মেঘতর মেঘ

অ+ অ-

 


সবকিছু হারানোর আনন্দে অবশেষে মেঘেদের মতো সাবলীল হতে পারছি; 
অ্যালব্যাট্রস মনে হচ্ছে না নিজেকে; বরং গতকাল রাতে বাবার কাছ থেকে
শিখেছি যেকোনো সময় ঝরে যাওয়ার কায়দা; ও সুখ; বাবার মতোই 
ভাবুক ও বর্ষীয়ান মেঘ হওয়ার সম্ভাবনা খুঁজছি নিজ রক্তে ও মহাবিশ্বে 
সবকিছু হারানোর পরও যেটুকু অটুট থেকে যায়, যেটুকু প্রশ্ন আদতে 
বারবার ফাঁস হয়েও নতুন, তারই জন্য চিন্তিত ছাত্রের মতো বসে আছি
পরীক্ষার রুমে; যতো ফাঁকিবাজই হই, আজ আমি সম্ভবত পাশ করে বেরোবো! 

 

যে পারে, ফসকে যাবে:
তারই জন্য মেঘেরা বাড়িয়ে দিয়েছে ঠোঁট, 
নিশ্চিন্তে সে চুমো খেতে খেতে উড়ে যাবে
অন্য কোনো আজব সময়ে, 
অন্যতর হিস্যায়,
যদিও সে মূলত শিকড়ে গাথা অস্তিত্বের, ও
বেহুদা নস্টালজিয়া তার মধ্যে এতোই প্রচুর, যে, 
সে উড়ে যায়, যেতেই থাকে, তবুও কেমনে জানি 
দৃঢ়তম বিশ্বাসে ভাবে, এই ঘরবাড়ি চিরায়ত, নিশ্চয়ই
এই দিনগুলি ফুরাবে না!

 

একদিন ছাতারেই মনে হবে মেঘতর মেঘ। 
পোড়া জুনমাসে একদিন
বৃষ্টির ভিতরে ছাতা ধরে হেঁটে যেতে যেতে
ছাতার বর্ষণে
এমন ভীষণভাবে ভেসে যাবে, যে তোমার 
মনে হবে, বৃষ্টি বেহতর
ছাতার অচিন জলে ভিজে ভিজে মরবার চেয়ে। 

 

বিস্তর, অর্থপরায়ণ কিছু লাজুক হলুদ মেঘ 
পথেরে মিমিক করে ধুলোদুঃখ মেখে শুয়ে আছে চিত হয়ে, 
দেখলেও পথই মনে হয়—কিন্তু পা দেওয়া মাত্রই, 
জানি, পাথরের মিতা ফুরফুরে জলের মতন, 
মেঘগুলি জল হয়ে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে 
অ্যাবস্ট্রাক্ট, অর্থময় এক দুনিয়ায়: আমি তাই 
মেঘরুপী পথ আর পথরুপী মেঘের তফাত জেনে 
সঠিক রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ানোর জন্য আজীবন হুশিয়ার।

 

ফলে স্বচ্ছভাবে উড়ে যাওয়া ভারি কিছু নয়। 
পাখিদের কাছে আমি ধূসরতা ছাড়া আর কিছুই শিখিনি— 
মানুষের মধ্যে আমি ধুলো ছাড়া কিছুই দেখিনি;
ফলে যত উড়ে যাই, ততই নশ্বর লাগে, ততই বিষাদ যেন 
সাড়ে তিন হাত দেহ পলকে পালকে ঢেকে নেয়; 
আমি বিষাদের কাছে কিছুই শিখিনি আর চুপচাপ জেগে থাকা ছাড়া; 
ফলে রাত চলে যায়, আমি ঠিকই ধূসরতা ভেবে 
দু’হাত উঁচিয়ে তাজা অন্ধকারের দিকে হেঁটে যাই, 
সঙ্গোপনে, অন্ধকারে আমরণ হাঁটি। 

 

‘আজানের মতো কিছু শুনলাম’ ভেবে সেই বৃদ্ধ বৈমানিক
আত্মহত্যাপরবশ হয়ে ফের সারি সারি নিরঙ্কুশ মেঘে 
ডুবে যেতে চাইলেন (হঠাৎ খেয়াল হলো মেঘগুলি
মসজিদে নববীর মতো): অকস্মাৎ বুকের ভিতরে 
বহু আগে ভালোবাসারিক্ত হয়ে চলে যাওয়া বত্রিশটি মেয়ে
আবার এসেছে ফিরে সার বেঁধে, দেখলেন, 
আবার শোনার যেন সাধ হলো প্রেমেপড়া মেয়েদের চোখের আখ্যান: 
এইসব পিঠ ব্যথা, পেট ব্যথা, কাঁধ ব্যথা শেষ হলে পর
হয়তোবা ভালোবেসে দেখা যেতো হতপ্রেম প্রতিটি মেয়েকে- 
অতএব, মেঘ যতো নিরঙ্কুশ হোক, যতো রুচিকর হোক
প্যারাশ্যুটহীন উড্ডয়ন- বৃদ্ধ বৈমানিক তবু শূন্যচারী আত্মার গহনে
সহস্র বারের মতো ভূতের আজান শুনে ভাবলেন, থাকি, 
থেকে যাই, লোলচর্ম, যতদিন তারা বেঁচে আছে,
যতদিন প্রত্যাখ্যাত প্রেমের বেদনা বেঁচে আছে, 
ততদিন আমারও নসিব হোক তাদের উদ্দেশ্যে অকৃত্রিম বেঁচে থাকা। 

 

জীবনে তো ভালোটালো বাসো নাই; অতএব 
মেঘ থেকে মেঘে ভেসে যাবা সহজেই; 
মেট্রোপলিটন থেকে মেট্রোপলিটনে বিচরণ
একই ফ্লাটে ঘর থেকে ঘরে ঘুরবার মতো অতি স্বাভাবিক মনে হবে: 

তোমার জন্য দেখবা সবাই উন্মুখ হয়ে বসে আছে, 
কেউ ফরমাল, কেউ ক্যান্ডিড, কেউবা তোমারই মতো 
ভালোটালো বাসে নাই, ফলে সবেতেই সুখ পায়, 
ক্যাপাচিনো-কফিতেই ভুলে যায় মোলায়েম হৃদয়ের ক্ষোভ;

অতএব, এমন করেই বাঁচো, রঙ্গ দেখো, টিকিট-সমেত 
নিরাপদ; এমন করেই হাঁটো, জীবনের ছাতা ফেলে তুমুল বৃষ্টিতে, 
সাফারি পার্কে, মেশো হৃদয়বর্জিত সাপেদের খুশি খুশি ঘরকন্নায়; 

জীবনে তো প্রেমে পড়ো নাই, ফলে দুনিয়ার পথে কোনো কাঁটা, 
সন্ধ্যাবেলা বনে কোনো ডোরাকাটা বাঘ কখনোই দেখবা না: 
তোমার ধরনই এই, হাসিখুশি, ধীর, অভিনব; সাফারি পার্কের মতো
ছাঁচে ঢালা, কিন্তু অকৃত্রিম! 

 

এমনকি কিছুই নেই যার
এক ফালি অভিনয়মান অস্তিত্ব
আর কিছু ঝকঝকে মুহূর্ত ছাড়া
মৃত্যু তাকেও সঙ্গ দেয় 
মৃত্যু তাকেও ফিসফিস করে 
গল্প শোনায় লালবাগে ফেলে আসা মেয়েটার
রাত চারটায় ঘুম আসার আগ পর্যন্ত