তো বুটটা কোথায় রেখেছি, নাইট ডিউটিতে যাব।
অথচ, এখন তিনি রিটায়ার করে গিয়েছেন। শুধু তাই নয়, কারখানাই গিয়েছে বন্ধ হয়ে!
অরুণিমা কথা বলতে বলতে বথরুমের দিকে চলে যায়। সঙ্গে একরাশ দুদিনের না-কাচা কাপড়। পূর্বা এক্সপ্রেসে ফেরার সময় বড্ড লেট হয়েছে। একটি টি-শার্টে চায়ের দাগই লেগে গেছে। অথচ বড্ড ফিটফাট থাকতে চায় অরুণিমা। বড্ড শৌখিন।
সমাদৃতা তখন সবে ক্লাস এইটে পড়ে। তবু তার মনে হয় মাকে সাহায্য করি, সুটকেস থেকে অন্তত নিজের জামাকাপড়গুলো বের করি। মাত্র দুখানা সুটকেস ও দুটি হাতব্যাগ। এই নিয়েই স্বামীর ঘর ছেড়ে প্রায় এককাপড়ে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে অরুণিমা। সেই সুটকেসের একটি খুলতে গিয়ে দেখে তালাচাবি দেওয়া। সেই সুটকেসে লেখা আছে, নিখিল। যে মানুষটাকে ত্যাগ করে এসেছে তার নাম। অরুণিমা হয়ত কেটে নাম পরিবর্তন করার সময় পায়নি। সমাদৃতা নীল প্যান্ট আর শাদা টি শার্ট পরে। মাথায় বিনুনি। সে তার ঠাকুমাকে ডাকে। কিন্তু তাকে ডাকে নাম ধরে—বলে ডালিয়া। এভাবেই চলে আসছে। কেউ তাতে আপত্তি করেননি বরং ছেলেমানুষের আদরই দেখেছেন। সমাদৃতা বলল,
—ডালিয়া বলো তো মা চাবি কোথায় রেখেছে।
—মা বাথরুম থেকে বেরুলে দেবে।
—মা চাবি রেখে দিল, আমাকে বলল না। মা কি আমায় বড় হতে দেবে না?
—বড় হওয়া কি কেউ কী কারো আটকাতে পারে? সময়ই মানুষকে বড় করে।
এত কথা বোঝার অবস্থা সমাদৃতার নেই। সে এদিকে ওদিকে খুঁজে মায়ের হাত ব্যাগ থেকে একটি চাবির গোছা বের করে। একটার পর একটা চাবি লাগাতে লাগাতে, একটি ছোট্ট বিবর্ণ চাবিতে খুলে যায় তালা। ডালিয়া বলে,
—দেখলি, খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেলি সমু।
—বাবা কবে আসবে ডালিয়া?
কথাটা শুনে উত্তর দেন না ডালিয়া। ‘কি জানি’ উত্তরটাই হয়ত দিলে ভাল হতো। কিন্তু সাহস করে মেয়ে বা নিজেকে নিরাশ করতে পারেন না। নিখিল বিয়ের সময় বলেছিল সে কোন হোটেলে কাজ করে। বিয়ের পরে পরে জানা গিয়েছিল, সে চাকরিটা অস্হায়ী। হোটেলটিরও সুনাম নেই। মূলত পানীয় সেবন করিয়েই মুনাফা। অর্থাৎ কিনা ইংরেজিতে যাকে ‘বার’ বলে। মাদকও চলে, এমনই বুঝেছিল অরুণিমা। সুতরাং নতুন জামাই কোন অন্ধকার কক্ষে দীপ জ্বালাত তা বুঝতে বুঝতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল ডালিয়ার। ততক্ষণে মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। সন্তানসম্ভাবাও হয়ে গিয়েছে। পুলিশ রেইডে পানশালা বন্ধও হয়ে যেত মাঝে মাঝে। রফা হলে ফের খুলে যেত।
৩
জিজ্ঞাসা করলাম, অরুণিমা বাপের বাড়িতে ফিরে এল। দাদু দিদিমার কাছে তো ছিলে সমাদৃতা। বাবাকে মিস করনি?
—বাবা আমায় ফোন করেছে। মা ধরতে দেয়নি।
সমাদৃতার চোখের তলায় অপরিণত অন্ধকার। তার মন বোঝার জন্যে জিজ্ঞাসা করি,
—তুমি কি বাবাকে ফোন করার চেষ্টা করেছিলে?
—আপনাকে বলব কেন? গল্পে আমার প্রতি কোন অনুকম্পা দেখাবেন না।
—মনে হচ্ছে করেছিলে। সঠিক বল।
—স্কুল ফ্রেন্ডের ফোন থেকে করেছিলাম। কেন করব না? বাবা বা মা হারানো—এটা যেন এক কাপড়ে চলে আসা রিফিউজির থেকেও খারাপ। ঘুর্ণিঝড়ে ছাদ ভাঙার দূঃখ কী বুঝবেন? বাবা বলেছিল, চলে আয়, নয়ত আমি গিয়ে তোকে নিয়ে আসব।
—মাকে বলেছিলে?
—না, কেন বলব? মা আর আমার বাইরে যে একটা জীবন আছে, অ্যাডোলেসেন্স থেকেই বুঝতে পারছিলাম। সব কথা সবাইকে বলতে নেই। এই যে সব কথা আপনাকে বলছি দাদুকেও সে কথা বলিনি। মা চাকরি পেয়েছিল। মিশনারি স্কুলে ইংরেজি শিক্ষিকার চাকরি। কেন্দ্রীয় বোর্ড। মাইনে সামান্যই। তারপরই ঘটল ঘটনাটা। বাবা বিচ্ছেদ চাইল। ডালিয়ার কথায় মা বলল, দেব না। মেইন্টেনেন্স দিতে হবে।
—ডালিয়া, মানে—
—হ্যাঁ দিদা। আসলে দিদাই আমায় সবচেয়ে ভালবাসত। মায়ের চেয়েও যেন বেশি। সেই ডালিয়ার সঙ্গেই কথা বলত আমার বাবা। রাতে বাবা যখন ড্রিঙ্ক করে বাড়িতে আসত, খালি ঘরগুলো দেখে মনে পড়ত ঘর ভেঙে গেছে। তখন ফোন তুলে ডালিয়াকে অকথ্য ভাষায় আক্রমণ করত। একদিন দেখি ডালিয়া চেঁচিয়ে বলছে—অরুণিমাকে মেরে মেরে পিঠে দাগ করে দিয়েছো, তোমার লজ্জা করে না নিখিল?
—মাকে করত না?
—না।
—তোমাকে?
—না। আমি করতাম। করলে একই কথা বলত। একটা ফ্ল্যাট দেখেছি। কেনা হয়ে গেলেই তোকে গিয়ে নিয়ে আসব। দিল্লীতে ইন্ডিয়া গেটের আইসক্রিম খুব ভাল।
—কিন্তু মাকে কেন ফোন করত না?
—কী জানি।
মনে হয় কিছু যেন লুকোতে চাইছিল সমাদৃতা। চারিদিকে মানুষের মেলামেশার শোরগোল। গাঢ় লাল পাগড়ির সাবেকী সাজে ওয়েটারদের ঘোরাঘুরি। অদূরে ছবি তোলার মাঝে মাঝে আমার প্রতি তমোনাশের বক্রদৃষ্টি। তার মধ্যে থেকে অন্ধকারের দিকে চোখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল সমাদৃতা। সে যেন কবিতার আলোছায়ার মত কিছুটা বলে, কিছুটা বলে না। ভাবায়। কল্পনা করায়। কথায় কথায় সে বলেছিল, সে সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী। হয়তো সে বুঝতে পারছে সমাজ, পরিবার, মানুষ আর প্রাণের ভাঙন। কিন্তু পড়া এক আর নিজে তার শিকার হওয়া আর। সেই জন্যে সে যেন নৈঃশব্দ্য দিয়ে আপনাকে ঢাকতে চাইছিল। ছাইদানির দিকে চেয়ে ভাবছিল। আমি সামনে থাকায়, আধপোড়া নিভে যাওয়া সিগারেটটা ধরা ছিল তার বাঁ হাতে। আমি তার কেউ নই, তবু মুখে সিগারেটটা দিতে পারেনি। এভাবেই হয়তো সম্পর্ক তৈরি হয়। যে টানাপোড়েনে সমাজ চলে, এভাবেই তার সৃষ্টি হয়।
৪
বাবা আসছে।
খুশির বদলে কোথাও যেন অবিশ্বাস আর শঙ্কা কাজ করছে। অরুণিমাকে কী জোর করে নিয়ে যাবে নিখিল? তা কী সম্ভব? অরুণাভ পারিবারিক উকিল সজলবাবুর কাছে যাবার কথা বললেন। কিন্তু স্বামীর মানসিক স্থিতির ওপর তেমন ভরসা ছিল না ডালিয়ার। স্বামীর সঙ্গে গেলেন তিনিও। প্রায় ছ’মাস ধরে মাঝে মাঝেই তাঁর কাছে যেতে হচ্ছিল বিবাহবিচ্ছেদ, খোরপোষ আর সন্তানের কাস্টডির ব্যপারে। সজলবাবু আশ্বস্ত করে বললেন, আজকের দিনে জোর করে কিছু করা যায় না, ছল করে করতে হয়। কী ছল করবে বাড়ির সবাই তাই ভাবছে। বোর্ডের পরীক্ষা ছিল সমাদৃতার। সে আর ভাবতে পারেনি। কেবল ঘুমের মধ্যে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখেছিল। নিখিল তাকে আইস্ক্রিম খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছে, কিন্তু সেটা যখন হাত থেকে নিতে যাবে তখন যেন মনে হল এই হাতটা মানুষের নয়।
বোর্ডের পরীক্ষা দিয়ে অরুণিমার সঙ্গে ফিরেছে সমাদৃতা। ফিরে স্নান করতে গিয়েছে অরুণিমা। বন্ধ দরজা দিয়ে আসছে জলের শব্দ। সমাদৃতা পরীক্ষার প্রশ্নপত্রটা ফের বের করে দেখছে। ডালিয়া রান্নাঘরে খাবার গরম করছেন, অরুণিমা বেরুলে সবাই খেতে বসবেন। অরুণাভ আগের দিন শোবার আগে একটু বেশি মদ্যপান করে ফেলেছিলেন। তাই উঠতে দেরি হয়েছিল। চোখে এখনো তাঁর ঘুম কাটেনি।
কলিং বেল বাজে।
যাই বলে ডালিয়ে গেলেন খুলতে। ভেবেছিলেন কোন ডেলিভারি বয় এসেছে। অরুণিমা তো কত শৌখিন কিছু অনলাইনে অর্ডার করে। সাবধানতার জন্যে প্রতিবারই তিনি দেখেন, কেবল সেবারে আর দরজার ছিদ্র দিয়ে দেখলেন না। দরজা খুলতেই—
কালো আলখেল্লার মত পোষাকে, দাড়ি না কামানো অবিন্যস্ত কেশ, মাঝারি উচ্চতার, যে মানুষটা দাঁড়িয়ে—সমাদৃতা তাকে এই রূপে কখনো দেখেনি। পুরোণ চোখটার মধ্যে ঘৃণা আর অস্হিরতা জ্বলজ্বল করছে। কর্কশ স্বরে নিখিল বলল,
—মেয়েকে ডাকুন। মেয়ে কোথায়?
ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করে কাঁপা কাঁপা গলায় ডালিয়া বললেন,
—কেন? কী চাই তোমার?
—কেন? দুশ্চরিত্রা! তোর ইতিহাস আমি জানি না নাকি? যৌবনে বাড়িতে কীসের সভা বসাতিস? প্রতি সন্ধ্যায়, কার টানে বাইরে এখানটায় অতগুলো জুতো পড়ে থাকত বড় বড় অফিসারদের। কে সন্ধ্যে নামার আগেই স্বামীকে মদ খাইয়ে বেঁহুশ করে রাখত, নিজের ঘরে মক্ষীরাণীর আসর বসাবে বলে? কে, বল কে? এমন নোংরা ফ্যামিলি জানলে তোর মেয়েকে বিয়ে করতাম না। আমার দাদা সেন্ট্রাল গরমেন্টের অফিসার।
মা-পাখি যেমন সন্তানকে রক্ষা করে তেমনি দুহাত দিয়ে দরজা আগলে দাঁড়িয়ে ডালিয়া। স্নানঘরে জলের শব্দ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ভিতরে ভয়ে কাঁপছে অরুণিমা। পিছনের ঘরের দরজা দিয়ে মুখটা বাড়িয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অরুণাভ বলছেন,
—এসব কী হচ্ছে। পাড়ার লোক কী ভাববে?
ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে সমাদৃতা।
ঠিক তখনই মাংস কাটার ছুরিটা আলখেল্লার ভিতর থেকে বের করে নিখিল। বাঁটটা শক্ত করে ধরা ডান হাতে। এতদিনের জমে থাকা ঘৃণার পূর্ণ প্রস্তুতিটা যেন আসুরিক শক্তিতে ছুরিটাকে ডালিয়ার পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। তারপর দেয় মোচড়। কোন কথা বলার সময় পান না ডালিয়া। মুহূর্তগুলো অভিযোগ নালিশের বাইরে বেরিয়ে যায়। একটা পতনের শব্দ পঁচিশের বি ফ্ল্যাটের চৌকাঠকে মুখরিত করে। একটা রক্তাক্ত বুট বাইরে অপেক্ষামান একটি গাড়িতে উঠে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যায়।
৫
সমাদৃতা স্বগোতক্তির মত করে। যেন কাউকে কৈফিয়ত দিচ্ছে।
—ব্যাপারটা এত নিমেষের মধ্যে হয়ে গেল যে আমরা কিছু বুঝে উঠে, হাসপাতালে নিয়ে যাবার আগেই সব শেষ। ডালিয়া বীরাঙ্গনার মতো মারা গিয়েছে। ঝাঁসি কি রানী!
—তারপর?
—পুলিশ মোবাইলের টাওয়ার লোকেশান দিয়ে হোটেলটা খুঁজে পেল। যতক্ষণে রুমে ঢুকেছে ততক্ষণে ওদিকেও সব শেষ। সিলিং ফ্যানের আংটা থেকে বাবার বডি ঝুলছে। বোধ হয়, ব্যাগে মাদকও পাওয়া গিয়েছিল। আমি অবশ্য সেখানে যাইনি। কেবল মনে আছে আমার মা আমাকে আর কিছু বলার অবস্হায় নেই। দুজনের পোস্টমর্টেমের পর এক দূরসম্পর্কের মামা আমাকে কান্নার মধ্যেই একটা গাড়িতে করে শ্মশানে নিয়ে এসেছিলেন। বাবার ব্যান্ডেজে মুখ বাঁধা শরীরটা আর ডালিয়ার রক্তশূন্য মুখের মুখাগ্নি কিভাবে যে আমি করলাম তা আর আজকে বলতে পারব না। কিন্তু একজন জোয়ান পুরোহিত আমার হাত ধরে গঙ্গার কাদামাখা ঘোলা জলে অস্থি ভাসাতে গিয়ে নিজেই পা পিছলে পড়ে গিয়েছিল, সেটুকুই মনে আছে। আমিই তাকে বলেছিলাম— লাগেনি তো!
চোখের সামনে এক ঘন্টার মধ্যে দু-দুটো মৃত্যু! এ যেন প্রাচীন গ্রিক ট্রাজেডির উপ্যাখ্যান শুনছি। আন্তিগোনেও এমন বিভৎস মৃত্যুকাহিনী ছিল না।
আমি সমাদৃতাকে জিজ্ঞাসা করি,
—কিন্তু তুমি বলছিলে দাদু তোমায় হেট করে!
—তা ঠিক। এটা আমার মনে হয়। তিনি তো কখনো বলেননি, আই হেট ইউ।
—কেন এরকম মনে হল?
—এক বছর কীভাবে যে গেল। মৃত্যুর মধ্যে বোর্ডের পরীক্ষা আর আমার দেওয়া হল না। পরের বছর প্রাইভেটে ওপেন স্কুল থেকে দেবার প্রস্তুতি নিলাম।
এবার সমাদৃতা থাকতে না পেরে সিগারেট ধরায়। চাকা চাকা ধোঁয়া ওপরে উঠে যায়।
—একবছর যেতে না যেতে মায়ের আপেন্ডিসাইটিস হল। পেটে খুব ব্যাথা। ডাক্তার বলল, সংক্রমণ ছড়িয়ে সেপটিসিমিয়া হয়ে গিয়েছে। এই তো সেদিন স্কুল থেকে ফিরল, ক্লাস ফাইভ পড়িয়ে। আমিই গাড়ি ভাড়া করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। ওষুধ কেনার জন্যে সেই মামার কাছে ধারও করেছি। দাদুকেও নিয়ে যেতাম। তবে দাদু হাসপাতালে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারতো না। বিকেল হলে যখন বেরিয়ে মাকে দেখতে যাচ্ছি, তখন দেখতাম ঘরে একটা নীল লো পাওয়ারের আলো জ্বালিয়ে, হাতে পানীয়ের গেলাস নিয়ে দাদু বসে আছে। আমাকে দেখে মাথা নাড়াত আর বলত, যা যা দেখ্ এবার কিছু করতে পারিস কিনা। আমার তো একটাই মেয়ে। তাকে যদি বাঁচাতে পারিস তো দেখ। তোরা দিল্লি থেকে আসার পর জীবনটাই ছারখার হয়ে গেল।
৬
—আজ রাত কাটবে কিনা সন্দেহ।
বিহ্বল হয়ে চেয়ে থাকে সমাদৃতা। এ যেন খড়কুটোহীন স্রোতে ভেসে যাওয়া। যে মেডিকেল অফিসার বলছেন, তার কর্মব্যস্ততার মধ্যে আর কিছু জিজ্ঞাসাও করা যাচ্ছে না। প্রায়সই হাঁটতে হাঁটতে কথা বলেন। দ্বিতীয় প্রশ্ন করলে গম্ভীর চোখে তাকান। সমাদৃতার একমাত্র সহায় তার মামা, ডালিয়ার দাদা কুমারেশ। কুমারেশ এ কথা শুনে বলে,
—চল সমু, সামনের দোকান থেকে কচুরি খাবি চল। গত তিনদিন থেকে নাওয়া-খাওয়া নেই। দুঃখ জীবনে থাকবেই। তা হলে কী ভেঙে পড়লে চলবে? আমার পাকা চুল কবে থেকে, আমারই যাওয়ার কথা; তা না হয়ে অরুণিমা মাত্র একচল্লিশ বছর বয়সেই—
—মার কি কোন আশাই নেই?
কথাটির কোন উত্তর কুমারেশ দেন না। তারও বোধ হয় মনে হয়েছে, আসন্ন মৃত্যুর কথা আলোচনা করে মন ভারাক্রান্ত করে উপকার কিছু নেই। যখন যা হবার হবে। তখন ওটুকু কেঁদে নিলেই হবে। প্রধান বিল্ডিংয়ের সামনে অনাদরের উদ্যানটিতে চাদর পেতে বসে থাকা ভিড়টাকে সরিয়ে সরিয়ে ওরা চলছে। বিকেলের সূর্য ঢলে পড়ছে পশ্চিমপ্রান্তে। মাঠের কোনে একটি ক্যানাগাছে তার আলো পড়েছে। তার দিকে দেখিয়ে বলেন,
—ফুলটা শুকিয়ে আসছে, শুকিয়ে যাবে। তার জন্যে দুঃখ করিস না।
—এসব কথা বোল না, ভাল লাগে না। মা তো। আমারই তো মা। দূঃখ করিস না বললেই হল।
অনেক লড়াই করেছিল অরুণিমা। ভেন্টিলেটরে যাবার পরও আরো দুটো দিন। তারপর যখন রোগভোগে শীর্ণ দেহটা নিয়ে গাড়িটা বেরিয়ে যাচ্ছে তখন সমাদৃতা বলেছিল,
—মা গুডবাই।
তবু কুমারেশই ঠেলে ঠেলে অরুণাভকে শ্মশানঘাটে নিয়ে এসেছিলেন। বটগাছতলায় বসে টাল রাখতে পারছিলেন না। তখনও তার চোখ ঢুলু ঢুলু। মুখে পানীয়ের গন্ধ। উদাসি হাওয়ায় তার চুল উড়ে উস্কোখুস্কো হয়ে যাচ্ছিল। কলপ উঠে এখন চুল সম্পূর্ণ শাদা। স্ত্রীর মৃত্যুর পর আর কলপ দেননি। সামনে শীর্ণ গঙ্গা। একটা শঙ্খচিল উড়ছে—তার ছায়া পড়েছে জলে। সেই ছায়াটার দিকেই তাকিয়ে ছিল সমাদৃতা। কিন্তু তার দিকে একবারও তাকাননি অরুণাভ। একটা চাপা আক্রোশ যেন তাকে অস্হির করে রেখেছে।
৭
সমাদৃতা বলল,
—দাদু কিন্তু একবারও বলেনি, তুই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা। কিন্তু কেবল একটি কি দুটি বাক্য বলে। আমি পড়াশোনা করি কি না-করি, আমি স্মোক করি কি না-করি, আমি বাড়ি ফিরি কি না-ফিরি; ওঁর কিছু এসে যায় না। পেনসনের যেটুকু ব্যাংকে আছে সেটুকুও খরচ করেন না সংসারে। আমি টিউশানি করে সংসার চালাই।
—কি করেন পেনসনের টাকায়?
—কেন?
সমাদৃতা দুদণ্ড চুপ করে থাকে, যেন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তারপর বলে,
—বিয়ারের বোতল তো আছে। সেটা তো কিনতে হয়। ওই টাকাটা সেই জন্যে।
কিছুক্ষণ থেকেই সে উশখুশ করছে, কোমল হাতে সরু ব্যান্ডের ঘড়িটা দেখছে। তার কি কোথাও যাবার আছে? আমি জিজ্ঞাসা করি,
—টিউশানি আছে?
—হুঁ।
না, টিউশানির জন্যে তারুণ্য কি এত অন্যমনস্ক হয়? সে আমার টেবিল থেকে উঠে পাশের টেবিলে যায়। সেখানে বাতানুকুল লোকাল ট্রেন, উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে উপযোগী কিনা সেই সংক্রান্ত তর্ক-বিতর্ক চলছে। তার মধ্যে থেকে নিজের বই দুটি তুলে নেয়।
—আসি।
এই বলে সে মাথা নেড়ে এগোয় দরজার দিকে। সিঁড়ি দিয়ে সে নেমে যাচ্ছে। তার জন্যে কি কোন কলেজের বন্ধু অপেক্ষা করছে। পুরুষ কিংবা নারী? আমার চোখে সেসব ছবি ভেসে উঠছে। টি শার্ট পরা এক যুবকের মুখ যেন আমি দেখতে পাচ্ছি মানসপটে। মৃত্যু দিয়ে গল্পের শেষ বড্ড সহজ, এ পরিণতি আন্তিগোনের গল্পের জন্যে নয়। গায়ে শাদা গেঞ্জি, জিন্সের নীল প্যান্ট, ডান হাতে একটা সিগারেট, বগলে ম্যাক্স ওয়েবারের সমাজবিজ্ঞানের বই আর হাতে মোবাইল ফোন। এই হল সমাদৃতা, আমার আন্তিগোনে। সে হয়তো কোন সমাজ পাল্টাবে না, কোথাও যুদ্ধ করবে না—সমাজের গভীর অন্ধকার ক্ষতগুলো নিভৃতে বয়ে নিয়ে যাবে। তাকে কফি হাউসে দেখা যাবে, কলেজ স্ট্রিটে, বাসে, লোকাল ট্রেনে দেখা যাবে—ইডিপাসের থিবিসের থেকে স্থান কালে বহুদূর। ওই যে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতে যেতে ফোনে কাউকে ডাকছে। কোথায় যাবে সে? কার সঙ্গে যাবে? এই নিয়ে বইমেলা সংখ্যার গল্পটা শুরু হোক।


আপনার মন্তব্য প্রদান করুন