ধারাবাহিক উপন্যাস: পর্ব–১ || ও আমার বন্ধু 

অ+ অ-

 

ও আমার বন্ধু || পর্ব

কফির মগ হাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল সান্তানু। জানালার কাঁচ বেয়ে টুপটাপ নেমে আসা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো বাইরের পৃথিবীটাকে ঝাপসা করে দিয়েছে। টেবিলের ওপর পেপারওয়েটের নিচে চাপা পড়া কাগজগুলোর কাঁপুনি আর বৃষ্টির একটানা শব্দ মিলেমিশে ঘরের ভেতর মনোরম সুর তৈরি করেছে।

কফিতে ছোট ছোট চুমুক দিতে দিতে বাইরে তাকিয়ে রইল সান্তানু। শ্রাবণ আজ যেন সবকিছু ধুয়ে মুছে নতুন করে লিখতে চায়। দূরের কৃষ্ণচূড়া গাছটি বৃষ্টির ভারে বারবার নুয়ে পড়ছে। ভেজা বাতাসে পাতাগুলো কাঁপছে। সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ বহু বছর আগের একটি রাত মনে পড়ে গেল।

সে রাতেও এমনই বৃষ্টি ছিল। মেঘের গর্জনের ফাঁকে ফাঁকে ভেসে এসেছিল শব্দের মাদল। সে শব্দ ভেজা বাতাসের মতো স্বচ্ছ। কত বছর কেটে গেছে! তবুও সময়ের কাছে হার মানেনি। একটি গন্ধ, একটি সুর কিংবা এমন একটি বৃষ্টিভেজা সময়, ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে বহু দূরের জীবনে।

টেবিলের ওপর রাখা মোবাইল ফোনটি একবার কেঁপে উঠল। সান্তানু তাকাল না। পৃথিবীর অধিকাংশ খবরই একান্ত সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি হতে পারে না তার কাছে। সে মগটি রেখে লেখার টেবিলের কাছে গেল।

ঘর জুড়ে বই। কাঠের তাক ভর্তি উপন্যাস, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, জীববিদ্যা। টেবিলের ওপর অর্ধসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি। গত কদিন একটি বাক্যও আর এগোয়নি। আজ যেন শব্দগুলো তাকে এড়িয়ে চলছে। অথচ শব্দই তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত আশ্রয়।

হঠাৎ বাতাসের ঝাপটায় পেপারওয়েটের নিচে চাপা কাগজ নড়ে উঠল। সান্তানু কাগজ ঠিক করতে গিয়ে থেমে গেল। একেবারে ওপরে পাতায় লেখা ছিল একটি নাম। মেঘলা

তিনটি অক্ষর। সেই অক্ষরের ভেতর লুকিয়ে আছে বহু বছরের বৃষ্টি, অসমাপ্ত কথা, কিছু অপূর্ণতা, যেগুলো থেকে চাইলেও পুরোপুরি দূরে যেতে পারে না।

সে চেয়ারে বসল। কফি ইতিমধ্যে ঠান্ডা হয়ে গেছে। মগের গায়ে হাত রেখে ভাবলো, সম্পর্কও কি এমনই? একসময় উষ্ণ থেকে উষ্ণতা বয়ে বেড়ায়।

ঘড়ির কাঁটা সাড়ে নয়টা ছুঁয়েছে। শুক্রবার এই সময়টায় সাধারণত সে লেখে। আজ কলম হাতে তুলতে ইচ্ছে করছে না। বৃষ্টি আরও ঘন হয়েছে। সামনের সরু রাস্তাটা ছোট্ট জলধারার মতো হয়ে গেছে। কয়েকটি রিকশা এগিয়ে যাচ্ছে। ছাতার নিচে মুখ লুকিয়ে মানুষ নিজের মতো করে পথ চলছে। সান্তানু পাণ্ডুলিপির পাতাগুলো উল্টাতে লাগল।

কোথাও একটি অনুচ্ছেদ শুরু হয়েছে, শেষ হয়নি। কোথাও একটি সংলাপ এসে থেমে গেছে মাঝপথে। শেষের দিকের পাতায় লেখা,

যে চলে যায়, সে সবসময় দূরে যায় না। সে থেকে যায় সবচেয়ে কাছে, যেখানে হাত বাড়িয়েও স্পর্শ করা যায় না।

বাক্যটির নিচে আর কিছু লেখা নেই। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠিক তখনই কলিংবেল বেজে উঠল। বৃষ্টির শব্দের ভেতর বেলের আওয়াজ অচেনাই লাগল। দরজা খুলে দেখল, সামনে একটি বাদামি রঙের খাম রাখা। খামের ওপর লেখা

সান্তানুর জন্য।

প্রেরকের নাম নেই। সে খামটি হাতে নিয়ে ভেতরে এল। টেবিলের ওপর রেখে তাকিয়ে রইল।

মানুষ কখনও কখনও খাম খুলতেও ভয় পায়। কারণ কিছু কাগজ সঙ্গে নিয়ে আসে চাপা পড়ে থাকা স্মৃতি। অবশেষে সে খামটি খুলল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি পুরোনো আলোকচিত্র। ছবিতে মানুষের ভিড়। সেই ভিড়ের মাঝেই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে সান্তানু, মেঘলা। ছবির হাসিটা ভোরের সমুদ্রের মতো স্নিগ্ধ। ছবির নিচে ভাঁজ করা সাদা কাগজ। সে খুলল। লাইন চমকে দিল,

বৃষ্টি এখনও একই রকম নামে। শুধু মানুষ বদলে যায়। আর তুমিও…’

কোনো নাম নেই। কোনো স্বাক্ষরও নেই। তবু সান্তানুর বুকের ভেতর হঠাৎ অকারণ মোচড় দিয়ে উঠল। ঠিক তখনই মোবাইল ফোনটি কেঁপে উঠল। অচেনা নম্বর। একটি মাত্র বার্তা। চিঠিটা পেয়েছ?

সান্তানু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। উত্তর লিখতে গিয়েও লিখল না। ফোনটা টেবিলে রেখে ছবিটি হাতে তুলে নিল। এই ছবির মধ্যে থাকা কেউ কাজটি করছে। কে করছে?

বাইরে তখনও অবিরাম বৃষ্টি। জানালার কাঁচ বেয়ে জলরেখা নেমে যাচ্ছে। হঠাৎ বিদ্যুতের আলোয় উল্টোদিকের দোতলার বারান্দায়, একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল, ঠিক তার রুমের দিকেই তাকিয়ে। পরেই অন্ধকার সবকিছু গিলে ফেলল। বিদ্যুত চলে এলে সেখানে আর কাউকে দেখা গেল না।

সে জানত না, সত্যিই কেউ সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, নাকি মনের গভীরে চাপা পড়ে থাকা কোনো স্মৃতি আজ একটি অবয়ব নিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। সে বিশ্বাস করে, যখন গভীরভাবে কাউকে হারায়, তখন স্মৃতি আর বাস্তবতার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়। নিজের মনের তৈরি কোনো ছায়াকেও তখন সত্যি হয়ে ওঠে।

সান্তানু জানালার ঠাণ্ডা কাঁচে হাত রাখল। বাইরের বৃষ্টি আর ভেতরের অস্থিরতার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য অনুভব হলো না। দুটোই নিরন্তর ঝরে পড়ে, অথচ কোনোটাই সহজে থামে না।

ঘড়ির দিকে তাকাল সে। দেয়ালের পুরোনো ঘড়িটি ঠিক চলছে। এই ঘড়িটা বাবার স্মৃতি। এটি এখন আর বস্তু নয়, সময়ের সাক্ষী।

ছবিটা হাতে তুলে নিল। মেঘলার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষ আসলে কতটা বদলে যায়? সেকি বদলেছে? কতটা বদলেছে?  ছবিটি মেঘলাই পাঠিয়েছে কি? সে কি সেই সময়ে যেন আটকে আছে, যখন কৃষ্ণচূড়া রঙে ভেজা পথ, অসমাপ্ত আনন্দের বাঁক। আর ছিল অনেকের পাশে সান্তানু?

সে তো এত বছর ধরে বেঁচে আছে। সময়ের সঙ্গে বদলেছে, হারিয়েছে, পেয়েছে অনেক কিছু। একজন লেখক হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে, একজন পথিক হিসেবে সে এগিয়ে গেছে। তবু কোথাও তার ভেতরে সেই পুরোনো দিনের দরজা এখনও বন্ধ হয়নি। যারা তার লেখা পড়ে, তারা জানে না এই লেখকের ঘরের ভেতরে কতগুলো বন্ধ দরজা আছে।

রাত আরও গভীর হচ্ছিল। সান্তানু আর বিষয়টা নিয়ে ভাবল না। চোখ বন্ধ করতেই ডুবে যেতে লাগল তার অসমাপ্ত উপন্যাসের জগতে। সে লেখার টেবিলে ফিরে এল। সাথে ফিরে এলো অগণিত ঢেউ।

সান্তানুর দিনগুলো খুব সাধারণ। খুব ভোরে ঘুম ভাঙে। ঘুম ভাঙার পর চা বানানো, জানালা খোলা, বই পড়া, লেখার টেবিলে বসা। এভাবেই কেটে যায় অধিকাংশ দিন। তার জীবনে বড় কোনো উৎসব নেই, নেই হঠাৎ কোথাও চলে যাওয়ার পরিকল্পনা, নেই দীর্ঘ ভ্রমণের ব্যস্ততা। জীবন নির্দিষ্ট ছন্দে এসে থেমে গেছে।

বন্ধুরা মাঝে মাঝে বলে—‘তুই এখনও একা, কেন-রে?

সান্তানু শুধু হাসে। কাউকে বোঝাতে যায় না, একা থাকা আর নিঃসঙ্গ থাকা এক জিনিস না। কখনও কখনও চারপাশে অগণিত মুখ থাকে, পরিচিত মুখে থাকে মুখোশ, কথা বলার কেউ থাকে না; তার ভেতরে একটি ঘর খালি পড়ে থাকে। সেই ঘরটিতে সবার প্রবেশাধিকার নেই।

সান্তানু ইদানীং নতুন লেখার চেয়ে লেখা পড়েই বেশি সময় কাটায়। খবরের কাগজ, প্রিয় লেখকদের বই, নিজের লেখা অসমাপ্ত পাতাগুলোই তার সঙ্গী। অনেকেই তাকে অলস বলে। কেউ কেউ ভাবে, সে হয়তো লেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।

সান্তানু জানে, সৃষ্টির আগে নিজের ভেতরের অন্ধকার আর আলো দুটোই চিনতে হয়। কিছু গল্প কাগজে লেখার আগে দীর্ঘদিন ভেতরে জন্ম নিতে থাকে। তার বিশ্বাস, একাকিত্ব সবসময় শূন্যতা না। সেটাই হয়ে ওঠে একজন সৃষ্টিশীলের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।

নতুন কোনো গল্প শুরু করতে গেলেই তার সময় লাগে। সম্পাদকগণ কখনও ফোন করেন। কেউ নতুন উপন্যাসের কথা বলেন, কেউ গল্প চান, কেউ প্রবন্ধ। সান্তানুর উত্তর প্রায় একই থাকে—‘কাজ চলছে।

ফোন রেখে নিজেরই হাসি পায়। সত্যিই কি কাজ চলছে? নাকি শুধু সময়টাই কেটে যাচ্ছে? কোথাও একটি ঘড়ি থেমে আছে। সময় এগিয়ে গেছে। ঠিক তখনই মোবাইল ফোনটি কেঁপে উঠল। অচেনা নম্বর। এবার বার্তায় মাত্র একটি শব্দ।

পাষাণ!

সান্তানুর আঙুল কেঁপে উঠল। ছবিটা প্রায় হাত থেকে পড়ে যাচ্ছিল। এই শব্দটি...

এই শব্দ তাকে জীবনে মাত্র একজন বলেছিল। তার বুকের ভেতর হঠাৎ দরজা খুলে গেল। এত বছর পরে? কীভাবে? কেন?

সে মাথা তুলে ঘরের চারদিকে তাকাল। চারদিকে একই রকম। বই, টেবিল, জানালা, বৃষ্টির শব্দ। তবু এর মধ্যেও কেউ যেন তাকে দেখছে। সে মোবাইলের স্কিনের দিকে তাকাল।

পাষাণ! মাত্র একটি শব্দ। সেই শব্দের ভেতরে এমন এক পরিচিতি লুকিয়ে আছে, যা কোনো অচেনার পক্ষে জানা সম্ভব নয়। সে উত্তর লিখতে গিয়েও থেমে গেল। আপনি কে? প্রশ্নটি লিখেও মুছে দিল।

ফোনটা টেবিলে রেখে বইয়ের তাকের দিকে এগিয়ে গেল। ছোট কাঠের কয়েকটি আলমারি পাশাপাশি রাখা। সেগুলোর একটিতে পুরোনো ডায়েরি, চিঠি, পাণ্ডুলিপি আর কয়েকটি অসমাপ্ত লেখা। বহুবার সে ভেবেছে এগুলো গুছিয়ে ফেলবে। পারেনি। কিছু জিনিস সরিয়ে ফেললেই ঘর গোছানো হয় না। থাক্ এলোমেলো এই কর্ণার।

আলমারির নিচের তাকে রাখা নীল ডায়েরিটা বের করল সে। ধুলোর পাতলা স্তর জমেছে। আঙুল বুলিয়ে ধুলো সরাতেই তারিখটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। পহেলা ফাল্গুন। অকারণে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

এত বছর ধরে ডায়েরিটা খোলা হয়নি। সে পাতা উল্টাতে লাগল। শুরুর পাতাগুলোতে ক্লাসের নোট, বন্ধুদের নাম, কিছু কবিতার লাইন। একসময় লেখার ভঙ্গি বদলে গেছে। একটি নাম বারবার ফিরে এসেছে। কখনও একটি বাক্যে। কখনও একটি শব্দে। কখনও শুধু একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে। পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ একটি জায়গায় তার চোখ থেমে গেল। সেখানে লেখা,

আজ মেঘলা এমন একটি কথা বলল, যা আমি বিশ্বাস করতে চাই না। যদি কথাটা সত্যি হয়, তাহলে এতদিন ধরে যা বিশ্বাস করেছি, যেভাবে জীবনকে ভেবেছি, সবই কি ভুল?

তার পরের কয়েকটি পাতা নেই। ছেঁড়া। কে ছিঁড়েছে? সে নিজে? নাকি অন্য কেউ? কোনো উত্তর নেই। সেই ছেঁড়া অংশের দিকে তাকিয়ে রইল সে।

চুপচাপ বসে থাকার পর সান্তানু ডায়েরিটা বন্ধ করে দিল। লেখার টেবিলে বসল। সামনের সাদা কাগজে কলম ছোঁয়াল। রাত আরও গভীর হলো। সে উঠে গোসল করল। রান্নাঘর থেকে দুটো বিস্কুট আর এক গ্লাস পানি নিয়ে খেয়ে নিল। বিছানায় শুয়ে মোবাইল হাতে নিতেই হঠাৎ অরুণিমার কথা মনে পড়ল। সে লিখল—‘কী করছিস, দিদি?’

অরুণিমার সঙ্গে তার এমন রাতজাগা কথাবার্তা নতুন নয়। ওদিক থেকে কোনো উত্তর এল না। মোবাইল স্ক্রল করতে করতে কখন যে চোখ আধবোজা হয়ে এসেছিল, সে বুঝতেই পারেনি।

হঠাৎ পর্দা জ্বলে উঠল। অরুণিমার উত্তর—‘ঘুমিয়ে পড়েছিলাম রে।’

সান্তানু লিখল—‘সমস্যা নেই।’

সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর এল—‘জানতাম। নিশ্চয়ই গোসল করে ফেলেছিস। এখন ঘুমাবি?’

সান্তানু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে লিখল—‘ঘুম আসছে না। একটু কথা বলবি?’

কয়েক সেকেন্ড উত্তর এলো না। অরুণিমা লিখল—‘কী হয়েছে, সান্তু?’

সান্তানু টাইপ করতে লাগল। ফের সব মুছে দিল। শেষ পর্যন্ত মাত্র দুটি শব্দ পাঠাল—‘কিছু না।

ওপাশ থেকে আরেকটি উত্তর এল—“তুই যখন কিছু না বলিস, তখনই বুঝি সবচেয়ে বেশি কিছু হয়েছে। ফোন কর।

সান্তানু পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল। কল বাটনের ওপর আঙুল গিয়ে থামল। চাপল না। বাইরে বৃষ্টি তখনও ঝরছিল। ঘরের ভেতর শুধু মোবাইলের আলো তার মুখে পড়ে রইল। ঠিক সেই সময় বাইরে মেঘ গর্জে উঠল। নীল ডায়েরিটা টেবিলের ওপর পড়ে রইল। যেন সেও অপেক্ষা করছে, অসমাপ্ত গল্পটি কোথা থেকে শুরু হবে।

রাতভর বৃষ্টি শেষে সকালের আকাশ পরিষ্কার। শহরের গায়ে বৃষ্টির চিহ্ন রয়ে গেছে। রাস্তার পাশে জমে থাকা পানি, গাছের পাতায় ঝুলে থাকা ফোঁটা আর ধোয়া-ধোয়া আকাশের নিচে ঢাকাকে কিছুটা নতুন লাগছে।

সান্তানু জানালার ভারিপর্দা সরিয়ে দিল। হুড়মুড় করে সকালের ভেজা আলো ঘরে ঢুকে পড়ল। নিচের রাস্তায় দু-একটা পথকুকুর অলস ভঙ্গিতে হাঁটছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ঝাড়ু দিচ্ছেন। কয়েকজন স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ দ্রুত পায়ে হাঁটছেন। দূরে দু-একটি রিকশা টুংটাং ঘণ্টা বাজিয়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

ভোরের এই সময়টা সান্তানুর খুব প্রিয়। রাতের অস্থিরতা একটু হলেও হালকা হয়ে আসে। সে চায়ে চুমুক দিল। ঠোঁটে ভেসে উঠল পুরোনো গানের সুর। হাতে জ্বলছে সিগারেট। সকালের এই অল্প আরামই তাকে দিনের বাকি সময় বাঁচিয়ে রাখে। তখনই কলিংবেল বেজে উঠল। সান্তানু ভ্রু কুঁচকাল। এত সকালে কে? কয়েক সেকেন্ড পর আরও আরও কয়বার। 

দরজা খুলতেই প্রায় হোঁচট খেতে খেতে ভেতরে ঢুকল মুস্তাফিজ। চুল এলোমেলো। চোখ লাল। মুখে ক্লান্তির ছাপ। সান্তানুকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সে সোজা শোবার ঘরে গিয়ে বিছানায় লুটিয়ে পড়ল। ক্ষীণ গলায় বলল—‘আমাকে ডাকিস না... একটু শান্তিতে ঘুমাতে দে।

সান্তানু বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল—‘কী হয়েছে?

মুস্তাফিজ চোখ না খুলেই বলল—‘ঘুম থেকে উঠে বলব...

—‘ঠিক আছে।

মুস্তাফিজ মোবাইল ফোনটা বন্ধ করে পাশে রেখে চোখ বন্ধ করল। সান্তানু এসি চালিয়ে দিল। আলমারি থেকে পাতলা কাঁথা এনে বন্ধুর গায়ে চাপিয়ে দিল। এরপর শ্বাসের ওঠানামা ছাড়া কোনো শব্দ নেই।

দুপুর গড়িয়ে গেল। মুস্তাফিজ তখনও ঘুমিয়ে। সান্তানু রান্নাঘরে গিয়ে সাদা ভাত আর মুরগির ঝোল রান্না করল। কয়েকবার ডাকতে গিয়েও ডাকল না। বুঝতে পারছিল, ও ক্লান্ত এবং ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছে। একাই খাবার খেয়ে নিল। খবরের কাগজ হাতে নিয়ে লাইব্রেরি রুমে ডিভান সোফায় শুয়ে রইল।

টেবিলের ওপর এখনও পড়ে আছে পুরোনো ডায়েরি, সেই আলোকচিত্র আর ভাঁজ করা চিঠি।

অজান্তেই তার চোখ সেই লাইনটায় গিয়ে আটকাল। কিছু সত্য মানুষকে মুক্তি দেয় না’—কেন জানি কথাটা বারবার ফিরে এলো তন্দ্রা আসা পর্যন্ত।

বিকেলের দিকে ঘুম ভাঙতেই সান্তানু ঘন দুধ দিয়ে কড়া লিকারের এক মগ চা বানাল। চায়ের মগ, এক প্যাকেট সিগারেট আর সামনে খোলা পাণ্ডুলিপি। লেখার টেবিলে বসে কলমটা হাতে নিল সে। সাদা পাতার দিকে তাকিয়ে রইল। শেষে লিখল। লিখতে লিখতে অবার চায়ের তেষ্টা পেল। চা বানাতে উঠতে যাবে, ঠিক তখনি শোবার ঘরের ভেতর থেকে মুস্তাফিজের কাশি শোনা গেল। সান্তানু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

মুস্তাফিজ আর সান্তানুর বন্ধুত্ব প্রায় এগারো, বারো বছরের। এই দীর্ঘ সময়ে তাদের সম্পর্ক এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে খুব বেশি কথা বলার প্রয়োজন হয় না। মন ভালো থাকলে, মন খারাপ থাকলে, কিংবা কোনো বিশেষ দিন এলে মুস্তাফিজ হয় নিজেই সান্তানুর কাছে চলে আসে, নয়তো ফোন করে অফিসে ডেকে পাঠায়।

ঢাকায় আসার পর মুস্তাফিজের জীবন সহজ ছিল না। ভোলার ছোট্ট শহর ছেড়ে একরকম শূন্য হাতেই এসেছিল। প্রকাশনা ব্যবসায় টিকে থাকার জন্য কত অপমান, কত অনিশ্চয়তা, কত রাত না ঘুমিয়ে কাটাতে হয়েছে, তার হিসাব সে নিজেও জানে না। ক্রমাগত মানুষের আস্থা পেয়েছে। এখন প্রকাশনীটা দাঁড়িয়েছে। অন্তত দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন আর সংসারের খরচ নিয়ে প্রতিদিন আতঙ্কে থাকতে হয় না।

বছর তিনেক আগে অনুশ্রীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। অনুশ্রী একজন নৃত্যশিল্পী। অবসরে কবিতাও লিখত। তার বন্ধু, ইলিয়াস, একদিন অনুশ্রীর কবিতার পাণ্ডুলিপি নিয়ে মুস্তাফিজের প্রকাশনীতে এসেছিল।

প্রথম দেখাতেই অনুশ্রীর ব্যক্তিত্ব মুস্তাফিজের ভালো লেগেছিল। তার সংবেদনশীলতা আর সাহিত্য নিয়ে আগ্রহের জন্য। বই সম্পাদনার কাজে অনুশ্রীকে যুক্ত করল সে। দিনের পর দিন একসঙ্গে কাজ করতে করতে তাদের পরিচয় ঘনিষ্ঠতায় বদলে গেল।

অনুশ্রীর কবিতাগুলো সম্পাদনার পর নতুন রূপ পেল। সেই রূপে অনুশ্রীর অনুভূতি ছিল, মুস্তাফিজের সম্পাদনার ছোঁয়াও ছিল। দুজনেই বুঝতে পারল, কাজের বাইরে তাদের মনের ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে।

তারা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিল। শুরুর দিনগুলো ছিল উজ্জ্বল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উজ্জ্বল ফিকে হয়ে উঠল। এখন প্রায়ই ছোট ছোট বিষয় নিয়ে তর্ক হয়। তর্ক থেকে ঝগড়া। ঝগড়া থেকে সন্দেহ। অনুশ্রী মুস্তাফিজকে সন্দেহ করে। মুস্তাফিজও অনুশ্রীকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারে না। মুস্তাফিজ জানে, কিছু সম্পর্ক ভাঙে প্রতিদিন একটু একটু করে।

মুস্তাফিজ বারান্দায় দাঁড়িয়ে আয়েশে সিগারেটে টান দিচ্ছিল। সান্তানু বলল—‘যা, আগে ফ্রেশ হয়ে নে। কিছু খাবি? সেই সকালে এসে ঘুমালি, এখন বিকেল পাঁচটা। এক মাসের ঘুম কি একদিনেই দিয়ে দিলি? মাঝে মাঝে তোকে সত্যিই বুঝতে পারি না।

মুস্তাফিজ বলল—‘বুঝিস না? বুঝবি... বিয়ে কর। সব বুঝবি।

সান্তানুও হেসে ফেলল—‘তা হলে না বুঝেই ভালো আছি।

মুস্তাফিজ গোসল সেরে এল। ভাত খেয়ে ঘন দুধ দিয়ে কড়া লিকারের চা হাতে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসল। বেশ কিছু সময় দুজনেই চুপ!

শেষ পর্যন্ত মুস্তাফিজ নিজেই বলল—‘আমি যদি তোকে না-ই বলি কেন আজ ভোরবেলা তোর বাসায় চলে এলাম... তোর কোনো সমস্যা হবে?

সান্তানু চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলল—‘একটুও না। তোর যখন বলতে ইচ্ছে হবে, তখন বলবি। আর যদি কোনো দিনই বলতে ইচ্ছে না করে, তাতেও আমার আপত্তি নেই।

মুস্তাফিজ তার মুখের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল—‘এই জন্যই তো বারবার তোর কাছেই চলে আসি।

সান্তানু হেসে বলল—‘তাহলে চল, বেরিয়ে পড়ি।

মুস্তাফিজ মাথা নাড়ল—‘আজ আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। নিজের মধ্যেই থাকতে চাই।

—‘যেমন তোর ইচ্ছে।

দূরে রাস্তায় মানুষ ও গাড়ি চলাচল বেড়েছে খুবই। শহর তার প্রতিদিনের ব্যস্ততায় ঢুকে পড়লে অচেনা লাগে। অথচ ঘরের ভেতর সময় একটু ধীরে চলছে। এসময় সান্তানুর মোবাইল বেজে উঠল। স্ক্রিনে অর্ণবের নাম—‘কোথায় আছিস?

—‘বাসায়।

—‘আর কত বাসায় পড়ে থাকবি? শাহবাগে আয়। সবাই জড়ো হচ্ছি।

সান্তানু একবার মুস্তাফিজের দিকে তাকাল—‘তুই যাবি?

মুস্তাফিজ একটু ভেবে ইশারায় বলল—‘না। আজ নয়। তোরা যা।

অর্ণবের কণ্ঠ ভেসে এল—‘শুনছিস? বেশি ভাবিস না। চলে আয়।

সান্তানু হেসে বলল—‘আচ্ছা, আসছি।

ফোনটা রেখে সে নিশ্চুপ বসে রইল।

তার চোখ চলে গেল টেবিলের ওপর রাখা ডায়েরির দিকে। সেই অচেনা খাম, পুরোনো ছবিটা, আর ভাঁজ করে রাখা কাগজের দিকে। ঘরের ভেতরে সে কি কিছু একটা রেখে বাইরে যাচ্ছে। কিন্তু কী? সে নিজেও জানে না।

সান্তানু উঠে দাঁড়াল। শার্টটা গায়ে চাপিয়ে দরজার কাছে গিয়ে একবার ঘরের দিকে তাকাল। বইয়ের তাক, লেখার টেবিল, নীল ডায়েরি, আর অর্ধেক খাওয়া চায়ের কাপ। সবকিছু আগের জায়গাতেই আছে। তবু তার মনে হলো, এই ঘরে ফিরে এলে হয়তো আর সবকিছু আগের মতো থাকবে না। দরজায় তালা লাগিয়ে সে ও মুস্তাফিজ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল।

আসছে  দ্বিতীয় পর্ব