কয়েদি ও কালপুরুষ

অ+ অ-


মানুষ এতটা কাছে কোথায় কখন আর আসে? 
এতটা হৃদয় খুলে কথা—এতটা হৃদয় ভুলে 
কবে কার সাথে বলে? এমন বোকার মতো হাসে 
নিজেরই ধিক্কারে কারা কোন খল তরঙ্গের কূলে?

অথচ গুহায় বন্দি, আলোশীর্ষ পাহাড়ের পাশে;
আঘাতে দেয়াল নয়, বুকের সিন্দুক যায় খুলে—
পেয়ে রত্নকণা চলছে লেনাদেনা বিপুল বিশ্বাসে,
অথচ এখানে হাওয়া স্তব্ধপ্রায় প্রতি শব্দমূলে।

তবুও এতটা কাছে মানুষ কি আর ফিরে আসে? 
এতটা হৃদয় খুলে কথা—এতটা হৃদয় গুলে 
কে যে কার সাথে বলে? নিজেরই ধিক্কারে কারা হাসে
এমন ফাটা কার্পাসে—কোন খল তরঙ্গের কূলে? 

তাই ইচ্ছে করে আরও অন্ধকার, কালি মেখে গায় 
পিপাসার্ত বসে থাকি পাপার্তের এ পাঠশালায়।

 

কালপুরুষের কথা হয় শুধু কয়েদির সাথে—
এতটা জীবন পার ক’রে এতদিনে অবেলায়
তার মুখোমুখি হওয়া গেল—পউষের শেষরাতে
বালুচরে মৌন জেলখানার ঘুমন্ত জানালায়।

অথচ এ চোখে ছিল নীলচিতা—নীলের অধিক—
মনে ছন্দ—মন্দাকিনী। দিনের আহত শব্দকণা
জ্বলে উঠেছিল কতবার—কত রাত্রির গথিক
গির্জার দেয়াল জুড়ে লিখে লিখে তারার কল্পনা। 

জবান খোলে নি তবু, হয় নি সময় এতদিন।
এবার কি ভাষা পেলে, বিঁধে নিলে তিরের ফলায়—
যে মৃগদানব আজ মানুষের কণ্ঠ ক’রে ক্ষীণ
ফেলে রাখে অন্তরীণ—পাথরের কুঠুরি-তলায়?

এখানে ঘুমন্ত জানালায় মৃদৃ আলো-ইশারাতে
যত কথা হয়—প্রহরীর শ্বাস লেগে রয় তাতে...

 

‘কারারক্ষী, কারারক্ষী, বাতিটা নেভাও’—মাঝরাতে
হাঁক দেয় জেলবন্ধু। জানে, বাতি নেভানো বারণ।
জানে এও : কিছু বিধি থেকে যায় বিধির তফাতে—
আমাদেরই দয়া, দুঃখ, অনাস্থাই হয়তো কারণ।

অন্ধকারও কত প্রার্থনীয়, কত অনুনয় তাতে!
হায় ঘুম, হায় ক্লান্তি—তোমাদেরও ভাঙা উচ্চারণ
যেন শুনি—জীর্ণ দেয়ালের গায়ে অস্ফুট আঘাতে—
তোমাদেরই মুখচ্ছবি দুটি চোখে করেছি ধারণ।

ঘুম তবু আসে নাকো, হাওয়া এসে ক্লান্তিকে ছড়ায়;
স্বপ্ন আর জাগে না কোথাও, শুধু কারারক্ষী জাগে।
তবুও হুইসেল কেন সে বাজায়—রাত্রি-অমরায়—
এ দুর্ভাবনায় তাকে পথের কুকুরগুলো ডাকে।

‘কারারক্ষী, কারারক্ষী, বাতিটা নেভাও’—কেউ আর
বলে না একটিবার। ফুটে ওঠে অর্থ—স্তব্ধতার।

 

তুমি হে কালপুরুষ, জেগে আছ রাতের প্রহরী।
তুমিও নিঃসঙ্গ বুঝি, নিস্তব্ধ এ গাছটির মতো! 
ধনুর্বাণ হাতে নিয়ে উঁচু কোন অদৃশ্য টাওয়ারে 
দাঁড়িয়ে নিশ্চল, দিচ্ছ পাহারা ঘুমন্ত পৃথিবীকে!

অথচ পেরিয়ে সিন্ধু, সরোবর—মেঘেদের ডানা 
আর পাখিদের পাখাগুলো ছুঁয়ে—ধুম-পাহাড়ের 
কোলে, বনানীর ধারে গড়ে ওঠা শান্ত লোকালয়ে 
উড়ে এসে পড়ে ড্রোন, সাঁই সাঁই উড়ে চলে যায়...

কোথায় ভিয়েতনাম, ফিলিস্তিন, ইরাক, ইরান!
অথবা জাপান! তুর্কি, আফগান সবাই দেখেছে
আমারই মতন, একচক্ষু শূন্যতায় নিষ্পলক—
তুমি হে কালপুরুষ, জেগে আছ অতন্দ্র প্রহরী।

এখানে প্রহর কাটে আয়ুর দর্পণে শিখা জ্বেলে,
রাত্রির মলাট খুলে দিন আসে নামলিপিহীন।

 

রাতের দেবতা তুমি, অথচ দিনের পলাতকা। 
তোমার চেয়েও সূক্ষ্ম নির্ভুল নিরিখে কত শত 
স্যাটেলাইট আমাকেই লক্ষ্য করে ছুটছে একরোখা,
বলছে তারা ইশারায়, সতর্ক সংকেতে অবিরত— 
যেন আমি হতে পারি আরও বেশি কারও অনুগত, 
যেন আমি রয়ে যাই জন্মাবধি মূঢ়তর বোকা।
পথে পথে জলের অধিক তাই পেয়েছি জলৌকা— 
তুমি হে কালপুরুষ, ছিলে নির্বিকার—নীলায়ত।

কয়েদির চোখে তবু এই দৃশ্য তীব্র-তমোহর, 
যখনই দাঁড়াও এসে অন্ধকারে—দীপ্র তিরন্দাজ— 
দিকে দিকে জেগে ওঠে আকাশের সকল মন্তাজ, 
শব্দহীন ভেঙে পড়ে জানালার ছোট্ট পরিসর।
না থাকুক সাথে তার ভাঙা তলোয়ার, কিম্বা তাজ—
রণসাজ দানা বাধে চুপিসারে মজ্জার ভিতর।

নোট: ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে কারাবন্দি অবস্থায় কবি কয়েদি ও কালপুরুষ নামে একগুচ্ছ সনেট রচনা করেন। সেই সনেট-সিরিজ থেকে ৫টি কবিতা এখানে প্রকাশিত হলো।