মানবজীবনের একক ভুল বলে কিছু নাই!
‘মানুষ কেন ভুল করে’—প্রশ্নটি পুরোনো এবং ক্লিশে। হয়তো কারো কারো জীবনে এটি বড় আত্মজিজ্ঞাসার জায়গা। বাঙালি লেখক সরদার ফজলুল করিমকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনার দীর্ঘজীবনে কোনো ভুল আছে কিনা।’ জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার জীবনে কোনো ভুল নেই। জীবনের চ্যুতি-বিচ্যুতি যা আছে তা সবই অভিজ্ঞতা।’ ভুল প্রশ্নে ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজে যে খুব সদুত্তর পেয়েছি, তা বলা যাবে না। প্রচলিত সমাজের সাধারণ বিবেচনায় ভাবা হয়—বিত্তবান মানুষ মাত্রই সফল। তাদের জীবনে ‘ভুল’ নাই বললেই চলে। প্রতিপত্তি, ক্ষমতা আর বিত্ত-বেসাতি দিয়ে আমাদের বিদ্যমান সমাজে এমন সফলতা মাপার চল। আর এও ভাবা হয়—অসফল মানুষের জীবন ভুলে ভরা। ভুলগুলো যথাযথভাবে শোধরাতে পারে না বলেই তারা অসফল। সমাজ কিংবা পরিবার দোষ দেয়—তারা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। ফলে ভুল করেন। যে যুক্তির নিক্তি ধরে সমাজ সাধারণ সফলতার বিচার করে সেটাও ভুলে ভরা। কারণ ক্ষমতা মানুষকে আরাম দেয়, কিন্তু ভবিষতের স্বস্তি বা সুখ দেয় না। একটি সাধারণ প্রশ্ন সামনে আনলে ভুলের রূপটা দেখা যাবে। প্রশ্নটি হলো—প্রতিপত্তি, ক্ষমতা আর বিত্ত-বেসাতির যিনি মালিক তিনি কি সুখি? সে এক জটিলতর ব্যাপার-স্যাপার। উত্তরও সহজ লভ্য নয়!
একটা ঘটনা দিয়ে বিশদ করা যাক। একা একা ধ্যান করা আমার ছেলেবেলার অভ্যেস। একা একা চুপচাপ ভাবা। আপন অধরা চিন্তাকে ভাষায় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য করা। নিজের আত্মজিজ্ঞাসার উত্তর খোঁজা। প্রচলিত যুক্তির বাইরে যে প্রজ্ঞা, তার সন্ধান করা। বস্তুগত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাকে বোঝা। বস্তুর কাছে সমর্পিত না হয়ে অসীমের কাছে যাওয়া। অপরূপ সুন্দরের অমিত ভবিষ্যতের কৃৎকৌশলকে জানা। অনুসন্ধানী মনের জন্য আমি এসব টের পেয়েছিলাম খুব অল্পবয়সে। ছাত্রাবস্থায় আমি কত যে ধর্মালয়ে গিয়েছি, সেখানকার সাহিত্য-চিন্তা পড়ার, বোঝার চেষ্টা করেছি, তার ইয়ত্তা নাই। বাইবেল স্কুলে কিছুদিন পড়েছিলাম জানাবোঝার জন্য। এবং এও বুঝেছিলাম—সাংস্কৃতিকভাবে ধ্যানের সূত্রধর হলো ধর্মালয়। কারণ ধর্মের ধর্মই হলে অধরাকে ধরা। যা বন্তুতে নাই, অতীন্দ্রিয়—তাকে ভাষায় বাগে আনা। যার মূখ্য রূপ হলো ধ্যান। যাই হোক, সে এক ভিন্ন বিষয়! রূপান্তরের রহস্যময় খেলা। তবে ধ্যানে এক ধরনের সুখ আছে। এই সুখ বস্তুর অধিক সত্য।
একবার আমি আনুষ্ঠানিক বিদ্যার মতো ধ্যানের আখড়ায় যুক্ত হয়েছিলাম। সেখানে যারা ধ্যানে মগ্ন হতেন—তাদের সিংহভাগই উচ্চবিত্ত পরিবারের, নিম্ন এবং উচ্চ-মধ্যবিত্ত কিছুটা কম। যিনি এই অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন তিনি অত্যন্ত সজ্জন ও জ্ঞানীজন। ধ্যানে যারা অংশগ্রহণ করতেন, তারা অনেকটাই এক পরিবারের মতোই থাকতেন। ধ্যানপর্ব শেষে একদিন গুরুকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা এখানে যারা মেডিটেশন করেন, তারা নিম্ন বা মাঝারি বিত্তের, তাদের অসুখের মূল কারণ অভাব। মানে ইহজাগতিক বস্তুগত অভাব। তাদের অসুখের কারণ সফেদ হৃদয়ের মতো ধবধবে! কিন্তু যারা উচ্চবিত্ত তাদের অসুখ কোথায়? তিনি উত্তরে বললেন, ‘তাদের তরল ও গরল সম্পদ এত বেশি, এই সম্পদ তাদের ঘুমাতে দেয় না।’ মনে হলো—সামান্য হলেও আমি প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছি! ‘অসুখ’ শব্দের বদলে ‘ভুল’ বসালেই উত্তর খানিকটা প্রশমিত হয়। প্রিয় পাঠিকা—আপনারাও কি ভিন্ন কিছু টের পেলেন?
যে সমাজে আমার জন্ম, সে সমাজ সামান্য পশ্চাৎপদ ছিল না। তবে সমাজটা ছিল বিকাশমান। এমন সমাজে দুয়েকটি পরিবার থাকে, যারা সমাজের আলোকবর্তিকার মতোন। আমাদের যৌথ পরিবারও স্বল্প-রকমের তেমনই বলা চলে। পরিবারে ছিল কৃষিনির্ভর সচ্চলতা, একই সঙ্গে পড়াশোনায় অগ্রসর। শহর-গ্রাম মিলিয়ে আমাদের পরিবারের জীবনযাত্রা চলত। পরিবারের ভেতর বাঙালি মুসলমান সমাজের বিকাশমান একটা প্রগতি আমরা দেখেছি। মননে-চিন্তায় আধুনিক, চলনে-বলনে অভিজাত! একই সঙ্গে রাজনীতি সচেতন। পরিবারের কেউ সাহিত্য চর্চা, কেউ প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। সে এক অন্য আলাপ! তো সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমাদের পরিবারে এক দুর্ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রাম শহরে আমার আম্মা ভয়াবহ দুর্ঘটনায় কবলে পড়েন। হাসপাতালে দীর্ঘদিন তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন। প্রায় ৬ মাসের অধিক সময় চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হন। পরিবারের এই সংকটকালে আমি ও আমার ছোটবোনকে লালন-পালনের পাঠানো হয় গ্রামের বাড়িতে, বড়-মা মানে জেঠি-মা’র কাছে। সংক্ষেপে আমরা বলতাম—‘বড্ডামা’। আর বড় চাচাকে ডাকতাম—‘বাবু’। আম্মার অনুপস্থিতিতে বড়-মা আমাদের ভাইবোনেকে আপন সন্তানের মতোই লালন-পালন করেছেন। ভাল দিক যেটা—যৌথপরিবারে পরস্পর পরস্পরের প্রতি এমন স্নেহ, শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য আর সম্প্রতি ছিল আমরা কখনো বুঝতে পারিনি, কে আমাদের প্রকৃত মা-বাবা! সেই হিসেবে আমরা খুব সৌভাগ্যবান। যেদিন আমাদের যৌথপরিবার পৃথক হলো, সেদিন মনে হয়েছিল আমাদের পৃথিবী টুকরো টুকরো হয়ে গেল! বড়ই বেদনার ছিল সেদিন। মায়েরা সেদিন কেঁদেছিলেন।
যাগ্গে, গ্রামের ফেরার কয়েকদিন পর ‘বাবু’ মানে ‘বড়চাচা’ মুক্তিযোদ্ধা সফি উল্লাহ সাহেব আমাকে স্কুলে নিয়ে গেলেন। আমাকে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি করিয়ে দিলেন সারিকাইত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়টি পুরনো, কিছুটা ঐতিহ্যবাহীও। প্রতিবছর দু’চারজন প্রতিভাবান ছাত্র বের হয় স্কুল থেকে। ফলে সামান্য খ্যাতিও আছে। বিদ্যালয়ে দুই বা তিনমাস ক্লাস করেছি। এমন সময় আমাদের এক শিক্ষক অবাক কাণ্ড করে বসলেন। পুরনো একসেট দ্বিতীয় শ্রেণীর বই দিয়ে বললেন, কাল থেকে আমি ওই শ্রেণীতে পড়ব। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি, কেন এমন হলো? ভয় পেয়েছিলাম, আমার কি কোনো ভুল হলো? আমার ছোট চাচাও শিক্ষকতা করতেন। তিনি খবর নিলেন। শিক্ষকরা জানালেন, ‘আমার জানা-বোঝা অন্য শিশুদের চেয়েও বেশ ভাল। ফলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে আমার সমস্যা হবে না।’ আমার প্রাথমিক শিক্ষাটা হয়েছিল পরিবারেই, আমার ‘বড়বাবু’র হাতে। ওনার মতো পড়ুয়া ও প্রাজ্ঞলোক আমি খুবই কম দেখেছি। দেশি-রুশি-চীনা সাহিত্যের বাইরে দর্শন, গণিত ও বিজ্ঞানের প্রচুর বই ছিল তার। প্রিয় বিষয় ছিল সাহিত্য আর গণিত। যতদিন বেঁচেছিলেন, বার্ষিক পরীক্ষার পর ছুটির সময়ে তিনি আমাকে নিজের সঙ্গে রাখতেন। সকালে অফিসে যাওয়ার সময় সঙ্গে নিয়ে যেতেন। বাসার বাইরে ওখানেও পড়াতেন। অদ্ভুত পদ্ধতিতে সারাবছরের পড়ার সূত্রগুলো একমাসেই ধরিয়ে দিতেন। আর সাহিত্য পড়া তো আছেই! পড়া বা শেখা যে কত আনন্দদায়ক সেটা তিনিই শিখিয়েছেন।
দ্বিতীয় শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার আগে চিকিৎসা শেষে আম্মা গ্রামের বাড়িতে আসলেন। তখনো তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি। ফলে আম্মা সারাবেলা আমার পড়াশোনা আর দেখাশোনা শুরু করলেন। আম্মার এত কঠোর শাসন কখনো ভোলা যাবে না। আম্মাকে সাংঘাতিক ভয় পেতাম। আম্মা ছিলেন রাজ-সিংহীর মতো একজন প্রাজ্ঞ নারী। গ্রামের মাতাব্বরদের দেখতাম আম্মার সামনে আসলে কেমন জানি যেন সমীহ করে কথা বলতেন। এও দেখেছি, আমাদের গ্রামের দরিদ্র মুসলিম মহিলা, অন্য সম্প্রদায়ের কাঁহার, শীল, জলদাসরা আম্মার কাছে প্রতিদিন কেউ না কেউ এসে বসে বসে থাকতেন। সুখ-দুঃখের কথা বলতেন। আম্মার কাজ করে দিতেন। আম্মা মমতা দিয়ে তাদের সুখে-দুখে নানা সহযোগিতা করতেন। আম্মার অসম্ভব বুদ্ধিবৃত্তিক সম্মোহনী ক্ষমতা ছিল। তবে আম্মা আমাকে গ্রামের অপরাপর ছেলেদের সঙ্গে মিশতে দিতেন না। মিশলে যেন মিয়াবংশের মেয়ের আভিজাত্য নষ্ট হয়ে যাবে! আসলে তিনি ভাবতেন, যার-তার সঙ্গে মিশলে ছেলে বরবাদ হয়ে যাবে! আম্মার এমন কঠোর শাসন ভুল না সঠিক কখনো ভাবিনি! হয়তো আম্মাও সঠিক ছিলেন। সত্যিকারার্থে—আমার সুপ্ত প্রতিভাকে তিনিও ছেঁকে-ছেনে বের করতে চেয়েছিলেন। অথবা আমি ব্যর্থ এক সন্তান, আম্মা আমাকে নিয়ে যা স্বপ্ন দেখতেন, আমি কখনো সে আশা পূরণ করতে পারিনি! মৃত্যুর আগেও আম্মা দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘তোমার জন্ম প্যারিসে হলে ভাল হতো!’ হয়তো এসব—সবই ভুল!
সে যাই হোক, দ্বিতীয় শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষায় আমি ক্লাসে প্রথম হই। দ্বিতীয় হয় মার্কিন প্রবাসী আমার প্রিয় বন্ধু শাহাদাৎ হোসেন কিসলু। ফলে তৃতীয় শ্রেণীতে শিক্ষকরা আমাকে ও তাকে একটু অধিক তদারকির মধ্যে রাখতেন। ক্লাসের বাইরে সাধারণ কিছু পড়াশোনায় অন্যদের এগিয়ে থাকতাম বলে, হয়তো এমন। নাকি, আমার ভেতরে প্রতিভার কণা দেখতে পেয়েছেন, জানি না! তৃতীয় শ্রেণীতে আমাদের অংক করাতেন মতিন স্যার। ডাক্তারি পাশ না করলে তিনি গ্রামের নামজাদা ডাক্তার ছিলেন। স্কুলে তিনি ডাক্তারি ব্যাগ নিয়ে আসতেন। স্কুল শেষে গ্রামের মানুষদের চিকিৎসা দিতেন। তো অংকের ক্লাশে তিনি একদিন হঠাৎ পরীক্ষা নিলেন সবার। ব্লাকবোর্ডে আমাদের ‘একশ টাকা’ কথায় ও সংখ্যায় লিখতে বলবেন। প্রথমে ডাকলেন আমাকে। চক ও ডাস্টার দিয়ে বললেন—একশ লিখো। আমি লিখলাম—সংখ্যায় ‘১০০.০’, আর বানানে ‘একশ ’। স্যার এরপর ক্লাসের সবচে পেছনের ছাত্র এমরান হোসেনকে ডাকলেন। বললেন, ‘একশ ’ লিখো। এমরান লিখল, সংখ্যায় লিখল ‘১০০.০০’, আর বানানে লিখল ‘একশ’’। এরপর স্যার একে একে সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন—কার উত্তর সঠিক? একে একে সবাই বলল—টিপুর! তারপর কিসলু বা অন্য কেউ হবে হয়তো, স্যার তাকে দিয়ে একটা লতানো বেত আনালেন। সবাই তো ভয়ে অস্থির! পিনপতন নিরব ক্লাস! আমাকে আর এমরানকে ডেকে নিয়ে গেলেন টেবিলের কাছে। বেত মোচড়াতে মোচড়াতে হঠাৎ—স্যার পিক করে হেসে দিলেন। এবং বললেন, ‘আজকে মাফ করে দিলাম! তোমরা সবাই ভুল উত্তর দিয়েছো!’ বললেন, ‘টিপুর সংখ্যায় একটা শূন্য কম আছে। এখানে এমরানেরই উত্তরই সঠিক।’
যৌথপরিবারে একমাত্র ছেলে বলে মাত্রারিক্ত স্নেহ-ভালোবাসা পেয়েছি। সেদিন বাড়ি ফিরে স্কুলের ব্যাগ রেখে সবাই যেখানে খোশগল্প করছেন, আমি সেখানে যাই। ‘বড় আপা’ মানে জেঠাতো বোন শাহানা আপা আদর করে আমাকে কোলে তুলে নিলেন। আমি ছটফট করে নেমে ‘বড় আপা’র গালে কষে একটা চড় বসিয়ে দেই। ঘরের সবাই তাজ্জব! আপা ভেবেছিলেন, আমি হাতে ব্যথা পেয়েছি হয়তো! বললেন, ‘হাতে ব্যথা পেয়েছো?’ বললাম, ‘না। তুমি আমাকে কবিতা পড়িয়েছো, অংক পড়াওনি কেন? আমি তো ক্লাসে অংক পারিনি!’ আপা জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ওরে লক্ষ্মী সোনা!’ সবাই হেসে বলল—‘এটা কোনো সমস্যা না! তুমি পারবে সামনে!’ অংকের এমন ‘অমায়িক ভুল’ আমি জীবনে কখনো ভুলতে পারিনি। সেদিন ক্লাসের বন্ধুরা আমার ‘অমায়িক ভুল’কে সমর্থন করেছিল কেন জানি না! ধারণা করেছিলাম, ক্লাসের ভাল ছাত্র কিসলু হয়তো আমার ভুলটা ধরিয়ে দিয়ে সঠিক উত্তর দেবে। অথচ সঠিক উত্তরটা দিল এমরান। এরপর এমরানের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বও হয়। গ্রামের অসচ্চল কৃষক পরিবারের ভাল মনের ছেলে এমরান। সে মাঝে মাঝে তাদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ফল-ফলাদি আপ্যায়ন করাতো। বহুদিন আমি ভেবেছি, এমরান কিভাবে ক্লাসে সঠিক উত্তর লিখেছিল? একদিন জিজ্ঞেসও করেছিলাম, কিভাবে সঠিক উত্তর পারলে তুমি? এমরান বলল, ‘হাটবারে একবার সে ও তার বাবা ১০০ টাকার সবজি বিক্রি করেছিল।’ সে নিয়মিত তার বাবার সঙ্গে কৃষিকাজ করত। সপ্তাহে দুদিন হাটবারে সবজি বিক্রি করতে যেত। জীবন-সংগ্রামী এমরান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর আর পড়াশোনা করেনি। কেন করেনি কখনো তাকে জিজ্ঞেস করিনি! আসলে মানুষ জীবন থেকে শেখে, ভুলও করে জীবনের প্রয়োজনে।
মানুষের জীবনে একক ভুল বলে কিছু নাই। মানুষের ভুলগুলোও সামষ্টিক। যে মানুষ যে সংস্কৃতির ভেতর গড়ে ওঠে, তার জীবনটাই তেমন হয়। তার জানাশোনা, বোঝাপড়া, লড়াই-সংগ্রাম, অনুশাসন, আচরণ ও অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যে সংস্কৃতির বাতাবরণ সৃষ্টি হয়, সে তেমনই জীবন পার করে। আদতে এর কোনো ব্যতিক্রম নাই। কিন্তু তারপরও কথা থাকে। ১৯৮৩ সালে মৃত্যুর বেশ কয়েক মাস আগে বড় বাবু আমাকে কিছুদিন ‘রাজনৈতিক মতবাদের ইতিহাস’ পড়িয়েছিলেন। তাদের জীবন কেমন, তারা কিভাবে বড় হয়েছেন, তারা কিভাবে চিন্তা করতেন—এসব কিছু। সেখানে জ্যঁ জাক রুশোর একটা উক্তি বারবার পড়ে শুনিয়েছিলেন—‘মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু সর্বত্রই সে শৃঙ্খলিত।’ [Man is born free, and everywhere he is in chains]। যদি শৃংখল ভাঙা যদি মানুষের ‘ভুল’ হয় তাহলে তো মানব জীবনই বৃথা। মানুষ শৃংখল ভাঙে। আবার শৃংখল বানায়। হয়তো রাষ্ট্রের দিক থেকে রুশোর কথায় সত্য আছে। কিন্তু সত্য অন্য কোথাও বিরাজিত—মানুষ তো প্রাকৃতিক জীব। ‘ভুল’ বা ‘সঠিক’ অথবা অন্য কোনো শব্দে অর্থ আরোপ করি না কেন—সবই মানব প্রকৃতির অংশ। এটা তার সাংস্কৃতিক আচরণের অবিচ্ছেদ্য যাপন। না হলে মানব জন্ম বৃথা।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন