ধূমকেতু: কাজী নজরুলের যুগান্তকারী পত্রিকা
বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ একটি যুগান্তকারী পত্রিকা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং জাতীয় চেতনার জাগরণে এ পত্রিকার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর সাহসী ভাষা, বিদ্রোহী মনোভাব ও বিপ্লবী বক্তব্য সমকালীন সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। একই সাথে এটি শাসকগোষ্ঠী ও নজরুল বিরোধীদের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়।
‘ধুমকেতু’ প্রকাশের পটভূমি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ভারতের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত করে এবং অর্থনৈতিক শোষণ, সামাজিক বৈষম্য ও প্রশাসনিক নিপীড়নের মাধ্যমে জনজীবনকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। ঔপনিবেশিক সরকারের ধারাবাহিক দমন-পীড়ন, বৈষম্যমূলক নীতি এবং নাগরিক অধিকার হরণের ফলে ভারতীয় জনগণের মধ্যে স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও আত্মমর্যাদার আকাঙ্ক্ষা ক্রমেই তীব্রতর হতে থাকে।
১৯২১ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরোধিতা করলেও ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্য ও কৌশল সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল। কংগ্রেস সে সময় স্বরাজ বা স্বশাসনের দাবিকে কেন্দ্র করে অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে সর্বস্তরের জনগণকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। তবে পূর্ণ স্বাধীনতা তখনও কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে ঘোষিত হয়নি। অন্যদিকে মুসলিম লীগের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল তুলনামূলকভাবে সংযত ও সাংবিধানিক। সংগঠনটি প্রত্যক্ষ সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনা, সমঝোতা এবং ধাপে ধাপে রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের নীতিকে অধিক গুরুত্ব দিত। একই সঙ্গে ভারতীয় মুসলমানদের পৃথক প্রতিনিধিত্ব, নির্বাচনী অধিকার ও সাংবিধানিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে তারা তাদের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করত। যদিও স্বাধীনতার প্রশ্নে মুসলিম লীগের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মত ও দৃষ্টিভঙ্গির উপস্থিতি ছিল, তবুও সংগঠনটির সামগ্রিক রাজনৈতিক কৌশল ছিল সাংবিধানিক পদ্ধতির মাধ্যমে মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণ ও রাজনৈতিক অবস্থানকে সুদৃঢ় করা।
অসহযোগ আন্দোলনে ব্রিটিশ শাসনের অটল শক্তির সামনে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জনে ব্যর্থতা এবং ১৯২২ সালে উত্তর প্রদেশের চৌরিচৌরার ঘটনায় মহাত্মা গান্ধী বিচলিত হয়ে অসহযোগ আন্দোলন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেন। এতে বিপ্লবী চেতনায় এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এলো, তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা দিল গভীর হতাশা। অপরদিকে ব্রিটিশ প্রশাসন রাজনৈতিক বন্দিদের ওপর কারাগারে অমানবিক নির্যাতন অব্যাহত রাখে। ফলে সরকারের নির্মম নির্যাতনের ভয়ে যুগান্তর ও অনুশীলন দলের সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলন কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে যায়। ১৯২১ ডিসেম্বরের শেষ অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস ও অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের অধিবেশনে মৌলানা হসরৎ মোহানি বিভিন্ন স্বাধীন রাষ্ট্র নিয়ে ভারতীয় ফেডারেশন গঠনের দাবি উত্থাপন করেন। এতে ব্রিটিশ সরকার তাকে দু'বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন।
এই জাগরণের অভিঘাত সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনেও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। কাজী নজরুল ইসলামও সময়ের এই অগ্নিগর্ভ বাস্তবতা থেকে বিদ্রোহী চেতনার প্রেরণা লাভ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে কলম হতে পারে সংগ্রামের এক শক্তিশালী অস্ত্র। তাই তিনি সাংবাদিকতাকে জনগণের চেতনা জাগ্রত করার কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। জাতিকে স্বাধীনতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ করা এবং ঔপনিবেশিক শাসনের স্বরূপ উন্মোচনের লক্ষ্যে ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট, বাংলা ১৩২৯ সালের ২৬ শ্রাবণ তারিখে তার সম্পাদনায় ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকার মাধ্যমে তিনি নির্ভীকভাবে ব্রিটিশ শাসনের অবিচার, শোষণ ও দমননীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। পাশাপাশি স্বাধীনতা, সাম্য ও মানবমুক্তির আদর্শকে জনমনে প্রতিষ্ঠিত করার নিরন্তর প্রয়াস চালান। ফলে ‘ধূমকেতু’ শুধু একটি পত্রিকা নয়, বরং স্বাধীনতা, সাম্য ও বিদ্রোহের এক বলিষ্ঠ মুখপত্রে পরিণত হয়।
পত্রিকার প্রচ্ছদে প্রথম সংখ্যায় 'সপ্তাহে দুইবার করিয়া বাহির হইবে' দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যায় 'সপ্তাহে দু'বার বেরুবে' চতুর্থ সংখ্যা থেকে 'হপ্তায় দু'বার করে দেখা দেবে' এই ঘোষণা দিয়ে পত্রিকাটি বের হয়েছিল। অর্থাৎ এটি ছিল অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা, ইংরেজিতে যাকে বলে By weekly, পত্রিকাটির বার্ষিক মূল্য ৫ টাকা, নগদ মূল্য প্রতি সংখ্যা ১আনা। ক্রাউন ১৫"X ২০" পৃষ্ঠার মাপে প্রথম ১৬ পৃষ্ঠার পত্রিকা বের হয়। কাগজ সাধারণ নিউজ প্রিন্ট।
দ্বিতীয় সংখ্যা ছিল ১৪ পৃষ্ঠার। তারপর তৃতীয় সংখ্যা থেকে ১২ পৃষ্ঠার পত্রিকা বের হতে থাকে। ষষ্ঠ সংখ্যা পর্যন্ত এভাবে চলে। প্রথম পৃষ্ঠায় কাগজের ওপর দিকে সৌর মণ্ডলের ছবি, তাতে ধূমকেতু আঁকা। সবই কালো কালিতে ছাপা। তার নীচে বড় হরফে লেখা সম্পাদক—কাজী নজরুল ইসলাম। ৩২নং কলেজ স্ট্রিট, কলকাতা থেকে আফজালুল হক কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়েছিল ‘ধূমকেতু’। ছাপা হয়েছিল মেটকাফ প্রেসে। যার ঠিকানা ৭৯ বলরাম দে স্ট্রিট, কলিকাতা। ধূমকেতুর বয়স হয়েছিল পাঁচ মাস ষোল দিন। প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট, বাংলা ২৬ শ্রাবণ ১৩২৯। শেষ সংখ্যা ‘ধূমকেতু’র তারিখ ১৩ মাঘ ১৩২৯ সাল, ২৭ জানুয়ারি, ১৯২৩। ‘ধূমকেতু’র মোট ৩২টি সংখ্যা বের হয়েছিল।
‘ধুমকেতু’ প্রকাশের আগে নজরুল বাণী চেয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ (তখন পণ্ডিচেরীতে ছিলেন) এবং আরও অনেককে পত্র লিখেছিলেন। তাদের নিকট থেকে বাণী এসেছিল। পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যার দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছিল ৮ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির অভিনন্দনবার্তা। এই ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ছিলেন—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সরোজিনী নাইডু, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, যতীন্দ্রমোহন বাগচী, পরিসুন্দরী ঘোষ, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিরজাসুন্দরী দেবী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও যতীন্দ্রমোহন বাগচী অভিনন্দন জানিয়েছিলেন কবিতায়। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের বাণীটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি কবিতায় নিম্নলিখিত কয় ছত্র পাঠিয়েছিলেন—
কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু
আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু,
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,
দুৰ্দ্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন!
অলক্ষণের তিলক রেখা
রাতের ভালে হোক না লেখা,
জাগিয়ে দে রে চমক মেরে’
আছে যারা অর্দ্ধচেতন।
২৪ শ্রাবণ ১৩২৯ শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(‘ধুমকেতু’তে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে লেখা থেকে উদ্ধৃত)
রবীন্দ্রনাথের এই অভিন্দন বার্তা পত্রিকার সকল সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হতো। ‘ধুমকেতু’ জন্ম-কথা নিয়ে মুজফ্ফর আহমদ ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি কথা’ গ্রন্থে লিখেছেন—দেওবন্দ মাদ্রাসার প্রাক্তন ছাত্র চট্টগ্রাম নিবাসী মসউদ আহম্মদ তাঁর কাছে একটি প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন। সে একটি বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করতে চায় এবং পত্রিকাটির লেখা ও পরিচালনার দায়িত্ব যেন তিনি গ্রহণ করেন। পত্রিকাটি সম্পূর্ণরূপে রাজনৈতিক হবে বলেও মাসউদ উল্লেখ করে। এছাড়া, খলিফা ওমর যে ‘সোস্যালিজম’র কিছু নীতি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন, সে কথাও মসউদ তাঁর কাছে তুলে ধরে।
সব কথা শোনার পর তিনি মসউদকে জিজ্ঞাসা করেন, অর্থের ব্যবস্থা কীভাবে হবে। উত্তরে মসউদ জানায় যে সে আড়াইশ’ টাকা সংগ্রহ করেছে। এ কথা শুনেই তিনি প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে মাত্র আড়াইশ’ টাকা হাতে নিয়ে একটি পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হঠকারিতা হবে। তাঁর ধারণা হয়েছিল, এতে মসউদ হতাশ হয়ে ফিরে গেছেন।
কিন্তু বাস্তবে মসউদ হতাশ হয়নি। তাঁর কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরই সে সরাসরি কাজী নজরুল ইসলামের কাছে যায় এবং একই প্রস্তাব তাঁর কাছেও উপস্থাপন করে। সে সময় নজরুল ‘সেবক’ পত্রিকায় সন্তুষ্ট ছিলেন না। ফলে মাসউদ আহমদের প্রস্তাবে তিনি তৎক্ষণাৎ সম্মতি দেন। এই কাজে যোগ দেওয়া উচিত কি না, সে বিষয়ে তিনি কারো সঙ্গে—এমনকি তাঁর সঙ্গেও-পরামর্শ করেননি। কারণ, তিনি আগেই মসউদ আহমদের প্রস্তাবে অসম্মতি জানিয়েছিলেন। তবে নজরুল তাঁর বন্ধুদের শুধু এতটুকুই জানিয়েছিলেন যে তিনি একটি নতুন পত্রিকা প্রকাশ করতে যাচ্ছেন এবং সবার সহযোগিতা কামনা করেছিলেন। মসউদ আহমদের প্রস্তাব ছিল সাপ্তাহিক কাগজের, কিন্তু নজরুল ঠিক করল যে কাগজখানা সপ্তাহে দু’বার বার হবে। মাসউদ আহমদের আড়াইশ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি দুশো টাকা দিয়েছিলেন। নজরুলের তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না। পরে জানা গিয়েছিল মসউদ পুলিশের দ্বারা নিয়োজিত ছিলেন।
নজরুল কাগজের নাম স্থির করলেন ‘ধূমকেতু’ সম্পাদক নিজে, ম্যানেজার শান্তিপদ সিংহ। আফজালুল হক মুদ্রাকর ও প্রকাশক হিসাবে চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত হতে ডিক্লারেশন নিলেন। তখন ডিক্লারেশন নেওয়া সহজ হয়ে গিয়েছিল। জামানত হিসাবে টাকা জমা দিতে হতো না। ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রীট। ‘সেবকে’ যোগ দেওয়ার পরে নজরুল আফজালুল হকের সঙ্গে এ বাড়িতেই ছিল।
পত্রিকাটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল এবং বিক্রয়ের দিক থেকে সেকালের সকল পত্রিকাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তরুণদের মধ্যে অভাবনীয় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। পত্রিকা সংগ্রহের জন্য তারা রাস্তার মোড়ে মোড়ে অপেক্ষা করত। তারপর হুড়োহুড়ি কাড়াকাড়িতে কয়েক মিনিটের মধ্যে তা নিঃশেষ হয়ে যেত। কেন পত্রিকাটি এ রকম জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, নিজের স্মৃতিচারণায় সে কারণ উল্লেখ করেছিলেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, ‘কালির বদলে রক্তে ডুবিয়ে লেখা’ হতো এর সম্পাদকীয় প্রবন্ধগুলো। বোঝাই যায়, নজরুলের লেখাগুলো আলোড়ন তুলেছিল।
অসহযোগ আন্দোলনের খাতিরে সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরা তাদের কার্যকলাপ বন্ধ রেখেছিল। নজরুলের আবেদন তাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছিল ফলে নতুন করে তারা চেতনা লাভ করেছিল। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের দু’টি বড় বিভাগের মধ্যে ‘যুগান্তর’ বিভাগে সভ্যরা তো বলছিলেন, ‘ধূমকেতু’ তাঁদেরই কাগজ। নজরুল শ্রীনিবারণ ঘটকের দ্বারা সাম্যবাদে প্রভাবিত হলেও সে সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের কোনো দলের সভ্য ছিল না। অতিমাত্রায় নিরুপদ্রবতা প্রচারের ফলে আন্দোলন মিইয়ে গিয়েছিল। এ হতে নজরুল তার লেখার ভিতর দিয়ে দেশকে খানিকটা চাঙ্গা করে তুলতে চেয়েছিল। এই করতে গিয়ে সে যে ঢেউ তুলেছিল তার দোলা লেগেছিল গিয়ে সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের প্রাণে।
মহান উর্দু কবি ফজলুল হাসন হসরৎ মোহানী আহমদাবাদে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের অধিবেশনে পরিপূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে কঠিন মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। তা সত্ত্বেও বাংলার কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২২ সালের ১৩ই অক্টোবর তারিখে ‘ধূমকেতু’তে লিখেছিলেন—
“সর্বপ্রথম ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়।”
‘স্বরাজ টরাজ বুঝি না, কেন না, ও-কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীর অধীনে থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসন-ভার সমস্ত থাকবে ভারতীয়ের হাতে। তাতে কোন বিদেশীর মোড়লী অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। যাঁরা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এদেশে মোড়লী করে দেশকে শ্মশানভূমিতে পরিণত করেছেন, তাঁদের পাততাড়ি গুটিয়ে, বোঁচকা-পুটলি বেঁধে সাগরপারে পাড়ি দিতে হবে। প্রার্থনা বা আবেদন নিবেদন করলে তাঁরা শুনবেন না, তাঁদের অতটুকু সুবুদ্ধি হয়নি এখনো। আমাদের এই প্রার্থনা করার, ভিক্ষা করার কুবুদ্ধিটুকুকে দূর করতে হবে।’
১১ই জুলাই, ১৯২২ তারিখে হাইকোর্ট মোকদ্দমার রায়ে মৌলানা হসরত মোহানীর রাজদ্রোহের সাজা (দু'বছর সশ্রম কারাদণ্ড) বহাল রেখেছিলেন। মৌলানা হসরৎ মোহানীর হাইকোর্টের মোকদ্দমা সবে শেষ হয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণা রাজদ্রোহ জানা সত্ত্বেও অনেক শক্ত বুকের পাটা ছিল বলেই নজরুল এইভাবে খোলাখুলি পরিপূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলতে পেরেছিল।
কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ ছিল একটি যুগান্তকারী পত্রিকা, যা ব্রিটিশবিরোধী চেতনা, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের শক্তিশালী মুখপত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই পত্রিকার অন্যতম প্রধান আদর্শ ছিল স্বাধীনতা ও সাম্যের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান। নজরুল বিশ্বাস করতেন, মানুষের জন্মগত অধিকার হলো স্বাধীনতা এবং সমাজে সকল মানুষের সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা। তাই ‘ধূমকেতু’তে তিনি পরাধীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন এবং অন্যায়, শোষণ ও বৈষম্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান। একই সঙ্গে পত্রিকাটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা প্রচার করে। হিন্দু-মুসলিম বিভেদ দূর করে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান ছিল এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। নজরুল মনে করতেন, ধর্ম নয়, মানবতাই মানুষের প্রকৃত পরিচয়। এছাড়া ‘ধূমকেতু’র গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল তরুণ সমাজকে জাগ্রত করা। যুবকদের মধ্যে দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ, সাহস ও সংগ্রামী চেতনা সৃষ্টি করে স্বাধীনতার আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করার জন্য তিনি ধারাবাহিকভাবে লেখালেখি করেন। তাঁর ভাষা ছিল প্রেরণাদায়ক, উদ্দীপনাময় এবং বিপ্লবী চেতনায় উজ্জীবিত। ‘ধূমকেতু’র ভাষাশৈলীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এর সাহসী, তীক্ষ্ণ ও কাব্যিক উপস্থাপনা। নজরুলের লেখায় যুক্তির পাশাপাশি আবেগ, অলংকার এবং কাব্যিক সৌন্দর্যের অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়, যা পাঠকদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করত। এভাবেই ‘ধূমকেতু’ কেবল একটি সংবাদপত্র নয়, বরং স্বাধীনতা, সাম্য, মানবতা ও জাতীয় জাগরণের এক শক্তিশালী সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে স্থায়ী স্থান লাভ করে।
নজরুলের কবিতা প্রবন্ধ সম্পাদকীয় ছাড়া ‘ধূমকেতু’তে শিবরাম চক্রবর্তী, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রবোধচন্দ্র সেন, হুমায়ুন কবির, হেমেন্দ্রকুমার রায়, বলাইদেব শর্মা, প্রেমাঞ্জুর আতর্থী, ফরিদপুরের কোটালি পাড়ার বীরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ লিখতেন। নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় ‘ত্রিশূল’ ছদ্মনামে ম্যাটসিনি-গ্যারিবল্ডি-কাভুরের জীবনী লিখতেন নিয়মিত। ‘নিক্তি-নিকষ’ নামে একটি গ্রন্থ পরিচয় বিভাগ ছিল। সাধারণভাবে প্রাপ্ত বইগুলো সম্পর্কে দু’চারকথা বলা হত। ‘মুড়ো খ্যাংরা: শ্রীকাঁধে বাড়ি বলরাম’ বিভাগে দেশ ও সমাজের উপর অন্যায় অত্যাচারের প্রতিবাদ থাকত এবং তা মাঝে মাঝে প্রকাশিত হতো। মুজফফর আহমদ ‘দ্বৈপায়ন’ ছদ্মনামে ‘দ্বৈপায়নের পত্র’ লিখতেন। মহিলাদের জন্য স্বতন্ত্র একটি বিভাগ ছিল—নাম ছিল ‘সন্ধ্যাপ্রদীপ’। এই বিভাগে মহিলাদের লেখা ছাপা হতো তাদের সমস্যা ও সমাধানের ওপর লেখা থাকত। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২), মিসেস এম রহমানের (মাসুদা খাতুন ১৮৮৪-১৯২৬) লেখা এই বিভাগে থাকত। ‘খাট্টামিঠা টিপ্পনি’ বিভাগে কৌতুকপূর্ণ মন্তব্য, ‘সানাইয়ের পোঁ’ বিভাগে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত আলোচনা ও প্রবন্ধের পুনর্মুদ্রণ, ‘শনির পত্র’ বিভাগ ছিল চিঠিপত্র বিভাগ, 'হংসদূতে' থাকত নজরুলের উদ্দেশে প্রেরিত অভিনন্দনবার্তা ও আশীর্বাণী, সর্বোপরি থাকত তিন ধরনের সংবাদ-দেশের খবর, ‘মুসলিম জাহান’, ‘পরদেশী পঞ্জী’। ‘দেশের খবর’ বিভাগে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামাজিক খবরাখবর ‘মুসলিম জাহানে’ বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রের খবর আর ‘পরদেশী পঞ্জী’তে থাকত অন্যান্য দেশের খবর। সংবাদ পরিবেশনের ভঙ্গিটি ছিল সহজ সরল এবং চিত্তাকর্ষক হেডিং—সাধারণ পাঠক যাতে সহজে বুঝে নিতে পারে। সংবাদের সঙ্গে সরস টীকাটিপ্পনী থাকত। সংবাদ পরিবেশনে তার দক্ষতার কয়েকটি উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো—
১ম বর্ষ ৮ম সংখ্যা, ১২ই সেপ্টেম্বর ১৯২২ প্রকাশিত হয় ‘বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা ঘর শত্রু বিভীষণ’
বোম্বাই প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির মোট ৬০ জন সদস্যের মধ্যে ৪০ জন নাকি গভর্নমেন্টের গোয়েন্দা বিভাগের চর বলে ধরা পড়েছে। আইন অমান্য গৃহীত প্রস্তাবসমূহ সরকারের নিকট জানানো হয়েছে।
যে ঘর-শত্রু বিভীষণের দল মা’কে পরের হাতে সঁপে দেয়, তাদের জন্য মা রুদ্রকালীর রক্ত খড়গ আস্ফালন করে উঠুক। ...যে ইংরেজ বিদ্রোহী আইরিশ তরুণ রবার্ট এমেটকে ফাঁসি দিয়ে মেরে তারপর তিনখণ্ড করে কেটে রাস্তার মোড়ে মোড়ে টাঙিয়ে রেখেছিল আর বলেছিল দেখ কেমন করে দেশদ্রোহীর প্রতি ব্যবহার করতে হয় সেই বৃটিশসিংহ এই সব মাদি টিকটিকিদের সম্বন্ধে কি বলেন?
১ম বর্ষ ৮ম সংখ্যা, ১২ই সেপ্টেম্বর ১৯২২ প্রকাশিত হয় ‘দুঃশাসনের বস্ত্রহরণ’—
সত্যাগ্রহ যুদ্ধ নতুন করে আরম্ভ করাতে মিঃ বাপাত ও আরও ২৩ জন সত্যাগ্রহী গ্রেপ্তার হয়েছেন।
এই সত্য নিতে কেহ নাহি পারে কেড়ে
যতই টানিবে খুড়ো তত যাবে বেড়ে।
১ম বর্ষ ৮ম সংখ্যা, ১২ই সেপ্টেম্বর ১৯২২ প্রকাশিত হয় ‘কিল্লাফতে’—
কাগজ ছাপা হচ্ছে এমন সময় খোশখবর এলো তুর্কীরা স্মার্ণা দখল করছে।
সাবাস কামাল মোস্তফা।
তোরই দেখছি মোচ তোফা।
খুব কসে ভাই গোস্ত খা।
বাঁধ জালিমের হস্ত পা।
গোবর-নর প্রসবিনী বঙ্গমাতা
১ম বর্ষ ১২শ সংখ্যা, ২৬শে সেপ্টেম্বর ১৯২২ প্রকাশিত হয় ‘গোবর-নর বঙ্গমাতা’—
বঙ্গমাতা কেবল রত্ন প্রসবিনী নন-গবর্ণর প্রসবিনীও বটে। ইতিপূর্বে বঙ্গমাতা দুইজন গবর্ণর প্রসব করেছেন এক লর্ড সিংহ ও দ্বিতীয় জন স্যার হ্যানরী হুইলার। এবার আর একজন গবর্ণর প্রসব করিলেন—স্যার জন কার। ইনি বাঙলার খাস দপ্তরের সদস্য ছিলেন—এখন আসামের গবর্ণর নিযুক্ত হলেন।
‘ধূমকেতু’-তে মাঝে মাঝে সচিত্র থাকত। বিশেষ সংখ্যাও বের হতো, যেমন ‘মোহররম সংখ্যা’ ‘আগমনী সংখ্যা’ (১২শ সংখ্যা ২৬. ৯. ১৯২২), ‘দেওয়ালী সংখ্যা’ (১৫শ সংখ্যা ২০.১০. ১৯২২), ‘কংগ্রেস সংখ্যা’ (৩০শ সংখ্যা), ‘নজরুল সংখ্যা’ (৩২শ সংখ্যা)। ৭ম সংখ্যা মোহররম সংখ্যারূপে বের হয়। এই সংখ্যায় ইমাম হোসেনের সমাধি, জমজম কূপ, মদিনায় হজরত মুহম্মদের (সা.) রওজা মোবারক, মক্কায় তাঁর জন্মস্থান, বিবি ফাতেমার বাসগৃহের ছবি ছিল। এই সংখ্যায় শহীদ ক্ষুদিরামের (১৮৮৯-১৯০৮) ছবিও ছিল।
‘ধূমকেতু’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতেই নজরুলের অগ্নিঝরা ‘ধূমকেতু’ কবিতা প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে তার কাব্যগ্রন্থ ‘বিষের বাঁশি’ ও ‘ভাঙার গান’-এর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতাও এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এছাড়া, তিনি যে সম্পাদকীয় নিবন্ধগুলো লিখেছিলেন, সেগুলোর নির্বাচিত অংশ সংকলিত করে ‘রুদ্রমঙ্গল’ (ভাদ্র ১৩২৯) এবং ‘দুর্দিনের যাত্রী’ (আশ্বিন ১৩২৯) নামে দুটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ১৯২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে রচিত ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি ‘ধূমকেতু’-তে প্রকাশিত হলে ব্রিটিশ সরকার তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং পত্রিকাটি রাজরোষের শিকার হয়। তবে এর আগেই পত্রিকাটি সরকারের কঠোর নজরদারির আওতায় ছিল। সমসাময়িক সূত্রে জানা যায়, মসউদ আহমদের মাধ্যমে পুলিশ গোপনে পত্রিকার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করত এবং আর্থিক সহায়তারও ব্যবস্থা করেছিল বলে প্রচলিত রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি ছিল দমন-পীড়নের একটি উপলক্ষ মাত্র; এর পূর্বেও ‘ধূমকেতু’-তে ব্রিটিশবিরোধী ও বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ বহু তীব্র কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল—
রক্তাম্বর পর মা এবার
জ্বলে পুড়ে যাক শ্বেত বসন;
দেখি ঐ করে সাজে মা কেমন
বাজে তরবারি ঝন্ন-ঝন্।
সিঁথির সিঁদুর মুছে ফেল মা গো,
জ্বাল সেথা জ্বাল সেথা কাল-চিতা
তোমার খড়গ—রক্ত হউক
স্রষ্টার বুকে লাল ফিতা।
… … …
টুটি টিপে মারো অত্যাচারে মা,
গল-হার হোক নীল ফাঁসি
নয়নে তোমার ধূমকেতু-জ্বালা
উঠুক সরোষে উদ্ভাসি
(রক্তাম্বরধারিণী মা: অগ্নিবীণা)
‘ধূমকেতু’র সারথি মুক্তি ও স্বাধীনতা ও সরকারের খয়ের খাঁদের সম্পর্ক ওজস্বিনী ভাষায় প্রবন্ধ গান কবিতা লিখে বৃটিশ রাজকে ব্যতিব্যস্ত করে তুললেন। ‘ধূমকেতু’ সবার কাছ থেকে অযাচিত অভিনন্দন পেয়েছিল যেমন দেওঘর থেকে সত্যানন্দ, অতীন্দ্রমোহন রায় (১৮৯৬-১৯৭৯), কোচবিহার থেকে প্রসন্নকুমার সমাদ্দার, কৃষ্ণনগর গোয়ারী থেকে নারায়ণদাস চট্টোপাধ্যায় প্রভৃতি। পত্র-পত্রিকাও প্রশংসা করেছিল। যেমন—আনন্দবাজার পত্রিকা ১৪ আগষ্ট ১৯২২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘ধূমকেতু'র প্রথম সংখ্যা সমালোচনা—
…সম্পাদক-কবি, কবিতার মধ্য দিয়া তিনি এক বীরত্বব্যঞ্জক অভিনব ভাবধারা আনিয়াছেন। বর্তমানে অসার নিস্পন্দ বাঙালি জীবনে তাঁহার কবিতা উৎসাহ চাঞ্চল্যভরা জাগরণ আনিবে। ‘ধূমকেতু’র প্রথম সংখ্যা পড়িয়া আমরা আশান্বিত হৃদয়ে নবীন সহযোগীকে সাদর অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করিতেছি। বাঙ্গালার জরাগ্রস্ত যৌবনকে নবজীবনের উদ্যমে আবেগে কর্মচঞ্চল করিয়া তুলিবার প্রত্যেক আয়োজনের সহিতই আমাদের আন্তরিক সহানুভুতি আছে। ‘ধূমকেতু’র সাধু সংকল্প জয়যুক্ত হউক।
অমৃতবাজার পত্রিকা ৩০ আগষ্ট ১৯২২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল—
…We cordially welcome the advent of our new Bengali contemporary the 'Dhoomketu' a bi-weekly edited by Habildar Kazi Nazrul Islam published from 32 College Street, Calcutta. The editor has already made his mark as a powerful poet and some of his recent poems, particularly the 'Bidrohi' are among the most wel-known in the Bengali literature. The articles from the editorial pen in the 'Dhoomketu' fully sustain the reputation of the soldier-poet and the collection he has been able to make are in tune with the fire and energy of his own writings. There is something novel, something enthralling in this new venture. We hope, the 'Dhoomketu' or Comet will not simply be an emblem of destruction in the hands of the soldier-poet but will create something that is beautiful, something that is abiding and holy.
দৈনিক বসুমতী ১২ই ভাদ্র ১৩২৯ সংখ্যায় লিখেছিল—
…বাঙলার নবীন কবি সুলেখক সুগায়ক স্নেহাস্পদ কাজী নজরুল ইসলাম ভায়া ধূমকেতুকে মাঙ্গলিক বেশে সাজাইয়া বাহির করিয়াছেন। ইহাতে ভয়ের কিছুই নাই কেবল নামটায় যা কিছু।... আশা করি কাজী নজরুল সাধনায় সিদ্ধিলাভ করিবেন।
আত্মশক্তি ৩০ আগস্ট ১৯২২ সংখ্যায় লিখেছিল—
…কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ বাংলার আকাশে উদিত হয়েছে। আমরা আমাদের আশীর্বাচন দিয়ে সহযোগীকে তাঁর জন্মদিনে আহ্বান করছি, আজও বাংলার পাঠক-পাঠিকার কাছে তাঁর ঠিকানার পরিচয় দিচ্ছি, ইনি সপ্তাহে দুবার করে বাংলা আকাশে ওঠেন।
বাসন্তী ২রা ভাদ্র, ১৩২৯ সংখ্যায় প্রকাশ করে—
আমরা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ উপহার পাইয়াছি। ‘ধূমকেতু’ জাতির ও দেশের বাধা বিঘ্ন জড়তা ধ্বংস করিয়া দেশে নূতন প্রাণের উৎস আনয়ন করুক আমরা এই প্রার্থনা করি। চারণ কবির দেশ-মাতান সঙ্গীত ‘ধূমকেতু’র আড়ালে উজ্জ্বল হইয়া ফুটিয়া উঠুক।
…কাজী নজরুল ইসলাম বাংলার সাহিত্যে ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছেন। তাঁহার কলমের জোর আছে, তাঁহার কবিতায় তুবড়ি ছুটে—কথায় আগুন জ্বলে—ভাবে বান ডাকে—ভাষায় ঝলক দেয়। তাঁহার লেখনী যেন কষাঘাত খাইয়া বঙ্গাহীন উন্মত্ত অশ্বের মত ছুটিয়া চলে। ‘ধূমকেতু’র পুচ্ছাঘাতে অনেকেরই চমক ভাঙ্গিবে, নেশা অনেকেরই টুটিবে। কাজেই অত্যাচারী সাবধান হউন।
বিজলী ভাদ্র ৮, ১৩২৯ সংখ্যায় লিখেছিল—
…কবির ‘ধূমকেতু’ ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ কবিতা যেন নিদ্রা-ব্যাধিগ্রস্ত জাতির অঙ্গে জাগরণী ইঞ্জেকশন। এছাড়া প্রবন্ধগুলোও নির্ভীক ও সতেজ। দেশের ও বিদেশের খবর বেশ সুন্দর সরস করে দেওয়াতে ‘ধুমকেতু’র জ্বালা বেশ উপভোগ্য হয়েছে। আমরা আশা করি এই জ্বালায় জ্বলে দেশবাসী যত অসত্য যত আবর্জনা সব পুড়িয়ে দেবে।
এছাড়া ‘হিতবাদী’, ‘সত্যবাদী’, ‘প্রসূন’, ‘পরিদর্শক’ প্রভৃতি কাগজ প্রশংসা করেছে।
‘ধুমকেতু’ অল্প সময়ের মধ্যে যেমন জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল তেমনি সাহিত্য ও সাংবাদিক মহলে এর বিরুদ্ধাচরণ করার মতো লোকেরও অভাব ছিল না। নজরুলের জীবনের মতো ‘ধূমকেতু’র ভাগ্যেও নির্ভেজাল প্রশংসাই জুটেনি, নিন্দাও জুটেছে। নিন্দার সঙ্গে কটুক্তি ইতরভাষা প্রয়োগও হয়েছে, কালিমালেপন করে চরিত্র হননের চেষ্টাও কম হয়নি। সমকালীন পত্রিকাগুলো তার সাক্ষী—
ইসলাম-দর্শন, আশ্বিন, ১৩২৯ সংখ্যা সায়েফুল ইসলাম ‘ধুমকেতু’ প্রসঙ্গে লিখেন—
…ইহা বাঙ্গালার কুশিক্ষিত তরুণ-তরুণীর চির-চঞ্চল চিত্তাকাশ-বিচরণকারী একখানি অর্ধ সাপ্তাহিক ব্যঙ্গপত্র! অর্থাৎ শ্লেষ-বিদ্রপ, ঠাট্টা তামাশা, স্বেচ্ছাচার ও অনাচারের একটি জীবন্ত অপগ্রহ। তবে নাম-মাহাত্ম্যে ‘ধূমকেতু’র এই নব অবতার ধর্ম ও নীতিদ্রোহিতায় এবং দেশ সমাজের অনিষ্টকারিতায় প্রকৃত ধূমকেতু হইতেও অধিক ভয়ঙ্কর! বাঙ্গালার সাময়িক সাহিত্যাকাশের এই নব ‘ধূমকেতু’ সপ্তাহে দুই বার করিয়া পরিদৃশ্যমান হইবে। ইহার ‘সারথী’ বা সম্পাদকের নাম কাজী নজরুল ইসলাম—অর্থাৎ একজন মুসলমান!
…ধর্ম-জগতে এবং সমাজ-সংসারেও অনেক সময় অনেক ধূমকেতুর আবির্ভাব হইয়াছে। কিন্তু কালে একটু বিদ্রোহ-বিপ্লব ও উৎপাত-উপদ্রব ছাড়া সেগুলি আর কিছুই করিতে পারে নাই। সনাতন ধর্ম-সমাজ যেমন ছিল, ঠিক তেমনই আছে; মাঝে থেকে ধূমকেতুরাই ললাটে কলঙ্কের কালিমা এবং মস্তকে অভিশাপের পশরা লইয়া জগৎ-সংসার হইতে চির বিদায় গ্রহণ করিতে বাধ্য হইয়াছে। এ ধূমকেতুর ভাগ্যেও ঠিক সেই পরিণতিই ঘটিবে—তা তিনি ‘শয়তানের মিতা’ই হউন কিংবা স্বয়ং ‘শয়তান’ই হউন;—আমাদের ভ্রুক্ষেপ করিবার কিছুই নাই। কারণ অমুসলমানের কথা বলিতে পারি না…কিন্তু দুষ্টাত্মা অভিশপ্ত শয়তানকে কেমন করিয়া বিতাড়িত ও দূরীভূত করিতে হয়, তাহা মুসলমানেরা ভাল মতই অবগত আছেন।–
ইসলাম-দর্শন, কার্তিক, ১৩২৯ সংখ্যায় সম্পাদক ‘মিঠেকড়া’ শিরোনামে লিখেন—
ইসলাম-দর্শনের গত আশ্বিন সংখ্যায় আমরা অমঙ্গলের অগ্রদূত ‘ধূমকেতু’ ও উহার স্বেচ্ছাচারী ‘সারথি’র সম্বন্ধে একটু সমালোচনা করিয়াছিলাম। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল ধর্মনীতি বিবর্জিত ‘ধূমকেতু’কে সতর্ক ও সংযত করা। কিন্তু তাহার পর হইতে ‘ধূমকেতু’র ধর্মদ্রোহিতা এবং উহার স্বেচ্ছাচারিতা এত বাড়িয়া গিয়াছে, ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ ও ‘ভৃগু-বন্দনা’ হইতে আরম্ভ করিয়া ‘মা ভৈঃ’, ‘ব্যোম কেদার—ব্যোম ভোলানাথ’, ‘হল বলরাম স্কন্ধে’, ‘বোল হরি-হরি বোল’ প্রভৃতি কোফরী কালাম তাহার মুখ দিয়া অনর্গল এত অধিক পরিমাণে নির্গত হইতেছে যে, আমরা বাধ্য হইয়া ভাবিয়াছিলাম, যবন হরিদাসের এরূপ উৎকট অবতারকে সমালোচনা করিয়া সংযত করিবার চেষ্টা করা পণ্ডশ্রম মাত্র! সেই জন্য ঐ শ্রেণীর পদার্থ বা ঐ জাতীয় জীবের আর কোন সমালোচনা করিব না বলিয়াই স্থির করিয়াছিলাম। কিন্তু দুষ্ট ‘ধূমকেতু’ ও উহার দুর্বিনীত সারথি এখন কেবল হিন্দু পুরাণের চর্বিত চর্বণে ক্ষান্ত না থাকিয়া পবিত্র ইসলাম ধর্ম ও ইসলামী শরা-শরীয়তের উপর পর্যন্ত শয়তানী আক্রমণ আরম্ভ করিয়া দিয়াছে। তাই ধর্মপ্রাণ মুসলমান সমাজ চঞ্চল ও অধীর হইয়া উঠিয়াছেন। আমরা দুরাচার ‘ধুমকেতু’র ধর্মহীনতা এবং উহার অনাচারী সম্পাদকের স্বেচ্ছাচারিতা সম্বন্ধে অনেকগুলি প্রতিবাদ পাইয়াছি।…
ইসলাম-দর্শন, কার্তিক, ১৩২৯ সংখ্যা ‘লোকটা মুসলমান না শয়তান?’ শিরোনামে মুনশী মোহাম্মদ রেয়াজুদ্দীন আহমদ লিখেন—
…যখন ‘ধূমকেতু’ প্রথম উদয় হয়, এবং বসরা-প্রত্যাগত উদ্দাম যুবক ‘হাবিলদার’ কাজী নজরুল ইসলামকে উহার ‘সারথি’ বলিয়া জানিতে পারি, তখনই বুঝিয়াছিলাম, ‘ধূমকেতু’ মোসলেম-গগনে প্রকৃত ধূমকেতু রূপেই উদয় হইতেছে। ‘মোসলেম ভারতে’র ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়ই কাজীর কারামৎ জাহির হইয়াছিল। তারপর ‘ধূমকেতু’ প্রত্যেক সংখ্যায় পবিত্র ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে গরল উদ্গীরণ করিতেছে। এই উদ্দাম যুবক যে ইসলামী শিক্ষা আদৌ পায় নাই, তাহা ইহার লেখার পত্রে-পত্রে ছত্রে-ছত্রে প্রকাশ পাইতেছে। হিন্দুয়ানী মাদ্দায় ইহার মস্তিষ্ক পরিপূর্ণ। হতভাগ্য যুবকটি ধর্মজ্ঞান সম্পন্ন মুসলমানের সংসর্গ কখনও লাভ করে নাই; অন্ততঃ সেটুকু লাভ করিলেও পবিত্র ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে স্বীয় পৈশাচিক খড়গ উত্তোলন করিত না। থাকুক তাহার লেখার যথেষ্ট শক্তি, হউক সে বিখ্যাত কবি, তজ্জন্য মুসলমানের গৌরব করিবার কিছুই নাই।… দুঃখের বিষয় অজ্ঞান যুবক এখনও আপনাকে মুসলমান বলিয়া পরিচয় দিতেছে। গত ৩০শে আশ্বিনের ১ম বর্ষ ১৪শ সংখ্যা ‘ধূমকেতু’তে ‘কামাল’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ প্রথমেই ছাপা হইয়াছে। তাহার একটু নমুনা এ স্থলে উদ্ধৃত করিয়া এবং আমাদের যৎকিঞ্চিৎ মন্তব্য লিখিয়া পাঠকবর্গের কৌতূহল নিবারণ করিতেছি। ‘এতদিন দুঃখ হতো যে, এই হিজড়ে নপুংসকগুলোর মুখ দেখে মরবার পাপে হয়ত আবার শুয়োর হয়ে জন্মাতে হবে।’
কাজীর পো’র যখন পুনর্জন্মের বিশ্বাসটা এত দৃঢ়, আর ‘হিজড়ে নপুংসকগুলোর মুখ দেখেই তাকে নিশ্চয় মরতে হবে’—কারণ মরণ কালে মহাবীর মোস্তফা কামাল পাশার মুখ দর্শন বা পদ দর্শন তাহার ভাগ্যে নিশ্চয়ই ঘটবে না, তখন তাহার শূয়োর রূপে পুনর্জন্ম গ্রহণ (তাহার নিজের উক্তি মতে) নিশ্চয়ই হইবার কথা।
…যে ব্যক্তি ইংরেজ প্রদত্ত ‘হাবিলদার’ উপাধিরূপ ‘লানতের তবক’ গলায় পরিয়া যে নিজেকে বেহায়ার মত ‘সৈনিক’ বলিয়া আস্ফালন ও বড়াই করে, তেমন মোসলেম-শত্রুর আস্পর্ধা দেখিয়া লজ্জায় অধোবদন হইতে হয়।
…নরাধম ইসলাম ধর্মের মানে জানে কি? খোদাদ্রোহী নরাধম নাস্তিকদিগকেও পরাজিত করিয়াছে। সে খোদাতালাফে রাম, কৃষ্ণ, বা নানক, চৈতন্য কিংবা বাইবেলের সদাপ্রভু পাইয়াছে কি যে, তাঁহার ‘পিলে চম্কিয়ে’ দেওয়া হইবে? লোকটা শয়তানের পূর্ণাবতার। ইহার কথা আলোচনা করিতেও ঘৃণা বোধ হয়। দুর্মতি তারপর মোটা মোটা হরফে ছাপিয়েছে—‘ইসলামের বিশেষত্ব তলোয়ার, দাড়িও নয়, নামাজ রোজাও নয়।’
একটা ধর্মজ্ঞানশূন্য বুনো বর্বরের নিকট—অকাট মূর্খের নিকট আর কি আশা করা যাইতে পারে?... এইরূপ ধর্মদ্রোহী কুবিশ্বাসীকে মুসলমান বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে না, পুনর্জন্ম-বিশ্বাসী কাফের বলিয়াই পরিগণিত হইবে।
ডাকাতের হাতে অস্ত্র, মর্কটের হাতে খন্তা, আর অকাল কুষ্মাণ্ডের হাতে কলম পড়িলে যা হয়, এ ক্ষেত্রে তাহাই হইয়াছে।
দুঃখের বিষয় একদল ধর্মজ্ঞানশূন্য মুসলমান ‘ধূমকেতু’র এই সকল শয়তানী ও পৈশাচিক উক্তি পাঠ করিয়া লেখককে ‘বাহবা’ দিয়া তাহার মাথাটা বিষম বিগড়াইয়া দিয়াছে। তাহাতে উহার বুকের পাটা আরও বাড়িয়া গিয়াছে। কলমের মুখে যাহা আসিতেছে, তাই লিখিতেছে। খাঁটি ইসলামী আমলদারী থাকিলে এই ফেরাউন বা নমরুদকে শূলবিদ্ধ করা হইত বা উহার মুণ্ডপাত করা হইত নিশ্চয়।
‘ধূমকেতু’ পত্রিকার মাধ্যমে কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যে তীব্র প্রতিবাদ ও স্বাধীনতার আহ্বান উচ্চারণ করেছিলেন, তা শাসকগোষ্ঠীকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তোলে। পত্রিকাটির প্রতিটি সংখ্যায় অন্যায়, শোষণ, পরাধীনতা ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সাহসী ভাষায় লেখা সম্পাদকীয়, কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হতো। এসব লেখায় দেশবাসী, বিশেষ করে তরুণ সমাজকে স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের আহ্বান জানানো হতো। ফলে ব্রিটিশ সরকার ‘ধূমকেতু’কে একটি বিপজ্জনক জাতীয়তাবাদী পত্রিকা হিসেবে বিবেচনা করে বিধায় পত্রিকটি অচিরেই সরকারের কুদৃষ্টিতে পড়ে যায় এবং এর ওপর কঠোর নজরদারি শুরু করে। গোয়েন্দা বিভাগ নিয়মিতভাবে পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যা পরীক্ষা করত এবং নজরুলের কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করত। পুলিশের হাঙ্গামা এড়ানোর জন্য ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটের বাড়ির মালিক ধূমকেতু প্রকাশে আপত্তি জানায়। ফলে ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ২রা সেপ্টেম্বর (শনিবার, ১৬ ভাদ্র ১৩২৯), ধূমকেতুর অফিস ৭ প্রতাপ চাটুজ্যে লেনে স্থানানান্তর করা হয়।
শাসকগোষ্ঠীর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল নজরুলের বিখ্যাত কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’। ১৯২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, ৯ আশ্বিন ১৩২৯ এ প্রকাশিত ‘ধূমকেতু’র শারদীয় সংখ্যায় কবিতাটি প্রকাশিত হয়। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ উল্লেখযোগ্য অংশ—
আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি-চাঁড়াল।
দেব শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, —আসবি কখন সর্বনাশী?
… … … …
মাদীগুলোর আদি দোষ ঐ অহিংসা বোল নাকি-নাকি
খাঁড়ায় কেটে কর মা বিনাশ নপুংসকের প্রেমের ফাঁকি।
… … … …
ঢাল তরবার, আন মা সমর, অমর হবার মন্ত্র শেখা,
মাদীগুলোয় কর মা পুরুষ, রক্ত দে মা রক্ত দেখা।
… … … …
অনেক পাঁঠা-মোষ খেয়েছিস, রাক্ষসী তোর যায়নি ক্ষুধা,
আয় পাষাণী এবার নিবি আপন ছেলের রক্ত-সুধা।
… … … …
দুর্বলেরে বলি দিয়ে ভীরুর এ হীন শক্তি-পূজা
দূর করে দে, বল মা, ছেলের রক্ত মাগে দশভুজা।
… … … …
‘ময় ভুখা হুঁ মায়ি’ বলে আয় এবার আনন্দময়ী
কৈলাশ হতে গিরি-রাণীর মা দুলালী কন্যা অয়ি!
এখানে দেবী দুর্গার আগমনের প্রতীকী চিত্রের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের আহ্বান জানানো হয়েছিল। কবিতার ভাষা ছিল অত্যন্ত তেজস্বী, বিপ্লবী এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উজ্জীবিত। ব্রিটিশ সরকার এই কবিতাকে রাষ্ট্রবিরোধী ও বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করে। ফলে কবিতাটি প্রকাশের পর ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয় এবং প্রশাসন দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়।
এরই ধারাবাহিকতায় কাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়। ফলস্বরূপ, ব্রিটিশ সরকার পত্রিকার এ সংখ্যাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং ১২৪ (ক) ও ১৫৩ (ক) ধারায় স্থিতাবস্থা নষ্টে ইন্ধনের অভিযোগে নজরুলকে ১৯২২ সালের নভেম্বরে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বিচার শেষে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারাগারে থেকেও নজরুল অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন। তিনি বন্দিদের প্রতি বৈষম্যের প্রতিবাদে দীর্ঘ অনশন পালন করেন, যা সমগ্র দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং তাঁকে স্বাধীনতার সংগ্রামের এক সাহসী প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
নজরুলের গ্রেপ্তারের পর ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার প্রকাশনা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ব্রিটিশ সরকার শুধু এই পত্রিকাই নয়, বরং অন্যান্য জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রের ওপরও কঠোর সেন্সরশিপ ও দমননীতি আরোপ করে। সংবাদপত্র বাজেয়াপ্ত করা, সম্পাদকদের হয়রানি, প্রকাশনা নিষিদ্ধ করা এবং রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেপ্তার ছিল তাদের নিয়মিত কৌশল। কিন্তু এসব দমনমূলক পদক্ষেপ স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে স্তব্ধ করতে পারেনি। বরং ‘ধূমকেতু’ ও নজরুলের সংগ্রাম বাঙালির জাতীয় চেতনা, স্বাধীনতার স্পৃহা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শক্তিকে আরও সুদৃঢ় করে তোলে। পরবর্তীকালে এই পত্রিকা ও এর সম্পাদকীয় আদর্শ ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে ‘ধূমকেতু’ নির্ভীক সাংবাদিকতার এক অনন্য মাইলফলক। ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় প্রকাশিত এই অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা কেবল একটি সাহিত্যপত্র ছিল না; বরং এটি ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় চেতনা, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক ন্যায়বোধের এক শক্তিশালী মুখপত্র। আয়ুষ্কাল স্বল্প হলেও ‘ধূমকেতু’ বাংলা সাংবাদিকতা, সাহিত্য এবং ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করেছে।
বাংলা সাংবাদিকতায় প্রতিবাদী ধারার প্রতিষ্ঠায় ‘ধূমকেতু’র অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ব্রিটিশ শাসনের ভয়ভীতি ও সেন্সরশিপ উপেক্ষা করে নজরুল এই পত্রিকায় স্বাধীনতার দাবি, শোষণবিরোধী বক্তব্য এবং সামাজিক সাম্যের আদর্শ প্রকাশ করেন। সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ, কবিতা ও রাজনৈতিক নিবন্ধে তিনি আপসহীন ভাষায় অন্যায়ের প্রতিবাদ জানান। এর ফলে ‘ধূমকেতু’ কেবল সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম না থেকে জনস্বার্থ রক্ষায় নিবেদিত সংগ্রামী সাংবাদিকতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে পত্রিকাটির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘ধূমকেতু’র প্রতিটি সংখ্যা দেশবাসীর মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, আত্মমর্যাদাবোধ এবং প্রতিরোধের চেতনা জাগিয়ে তুলতে সচেষ্ট ছিল। বিশেষত ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতায় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর সরকার নজরুলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনে এবং তাঁকে কারারুদ্ধ করে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে ‘ধূমকেতু’ ব্রিটিশ সরকারের কাছে কতটা প্রভাবশালী ও ভীতিকর হয়ে উঠেছিল।
পরবর্তী প্রজন্মের সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদদের জন্য ‘ধূমকেতু’ এক অনুপ্রেরণার উৎস। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে নির্ভীক অবস্থান, মানবমুক্তির আদর্শ এবং সাহিত্যকে সমাজ-পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে ব্যবহারের যে দৃষ্টান্ত নজরুল স্থাপন করেন, তা পরবর্তী বাংলা সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চায় গভীর প্রভাব ফেলে। আধুনিক অনুসন্ধানী ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা বিকাশেও ‘ধূমকেতু’র আদর্শ প্রাসঙ্গিক বলে বিবেচিত হয়।
স্বাধীনতার ইতিহাসে ‘ধূমকেতু’ আজ এক মূল্যবান ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃত। এর প্রকাশিত সম্পাদকীয়, কবিতা ও নিবন্ধসমূহ তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা, ঔপনিবেশিক দমননীতি এবং স্বাধীনতাকামী জনগণের সংগ্রামী চেতনার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে। তাই নজরুল গবেষকদের মতে, ‘ধূমকেতু’ শুধু একটি পত্রিকা নয়; এটি জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল এবং নির্ভীক প্রতিবাদী বাংলা সাংবাদিকতার এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
পরিশেষে এ কথা স্পষ্টভাবেই বলা যায় ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ, বিরোধিতা সত্ত্বেও ‘ধূমকেতু’ কেবল একটি সাময়িক পত্রিকা ছিল না; এটি ছিল একটি আন্দোলন, একটি গণচেতনা এবং স্বাধীনতার অগ্নিশিখা। এর মাধ্যমে কাজী নজরুল ইসলাম নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করেছিলেন এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের ভাষা নির্মাণ করেছিলেন। জনমনে স্বাধীনতার জাগরণ সৃষ্টি করা এবং শাসকগোষ্ঠীকে শোষক হিসেবে চিনিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়েই ‘ধূমকেতু’ বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় স্থান অধিকার করেছে।
তথ্য নির্দেশিকা
১। বাংলা সাহিত্যে নজরুল: আজহারউদ্দিন খান, সুপ্রীম পাবলিশার্স, কলকাতা; ১৯৯৭
২। কবি কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সৃজন, রফিকুল ইসলাম, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট; ২০১২
৩। কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি কথা: মুজফ্ফর আহমদ: কবি প্রকাশনী, ঢাকা; ২০২৪
৪। যুগস্রষ্টা নজরুল: খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন, জোনানী প্রকাশনী, ঢাকা; ২০১৬
৫। বাংলা বিভাজনের অর্থনীতি-রাজনীতি: সুনীতি কুমার ঘোষ, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ;২০০৮
৬। সমকালে নজরুল ইসলাম: মুস্তাফা নূরউল ইসলাম; বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি; ১৯৮৩
৭। নজরুলের ধুমকেতু সংগ্রহ ও সম্পাদনা: সেলিনা বাহার জামান, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট ২০১৯



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন