রাশিদা সুলতানার গল্প: গভীর সত্যের শিল্পিত রূপ

অ+ অ-

 

গল্প হলো সাহিত্যের এমন একটি গদ্যরূপ, যেখানে সীমিত পরিসরে জীবনঘনিষ্ঠ কোনো ঘটনা একটি বা একাধিক চরিত্রকে কেন্দ্র করে জীবনের বিশেষ দিক শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। গল্পে সাধারণত একটি সুসংগঠিত কাহিনী, চরিত্র, পরিবেশ, সংঘাত এবং পরিণতি থাকে, যা পাঠকের মনে বিশেষ প্রভাব সৃষ্টি করে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে আশা-নিরাশা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, আনন্দ-বেদনা ও গঠন-পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে সমাজ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির প্রভাবে মানুষের জীবন বদলে গেলেও বৈষম্য, বঞ্চনা, ক্ষোভ ও মানবিক সম্পর্কের অবক্ষয় নিত্যনতুন সংকট তৈরি করছে। সমাজের পরিবর্তনশীলতার পূর্ণ প্রতিচ্ছবি ইতিহাসে সবসময় ধরা না পড়লেও শিল্প-সাহিত্য সেই সময় ও সমাজের বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে ধারণ করে এবং জীবনকে উপলব্ধি করার সুযোগ সৃষ্টি করে। সমকালীন লেখকদের সম্মিলিত প্রয়াস পাঠকের সামনে জীবন ও সময়ের নানা দিক উন্মোচন করে। রাশিদা সুলতানার নির্বাচিত গল্পও তেমনি জীবন ও সময়কে বোঝার এক শৈল্পিক প্রয়াস, যা পাঠকের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে সাহিত্যরস ও জীবন-উপলব্ধির নতুন দ্বার উন্মোচন করে। রাশিদা সুলতানার গল্পগুলো জাদুবাস্তবতার কাঠামোতে লেখা।

এ প্রসঙ্গে প্রথমেই জাদু বাস্তবতা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা থাকা আবশ্যক। জাদু বাস্তবতা হলো এমন একটি সাহিত্যিক রীতি, যেখানে বাস্তব জীবনের মানুষ, সমাজ ও পরিবেশের মধ্যে অলৌকিক, অবাস্তব বা অসম্ভব ঘটনাকে একেবারে স্বাভাবিক ও বাস্তব ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অর্থাৎ গল্পের জগৎ মূলত বাস্তব, কিন্তু তার মধ্যে ভূত, অলৌকিক ঘটনা, অস্বাভাবিক ক্ষমতা বা অসম্ভব কোনো ঘটনা যা বাস্তবতা ও কল্পনার মধ্যে একটি স্বাভাবিক মিশ্রণে তৈরি হয় বাস্তবতা ও অলৌকিকতার সহাবস্থান।

এই ধারার সাহিত্যে বাস্তব জীবনের মানুষ, সমাজ, পরিবার, গ্রাম বা শহরের পরিবেশের সঙ্গে জাদু, অলৌকিকতা কিংবা অসম্ভব ঘটনাকে এমন স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করা হয় যে, বাস্তব ও কল্পনার মধ্যে স্পষ্ট কোনো সীমারেখা থাকে না। গল্পের চরিত্ররাও সাধারণত এসব অলৌকিক ঘটনাকে অস্বাভাবিক মনে করে না; বরং সেগুলোকে দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে পাঠকের কাছেও অলৌকিক ঘটনা বাস্তবতারই একটি অংশ বলে মনে হয়।

জাদু বাস্তবতায় লোকবিশ্বাস, লোককথা, পুরাণ, ধর্মীয় বিশ্বাস ও স্থানীয় সংস্কৃতির নানা উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখানে সময় ও স্থান অনেক সময় প্রচলিত নিয়ম মেনে চলে না; অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পরস্পরের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। অলৌকিক ঘটনার পেছনে সাধারণত কোনো বৈজ্ঞানিক বা যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা দেওয়া হয় না। বরং রহস্য ও কল্পনাকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করা হয়। তবে জাদু বাস্তবতা শুধু কল্পনানির্ভর সাহিত্য নয়; এর মাধ্যমে দারিদ্র্য, শোষণ, বৈষম্য, রাজনৈতিক সংকট, ঔপনিবেশিকতা ও সামাজিক বাস্তবতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও তুলে ধরা হয়। অলৌকিক ঘটনাগুলো অনেক সময় এসব বাস্তব সমস্যার প্রতীক বা রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই জাদু বাস্তবতার মূল বৈশিষ্ট্যবাস্তব জীবনের পটভূমির সঙ্গে অলৌকিকতার মিশ্রণ এবং সেই অলৌকিকতাকে স্বাভাবিক ও নিরাসক্ত ভঙ্গিতে উপস্থাপন।

১৯২৫ সালে জার্মান শিল্প সমালোচক ফ্রানৎস রো চিত্রকলার ক্ষেত্রে প্রথম ম্যাজিক রিয়ালিজম শব্দটি ব্যবহার করেন। ১৯৪০-এর দশকে কিউবার ঔপন্যাসিক আলেহো কার্পেন্তিয়ের এটিকে লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের বর্ণনাকৌশল হিসেবে চিহ্নিত করেন। ১৯৪০ থেকে ১৯৫০-এর দশকে হোর্হে লুই বোর্হেস এবং আলেহো কার্পেন্তিয়েরের হাত ধরে লাতিন আমেরিকায় এই ধারার বিকাশে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯৬৭ সালে কলম্বিয়ান লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের বিখ্যাত উপন্যাস নিঃসঙ্গতার একশ বছর (One Hundred Years of Solitude) প্রকাশের পর জাদু বাস্তবতা বিশ্বসাহিত্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। পরবর্তীতে সালমান রুশদী, ইসাবেল আইয়েন্দে প্রমুখ লেখকের মাধ্যমে এই ধারা লাতিন আমেরিকার গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বসাহিত্যে স্থায়ী রূপ নেয়। বাংলাদেশেও শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির প্রমুখের কিছু রচনায় জাদু বাস্তবতার বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা হয়েছে; তবে তাঁদের রচনাকে সামগ্রিকভাবে জাদু বাস্তবতার সাহিত্য হিসেবে চিহ্নিত করা নিয়ে সাহিত্যসমালোচকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এদেরই উত্তরসূরি গল্পকার রাশিদা সুলতানা যিনি লেখনিতে জাদুবাস্তবতায় সফলতার পরিচয় দিয়েছেন।

 

রাশিদা সুলতানার নির্বাচিত গল্প সমকালীন জীবন ও সমাজবাস্তবতার বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতাকে কাহিনি, চরিত্র ও শিল্পকৌশলের সমন্বয়ে তুলে ধরা হয়েছে। গল্পগুলোতে দারিদ্র্য, শোষণ, বৈষম্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক সংকট, পারিবারিক টানাপোড়েন ও মানবিক সম্পর্কের জটিলতার পাশাপাশি মানুষের অন্তর্জগতের নানা দিকও প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, লেখিকা বাস্তবতার ভেতরে অলৌকিক ও অবাস্তব ঘটনাকে এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন যে, বাস্তব ও কল্পনার মধ্যকার প্রচলিত সীমারেখা অনেকাংশে বিলীন হয়ে যায়।

 

নির্বাচিত গল্প: রাশিদা সুলতানা || প্রকাশক: সমাবেশ || প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১৭ || পৃষ্ঠা: ১৯৮|| মূল্য: ৩৯৫ টাকা

রাশিদা সুলতানার নির্বাচিত গল্প বইটিতে মোট একুশটি গল্প রয়েছে। গল্পগুলো ২০০০ থেকে ২০১৫ সাল সময়ে মধ্যে লিখিত। বইয়ের প্রথম গল্প পাখসাট যার অর্থ পাখির ডানা ঝাপটানো। গল্পের নায়ক মাশরুকের ছোটভাই রিমন বাড়িতে পোষার জন্য একটি ময়না পাখি কিনে আনে। মাশরুক প্রতিদিনে মতো রাতে খাওয়ার পর সিগারেট খেতে বারান্দার লনে গেলে পোষা ময়না পাখিটি তার সাথে কথা বলে। বিষয়টি মাশরুক তার ছোট ভাই এবং স্ত্রীকে জানালে তারা পাখির কথা শোনার জন্য বারান্দায় আসে কিন্তু পাখি শুধু খুটেখুটে খাবার খায় আর ডানা ঝাপটায় কোনো কথা বলে না। অথচ মাশরুক যখন একা থাকে পাখি তার সাথে অন্তরঙ্গভাবে কথা বলে। এভাবে চলতে থাকে পাখি তার আগের মালিকদের সম্পর্কে অনেক কথা বলে।

গল্প থেকে সরাসরি শোনা যাক

আমি কাছে যেতেই সে তার অনুযোগ অভিযোগ করে যেতে থাকে। ‘তুমি জানো, তুমি যে একটা সীমাহীন প্রতারক, ভণ্ড? রাতে সিগারেট খেতে খেতে আমাকে বহুবার বলেছ তোমার বউ একটা অসভ্য মহিলা, তার অত্যাচারে তুমি জর্জরিত। অথচ পার্টিতে তুমি সবার সামনে ঘোষণা করলা, “আমার সব সাফল্যের পিছনে আমার স্ত্রীর অবদান অসামান্য। আমার স্ত্রী কাশফিয়া ছাড়া আমি এতদূর আসতে পারতাম না।” বিশ্বাস করো, তোমার এসব নাটক দেখে আমার নিজের ওপর রাগ হয়। জীবনে কখনো ভণ্ড, প্রতারক, চতুর মানুষের সাথে কথা বলি নাই। অথচ ঠিক আধঘণ্টা পরই সবার দৃষ্টির অগোচরে তোমার এক কলিগের স্ত্রীর কোমরে হাত দাও, আর সেও প্রতিউত্তরে তোমাকে চিমটি কাটে। মাশরুক, তুমি কতটা ভণ্ড, বলো তো? পুরো অনুষ্ঠানে আমি তোমার দিকে চোখ রাখি। আমি তোমাকে ঘৃণা করি। নিজেকেও ঘৃণা করি তোমার মতো চতুর মানুষের সাথে কথা বলার জন্য।’ (পৃষ্ঠা: ২০)

পাখিটি যখন মাশরুকের চরিত্রের দ্বিচারিতা ও ভণ্ডামি নিয়ে কথা বলতে শুরু করে, তখন সে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তার ভয় হয়, পাখিটি অন্য কোথাও চলে গেলে তার সম্পর্কে অন্য মানুষের কাছেও এসব কথা বলে দেবে। এই আশঙ্কায় সে পাখিটির পা দুটি বেঁধে রান্নাঘরের চুলার আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলে।

এই গল্পে জাদুবাস্তবতার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়প্রধানত পাখির মানুষের মতো সচেতনভাবে কথা বলা এবং মাশরুকের গোপন চরিত্র সম্পর্কে অবগত থাকার ঘটনায়। পাখিটি এখানে একটি জাদুবাস্তব চরিত্র, যার অলৌকিক ক্ষমতার মাধ্যমে মাশরুকের অন্তর্গত নৈতিক বাস্তবতা প্রকাশিত হয়েছে। ফলে বলা যায়, জাদুবাস্তবতা এখানে গল্পের অলংকারমাত্র নয়; বরং চরিত্র উন্মোচন ও গল্পের বক্তব্য প্রকাশের একটি কার্যকর কৌশল। সে হিসেবে 'পাখসাট' একটি সফল জাদুবাস্তব গল্প।

আরেকটি গল্প বিচারকাণ্ড এই গল্পে দেখা সুনামগঞ্জের ডিসি, এসপিসহ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা বর্ষাকালে টাঙ্গুয়ার হাওর এলাকায় ঘুরতে যায়। আড্ডার সুবিধার জন্য তারা আর্দালি ও বডিগার্ডদের সবাইকে দূরে পাঠিয়ে দেয়। সন্ধ্যার অন্ধকারে লুঙ্গি পরা পান-দোকানদার, রিকশাচালক ও পিয়নের মতো চেহারার ৮-১০ জন লোক এসে তাদের হাত-মুখ বেঁধে অপহরণ করে। এরপর মাইলের পর মাইল হাঁটিয়ে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়। পাথুরে মাঠের অদূরের একটি জলাভূমিতে দেখা যায়, আধা-উলঙ্গ নারী-পুরুষেরা কাদা ছোড়াছুড়ি করছে। তাদের কণ্ঠে উৎসবের আমেজ। সেই উল্লাসের মধ্যেই দেখা যায়, মাথা নত করে কয়েকজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেএকজন সেনাবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তা, একজন এসপি, একজন জেলা জজ ও একজন ইউনিট কমান্ডার।

সেনা কর্মকর্তা জানায়, এখানে প্রতিদিন সাংসদ, মন্ত্রী, সামরিক কর্মকর্তা, পুলিশ কর্মকর্তা, বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচার করা হয়। আর তাদের বিচার করে লিন্ডা রহমান নামে একজন যৌনকর্মী। অভিযোগ হলো, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিরপরাধ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা ও অন্যায় করেছে। কারও মৃত্যুর জন্য তারা দায়ী, কেউ আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে, কাউকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে, আবার কাউকে হেফাজতে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতার দাপটে নিরপরাধ মানুষের ওপর সংঘটিত নানা অন্যায়ের জন্য এসব কর্মকর্তাকে দায়ী করা হয়।

ভোররাত পর্যন্ত বিচার চলতে থাকে। সেখানে শাস্তি হিসেবে দেওয়া হয় কিল-ঘুষি, চড়-থাপ্পড়, নাকে-মুখে কাদাপানি ছিটানো এবং মাথায় থুতু দেওয়া। পরে বিকেলে বাদী, বিবাদী ও বিচারক সবাই মিলে নাচ-গানের উৎসবে মেতে ওঠে। এ সময় পাহারা শিথিল হয়ে পড়ে। গল্পের নায়ক সেই সুযোগে পালিয়ে আসে। সারারাত দৌড়াতে থাকে সে। পথে শুরু হয় প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি।

গল্পের শেষ অংশে দেখা যায়

হঠাৎ ঝড়ো বাতাসে নদীর কিনারে এবং পাহাড়ের গায়ে বৃক্ষেরা একে অন্যের গায়ে আছড়ে পড়ে। এলোমেলো বাতাসে আমার ভেসে যাবার দশা। বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে বৃষ্টি নামে। বাতাস, বৃষ্টি কোনোকিছুতেই আমার দৌড়ানোর গতি কমে না। এক মুহূর্তের জন্য না-থেমে আমি দৌড়াতে থাকি। দুইজন জেলে আমাকে উদ্ধার করে, আমাকে দেখে প্রথমে মৃত মানুষ ভাবে। ক্ষুধায়, ক্লান্তিতে আমি বেহুঁশ। কাছে এসে আমাকে জীবিত দেখে তাদের নৌকায় তুলে নেয়। চোখ মেলে আমি বুঝতে পারি না আমি আবার ওদের হাতে ধরা পড়েছি কিনা। আমি কোনো কথার জবাব দেই না, জিজ্ঞাসা করি, এটা কোন্ জায়গা। তারা জবাব দেয়, এটা হাওড়, সুনামগঞ্জ জেলা। তাদের অনুরোধ করি, আমাকে কোনো পুলিশফাঁড়ি বা থানায় নিয়ে যেতে। সবার কাছে আমি মিথ্যা গল্প বলি, আমাকে দুর্বৃত্তরা ধরে নিয়ে গিয়ে দিনরাত ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ফেলে রেখেছে। পুলিশ বা প্রশাসনে আমার ঘনিষ্ঠ যাদেরকেই আমার অভিজ্ঞতার কথা বলি, কমলা চাঁদের রাত্রির কথা বলি, কেউ আমাকে বিশ্বাস করে না। কেউ কেউ আমার মানসিক সুস্থতা নিয়েও সন্দেহ করে। কিন্তু ওই অফিসারদের কাউকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। সবাই ধরে নিচ্ছে সরকারি কর্মকর্তা এবং রাজনীতিবিদরা সরকারের কোনো গোপন তথ্য জানত যা ফাঁস হয়ে যেতে পারে আশঙ্কায় সরকার নিজেই তাদের গুম করে ফেলেছে। (পৃষ্ঠা: ৭৮)

বাস্তব ও অস্বাভাবিকের মিশ্রণ, বাস্তব রাজনৈতিক অন্যায়ের অলৌকিক প্রতিফলন, দুই ধরনের বাস্তবতার সহাবস্থান এ সবকিছু মিলে এটি একটি সফল জাদুবাস্তব গল্প।

 

আমি কাছে যেতেই সে তার অনুযোগ অভিযোগ করে যেতে থাকে। ‘তুমি জানো, তুমি যে একটা সীমাহীন প্রতারক, ভণ্ড? রাতে সিগারেট খেতে খেতে আমাকে বহুবার বলেছ তোমার বউ একটা অসভ্য মহিলা, তার অত্যাচারে তুমি জর্জরিত। অথচ পার্টিতে তুমি সবার সামনে ঘোষণা করলা, “আমার সব সাফল্যের পিছনে আমার স্ত্রীর অবদান অসামান্য। আমার স্ত্রী কাশফিয়া ছাড়া আমি এতদূর আসতে পারতাম না।” বিশ্বাস করো, তোমার এসব নাটক দেখে আমার নিজের ওপর রাগ হয়। জীবনে কখনো ভণ্ড, প্রতারক, চতুর মানুষের সাথে কথা বলি নাই। অথচ ঠিক আধঘণ্টা পরই সবার দৃষ্টির অগোচরে তোমার এক কলিগের স্ত্রীর কোমরে হাত দাও, আর সেও প্রতিউত্তরে তোমাকে চিমটি কাটে। মাশরুক, তুমি কতটা ভণ্ড, বলো তো? পুরো অনুষ্ঠানে আমি তোমার দিকে চোখ রাখি। আমি তোমাকে ঘৃণা করি। নিজেকেও ঘৃণা করি তোমার মতো চতুর মানুষের সাথে কথা বলার জন্য।’

 

ছবি || রাশিদা সুলতানা

'আধি' (পৃ: ১২০) গল্পের কাহিনী সংক্ষেপভার্সিটির ৪ বছরের সিনিয়র মাহমুদের সাথে গল্পের নায়িকার পরিচয় থেকে প্রণয়। বিয়ের পর থেকেই মাহমুদের সন্দেহ বাতিকতা শুরু হয়। টানা চব্বিশ বছর সংসারে কোনো সন্তান হয় না। নায়ক নায়িকাকে অসম্ভব ভালোবাসলেও সাথে অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণ আচরণ করে। মোবাইল রিসিভ না করলে কিংবা কোনো পুরুষ কলিগের সাথে কথা বলা দেখলে মাথাখারাপের মতো ব্যবহার করত। সব সময় নায়িকাকে কঠোর পাহারায় রাখত। এতে নায়িকা অতিষ্ট হয়ে মাহমুদের কাকুতি মিনতি সত্তেও তাকে ডিভোর্স দেয়। ডিভোর্স দেওয়ার মাস খানেক পর মাহমুদের মৃত্যু হয়। নায়িকার সব সময় মাহমুদের ডিভোর্সের আগের কাকুতি মিনতির কথা  মনে পড়ে। একদিন মাঝ রাতে ফোন বেজে ওঠে

গল্পের বাকী অংশ কথকের মুখ থেকে শোনা যাক

এক মাঝরাতে ফোন বেজে উঠল। ঘুমের ঘোরে রিসিভার কানে দিতেই শুনি, ‘কেমন আছ, সোনা?’

কণ্ঠস্বর চিনতে পেরে কাঁপছি আমি আর সে ক্যাজুয়ালি জিজ্ঞেস করছে, তুই আমার গলা চিনিস না,  মানিক?

কোনোমতে জবাব দেই, ‘হ্যাঁ চিনি তো।’

এইটুকু বলতেই গলা মরু-বালিয়াড়ি। ইচ্ছা হচ্ছে চিৎকার করে লোক জড়ো করি।
‘তুমি বিরক্ত হচ্ছো, মানিক? ময়না, এত তাড়াতাড়ি বদলে গেলি? ভুলে গেলি আমারে? সত্যিই ভুলে গেছিস। আমারে “জান” বলিস না ক্যান একবারও?’

ভয়ে তখনও কাঁপছি। তাকে বলতে সাহস হয় না, ‘তুমি না মারা গেছ কয়মাস আগে, আবার কথা বলছ কেমনে’।
আর... এত জীবন্ত, এত তাজা তার আওয়াজ! তবে কি আমিও মারা গেছি?
সে প্রশ্ন করে যায়:
‘ঘর ক্লিন করো তো ডেইলি? রান্না করো তো, সোনা? নাকি না-খায়া পড়ে থাকিস?’

‘হ্যাঁ, সবই করি,’ জবাব দিই।

‘তোমার কোনো অনুভূতি নাই আমার প্রতি। আমি পরিষ্কার টের পাইতেছি তুমি বদলে গেছ। ভুলে গেছ, পাখি। আমি মরে গেছি তবু তোমার মায়া হয় না!’ ফোনের ওপাশ বলে যায়।

সে কি কবরে নিয়ে যেতে চাইছে আমাকে? তার এত অনুনয়ের জবাবে এর মধ্যেও বলি, ‘আমি তো একা ঘরে, মাঝেমধ্যেই কাঁদি তোমার জন্য।’

ফোনের লাইন কেটে গেলে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমাই। তার পরদিন সারাদিন জড়পদার্থের মতো কাটাই। এখন প্রায়ই মাঝরাতে ফোন আসে মরা মানুষটার।

‘জাদুসোনা, রান্না করছো ঠিকমতো? ভুলে গেছ আমারে, মানিক?’

তার কথার একদুইটা উত্তর দেই, আর তীব্র মৃত্যুভয় চেপে ধরে আমাকে। ভাবি, একা থাকায় হয়তো এসব হচ্ছে। অনেক লোকের মধ্যে থাকলে ঠিক হয়ে যাবে হয়তো। কিন্তু এও জানি যে লোকজনের মধ্যে, হৈচৈয়ের মধ্যে থাকা সম্ভব নয় আমার।

আবার রিং বাজে। সেই গলা। সেই তাজা গলা। সেই আকুতি।

ফোনের লাইন কেটে গেলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। অস্পষ্ট জোছনালোকে অন্ধকার ঝোপঝাড় আর ঝাপসা কুয়াশা ছাড়া আর কিছুই দ্রষ্টব্য নাই। আমার স্বামীর নিশ্বাস-প্রশ্বাস রূপে ধূসর কুয়াশা এসে আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরে, আচ্ছন্ন করে রাখে।

আমার নতুন এক বিবাহিত জীবনের সূচনা। ফারাক শুধু এই যে এবার আর ডিভোর্সের পথ খোলা নেই আমার।  (পৃষ্ঠা: ১২৫)

রাশিদা সুলতানার নির্বাচিত গল্প সমকালীন জীবন ও সমাজবাস্তবতার বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতাকে কাহিনি, চরিত্র ও শিল্পকৌশলের সমন্বয়ে তুলে ধরা হয়েছে। গল্পগুলোতে দারিদ্র্য, শোষণ, বৈষম্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক সংকট, পারিবারিক টানাপোড়েন ও মানবিক সম্পর্কের জটিলতার পাশাপাশি মানুষের অন্তর্জগতের নানা দিকও প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, লেখিকা বাস্তবতার ভেতরে অলৌকিক ও অবাস্তব ঘটনাকে এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন যে, বাস্তব ও কল্পনার মধ্যকার প্রচলিত সীমারেখা অনেকাংশে বিলীন হয়ে যায়। পাখসাট-এর কথা বলা ময়না, বিচারকাণ্ড-এর অলৌকিক বিচারব্যবস্থা এবং আধি-তে মৃত স্বামীর ফোনালাপএসব উপাদান নিছক বিস্ময় সৃষ্টির জন্য ব্যবহৃত হয়নি; বরং চরিত্রের অন্তর্গত সত্য, সামাজিক অন্যায়, ক্ষমতার অপব্যবহার ও মানবিক সংকটকে সরল ও প্রাঞ্জলভাবে প্রকাশ করেছে। ফলে তাঁর গল্পে জাদুবাস্তবতা কেবল আঙ্গিকগত বৈশিষ্ট্য নয়, বরং জীবন ও সমাজবাস্তবতাকে নতুন দৃষ্টিতে অনুধাবনের একটি কার্যকর শিল্পকৌশল। বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য, কাহিনি বিন্যাস, চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা এবং বাস্তবতা ও অলৌকিকতার সৃজনশীল মেলবন্ধনের কারণে নির্বাচিত গল্প বাংলা ছোটগল্পের পাঠে একটি স্বতন্ত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে।

রাশিদা সুলতানার নির্বাচিত গল্প গ্রন্থের গল্পগুলোতে জাদুবাস্তবতার প্রয়োগ ও এর সামাজিক-সাংস্কৃতিক তাৎপর্য নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা করা যেতে পারে। পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যে জাদুবাস্তবতার বিকাশের ধারায় তার গল্পের অবস্থান নির্ণয় করে সমকালীন অন্যান্য গল্পকারের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। ভবিষ্যৎ গবেষণায় তার গল্পের ভাষা, চরিত্র, প্রতীক ও জাদুবাস্তবতার পারস্পরিক সম্পর্কও বিশেষভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। সর্বোপরি, বিষয় ও আঙ্গিকের সুষম সমন্বয়, সংবেদনশীল উপস্থাপন এবং পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী অনুরণন সৃষ্টির ক্ষমতার কারণে নির্বাচিত গল্প একটি পরিণত ও শিল্প সফল গল্প সংকলন হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য।