যেদিন বেরিয়ে যাবো ও অন্যান্য কবিতা

অ+ অ-

 

ভাঙা শব্দের ভেতরে

এই কথাই শেষ কথা নয়। দুরন্ত ঘোড়ার পিঠে চড়ে
দুই জনপদের দূরত্ব—স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়।
কারও এক কথাতেই কি স্বপ্নগুলো চোরাবালিতে
মুক্ত করে দেবে জীবনের বালুচর?

চার দেয়ালের কথা শুনতে শুনতে শিল্পীরা ছবি
আঁকে—ময়ূর আর গোলাপের। স্কুলের বইখাতা
ফেলে কবিতার বুকে রঙিন কাগজের ফুল তুলে—
এভাবেই তো বাগানের জন্ম শুরু।
সবার অগোচরে দুই হাত সরিয়ে প্রাচীন শহর
থেকে ছুটে এসে রাত—বাসস্ট্যান্ড থেকে কে
আমায় বুকে টেনে নেবে? কার অপেক্ষায় থেকে
ছিন্ন সংসার বেলা শেষে সেলাই করতে বসে
মন। যদি জোড়া লাগে কোনোদিন—
শেষ কৃত্যের জলে ভাসা মরীচিকা-জীবন।

ধুলো পড়া দেয়াল জানে—এ ছবি মুক্তির, এ ছবি
বিরহ-প্রেমের। মনে করে দেখো—দিন বদলের
দিনগুলোতে প্রবল বাতাসে শিমুল-তুলোর গাছগুলো
আমাদের চুপ-কথার মতো ভালোবেসে জড়িয়ে
যেত। সমস্ত পতন, দুঃখের জনপদ ভেঙে চন্দন
জলে সোনালী চিবুক ভিজিয়ে বাড়ি ফিরতাম।
মনে করে দেখো—

তুমি চলে যাওয়ার পর প্রতি রাতে আকাশের উল্টো
দিকে ফিরে নিকষ চাঁদের কষ্ট নিয়ে ডং ডং ডং ডং
শব্দে—শব্দহীন মহাকাশ বাজে, বাজে হারানো
জীবনের সুর। আমি এ পাশ ফিরে কান পেতে শুনি
পুরনো সংসার, সম্পর্ক, উচ্ছ্বাস, মুছে যাওয়া দিনগুলো।
মধ্যরাতের চিঠি খুলে দেখা গেল এসবের কোনো
কিছুই আর আমাদের নয়।


একেবারে বিদায় বলো না

একেবারে বিদায় বলো না,
তুমি জানো না ছায়া লেবাস উপড়ে এখন দুপুরেও ঘন
হয়ে উঠে মনে রাতের পশম, নামি দামি ফুল-পাঁপড়ি
ছিঁড়ে একাকার হয়ে স্মৃতি'রা পায় মুক্তি অবহেলায় কিছুটা
উন্মাদনা ঠাঁই।

ঘরে ঢুকে খামচি মেরে মউতের কাফেলায় জীবন এখনো
ভুল করে বাতি নেভায়, নিভতে নিভতে হঠাৎ জ্বলে উঠে
চমকে অকারণ ভালোবাসে, ভেজা ঠোঁটে থুতুর জঠর মেখে
ভালোবেসে যায় পার্বতীর কথামতো;

কারণ দেখিয়ে নিজের ভেতরে বান মেরে মরে যাওয়া
পাখিরা বালিশে মাথা রেখে পালাও পালাও মন্ত্র-বিনাশ
জপে এখনো কাছে আসার প্রতিজ্ঞা করে
হাওয়ার কঙ্কাল।

জোস্না গলে রক্তে পুনরায় ফোটে বোধ-প্রেম, বিষণ্ণ
আঙ্গুলগুলো উপোস দুপুরের হাওয়ার বেলুনে উড়ে উড়ে
একবার অন্তত আরও একবার এ জীবন তোমায় নিয়ে
রুদ্র হতে চায়।

একেবারে বিদায় বলো না,
আমার পথিক মনে অন্ধকার আসন পেতে কোথায়
কতদূর গেছে পালাবার পথ কে জানে, হারানো গল্পের
চিঠিগুলো আমার কাতর বাম চোখে জলের খসড়া
এঁকে যায়—একেবারে বিদায় বলো না কোনোদিন।


সরে যায় সূর্যাস্ত

অজানা দেশে অজানা ধাঁধা—কি আছে ওখানে?
অবুঝ সবুজ, ক্লান্ত পাতার নিচে শীতলপাটি
বিছিয়ে রাখা কোনো বনভূমি,
না রংবেরঙের বৃষ্টি-গহনার ফোঁটা,না নখর
কোনো কারিগর কুয়াশারঙে ঢাকা চোখে—
বঞ্চিত ভবিষ্যতের ধূসর স্রোতে মৃত
মুখ দিয়ে রক্তনদীতে বসে আছে আমার জন্যে।

দেখেও দেখি না কিছু অজানা অচেনা দেশে।
কি আছে ওখানে—বোকা হলুদ-কালো মিথ্যে
কায়ায় ঘর বাঁধতে বাঁধতে চিবুক জুড়ে ইচ্ছের
আয়নায় কেমন মানায়, আঙুলের ইশারা ছাড়া
এক বিকেল বালুচর।

উপেক্ষা, অপেক্ষা, জুতা-জামা খুলে গায়ে
পায়ে বিঁধে কাঁটা। মলিন তবু বাঁধি ঘর বালুর;
দেখতে গেলে ভেঙে যাবে জানি। ধরতে
গেলে থমকে দাঁড়ায়, ভেঙে যায় কাঠের পুতুল—
অন্তর পুড়ে তোমার জন্যে সুদূরে।
ভীষণ মায়া হয়।

কি আছে অজানা দেশে দেখার মতো?
না গ্রাম, না শহর, না কবিতা শোনানো কোনো
কাছের মানুষ। অসুখের মহামারীতেও
প্রেমিকার মুখ দেখে যে সুখ ছিল স্বদেশে,
ভাঙনের বিপরীতে নামতে নামতে স্মৃতি চিড়ে
আমাকে আলাদা করে যায়
বিদ্রোহমাখা বেদনার অচেনা রোদ্দুর।

 
যেদিন বেরিয়ে যাবো

দরজা খোলা পেয়ে ঢুকলাম ঘরে—মেঝে আর
দেয়ালজুড়ে রক্ত-মাংসের আসবাবপত্র, ছবি
কোনোটা পুরনো, কোনোটা নতুন, কোনোটা কাছে,
কোনোটা অনেক দূরে—হঠাৎ পড়ে গিয়ে সবই
যেন থমকে আছে নতজানু শিশুর পায়ের কাছে।

জল মুছতে গিয়ে চোখ দুটো খুঁজে পেলাম
হাতের তালুতে। কোথাও ছোট ছোট
ছায়া, দাগ, শোক; কোথাও লম্বা নিকষ কালো
অন্ধকার; কোথাও মাকড়সার জালে আটকে
পড়া আমি। ফুলদানিতে অসংখ্য আমি—
জন্ম থেকে উধাও হয়ে বসে আছি এক ঘরে।

যেদিন একেবারে বেরিয়ে যাব,
সেদিন হয়তো ভিতর থেকে খুলে দেখব—
দেখার মতো বাইরে কেউ কি আছে?
আর কী আছে?

আমার ভিতরে দিনরাত এত ব্যস্ত আমি,
কোনোদিন জানাই হলো না—ভিতরে আমি
কেমন আছি আমার কাছে, তোমার কাছে।