নামের ওপারে

অ+ অ-

 

ফুটওভার ব্রিজের ওপর মানুষ থামে না। সবাই ছুটে চলে। এটাই এই শহরের নিয়ম। সবাই শুধু ছুটবে। যে যত বেশি ছুটতে পারবে সে তত বেশি ওপরে থাকবে। মানে টাকা পয়সা কামাতে গেলে ছুটতেই হবে। কেবল এই ফুটওভার ব্রিজের ওপর দিয়ে নয়। বাসে-ট্রেনে-লঞ্চে-প্লেনে-সাইকেলে-রিক্সায় আরও যত ছুটে চলার উপায় আছে সব উপায়েই ছুটতে হবে।

কিন্তু একেবারে গতিহীন মানুষও কিন্তু কম কামায় না এই শহরে। এই দলের নিয়ম আবার একেবারে উল্টো। যে যত ধীর সে তত বীর!

দ্বিতীয় দলের মানুষ হেকলু খা। তিনি কেবল শুয়ে থাকেন, চোখ দুটো ছাদের দিকে। মাঝে মাঝে মানুষ তাকে দেখে, আবার না-দেখার ভান করে চলে যায়। ফার্মগেট ফুটওভার ব্রিজের পশ্চিম অংশ তার শোয়ার ঠিকানা।

এই ব্রিজে তিনি একা নন। যদিও এই পেশায় সঙ্গী সাথী কম থাকাই ভালো। কিন্তু দেশের যে অবস্থা বড়লোকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হেকলু খাদের সংখ্যাও বাড়ছে। এই যেমন হেকলু খার ডান পাশে বসে থাকা কানা আজিজ এই ব্রিজে নতুন এসেছেন। কানা আজিজ বললে না কি তাকে সবাই চেনে। এ নিয়ে তার গর্বও আছে।

হেকলুর বামে টুথ ব্রাশ-পেস্ট-থালাবাসন মাজুনি ইত্যাদি নিয়ে বসে খলিল হাওলাদার। তার পাশে বসে বুড়ি মহেলা, যার কণ্ঠে সারাদিন কাঁদো কাঁদো সুর। একটু দূরে হালিমা, যে ছোট্ট একটা বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বসে থাকেবাচ্চাটা সত্যি নাকি ভাড়া করা, কেউ জানে না, কেউ জিজ্ঞেসও করে না। এই এরাই মূলত হেকলু খার প্রতিদ্বন্দ্বী আবার পরানের বন্ধুও বটে।

সকালবেলা রোদটা যখন পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে, তখন হেকলু একটু উঠে বসে। প্লাস্টিকের বাটিটা হাতের কাছে টেনে নেন। কয়েনের টুংটাং শব্দ তার কাছে এখনো সুরের মতো লাগে।

খয়বর খা... নিজের নামটা মাঝে মাঝে ফিসফিস করে ডাকেন তিনি। শুধু খয়বর খা নয় আরও কী যেন বলেন তিনি। সবটা অবশ্য বোঝা যায় না।

আজিজ কানা হেসে বলেনএই নাম ডেকে কি হবে? এখানে তো আমাদের সবারই এক নামফহির। ফহিরের আবার নাম।

হেকলু খা কিছু বলেন না। ফহির মানে ফকির শব্দটা হেকলু খার পছন্দ নয়। ভিখিরি-ফকির-মিসকিন আরও কত কী যে লোকে বলে তাদের! এসবের মধ্যে এই ফকির শুনলেই তার গা জ্বালা করে।

আজিজ কানার কাজই হেকলু খাকে তাঁতানো। যদিও এই কাজে খুব একটা সফল হতে দেখা যায়নি আজিজ কানাকে। ও ভালো কথা বলাই হয়নি, আজিজ কানার আসল নামও আজিজ কানা। বিশ্বাস না হলে একদিন আসেন ফার্মগেট ফুটওভার ব্রিজে। আজিজ কানার জাতীয় পরিচয় পত্রও আছে। যদিও জিনিসটা নকল বলেই দাবি বাকিদের। যাক ওসব গল্প আরেকদিন বলবো।

ফুটওভার ব্রিজের ওপর দশটার দিকে ভিড় বাড়ে। অফিসগামী মানুষ তাড়াহুড়োয় থাকে, কিন্তু ওই তাড়াহুড়োর মাঝেই দু-একজন থামে। আজিজ কানার সামনে আজ একটা দশ টাকার নোট পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে হালিমা কটমট করে তাকায়।

সব ভালো জায়গা তুই দখল কইরা রাখছস।

আজিজ জবাব দেআমার চোখ নাই, জায়গা রাখুম না? আমারই তো এই বিরিজে হক বেশি। হালিমা এই হক-বেহকের তর্কে আর যেতে চান না। কারণ, ঝগড়া করার আরও সময় পাওয়া যাবে কিন্তু টাকা চাওয়ার সময় গেলে আর পাওয়া যাবে না।

বুড়ি মহেলা তখনই গলায় কান্না মিশিয়ে সুর তোলেনআল্লাহর নামে দশটা টাকা দিয়া যান বাবারা-মায়েরা। এই দুনিয়া করলে দান

তার কান্না শুনে দু-তিনজন লোক থামে। দুই/দশ টাকার নোটও ঢুকে যায় মহেলার ঝোলায়। এখনও হালিমার বউনি হয়নি। তাই হালিমার রাগ আরও এক ডিগ্রি বাড়ে। তারপর হেকলুর দিকে তাকিয়ে বলেন,

তুমিই কও, এই বুড়িরে সরানো লাগে না? সব কাস্টমার ওই বেডি লইয়া যায়।

হেকলু খা খুব অনাগ্রহ নিয়ে খানিক চুপ থাকে। কিন্তু হালিম আবার কটমট করে তাকানোয় বলেনযার ভাইগ্যে আছে, সে পায়।

ভাইগ্য?

হালিমা থুথু ফেলেভাইগ্য বইলা কিছু নাই। জায়গা দখল কইরতে হয়।

দুপুর গড়ালে রোদ আরও চড়তে থাকে। ব্রিজের টিনের ছাদে আগুন পড়ে যেন। ব্রিজের পাটাতনে পিঠ রাখাও তখন মুশকিল হয়ে যায়। মানুষের ভিড়-গরম চিৎকার সব মিলিয়ে হেকলু খার অস্থির লাগতে শুরু করে তখন। হেকলু ক্র্যাচ দুটোর ওপর হাত রেখে একটু বসার চেষ্টা করেন।

ক্র্যাচগুলোকে তিনি মজা করে বউ বলে ডাকেন।

আজিজ একদিন শুনে হেসে বলেছিলেনতোর বউ দুইটা কাঠ!

হেকলু চুপ করে ছিলেন না সেদিন। জবাবে বলেছিলেনশোনেন মিয়া আজিজ ভাই, মানুষের চাইতে কাঠও ভালা, কাঠের কুনো ইচ্ছা নাই। যেম্বা থুইবেন, সেম্বা থাকপে।

কিন্তু জবাবটা দিয়েই সেদিন খুব করে মনে পড়েছিল তার দুই বউয়ের কথা। ওরা সতিন ছিল। তখন হেকলু খার পা-ও ছিল।  

একদিন দুপুরে হঠাৎ হৈচৈ লাগে। নতুন এক ভিখারি এসেছেখাটো, কিন্তু গলার জোর বেশি। এসে হালিমার জায়গার কাছেই বসে পড়ে।

এই জায়গা কার?সে চিৎকার করে।

হালিমা উঠে দাঁড়ায়...

আমার জায়গা।

কাগজ আছে?

কানা আজিজ হেসে ওঠে...

এখানে আবার কাগজ লাগে নাকি?

লোকটা বলে,

সব জায়গারই মালিক থাকে। আমারে পাঠাইছে ওরা।

ওরা’—শব্দটা শুনে সবার মুখ গম্ভীর হয়ে যায়।

এই ব্রিজেও একটা অদৃশ্য দখলদার আছেযারা প্রতিদিন বিকেলে টাকা তোলে।

বুড়ি সামছু ফিসফিস করে বলে,

আজ আবার কেউ আসবো।

হেকলুর বুক ধড়ফড় করে।

প্রতিদিনের উপার্জন থেকে একটা অংশ দিতে হয়। না দিলে মার, জায়গা ছাড়াসবই হয়।

 

বিকেল চারটার দিকে আকাশটাও গুমোট হয়ে ওঠে। ভিড় বাড়ে। এটাই শেষ সময়যতটা আয় করার করার।

হালিমা আজ মরিয়া। বাচ্চাটাকে জোরে জোরে কাঁদায়।

কানা আজিজও গলা তুলে...

একটা টাকা দেন বাবা

হেকলু চুপ।

সে শুধু বাটিটা সামনে রেখে তাকিয়ে থাকে মানুষের দিকে। কখনো তিড়তিড় করে কাঁপে অল্পজলের মাছ, হেকলু খা।

একটা স্কুলপড়ুয়া ছেলে এসে থামে।

সে নিচু হয়ে বলে,

চাচা, আপনার নাম কি?

হেকলু একটু থেমে বলে,

হিলাল হিলাল উল খয়বর খা।

ছেলেটা আবার জিজ্ঞেস করে,

ওরা আপনাকে হেকলু বলে কেন?

হেকলু উত্তর দেয় না।

ছেলেটা পকেট থেকে একটা বিশ টাকার নোট বের করে বাটিতে রাখে।

তারপর বলেআমি আপনাকে খয়বর চাচা বলব।

ছেলেটা চলে যায়।

হেকলুর চোখে পানি এসে যায় কিনাসে নিজেও বুঝতে পারে না।

ঠিক পাঁচটার একটু আগে তিনজন লোক আসে।

সবাই চুপ হয়ে যায়। এরা সেই ওরা

একজন এসে বলেহিসাব দে।

কানা আজিজ কাঁপা হাতে টাকা দেয়।

হালিমা মুখ গোমড়া করে দেয়, কিন্তু দেয়।

বুড়ি সামছু হাত কাঁপিয়ে কয়েন গুনে দেয়।

শেষে আসে হেকলুর কাছে।

এই হেকলু, তোরটা দে।

হেকলু বাটিটার দিকে তাকায়। আজ একটু বেশি হয়েছে কামাই। সেই ছেলেটার দেওয়া টাকাটাও আছে। মনে মনে বলে হেকলু বলেশিশুরা দান করলে সেই দানে বরকত বাড়ে।

সে ধীরে বলেআজ একটু কম দেই?

লোকটা চোখ কুঁচকে তাকায়...

কম মানে?

আমার দরকার আছে

সবার দরকার আছেলোকটা ঝাঁঝিয়ে ওঠে।

হালিমা ফিসফিস করে বলেদে, না হলে সমস্যা করবো।

হেকলু বাটিটা এগিয়ে দেয়। লোকটা টাকা নিয়ে গুনে।

কম কেন?

আমিহেকলু থেমে যায়।

একটা থাপ্পড় পড়ে তার গালে।

ক্র্যাচ দুটো কেঁপে ওঠে।

নাটক করিস না!

সবাই চুপ। কেউ কিছু বলে না।

লোকগুলো চলে গেলে এক অদ্ভুত নীরবতা নামে।

হালিমা ধীরে বলেএখানে থাকতে হলে নিয়ম মানতে হয়। কানা আজিজ মাথা নিচু করে। বুড়ি সামছু আবার আস্তে আস্তে কাঁদা শুরু করে।

হেকলু কিছু বলে না। সে শুধু শুয়ে পড়ে। তার মাথার ভেতরে একটা শব্দ ঘুরতে থাকে, খয়বর চাচা

অনেকদিন পর কেউ তাকে তার নাম ধরে ডেকেছে।

ন্ধ্যা নামে। ব্রিজ ফাঁকা হতে শুরু করে।

একসময় সবাই চলে যায় নিজ নিজ অন্ধকারে।

হেকলু একা পড়ে থাকে।

ক্র্যাচ দুটো পাশে।

সে একটা ক্র্যাচ ধরে টেনে নেয়।

ধীরে ধীরে বসে।

আজ প্রথমবার তার মনে হয়এই ব্রিজ ছেড়ে যেতে হবে।

কোথায় যাবেজানে না!

কিন্তু এখানে থাকলে তার নামটা পুরো মরে যাবে।

সে ফিসফিস করে...

আমি হিলাল উল খয়বর খা।

চারপাশে কেউ নেই।

শুধু বাতাস। তাতেই গুত্তা খায় তার নামের কিছু অংশ।

অনেক কষ্টে সে ক্র্যাচ দুটো হাতে নেয়। দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। শরীর কাঁপে। দু-একবার পড়ে যায়।

তারপর আবার উঠে। নিচে ব্যস্ত রাস্তা, আলো জ্বলছে।

মানুষ এখনো দৌড়াচ্ছে। সে ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করে...

ক্র্যাচের টক টক শব্দে।

কেউ তাকে থামায় না। কেউ ডাকে নাহেকলু।

ব্রিজের শেষ প্রান্তে এসে সে একবার পেছনে তাকায়।

কানা আজিজ, হালিমা, বুড়ি সামছু...

ওরা আছে, থাকবেএই একই জায়গায়, একই লড়াইয়ে।

হেকলুনা, হিলালমুখ ফেরায়। নিচে নেমে আসে। প্রথম ধাপটা কঠিন। দ্বিতীয়টা একটু কম। তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় ভিড়ের মধ্যেএকজন নামহীন ভিখারি নয়, নিজের নাম ফিরে পাওয়া একজন মানুষ হয়ে।

এবার আরও জোরে চিৎকার করে নিজের নামটা বলে হেকলু খা, আমার নাম হিলাল উল খয়বর খা। তার নামটা এবার বেশ দূরে চলে যায়, চলন্ত বাস-প্রাইভেটকার আর ফুটপাথ আর মানুষের মগজেও কিছুটা লেগে যায় তার নাম, হয়তো!