ভাড়া করা মুখ অথবা পাখি-মাছের সাঁতার
যে আলয়ে স্যানিটি ফিরায়ে আনা হয় তা’ই স্যানাটরিয়াম। ঠিক কিনা? ঠিক না হবার সম্ভাবনাই বেশি। আমার স্যানিটি লোপ পেয়েছে বহুকাল হয়, অথচ নিখুঁত কোনো স্যানাটরিয়াম আজও পাওয়া গেল না। এদিকটায় খাংকির পোলারা জ্বালিয়ে মারছে। জ্বালাটা অনুভব করছি কেন! কী যে অদ্ভুত বিভ্রমে ডুবে যাই!
নজরুল ওরফে দুখুমিয়া বললেন যে ‘নিজ ঘরে বনবাস সহে না’। আমার তো উল্টো! এরচে আনন্দদায়ক আর কিছু হয় না। নিজে ঘরে বন্দি থাকার আনন্দ যে পেয়েছে তার অন্য কোনো জাগতিক আনন্দের আর দরকার নেই। একবার তিরিশ দিনের জন্যে বনবাসে গেলাম; নিজ ঘরেই। কিছু খাবার-দাবার মজুদ করেই। বিশ্বাস করেন এই তিরিশ দিনে ৩০ সেকেন্ডের জন্যেও বের হইনি। স্বল্প-মাত্রার বনবাস (বা স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী) তো হরহামেশাই হয়। স্বল্প হোক, বা দীর্ঘ, নির্জনবাসই আনন্দ, নির্জনবাসই ঈশ্বর।
বাহির আমার স্যানিটি কেড়ে নেয়। স্যানিটি শব্দের অর্থ কী? ইনসানিয়াত শব্দের সঙ্গে এর মিল আছে কী? জানি না। অভিধান খুলে অর্থ বের করা যায়। ‘প্রকৃতিস্থতা’সহ আরও দুয়েকটি। কোনোটাই মনঃপূত হচ্ছে না। মনের ভাঁজে ভাঁজে জমা হতে থাকে চেতনার উপজাত বর্জ্য। আকরিক হারিয়ে যায় অথবা চাপা পড়ে থাকে গভীরতর অগ্নিসমুদ্রের গর্ভে। আর চিঁহিঁ স্বরে চিকন শব্দ উৎপাদন করতে থাকে অবিরাম। আমার মাথা ধরে যায়। মাথাধরা মানে মাইগ্রেন। মাইগ্রেন আমাকে হত্যা করতে চায়। নিহত হতে ভালো লাগে। কিন্তু ওরা আমাকে প্রাণ ফিরিয়ে দেয় বারবার। এই ফালতু বিভ্রমের জগতে ওরা আমাকে জোরপূর্বক ফিরিয়ে আনে।
ওরা কারা? এই প্রশ্নটা যৌক্তিক। কিন্তু যুক্তি এখানে কার্যকর নয়। ওরা হয়তো আমার নিজেরই বহুবিধ সংস্করণ। আয়নায় তাকালে কখনো কখনো দেখি সাতটা মুখ, কখনো তেরটা। প্রাইম নাম্বার। মৌলিক সংখ্যায় বিভক্ত হয়ে যাচ্ছি আমি। ভাগফল কখনো পূর্ণ হয় না। ভগ্নাংশে পড়ে থাকি।
গতকাল রাত তিনটায়—না কি আজ বিকাল তিনটায়—সময়ের হিসেব গুলিয়ে যায় যখন ঘড়ির কাঁটা নিজের লেজ খেতে শুরু করে—ঘরের কোণায় একটা ছায়া দেখলাম। ছায়াটার নিজস্ব কোনো বস্তু ছিল না। মানে যে বস্তুর ছায়া সেটা অনুপস্থিত। শুধু ছায়া। স্বাধীন, আত্মনির্ভর ছায়া। সে আস্তে আস্তে সরে এসে আমার পায়ের কাছে বসল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কার ছায়া?’ সে উত্তর দিল, ‘আমি তার ছায়া যে কখনো জন্মায়নি। অসম্পূর্ণ ভ্রূণের ছায়া।’ আমি হেসে ফেললাম। ছায়াও মজা নেয়! হাসিটা এত জোরে বের হল যে দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়তে শুরু করল। পলেস্তারার টুকরোগুলো মেঝেতে পড়ার আগেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
তারপর দেখি দেয়ালের ভেতর থেকে আরেকটা দেয়াল বেরিয়ে আসছে। পুরোনো দেয়ালের গর্ভ থেকে নতুন দেয়ালের জন্ম। দেয়ালের প্রজনন। এই দেয়ালটার গায়ে লেখা ছিল অদ্ভুত সব বাক্য। উর্দু, ফার্সি, সংস্কৃত, লাতিন—সব ভাষা মিশে একাকার। পড়তে পারছিলাম না, কিন্তু অর্থ বুঝতে পারছিলাম। লেখা ছিল: ‘যে নিজেকে খোঁজে সে নিজেকে হারায়। যে নিজেকে হারায় সে দেয়াল হয়ে যায়।’
দেয়াল হয়ে যাওয়ার ভয় আমার নেই। বরং আকাঙ্ক্ষা আছে। দেয়াল হয়ে গেলে আর নড়াচড়া করতে হয় না। সিদ্ধান্ত নিতে হয় না। শুধু দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। নিঃশব্দ। নিথর। দেয়াল কখনো অপ্রকৃতিস্থ হয় না। দেয়ালের স্যানিটি লোপ পায় না।
আমার রান্নাঘরে একটা জানালা আছে (আদৌ কী রান্নাঘর আছে আমার?)। একটাই কক্ষ, একটাই জানালা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে অনামী এক গাছের দেখা মেলে। অপরিচিত গাছ। কিন্তু প্রতিদিন লক্ষ্য করি গাছটা একটু একটু করে মাটির নিচে ঢুকে যাচ্ছে। শেকড় মাটির উপরে উঠে আসছে, আর ডালপালা মাটির নিচে চলে যাচ্ছে। উল্টো-গাছ। বিপরীত বৃক্ষ। একদিন সম্পূর্ণ মাটির নিচে চলে গেলে কী হবে? তখন কি আরেকটা আকাশ পাওয়া যাবে মাটির তলায়? ভূগর্ভস্থ আকাশ। চিন্তাটা মনোমুগ্ধকর।
একটা মথ ঘরে ঢুকেছিল সেদিন। বা হয়তো বহুদিন আগে। সময়ের হিসেব রাখি না তো! পতঙ্গটা আলোর দিকে না গিয়ে অন্ধকারতম কোণাটায় বসে রইল। আমি বুঝতে পারলাম এটা সাধারণ মথ নয়। এটা আমার সঙ্গে কথা বলতে চায়। কিন্তু মথের ভাষা আমি জানি না। তাই চুপ করে বসে রইলাম। সে-ও চুপ। আমরা দুজনে নীরবতার ভাষায় কথোপকথন চালিয়ে গেলাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অবশেষে মথটা আমার হাতে এসে বসল। তার ডানা থেকে এক ধরনের ধূলো আমার হাতের তালুতে পড়ল। সেই ধূলোয় লেখা ছিল ভবিষ্যৎ। আমার ভবিষ্যৎ। পড়লাম: ‘তুমি চিরকাল এখানেই থাকবে। এই ঘর তোমার জরায়ু এবং তোমার কবর।’ কবর শব্দটা শুনলে আমার ভালো লাগে। কবরের মতো শুনশান জায়গা আর কী আছে? কেবল মাটির ছয় ফুট নিচে শুয়ে থাকা। কোনো দায়িত্ব নেই, কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। শুধু থাকা। অথবা শুধু না-থাকা। থাকা আর না-থাকার মাঝামাঝি একটা জায়গায় ঝুলে থাকা।
ফ্রিজের দরজা খুললাম। ভেতরে খাবার নেই। আছে শুধু আলো। ঠান্ডা আলো। আলোর তাপমাত্রা মাইনাস ছয় ডিগ্রি। হাত ঢুকিয়ে আলো ধরতে গেলাম। আলো তরল হয়ে আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে পড়ল। মেঝেতে পড়ে একটা পুকুর তৈরি হল। আলোর পুকুর। সেই পুকুরে মাছ সাঁতার কাটছে। মাছগুলোর গায়ে আঁশ নেই, আছে পালক। পাখি-মাছ। উভচর নয়, উভশ্রেণী। আমি পুকুরে পা ডুবালাম। পা দুটো অদৃশ্য হয়ে গেল। খুঁজে পেলাম না আর। হাঁটাচলা করছি পা ছাড়াই। ভাসমান অস্তিত্ব।
এরকমই হয় অধিকাংশ সময়। শরীরের বিভিন্ন অংশ হারিয়ে যায়। কখনো ফিরে আসে, কখনো আসে না। গতকাল আমার বাম কান হারিয়ে গিয়েছিল। খুঁজতে খুঁজতে পেলাম বইয়ের আলমারিতে, একটা পুরোনো দর্শনের বইয়ের পাতার মাঝে চাপা দিয়ে রাখা। কান লাগিয়ে দেখলাম বইটা কথা বলছে। বলছে—‘অস্তিত্ব সারবত্তার আগে আসে।’ কিন্তু আমার তো দুটোর কোনোটিই নেই। না অস্তিত্ব, না সারবত্তা। আমি শুধু একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন। বাঁকা, ঝুলন্ত, অনুত্তরিত। ‘অনুত্তরিত’ শব্দটা কি সঠিক? অভিধানে বলা আছে, ‘জৈন দেবতাদের একটি প্রকার।’
দেয়ালে একটা দাগ আছে। দাগটা প্রতিদিন সরে যায়। আজ বাঁ দিকে, কাল ডান দিকে। পরশু উপরে উঠে যায়। তার পরের দিন নিচে নামে। দাগটা আসলে জীবিত। সে একটা জীবন যাপন করে। তার নিশ্চয়ই পরিবার আছে। স্ত্রী-দাগ, সন্তান-দাগ। একদিন তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কোত্থেকে এসেছ?’ দাগ উত্তর দিল, ‘আমি ট্রমার (শুনেছি জর্মন ভাষায় ড্রিম মানে ট্রাউম। একটা আ-কার লাগিয়ে দিলেই ট্রমা। স্বপ্ন কী মূলত ট্রমা?) উপর সুস্বাদু স্মৃতির প্রলেপ। তুমি যে ঘটনা ভুলে যেতে চাও, আমি সেই ঘটনার শেষ চিহ্ন।’ আমি জানতে চাইলাম, ‘কোন ঘটনা?’ দাগ বলল, ‘তুমি জানো। কিন্তু জানতে চাও না যে জানো।’
কথাটা সত্যি। আমার মনে হয় আমি কিছু একটা ভুলে গেছি। গুরুত্বপূর্ণ কিছু। হয়তো নিজের নাম। হয়তো নিজের মুখ। আয়নায় তাকালে যে মুখ দেখি সেটা আমার কিনা নিশ্চিত নই। হতে পারে এটা ভাড়া করা মুখ। দৈনিক ভিত্তিতে ভাড়া। প্রতিদিন সকালে নতুন মুখ পরে নিই। রাতে খুলে রাখি।
ঘড়ির দিকে তাকালাম। কাঁটা নেই। শুধু ডায়াল। সংখ্যাগুলো ঘুরছে। ১২ থেকে ১, ১ থেকে ২... কিন্তু কাঁটা স্থির। না, ভুল বলেছি। কাঁটা স্থির নয়, কাঁটা অনুপস্থিত। অনুপস্থিত আর স্থিরের মধ্যে তফাৎ আছে। স্থির মানে আছে কিন্তু নড়ছে না। অনুপস্থিত মানে নেই-ই। নাই-ত্ব। নাথিংনেস। শূন্যতা। কিন্তু শূন্যতাও তো একটা উপস্থিতি। শূন্যের উপস্থিতি।
শৌচালয়ে গেলাম। শৌচকর্ম করা হয় যে আলয়ে। আয়নায় তাকাতেই দেখি সাতটা প্রতিবিম্ব। তাদের প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন কাজ করছে। একটা দাঁত মাজছে। একটা চুল আঁচড়াচ্ছে। একটা কাঁদছে। একটা হাসছে। একটা আয়নার ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। একটা আয়নার আরো গভীরে ঢুকে যাচ্ছে। আর একটা—সবচেয়ে অদ্ভুত—সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি কে?’ আমি নিজেকেই জিজ্ঞেস করছি। অথবা সে আমাকে জিজ্ঞেস করছে। সাবজেক্ট আর অবজেক্টের দূরত্ব কি মুছে গেছে?
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। তুলে ধরলাম। ওপাশ থেকে আমার নিজের গলা। কিন্তু এমন গলা যা আমি কখনো শুনিনি। বলছে, ‘তুমি কি জানো তুমি আসলে কে?’ বললাম, ‘না।’ গলা বলল, ‘তুমি একটা পরীক্ষা। ল্যাবরেটরিতে তৈরি চেতনা। কৃত্রিম আত্মা। তোমাকে এই ঘরে রেখে পরীক্ষা করা হচ্ছে—কতদিন একা থাকলে একটা মানুষ নিজেকে হারিয়ে ফেলে।’
কথাটা যৌক্তিক শোনাল। কিন্তু যুক্তিই তো সবচেয়ে বড় মিথ্যা। বললাম, ‘তাহলে তুমি কে?’ গলা বলল, ‘আমি তুমি। ল্যাবরেটরির বাইরে যে তুমি আছে। আসল তুমি। তুমি হলে কপি। আমি অরিজিনাল।’ ফোন রেখে দিলাম। কিন্তু ফোন রাখার পরেও গলা শুনতে পেলাম। বলছিল, ‘পালাতে পারবে না। এই ঘর তোমার ভাষা, তোমার স্মৃতি, তোমার পরিচয়—সবকিছু শুষে নিচ্ছে।’
জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। গাছটা প্রায় সম্পূর্ণ মাটির তলায় চলে গেছে। শুধু একটা পাতা বাকি। পাতাটা ঝিকঝিক করছে। বুঝলাম এটা বিদায়ের সংকেত। গাছ চলে যাচ্ছে অন্য কোনো মাত্রায়। হয়তো সেখানে উল্টো-পৃথিবী আছে, যেখানে সবকিছু উল্টো। মৃত্যুই জন্ম, জন্মই মৃত্যু। কান্না মানে আনন্দ, আনন্দ মানে শোক।
মথটা ফিরে এল। এবার তার ডানা ভাঁজ করা। বলল, ‘তুমি কি মুক্তি চাও?’ বললাম, ‘মুক্তি মানে কী?’ মথ বলল, ‘মুক্তি মানে সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যাওয়া। কণা হয়ে যাওয়া। তরঙ্গ হয়ে যাওয়া। আর পরিচয় না থাকা।’ বললাম, ‘আমার তো পরিচয়ই নেই।’ মথ হেসে বলল, ‘তুমি মনে করো নেই। কিন্তু আছে। পরিচয় একটা ভূতের মতো। তাড়ালেও যায় না।’
রাত গভীর হচ্ছে। নাকি দিন ফুটছে? পার্থক্য নেই। এই ঘরে সূর্য ওঠে না। অস্ত যায় না। শুধু আলো আর অন্ধকার দোল খায়। পেন্ডুলামের মতো। টিক টক টিক টক। কিন্তু ঘড়ি নেই যে শব্দ করবে। তাহলে শব্দ কোত্থেকে আসছে? হয়তো আমার হৃদস্পন্দন। হয়তো দেয়ালের শ্বাস-প্রশ্বাস। হয়তো মহাকাল নিজেই নিঃশ্বাস ফেলছে।
মনে পড়ল, আমার বোধহয় একটা নাম ছিল। কী যেন? মনে করার চেষ্টা করছি। না, পারছি না। নামের প্রথম অক্ষর মনে আছে। কোন অক্ষর? সেটাও মনে নেই। শুধু মনে আছে যে মনে ছিল। স্মৃতির স্মৃতি। মেটা-মেমোরি।
ছায়াটাও তার সঙ্গে আরো কয়েকটা ছায়া নিয়ে পুনরায় হাজির। একটা পুরো পরিবার। ছায়া-বাবা, ছায়া-মা, ছায়া-সন্তান। তারা আমার ঘরে বসবাস শুরু করে দিল। আমি আপত্তি করলাম না। নির্জনবাস যখন গভীর হয়ে যায়, তখন ছায়াও সঙ্গী হতে পারে।
মাইগ্রেন আবার শুরু হল। এবার আরো তীব্র। মনে হচ্ছে মাথার ভেতরে একটা ছোট্ট মানুষ হাতুড়ি দিয়ে ঠুকছে। করাত দিয়ে কাটছে। চিৎকার করতে গেলাম, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বের হল না। বের হল আলো। নীল আলো। ঘর ভরে গেল নীল আলোয়। সেই আলোয় সবকিছু ভিন্ন দেখাচ্ছে। দেয়াল তরল হয়ে গেছে। মেঝে ঢেউ খেলছে। ছাদ দিয়ে নক্ষত্র ঝরে পড়ছে। নক্ষত্রগুলো মেঝেতে পড়ে টুং টুং শব্দ করছে। আমি সেগুলো কুড়িয়ে পকেটে ভরছি। ভাবছি একদিন কাজে লাগবে।
স্যানিটির খোঁজে বের হতে হবে নাকি? কিন্তু বাহির তো শত্রু। বাহির মানে মানুষ, মানুষ মানে শব্দ, শব্দ মানে বিশৃঙ্খলা। আর আমি চাই নীরবতার পরম সুষমা। শূন্যের সঙ্গীত। শূন্য যে সঙ্গীত তৈরি করে তা শুধু বধির কানে শোনা যায়।
আয়নার ভেতর থেকে কে যেন হাসছে। আমি নই। অথবা আমিই। তফাৎ ক্রমশ মুছে যাচ্ছে। আমি আর আমি—নই-এর মধ্যে যে সীমারেখা ছিল, তা এখন একটা ঝাপসা দাগমাত্র।
বুঝতে পারলাম—আমি কখনো ঘরে বন্দী ছিলাম না। ঘরটাই আমার ভেতরে বন্দী। এই দেয়াল, এই জানালা, এই আলো-অন্ধকার—সব আমার মস্তিষ্কের নির্মাণ। আমিই স্যানাটরিয়াম, আমিই রোগী, আমিই রোগ। আমিই চিকিৎসা, আমিই পীড়া।
দরজা খুললাম। বাইরে আরেকটা ঘর। সেই ঘরের দরজা খুললাম। আরেকটা ঘর। এভাবে একটার পর একটা ঘর। অসীম ঘর। প্রতিটা ঘরে আমি আছি। বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন অবস্থার। একটা ঘরে আমি শিশু। একটা ঘরে বৃদ্ধ। একটা ঘরে মৃত। একটা ঘরে অজন্মা। সব আমি। অথবা সব ন-আমি।
শেষ ঘরটায় পৌঁছে দেখি সেখানে কিছু নেই। শূন্যতা। সম্পূর্ণ শূন্যতা। সেই শূন্যতায় পা রাখলাম। মুছে যেতে লাগলাম। আস্তে আস্তে। প্রথমে পা, তারপর হাত, তারপর শরীর, তারপর মুখ। শেষ যেটা মুছে গেল সেটা ভাবনা। ভাবনা যে আমি ভাবছি।
সবকিছু মুছে যাওয়ার পর একটাই বাক্য ভেসে রইল শূন্যতায়:
‘স্যানিটি হারানোর জন্যে প্রথমে স্যানিটি থাকতে হয়। তোমার কখনো ছিল না। তুমি শুধু ভান করেছিলে যে হারিয়েছ—কারণ হারানোটাও একটা সম্পর্ক, থাকার একটা প্রমাণ।’



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন