ঈগলের রাজ্যে বসবাস ও অন্যান্য কবিতা

অ+ অ-

 

আমি বুঝে গেছি—এই দেশকে শ্যামল হতে দেওয়া হবে না

আমি বুঝে গেছি—এই দেশকে শ্যামল হতে দেওয়া হবে না,
মুক্তকণ্ঠে পাখিকে ডাকতে দেয়া হবে না
উড়তে দেয়া হবে না স্বাধীন আকাশে
শিশুকে তার চেনা উঠোনে স্বপ্নের মতো বড় হতে দেওয়া হবে না!
কবিতা, গান, গল্পের নায়কেরা বেঁচে থাকবে কাগজে।
বাস্তবের ময়দান ক্রমশই ছোট হতে থাকবে, চুর্তুদিকে উঠবে অদৃশ্য দেয়াল।
স্বদেশের নামে জন্ম নেবে অসংখ্য পক্ষ—স্বদেশ থাকবে স্লোগানে।
অথচ তারা কেউ মাটির সন্তান নয়, তবু দাবি করবে মাটির মালিকানা।
সুবিধাজনক সময়ে ছিঁড়ে নেবে এই জনপদের শিরা-উপশিরা।
এতেই অস্ত্রের ঝনঝন আর অর্থের দম্ভে উর্বর জমিন রক্তে ভিজবে!
পদ্মা-মেঘনার বুকে একদিন বৃষ্টির বদলে নামবে বারুদের গন্ধ!

আমি বুঝে গেছি—এই দেশকে শ্যামল হতে দেওয়া হবে না!
ইতরেরা রাজ্য গিলেও ক্ষুধার কাছে পরাজিত,
সমুদ্র পান করেও থাকবে তৃষ্ণার্ত।
বালি, পাথর, বন আর পাহাড় খেয়েও ভয়ংকর
এদের তৃপ্তি কেবল রক্তে, রক্তই নিয়ে আসে খুশির আমেজ।
তাদের কাছে ফুলের গন্ধ অসহ্য
সবুজে যত ভয়তন্ত্র
তাই বাগানের আগে বানায় কাঁটাতার 
নদীর আগে বাঁধ
স্বপ্নের আগে ভয়
সত্যের সামনে দাঁড় করায় বন্দুক!
মাটি জানে—রক্ত স্রোতেও বেঁচে থাকে বীজ, আলো জ্বালাতে
একদল ডাকাত নিভিয়ে দেয় সেই আলো!

আমি বুঝে গেছি—এই দেশকে শ্যামল হতে দেয়া হবে না!
এই দেশ রক্তাক্ত গোলাপের! এই দেশ ডাকাতের!


ঈগলের রাজ্যে বসবাস

যেদিন আকাশ তার শব্দ-বন্দনা ভাঙে, ঠিক সেদিনই নেমে আসে ঈগল।
দূরের নীল প্রহরী—
চোখের তীক্ষè মানচিত্রের গোপন আয়নায় তাকায়,
আর নখে বহন করে অনিবার্য ভাষা।

এদিকে শিয়ালেরা মিথ্যাকে উৎসবে পরিণত করে,
বাঘের কানে সিংহের নামে আগুন ঢালে,
আর মজলিশজুড়ে অরাজকতার মাফিয়া হয়ে থাকে।

ঈগল কারও দারস্থ হয়ে বিচারের খাতা খোলে না;
শুধু অপেক্ষা থাকে—সবচেয়ে নিঃশব্দ মুহূর্তের।
তারপর ঝাপটা ডানা মেলে নেমে আসে
আর মাটি থেকে তুলে নেয় শিয়াল!
একজন অন্যজনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
বাবার উপরও বাবা আছে...

কিন্তু কেউ জানে না, 
পরেরবার ঈগল-নখ কাকে স্পর্শ করবে!


হে পাপের ইজারাদার

সবচেয়ে বেশি অন্ধ সে, যার বিবেক ঘুমিয়ে থাকে।

ঈশ্বর আমাদের চোখ দিয়েছেন—
অন্ধকারের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার স্বচ্ছ দেখতে;
কান দিয়েছেন—নীরবতার ভেতরে নীরব আর্তনাদ শুনতে।

তবু কত কত জন
নিজের চোখে পর্দা টানে,
কানে পাথর গেঁথে রাখে।
তবু চোখ রক্তের স্মৃতি ধারণ করে;
তবু কান, নীরব কান্নার ভাষা আয়াত্ত করে।

যে অবিচারের হাঁড়িতে মসলা মেশায়,
সে জানে না—আগুনেরও প্রখর স্মৃতিশক্তি আছে
আগুন আগে পোড়াবে, তবে পাপকে নয়—
পাপের ইজারাদারকে।


তুমি আগের মতো আর নেই

ধান থেকে চাল, চাল থেকে ভাত—
সভ্যতার সরল সমীকরণ সকলেরই মুখস্থ।
একদিন নারীকেও অনুবাদ করা হলো রান্নাঘরের ভাষায়; তাকে শেখানো হলো—নরম হতে হবে।

শতাব্দী পেরিয়ে এলো নতুন শতাব্দী,
মুক্তির প্রতিশ্রুতি নিয়ে—
কিন্তু ক্ষমতা কখন যে মুক্তির পোশাক পরে ক্ষুধার ভাষা আয়াত্ব করল, কেউ বুঝতেই পারল না!

আজকাল নারী-পুরুষ পাশাপাশি হাঁটে ঠিকই,
তবু জিহ্বার নিচে লুকিয়ে থাকে নতুন অভিযোগ;
তোমার পতন হোক, পতন হোক
কারণ, পাহারাদার বদলালেও কারাগার একই থাকে!

বি. দ্র: কবিতাগুলো ২০২৪ সালে লেখা।